পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব গণ- আন্দোলন! কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে ভিত্তি করে এই গণ আন্দোলন তৈরী হয় নি। একেবারে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের মৌলিক সমস্যা নিরসনের জন্য দেশে দেশে দল- নিরপেক্ষ ভাবে পথে নামছেন – এ এক নতুন পথ!
ঘটমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির থেকে উদ্ভূত সংকটের হাত থেকে রেহাই পেতে মানুষ মরীয়া হয়েই পথে নামছেন! পৃথিবীর দেশে দেশে জীবনযাত্রার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে; মাথার উপর ছাদ তথা আশ্রয়ের সংস্থান করা ক্রমশঃ কঠিন হচ্ছে ; সাধারণের শিক্ষার সুযোগের হ্রাস হয়ে চলেছে ব্যাপক ভাবে। বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত সরকার তার দেশের এই নিদারুণ সংকট সামাল দিতে একেবারেই বেসামাল হয়ে পড়ছেন! সার্বিকভাবে সরকারের জনকল্যাণকামী চরিত্র বা ভূমিকাই আজ এক প্রশ্ন চিহ্নের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে! কিভাবে এই সংকট থেকে দেশের মানুষকে নিস্তার দেওয়া যাবে, এই নিয়ে সরকার গুলোর বাস্তবিক দিশা নেই! আলংকারিক উন্নয়ণ ও প্রচারের ফানুস আজ চুপসে গেছে!
সাম্প্রতিক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেশে, বিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তূগাল, আলবেনিয়া, বেলজিয়াম ইত্যাদি দেশে সাধারণ মানুষের গণ- আন্দোলন এক তরঙ্গ শীর্ষে পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষের গণ আন্দোলনের ক্রমাগত ঢেউ এ বিভিন্ন দেশের সরকার পুলিশ, সেনাবাহিনী নামিয়ে চিরাচরিত ভাবে আন্দোলন দমানোর কৌশল নিলেও মানুষ উদ্বেল! সত্যি কথা বলতে গোটা ইউরোপ মহাদেশের পরিস্থিতি এককথায় অগ্নিগর্ভ!
জীবন- জীবিকা – অস্তিত্বের যে ভয়াবহ সংকট দেশে দেশে নেমে এসেছে, তার থেকে মুক্তি পেতে ছাত্র, যুব, মহিলা, কৃষক, শ্রমিক, একযোগে পথে নেমে এসেছেন! একেক দেশে একেক রকম সমস্যা প্রকট হলেও সাধারণ ভাবে প্রতিটি দেশেই রুটি – কাপড়া আউর মাকান এর সমস্যাই প্রধান! আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দৈনিক মজুরি, পেনশনের দাবি ইত্যাদি প্রশ্নে ঐ সমস্ত দেশের সরকার গুলির অসহয়তা চোখে আঙুল দিয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার অন্তঃসারশূন্য দেউলিয়াপনাকেই তুলে ধরছে!
গোটা পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষ আজ কোনো রাজনৈতিক পতাকা ছাড়াই সমবেত হচ্ছেন; কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকেই ভিত্তি হিসেবে ধরছেন না ; তারা সংকটের নাগপাশ থেকে বেরোতে চাইছেন! পৃথিবী জুড়েই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব বাড়ছে! তথাকথিত রাষ্ট্রবাদী রাষ্ট্রনায়ক দের কাছে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক নিদান নেই!
এই রকম এক ভয়াবহ সংকটের আবর্তে যখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, তখন দেশে দেশে উগ্ৰ জাতীয়তাবাদ, পরিচিতি সত্ত্বার রাজনীতি, ধর্মীয় উন্মাদনার রাজনীতি একেবারে পরিকল্পিতভাবে নামিয়ে আনা হচ্ছে! সাধারণ মানুষকে উগ্ৰ জাত্যাভিমান, ধর্মীয় আবেগ আর উন্মাদনায় ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ বাড়ছে! জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে ঘটমান পূঁজি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, নিজের পারিবারিক, সামাজিক জীবনও এককথায় বিপন্ন হয়ে উঠছে!
ব্যক্তিগত স্বভাব, আচরণ, চাহিদা, আবেগ, আকাঙ্খা কে একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে আমাদের মন টা কে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে সন্দেহ, হিংসা, দ্বেষ, কুটিলতার বিষে সিক্ত করে দেওয়ার আয়োজন সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে! আজকের সময়ে ব্যাক্তি “আমি” -র যে ভয়ঙ্কর রূপান্তরভবনের কাজ অলক্ষ্যে চলছে, তার মধ্য দিয়ে ঐ ব্যক্তি “আমি” যে বিপজ্জনক সত্ত্বায় পরিণত হয়ে চলেছে তাতে মায়া, মমতা, ভালোবাসা, প্রেম – সব উধাও হয়ে যাচ্ছে। লাভের আশায়, পূঁজির বিকাশের স্বার্থে যেভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে, ঠিক একইরকম ভাবে ব্যাক্তি বিপর্যয় তথা সামাজিক বিপর্যয়ও এক ভয়াবহ জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। নৈতিক বোধ, উচ্চ মানবিক গুণ – এগুলো অপ্রয়োজনীয় – এই দর্শনের আবহে নতুন এক সামাজিক আবহ সৃষ্টি করবার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলছে! মানুষ একেবারে খাদের কিনারায় এসে আবার জোট বাঁধছেন, পথে নামছেন – আশার কথা এটাই!
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দখলদারিত্বের লড়াই টা আজ মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, মানুষের মৌলিক সমস্যা নিরসন করা আজ গৌণ! এই প্রেক্ষিতে কোনো আদর্শ, কোনো দৃষ্টিভঙ্গী বা কোনো মতবাদের উপর মানুষ আজ বিশ্বাস করতে চাইছেন না! সর্বগ্রাসী ভাঙন আর অবিশ্বাসের যুগে আজ কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস রাখা, আস্থা জ্ঞাপন করে একমনে এগিয়ে চলাটাই এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৈতিক বোধে উদ্বুদ্ধ করা এবং সেই আঙ্গিকে সঞ্চারিত হওয়ার বিষয়টিই আজ সার্বিক ভাবে চূড়ান্ত রূপে অবহেলিত হয়ে চলেছে। পণ্যায়িত ভুবনায়নের যুগে মনের প্রক্ষোভিক আবেগগুলিও যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে! এই পরিস্থিতিতে মানুষে মানুষে জোটবাঁধা এবং জোট বেঁধে গণ আন্দোলনের পথে থাকা…… বিষয়টিই বড় কথা। কখন, কোন দেশে, কোন পরিস্থিতিতে গণ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে, আজ তার কোনো সেরকম পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। হঠাৎ করেই দাবানলের মতো লাখো লাখো মানুষের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর আছড়ে পড়ছে! এও এক অভিনব স্ফূরণ!
কোনো সময় এই আন্দোলন একেবারে অহিংস, কোনো সময় আবার কোথাও সহিংস। সবসময় যে কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের জন্য লড়াই হচ্ছে তাও নয় ; কিন্তু মাঝে মাঝে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদী আওয়াজ উঠছে! চিরায়ত প্রতিবাদী আন্দোলনের এতদিনের চেনা পথ ছেড়ে প্রতিবাদ, প্রতি রোধের নতুন নতুন ভাষ্য তৈরী হয়ে চলেছে। বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমের অদ্ভুত সৃজনশীল ব্যবহার ও প্রয়োগের মধ্য দিয়ে মানুষ যে কোনো ইস্যুতে সমবেত হচ্ছেন, প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠছেন – এও নতুন যুগের নতুন পথ। এই পথ নিয়ে, আন্দোলনের প্রয়োগ ও কৌশল নিয়ে দেশে দেশে বিতর্কও উঠে আসছে। হাজারো রকমের প্রতিবন্ধকতা, প্রলোভন, ভয়, সন্ত্রাস উপেক্ষা করে মানুষ এক হওয়ার, সম্মিলিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ধীরে হলেও অনুভব করছেন, এটাও এক বিরাট পাওয়া। ঘটমান পৃথিবীতে সর্বক্ষেত্রেই যখন এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব চলছে, তখন গণ আন্দোলনের এই জাতীয় সৃজন দিন বদলের হাতছানি দেয়!
মানুষের এই জোট বাঁধা, সম্মিলিত প্রতিরোধের বন্ধনকে আলগা করে দেওয়ার জন্য সার্বিক ভাবে সনাতনী পূঁজি ব্যবস্থাপনা তার বিষ দাঁত, নখ বার করে উদগ্ৰ ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচার, লিঙ্গবৈষম্যের অবসান, সমাজের সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জিইয়ে রাখা, শিক্ষার সার্বিক বিস্তার, দারিদ্র্যের অবলুপ্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকে রাষ্ট্র আজ তার হাত গুটিয়ে নিতে চাইছে। একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ণ, অন্যদিকে মানসিকভাবে মধ্যযুগীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের দিকে আশ্রয় নেওয়ার মানসিকতা…. এক অদ্ভুত বিচিত্র সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রচেষ্টার মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার নিমজ্জন – এক জগাখিচুড়ি অবস্থা! এইরকম এক চূড়ান্ত সামাজিক ভঙ্গুর অবস্থায় দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচার, স্বজন পোষণ, চাটুকারিতা, সুবিধাবাদ – এগুলো আমাদের ব্যক্তি মনে মান্যতা পেয়ে লালিতপালিত হয়ে চলেছে; এরকম অবস্থায় কোনটা ভালো আর কোনটাই বা মন্দ আমরা মাঝে মাঝেই বুঝেও উঠতে পারছি।
বহুমুখী, বহুমাত্রিক নতুন নতুন আর্থ- সামাজিক দ্বন্দ্বের মধ্যে এক বিচিত্র রকমের ভাসমান উদ্বায়ী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটছে, যার কোনো সার্বিক ব্যাখ্যা নেই। আঞ্চলিক বৈষম্য, অনুন্নয়ণ , সম্পদের কেন্দ্রীকরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সার্বিক ভাবে সমমনস্ক ভাবনারও সমভাবে বিস্তার হচ্ছে না- এক অদ্ভুত টানাপোড়েন!
“বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য” ভারতীয় সভ্যতার মূলগত ভিত্তি বলে যাকে ঐতিহাসিকভাবে মান্যতা দেওয়া হয়। এই ভাবধারা অন্যদিকে আবার আমাদের মতো বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্মের, বহু সম্প্রদায়ের দেশে সার্বিক আন্দোলন বিকাশেরও অন্তরায়।
আজকের পৃথিবীর বুকে দেশে দেশে যে মৌলিক প্রশ্নে গণ আন্দোলন চলছে, তার সাথে সাযুজ্য রেখে আমাদের দেশেও শুরু হয়েছে। সন্ধিপদী প্রাণীর নামানুসারে কোনো দলই হোক বা কোনো ফুলের নামে গোষ্ঠী হোক কিংবা কোনো সংগঠনই হোক, গণ আন্দোলন হবেই হবে। কোনোভাবেই এই গণ আন্দোলনের স্বাভাবিক গতি কে এখন থামানো যাবে না। সাময়িক ভাবে রাষ্ট্রশক্তি পুলিশ, আর্মি, দিয়ে গণ আন্দোলন দাবালেও পুরোপুরি পারবে না দাবিয়ে রাখতে। সাধারণ মানুষের জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণের লড়াই এখন আর কোনো আদর্শ , তত্ত্ব, মতবাদের ঘেরাটোপে আটকে থাকবে না! এটাই মনে হয় সময়ের পরিণতি। পূঁজি তার সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য নিও ফ্যাসিজমের দিকে ঝুঁকলেও চূড়ান্ত ভাবে গণ আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে যাবেই যাবে। এই সময় গণ আন্দোলনের সময় হিসেবে সময়ই নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই আমাদের সকলকেই নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিবাদের পরিসরকে বাড়াতেই হবে। সময়কে সাথে নিয়ে নিজেকে সকলের সাথে নিয়ে চলতে হবে, এটাই তো আজকের গণ আন্দোলনের উত্তাল সময় চায়।











