
নাসিকের শরীর জুড়ে অনেক অনেক তকমা, কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা আগে বলি ? – গোদাবরী নদী তীরবর্তী এই পুণ্যভূমিতেই নাকি শ্রীরামচন্দ্র , সীতা দেবী ও লক্ষণ বনবাসী জীবন কাটিয়েছিলেন। এখানেই রক্ষরাজ রাবণের প্রিয়তমা ভগিনী শূর্পণখার নাসিকা ছেদন করেছিলেন লক্ষণ। সেই থেকেই নাকি এই অঞ্চলের নাম হয় নাসিক। পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে এভাবেই জড়িয়ে আছে নাসিকের নাম।
এখানেই তো শেষ নয়। নাসিক হলো ভারতের অন্যতম পবিত্র কুম্ভমেলা স্থল। প্রয়াগরাজ ছাড়া ভারতের আর যে তিনটি জায়গায় পর্যায়ক্রমে কুম্ভমেলার আয়োজন করা হয় সেগুলো হলো – হরিদ্বার, উজ্জয়িনী এবং অবশ্যই গোদাবরী নদী তটবর্তী নাসিক । পৌরাণিক বিচারের পাশাপাশি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নাসিক গুরুত্বপূর্ণ।
যদি বলি নাসিকের সঙ্গে আমার আপনার রান্নাঘরের নিত্যদিনের যোগাযোগ তাহলেও একদম ভুল বলা হবে না। নাসিক হলো ভারতের পেঁয়াজের রাজধানী বা ওনিয়ন ক্যাপিটাল। এই শহর থেকে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বিদেশে রপ্তানি করা হয় যা রাজ্যের কৃষি অর্থনীতির পুষ্টি সাধনে বড়ো ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি নাসিক ভারতের ওয়াইন ক্যাপিটালও বটে। ওয়াইনের নাম শুনলেই যাঁদের গলা শুকিয়ে পিপাসা জাগে , তাঁরা এই খবর শুনে নিশ্চয়ই খুশি হবেন।
সর্বভারতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে এই সংবাদ। নাসিকের আম্বাড় এলাকায় ভৌমজলে রাসায়নিক শিল্প দূষক হেক্সাভেলেন্ট ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির বিষয়টি ধরা পড়েছে মহারাষ্ট্র পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের অনুসন্ধানে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে MPCB এর পক্ষ থেকে ১৭ টি শিল্প ইউনিটকে নোটিশ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
দূষণের বিষয়টি প্রথম বোর্ডের নজরে আনেন স্থানীয় বাসিন্দারা। টিউবওয়েল থেকে সমানে হলুদ জল উঠে আসছে দেখে তাঁরা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নজরে আনেন বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ অকুস্থলে হাজির হয়ে আম্বাড় শিল্প উপনগরীর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন টিউবওয়েল এবং বোরওয়েল থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ করে। খবর শুনেই সেখানে দলবল নিয়ে হাজির হয়ে যান অন্যান্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা। তাঁরাও স্থানীয়দের প্রতিদিনের ব্যবহৃত জলের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য।
ভৌমজলে উচ্চ মাত্রায় হেক্সাভেলেন্ট ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির ঘটনাটি আরও যে কারণে বিশেষ তৎপরতার সঙ্গে যাচাই করে দেখছে প্রশাসনের আধিকারিকরা তা হলো আগামী বছরে অর্থাৎ ২০২৭ সালে এই নাসিকেই কুম্ভমেলার আয়োজন করা হচ্ছে। দেশ বিদেশের লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ শ্রদ্ধালু মানুষ এসে সমবেত হবেন গোদাবরী তীরে মেলা স্থলে যা আম্বাড় থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এতো বড়ো একটা অনুষ্ঠানের ঠিক প্রাক্কালে জলের গুণমান নিয়ে বড়োসড়ো প্রশ্ন ওঠায় সকলেই এখন চিন্তায় পড়েছে।
অপরদিকে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিডার্স এন্ড পিপল বা SANDRP প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে যে ভৌমজলে উপস্থিত হেক্সাভেলেন্ট ক্রোমিয়ামের পরিমাণ লিটার পিছু ৫০. ৩ মিলিগ্রাম যা উপস্থিত সর্বমোট ক্রোমিয়ামের ( ৫০. ৫ মিলিগ্রাম / লিটার) প্রায় ৯৯.৬১%।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে এই দুটি পরিমাণই নিরাপদ সীমার থেকে ( ০.০৫ মিলিগ্রাম/ লিটার) ১০০০ গুণ বেশি। ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার তুলনায় অনেক অনেক বেশি পরিমাণে ভৌমজল,বোরওয়েল এবং নদীর জলে ক্রোমিয়াম থাকাটা যে অতীব উদ্বেগের তা মনে করেই ঘুম ছুটেছে সকলের। এমন বিষাক্ত জলের সংস্পর্শে আসার ফলে আম্বাড়ির অধিবাসীদের স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে।
হেক্সাভেলেন্ট ক্রোমিয়াম শরীরে ক্যান্সারের কারণ। পাশাপাশি এই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থটি পানীয় জলের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে আমাদের শরীরের লিভার ও কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই দূষিত জলের সংস্পর্শে আসার ফলে আম্বাড়ের সাধারণ আবাসিকদের মধ্যে নানান শারীরিক উপসর্গ যেমন চর্মের আলসার, ফুসকুড়ি, শরীর জুড়ে চুলকানির মতো উপসর্গ দেখা গেছে।
এই মুহূর্তে নাসিকের আম্বাড় এলাকা ওই অঞ্চলের রকমারি শিল্প যেমন ক্রোম প্লেটিং, জিঙ্ক প্লেটিং এবং পাউডার কোটিং এর প্রায় ৮০ টি ইলেক্ট্রোপ্লেটিং শিল্প ইউনিট রয়েছে। এই শিল্পগুলো থেকে বর্জ্য হিসেবে বর্জিত জল ওই শিল্পাঞ্চলের নালা নর্দমার পথ বেয়ে এসে পড়ছে গোদাবরীর উপনদী নন্দিনী নদীতে।আর তারপর তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা নিম্ন গোদাবরী অববাহিকার আনাচেকানাচে। এরফলে এক গভীর বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সমগ্র এলাকায়।
ইতোমধ্যেই বেশ কিছু কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে বাকিদের। দুটো বোরওয়েল সিল করে দেওয়া হয়েছে যাতে সংক্রমণ বাড়তে না পারে। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ দূষণের শিকার না হন। সবটাই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় করা হচ্ছে। নন্দিনীর দূষিত জল গোদাবরীর জলে কতটা বিষ ঢেলে দিয়েছে তার পরীক্ষাও শুরু হয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রিন্ট, ডাউন টু আর্থ পত্রিকা এবং অন্যান্য পরিচিত সংবাদ সূত্র।











