সমাজমাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরে ইন্টার্নদের কাজকর্ম ও রিপ্লেসমেন্ট ডিউটি নিয়ে এক আলোড়ন চলছে। সেই সঙ্গে অতিরঞ্জিত, বিভ্রান্তিকর এবং অপপ্রচারমূলক খবরও আমাদের নজরে এসেছে। West Bengal Junior Doctors’ Front চিকিৎসাক্ষেত্রের এই নবীন প্রশিক্ষণরত ভাইবোনদের পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকটি জরুরি কথা স্পষ্টভাবে জানাতে চায়।
প্রথমেই বোঝা দরকার, মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নশিপ আসলে কী এবং সরকারি হাসপাতালগুলিতে ইন্টার্নদের দিয়ে কী কাজ করানো হয়।
MBBS ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর এক বছরের, অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের রোটেটরি ইন্টার্নশিপ করতে হয়। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিকস, পেডিয়াট্রিকস-সহ বিভিন্ন বিভাগে সিনিয়র চিকিৎসকদের অধীনে কাজ দেখে শেখা এবং প্রয়োজনমতো তত্ত্বাবধানে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করাই এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য। অথচ সরকারি হাসপাতালের বাস্তব ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা।
ইন্টার্নদের দিনের একটা বড় অংশ কাটে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে সেন্ট্রাল ল্যাবে পৌঁছে দিতে, রিপোর্ট আনতে, রোগীকে ট্রলি ঠেলে USG-তে নিয়ে যেতে, OT-তে পৌঁছে দিতে কিংবা বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে MRI, CT scan, USG ও Endoscopy-র ডেট নিতে। যে কাজের জন্য কর্পোরেট হাসপাতালে দুটো কম্পিউটার বসিয়ে কয়েক মিনিটে ব্যবস্থা করা সম্ভব, সরকারি হাসপাতালে সেই পরিকাঠামোটুকুও গড়ে তোলা হয়নি। ইন্টার্ন না থাকলে সন্ধ্যায় ওয়ার্ডে ব্লাড রিপোর্ট পৌঁছবে না, রোগীর CT, MRI, USG-এর তারিখ পাওয়া যাবে না, এমনকি প্রয়োজনীয় পরিষেবাও আটকে যেতে পারে।
প্রশ্ন হল, এগুলো কি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কাজ? না। এগুলোর অনেকগুলিই পর্যাপ্ত সহায়ক কর্মী, সঠিক পরিকাঠামো ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবের ফল। বছরের পর বছর সরকার প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ করেনি। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, কলকাতার একটি মেডিক্যাল কলেজে ৩৫০-এর বেশি গ্রুপ ডি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৭২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের নিরিখে কর্মী রয়েছেন প্রায় ২০ শতাংশ। এই ঘাটতির বোঝা এসে পড়ছে পিজিটি ও ইন্টার্নদের উপর। পিজিটিরা অনেক সময় বাধ্য হয়েই ইন্টার্নদের দিয়ে এই কাজগুলি করান, কারণ বিকল্প ব্যবস্থা নেই। সরকার কর্মী নিয়োগ করবে না, অথচ সেই ব্যর্থতার বোঝা বইতে হবে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের।
এবার আসা যাক রিপ্লেসমেন্ট ডিউটির প্রসঙ্গে।
ইন্টার্নদের বছরের ৩৬৫ দিনই কার্যত হাসপাতালের কাজে উপলব্ধ থাকতে হয়। সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা ডিউটি করার কথা থাকলেও কার্যত তার থেকে অনেক বেশি কাজ করতে হয় তাদের, বছরে ১৫ দিন ছুটি ধার্য থাকলেও ছুটি পাওয়া যায়না, মানে আসতে না পারলেও কাউকে না কাউকে সেই কাজ করার জন্যে রিপ্লেস পাঠাতে হবেই, নাহলে হাসপাতাল চলবে না, এমনই কাঠামোগত দুর্বলতা! ফলে, এর মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে, বাড়িতে জরুরি সমস্যা দেখা দিলে, তাঁর পরিবর্তে একই হাসপাতালে কর্মরত কোনও সহকর্মী ডিউটি করলে সমস্যাটা কোথায়? চিকিৎসাব্যবস্থায় বিভিন্ন স্তরে বিকল্প দায়িত্বের ব্যবস্থা থাকে। কোনও প্রফেসর অনুপস্থিত থাকলে অন্য প্রফেসর দায়িত্ব নেন, অধ্যক্ষ অনুপস্থিত থাকলে অন্য কেউ দায়িত্ব সামলান। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিকল্প দায়িত্বের ব্যবস্থাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সচল রাখে। রিপ্লেসমেন্টের ধারণাটি নিজেই কোনও অপরাধ নয়।
অবশ্যই, রিপ্লেসমেন্টের বিনিময়ে টাকা দেওয়া বা নেওয়ার বিষয়টি নৈতিকভাবে প্রশ্নাতীত নয়। কিছু বছর আগে অবধি সহকর্মীর পরিবর্তে ডিউটি করলে অন্য সময় তাঁর প্রয়োজনে ডিউটি ফিরিয়ে দেওয়ার একটা পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল। এখন সেই পারস্পরিক ব্যবস্থার বদলে কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে ডিউটি সামলাচ্ছেন। বিষয়টি অনভিপ্রেত মনে হতে পারে, নৈতিকতার প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু কোনও কাজ নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া আর তা বেআইনি হওয়া এক বিষয় নয়।
যদি কোথাও আইনভঙ্গ হয়ে থাকে, ইন্টার্ন হোক বা পিজিটি, জুনিয়র ডাক্তার হোক বা সিনিয়র, যথাযথ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর যদি অভিযোগ থাকে যে ইন্টার্নদের পরিবর্তে অন্য কোনও মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়া, ডেন্টাল, আয়ুর্বেদিক বা হোমিওপ্যাথির পড়ুয়াদের দিয়ে ডিউটি করানো হচ্ছে, তাহলে নির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে এনে তা বন্ধ করা হোক এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে সমস্ত ইন্টার্নকে দুর্নীতির চক্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অপপ্রচারমূলক।
এখানেই আরও কিছু প্রশ্ন ওঠে। যদি সত্যিই ইন্টার্নদের মধ্যে কোনও দুর্নীতিচক্র চলত, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধান, অধ্যক্ষ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এতদিন কী করছিলেন? তাঁরা বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানাননি কেন? এত বড় অভিযোগের কথা কর্তৃপক্ষ আগে জানতেন না, অথচ ইন্টার্নদের গ্রুপ চ্যাট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরেই সব জানতে পারলেন? সেই গ্রুপ চ্যাটের সত্যতা যাচাই হয়েছে তো? সেটি আদৌ আসল, নাকি বিকৃত বা জাল? অভিযোগের তদন্ত হোক, কিন্তু কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও দায়িত্বও তদন্তের আওতায় আসুক।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে পড়ুয়াদের WhatsApp গ্রুপের উপর নজরদারির প্রসঙ্গও এসেছে। ব্যক্তিগত কথোপকথনে এভাবে নজরদারির বৈধতা, পদ্ধতি ও গোপনীয়তার প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অভিযোগের তদন্তের নির্দিষ্ট ও আইনসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। তার বদলে ব্যক্তিগত কথোপকথনকে সামনে এনে জনসমক্ষে একটি গোটা পেশাগত গোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা কেন?
আরও বড় প্রশ্ন, NMC-র নিয়ম অনুযায়ী ইন্টার্নশিপের মূল উদ্দেশ্য প্রশিক্ষণ। ইন্টার্নরা নিয়মিত কর্মীর ঘাটতি পূরণ করার জন্য নিযুক্ত নন। তাহলে তাঁদের অনুপস্থিতিতে রোগী পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কেন? কোন কাজ ইন্টার্নদের প্রশিক্ষণের অংশ, আর কোন কাজ কর্মীসংকটের কারণে তাঁদের দিয়ে করানো হচ্ছে, সেই প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে না কেন? পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ না করে হাসপাতাল চালানোর সরকারি ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না কেন?
যদি কোথাও রিপ্লেসমেন্ট ডিউটির কারণে রোগী পরিষেবা বিঘ্নিত হয়ে থাকে, তার তদন্ত হোক। কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে, নিয়মিত কর্মীদের কাজ প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের দিয়ে করানো হচ্ছে কেন। ইন্টার্নদের অনুপস্থিতিতে যে পরিষেবা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তা কি তাঁদের অপরাধ, নাকি দীর্ঘদিনের কর্মীসংকট ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল?
ইন্টার্নরা কি তবে মৌচাকে ঢিল মেরেছে? তাঁদের বিরুদ্ধে এমন প্রচার, এমন ক্ষোভ ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার কারণ কী? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা ছাড়া এর অন্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। দুর্নীতি থাকলে তদন্ত হোক, আইনভঙ্গ হলে শাস্তি হোক। কিন্তু সেই অজুহাতে ইন্টার্নদের গণশত্রু বানানো চলবে না। সরকারি হাসপাতালে কর্মী নিয়োগ না হওয়া, পরিকাঠামোর অভাব এবং প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদের দিয়ে নিয়মবহির্ভূত কাজ করানোর প্রশ্নগুলিও সামনে আসুক।
রিপ্লেসমেন্ট ডিউটি নিয়ে বিতর্কের আড়ালে আসল প্রশ্নগুলি চাপা পড়তে দেওয়া যায় না। সরকারি হাসপাতালের এই দুরবস্থার দায় কার? পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ না করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালানোর দায় কার? আর সেই প্রশ্ন থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই কি ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার?
West Bengal Junior Doctors’ Front আমাদের নবীন প্রশিক্ষণরত ভাইবোনদের পাশে আছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, কিন্তু অপপ্রচার ও একতরফা দোষারোপের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব।











