প্রথমে গাইঘাটা এবং তারপরে ধুলিয়ান দুটো জায়গায় একই দিনে তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’-এ মারা গেলেন একজন ধর্ষণ-খুন এবং অন্যজন খুনে অভিযুক্ত। সরকার বদল হওয়ার পরপরই বারুইপুরে ‘এনকাউন্টার’ দেখেছি আমরা। অর্থাৎ নতুন সরকারের প্রথম ছমাসেই তিনটে। এই ‘এনকাউন্টার’ সমাজে বড় একটা অংশ সমর্থন করেন বলেই মনে হয়। অন্তত সমাজ মাধ্যমে তার প্রতিচ্ছবি মেলে।
অভয়ার মা বলেছেন তিনি এনকাউন্টার সমর্থন করেন। কিন্তু অভয়া ধর্ষণ-খুনের পর একমাত্র অভিযুক্ত সঞ্জয়কে ধরে যদি পরের দিনই তাকে পুলিশ এনকাউন্টার করে দিত, তাহলে তো এই কেসটা ওখানেই ধামাচাপা পড়ে যেত। আমরা সবাই পুলিশ দারুণ কাজ করেছে, শাসক দারুণ কাজ করেছে বলতাম আর সমাজে সেটা বৈধতা পেয়ে যেত। কিন্তু আদতে সঞ্জয় একা অপরাধী নয় এবং সম্ভবত আসল অপরাধীও নয়, এটা একটা পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, অনেকে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এটা যে আমরা এখন জানতে পারছি এবং সব অপরাধী যে আগামীতে ধরা পড়তে পারে এই সম্ভাবনা সঞ্জয়ের এঙ্কাউন্টারেই শেষ হয়ে যেত। তাহলে প্রত্যেকটা ঘটনাকেই তো তদন্ত করে দেখতে হবে। কে বা কারা প্রকৃত অপরাধী খুঁজে বের করতে হবে, না হলে হয়ত একজন নিরপরাধ শাস্তি পেয়ে যেতে পারে আর প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যেতে পারে আড়ালে। আসলে এরকম ধর্ষণ-খুন ইত্যাদির মত কোনো সংবেদনশীল ঘটনা ঘটলে শাসকের ওপর চাপ তৈরি হয়। একজনকে ধরে ‘এনকাউন্টার’ করে দিয়ে সেই চাপমুক্ত হওয়া শাসকের পক্ষে সবচেয়ে সহজ। এতে শাসকের কত দিক দিয়ে লাভ একবার ভাবুন! ‘এনকাউন্টারে’ ভিক্টিমের পরিবার খুশি হয় সঙ্গে সঙ্গে বিচার পেয়েছে বলে আবার ‘এমন ঘটনা কেন বারবার ঘটছে’ এই মর্মে সমাজে শাসকবিরোধী যে উষ্মা ওঠে সেটাও তৎক্ষণাৎ পরিবর্তিত হয় শাসকের জয়গানে। অপরাধের প্রমাণ করার আর কোনো দায় থাকে না শাসকের। অন্যদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কিত ত্রুটি, প্রশাসনিক অদক্ষতা, মুহূর্তে ঢাকা পড়ে যায়। উল্টে শাসক পায় ন্যায় বিচারকের মর্যাদা।
কিন্তু এই প্রবণতা যে কতটা ভয়ংকর সেটা কি ঠান্ডা মাথায় আমরা ভাবে দেখেছি? একটা উদাহরণ দিই। ধরুন কোনো একজন শাসক-ঘনিষ্ঠ অত্যন্ত প্রভাবশালী কেউ এরকম ধর্ষণ বা খুনের মত কোনো অন্যায় করলেন এবং তারপর পুলিশ শাসকের নির্দেশে যে কোনো কাউকে ধরে এনে ‘এনকাউন্টার’ করে দিল, আমরা সবাই দারুণ হয়েছে বলে হইহই করলাম আর সেই অপরাধকে বৈধতা দিয়ে দিলাম। অথবা ধরুন শাসক বিরোধী কোনো আন্দোলনকে শেষ করে দিতে পুলিশ আন্দোলনকারী কাউকে কাউকে তুলে নিয়ে গেল এবং তাদের এনকাউন্টার করে দিল। পুলিশের ওপর যদি আইনের কোনো চাপ না থাকে, শাসক পুলিশকে দিয়ে ভুয়ো কেসে বিরোধী যাকে খুশি তুলে নিতে পারে এবং ‘এনকাউন্টার’ করিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ আজ এই সব পুলিশের নির্বিচার ‘এনকাউন্টার’ কিংবা কাস্টডিতে হত্যা যদি আমরা মেনে নিই আগামী দিনে শেষ কথা বলবে শাসক এবং পুলিশের স্বেচ্ছাচার। এই যদি হতে থাকে তাহলে কোর্ট, বিচার ব্যবস্থা এসব ক্রমশঃ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে পড়বে। জুডিশিয়ারি নামক গণতান্ত্রিক ব্যবস্হার স্তম্ভটি যেটুকু বেঁচে আছে সেটাও হয়ে যাবে অর্থহীন বশংবদ। এটা কতটা ভয়ংকর গণতন্ত্রের পক্ষে সেটা কি আমরা ভেবে দেখব না? শাসককে আরো আরো স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার লাইসেন্স আমরাই দিয়ে দিচ্ছি, আগামীতে সেটা আরো প্রকট হয়ে উঠবে মিলিয়ে নেবেন!
* সঙ্গের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত












