
এতো গেল জঙ্গল নিয়ে আমাদের আগ্রাসনের প্রভাবের কথা। কিন্তু জঙ্গলের মূল্যবান গাছেদের যদি গণমৃত্যু ঘটে কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়া, তাহলে তো তা গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়! ঠিক এমনটাই ঘটেছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের বনাঞ্চলের মূল্যবান সেগুন গাছেদের ক্ষেত্রে। কোনো পোকামাকড়ের উপদ্রব নেই, নেই কোনো রোগভোগের বালাই –দৃশ্যমান সঙ্গত কারণ ছাড়াই রাজ্যের পশ্চিম বেতুল ফরেস্ট ডিভিশনের ১৬,৮০০ হেক্টর পরিমিত এলাকার ২৫০০০ পূর্ণবয়স্ক পরিণত সেগুন গাছ মারা গিয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে সব তথ্য তাতে বলা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা খরা পরিস্থিতি ও প্রচণ্ড দাবদাহের কারণে মাটিতে জলের জোগান ভীষণ ভাবে কমে গিয়েছে যেই কারণে শিকড়ের মাধ্যমে শোষিত জল গাছের শরীরে সেভাবে পৌঁছতে পারেনি। এর ফলে গাছের কোষে জল না পৌঁছনোর কারণে সেগুলো শুকিয়ে গিয়ে গাছেদের মৃত্যু ঘটিয়েছে।
GPS প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি গাছের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং তারপরই এমন বিপর্যয়ের কারণ প্রকাশ্যে এনেছেন তাঁরা। সেগুন গাছ ও তার কাঠ যে শুধু মূল্যবান তা নয়, বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রেও এই গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রতিবছর সেগুন কাঠ বিক্রি করে বেতুল ফরেস্ট ডিভিশনের ১০০ কোটি টাকা আয় হয়। একটা সেগুন গাছ পরিণত হতে ৬০ – ৮০ বছর সময় নেয়। ফলে পূর্ণবয়স্ক গাছেদের এই অকাল মৃত্যুতে হতাশা জেগেছে বনদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে।
গড়পড়তা ১৫ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার গুঁড়ির ব্যাস যুক্ত গাছগুলো ৪০ থেকে ১২০ বছর বা ততোধিক বছরের প্রাচীন। ২০২৩ সালে বনকর্মীরা প্রথম এই ঘটনার কথা জানতে পারেন।প্রায় তৎক্ষণাৎ এগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা হয় । লাগাতার অনুসন্ধান ও পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এতো বিপুল সংখ্যক গাছের মৃত্যুর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হন বনদপ্তরের আধিকারিকরা। পরবর্তী সময়ে এই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে কীভাবে বনজসম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে তা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক ভাবেই ২৫০০০ সেগুন গাছের মৃত্যুর ফলে বেতুলের বাস্তুতন্ত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হবে কী করে? মাটি এক অমূল্য সম্পদ – জীবনের ধারক ও বাহক। মানুষের শরীর যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি উপাদান না পেলে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা কমে যায় গাছেদের বেলায়ও ঠিক তেমনি ঘটে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে দীর্ঘমেয়াদি খরা এবং তাপদাহের কারণে গাছেদের আভ্যন্তরীণ জল সঞ্চালনের সহজাত প্রাকৃতিক ব্যবস্থাটাই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। মাটি থেকে শিকড়ের মাধ্যমে গাছ যে জল সংগ্রহ করে তা জাইলেম তন্তু মারফত পরিবাহিত হয়ে পাতায় পৌঁছয়। খরার কারণে এই স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ব্যাঘাত ঘটে ফলে গাছের ভেতরে ছোট ছোট বায়ু বুদবুদ সৃষ্টি হয় যা জলের উর্ধ্বগমন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। রান্নাঘরে প্রয়োজনীয় রসদ না পৌঁছলে খাবার তৈরি হবে কী করে? উপবাসী গাছ তখন শুকিয়ে যায় এবং অবশেষে তার অকালমৃত্যু ঘটে। বেতুলের সেগুন গাছেরা এভাবেই মারা গেছে।
বেতুলের ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে নতুন করে। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির প্রভাব বেড়েছে। আধুনিক ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যাবস্থাও হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি নির্ভর। তা সত্বেও কীভাবে এতো বড় বিপর্যয় নেমে এলো সেই বিষয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আগামী দিনে আরও সজাগ থাকতে হবে বনকর্মীদের। প্রথমে এই খবরটি পড়তে গিয়ে শুনেছিলাম ছত্রাক আর ঘুণপোকাদের আক্রমনের কথা, এখন জানলাম নতুন সম্ভাবনার কথা। যে কারণেই হোক না কেন বাস্তব সত্যটা হলো এই যে, বিপুল সংখ্যক পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষরাজি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আসুন দুফোঁটা চোখের জল ফেলি আমাদের ছেড়ে যাওয়া বন্ধু বৃক্ষদের জন্য।
জানি, তোমাদের জন্য
দু ফোঁটা চোখের জল,
মোটেই যথেষ্ট নয়।
তবু, সেটুকুই ঝরে পড়ুক
তোমাদের নিথর শরীরে,
শ্রদ্ধার অর্ঘ্য হয়ে।
বোবা শিশিরের মতো–
নিস্তব্ধে।
তথ্যসূত্র: ডাউন টু আর্থ পত্রিকা।
নভেম্বর ১, ২০২৬












