বিষয়টি কিছুটা স্থূল হলেও এই নিয়ে চর্চা ইত্যাদি ব্রাজিলের রাজনীতিতে সুবিদিত। চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত ব্রাজিলের জনপ্রিয় শ্রমিক এবং জাতীয় নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা যখন একজন তরুণ শ্রমিক তখন অস্বাস্থ্যকর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কর্মরত অবস্থায় একবার দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তাঁর বাঁহাতের একটি আঙুল বাদ চলে যায়। বলা হয়ে থাকে এরপরই তিনি প্রতিবাদী শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেন। বিরোধীরা এটি নিয়ে মস্করা করলেও তাঁর এই অঙ্গহানিকে শ্রমজীবী জনসাধারণ শ্রমিকদের প্রতি পুঁজিপতি মালিক ও রাষ্ট্রের বৈষম্য ও অবহেলা এবং নিজেদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসাবেই দেখেন।
ব্রাজিল নিয়ে দুনিয়ার এত আগ্রহ কেন?: দক্ষিণ গোলার্ধের এক প্রান্তে অবস্হিত ব্রাজিল বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ ও লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ; বিশ্বের সপ্তম জনবহুল ও লাতিন আমেরিকার সবচাইতে জনবহুল দেশ; বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ ও লাতিন আমেরিকার সর্ব বৃহৎ অর্থনীতি। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আগ্রাসী ট্রাম্প নির্ধারিত পথের অন্যতম সমালোচক লুলার নেতৃত্বে এই ব্রাজিল নিজের পথে স্থিত; মার্কিন প্রতিস্পর্ধী ব্রিকস মঞ্চের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মার্কিন এজেন্ট স্বৈরাচারী বোলসোনারো পিতা – পুত্রের মাধ্যমে ব্রাজিলকে নতুন করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লুটপাট (Open Veins of Latin America: Five Centuries of the Pillage of a Continent – Eduardo Galeano – র গ্রন্থ থেকে শব্দটি গ্রহণ করা) থেকে আপাতত রক্ষাকারী Brazil for Hope Federation এর এই ব্রাজিল; শ্রমজীবী, কৃষক, জনজাতি, সাধারণ মানুষের এই ব্রাজিল; মার্কিন পুতুল সামরিক জুন্তা কিংবা স্বৈরাচারের বিপরীতে ভুলত্রুটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা সত্বেও গণতান্ত্রিক ব্রাজিল; এবং বাঙালির কাছে পাঁচ বারের বিশ্ব কাপ জয়ী পেলে, গ্যারিঞ্চা, রিভেলিনো, জিকো, সক্রেটিস প্রমুখ অসাধারণ দক্ষ ও প্রতিভাবান ফুটবলারদের দেশ ব্রাজিল।
সংক্ষেপে ঝালিয়ে নেওয়া: কলম্বাসের পথ ধরে ইউরোপের যে লাতিন আমেরিকা দখল সেই পর্বে পর্তুগাল এই বিশাল সম্পদশালী দেশকে দখল করে নেয় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে। ১৮২২ এ পর্তুগালের থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তি। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র গঠন। তার পরের ব্রাজিলের শাসন কালকে পাঁচ টি পর্যায়ে ভাগ করা হয় – First অথবা Old Republic (১৮৮৯ – ১৯৩০), Vargas Era (১৯৩০ – ‘ ৪৬), Fourth Republic (১৮৪৬ – ‘৬৪), Military Dictatorship (১৯৬৪ – ‘ ৮৫) এবং Sixth or New Republic (১৯৮৫ -)।
৮,৫১০,৩৪৬ বর্গ কিমি আয়তনের ব্রাজিলের লোকসংখ্যা ২১৪ মিলিয়ন, জন ঘনত্ব ২.৩ জন প্রতি বর্গ কিমিতে। ২৬ টি প্রদেশ ও একটি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্টে বিভক্ত ব্রাজিলের অ্যামাজন ও প্যারাগুয়ে দুটি বৃহৎ নদী ব্যবস্থাকে ঘিরে রয়েছে অ্যামাজনিয়া এবং পান্তানাল দুটি বিশাল উদ্ভিদ ও জীব বৈচিত্র্যে ভরা বন ও জলাভূমি। এই অ্যামাজন অরণ্যকে ব্যাপক হারে ধ্বংস করে জাইর বোলসোনারো প্রমুখ মার্কিন বহুজাতিকদের পদলেহী স্বৈরাচারী দের সময় আখ ও সোয়া চাষ এবং পশু খামার তৈরি শুরু হয়। এছাড়া ব্রাজিলের রয়েছে বিশাল সাভানা তৃণভূমি এবং অতলান্তিক মহাসাগরের তীরে বিস্তীর্ণ নয়নাভিরাম সব বেলাভূমি। পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বেশি কফি, আখ, সোয়া ও কমলালেবু ব্রাজিলে উৎপন্ন হয়। এছাড়াও ভুট্টা, তুলো, লেবু, তামাক ইত্যাদি এবং ডেয়ারি প্রোডাক্ট প্রচুর উৎপন্ন হয়।
লোহা, তামা, নিকেল, সোনা, বক্সাইট, টিন, ম্যাঙ্গানিজ, রেয়ার আর্থ, তেল ইত্যাদি ব্রাজিলে পর্যাপ্ত পাওয়া যায়। কাগজ, জুতো থেকে কেমিক্যাল, অটোমোবাইল, এরোপ্লেন ইত্যাদি শিল্প ব্রাজিলে উন্নত। ব্রাজিলের বার্ষিক জিডিপি (পিপিপি) মোট ৫.২৬৭ ট্রিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু ১২,৩৯৭ ডলার (বিশ্বে ৭৯ স্থান), ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। মানব উন্নয়ন সূচক ০.৭৮৬ (বিশ্বে ৮৪ স্থান), ভারতের চাইতে অনেক এগিয়ে।
তবে আর্থিক বৈষম্য অনেক এবং দরিদ্রের সংখ্যাও প্রচুর। ৪২% শ্বেতাঙ্গদের কাছে বেশি সম্পদ রয়েছে। ৪৫% পার্দো (মিশ্র), ১০% কৃষ্ণাঙ্গ এবং ০৩% জনজাতি দের মধ্যে দরিদ্র বেশি। মুদ্রা রিয়েল (এক রিয়েল = ১৭.৪৯ ভারতীয় টাকা), প্রধান ভাষা পর্তুগিজ, প্রধান ধর্ম খ্রিস্টধর্ম (৮৫%)। সাও পাওলো ছাড়াও রিও দি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, ফোরতালাজা, সালভাদর, বেলা হরাইজনতে, মানাউস, কিউরিতিবা, রেসিফে, গোয়াইয়ানিয়া প্রমুখ ব্রাজিলের বড় শহর, শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্র।
লুইজ ইনসানিও লুলা দা সিলভা: কিছু ব্যতিক্রম বাদে আমাদের এখানকার মত শ্রম ও শ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন অবস্থাপন্ন উচ্চবর্ণের শহুরে পরিবার থেকে আগত অফিসে বসে ট্রেড ইউনিয়ন করা বামপন্থী নেতাদের মত নয়, লুলা উঠে এসেছেন একেবারে দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবার ও শ্রমজীবী পরিবেশ থেকে। নিজেও বাল্য থেকে ছিলেন একজন অসংগঠিত শিশু শ্রমিক।
ব্রাজিলের উত্তর পূর্বের পার্নামবুকো প্রদেশের রাজধানী রেসিফে থেকে ২৫০ কিমি দূরে এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক অতি দরিদ্র কৃষক পরিবারে ১৯৪৫ এ লুলার জন্ম। এই সেই পার্নামবুকো যেখানে জগৎবিখ্যাত শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে (১৯২১ – ‘৯৭) গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের আন্তক্রিয়ার মাধ্যমে পড়ানোর কৌশল অবলম্বনে Critical Pedagogy পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এবং ১৯৬২ তে ৩০০ মরশুমী নিরক্ষর আখ চাষীকে ৪৫ দিনে সাক্ষর করে তোলেন।
লুলার শৈশবে তাঁর পরিবার দুর্ভিক্ষ ও প্রবল দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়। তার মধ্যেই লুলার জন্মের পরপরই তাঁর পিতা তাঁদের ছেড়ে দেশের বৃহত্তম শহর সাও পাওলো তে চলে গিয়ে সেখানে নতুন সংসার পাতেন। অভাব সমস্যায় অস্থির লুলার মা লুলার যখন সাত বছর বয়স তখন লুলাকে নিয়ে ১৩ দিন খোলা ট্রাকে চেপে সাও পাওলো চলে যান এবং পিতার নতুন পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন। পরবর্তী চার বছর ১১ জনের বৃহৎ পরিবার একসঙ্গে একটি ঘেটোতে কষ্টেসৃষ্টে অতিবাহিত করেন। তারপর লুলার মা লুলাকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। ১২ বছর বয়সে রাস্তার হকার হিসাবে লুলার শ্রমিক জীবন শুরু। তারপর জুতো পালিশের কাজ। ১৫ বছর বয়স থেকে ধাতু শ্রমিক হিসাবে একটি কারখানায় যোগ দেন। স্বাভাবিকভাবেই লুলা জীবনের এই পর্বে সেকেন্ড গ্রেডের বেশি তিনি পড়াশুনার সুযোগ পাননি।
শ্রমিক ও জাতীয় নেতা লুলার উত্থান: কাজ করতে করতে এক দাদার সূত্রে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতিতে তাঁর যোগদান। ক্রমে ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে চলে আসা। তারপর সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দেশের গণতান্ত্রিকরণের দাবিতে ১৯৭৮ – ‘ ৮০ এর পর্যায়ের ঐতিহাসিক শ্রমিক ধর্মঘট ও গণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান এবং এক মাসের জেল জীবন। ১৯৮৪ – র সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে Dirtas Ja Movement এও নেতৃত্বদান। এর আগে ১৯৮০ তে Workers’ Party (PT) এবং ১৯৮৩ তে Central Trade Union (CUT) গঠন। ১৯৮৬ তে সাও পাওলোর ফেডারেল ডেপুটি নির্বাচিত হয়ে জাতীয় কংগ্রেসে প্রবেশ।
প্রেসিডেন্ট লুলা: ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন। ২০০২ তে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সেই সময় কাস্ত্রো, মোরালেস, কোরিয়া, চাভেজ প্রমুখের নেতৃত্বে সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে বামপন্থী Pink Tide এবং Bolivarian Movements চলছিল। তিনি ব্রাজিলীয় দের নিয়ে তাতে অংশ নেন। ২০০৬ – র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও লুলা দ্বিতীয়বার বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
তাঁর সময়ে বেশ কিছু জনমুখী পদক্ষেপের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য Foma Zero বৃহৎ সরকারি প্রকল্পের অধীনে Bolsa Familia Conditional Family Cash Transfer এবং Bolsa Escola School Stipend প্রকল্প ব্যাপক সাফল্য নিয়ে আসে। শিক্ষা সম্প্রসারণে এবং দেশের দারিদ্র্য মোচনের বিশেষ সহায়ক হয়। Free School Meal প্রকল্পে দেশের শিশুদের অপুষ্টির হার কমে যায়। তাঁর শাসনকালে দেশের অর্থনীতির শ্রীবৃদ্ধি ও জিডিপি বৃদ্ধি ঘটে, বিদেশি ঋণ কমে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতিও কমে যায়। আন্তজার্তিক বাণিজ্যেও প্রসার ঘটে। পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়েও বিশেষ করে অ্যামাজনিয়া বাঁচাতে স্থানীয় জনজাতিদের সঙ্গে নিয়ে গুরুত্বপুর্ণ অবস্থান নেন। মুক্ত সংবাদ জগতের উপর জোর দেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০০৯ তে রাশিয়া, চিন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা কে নিয়ে BRICS আন্তর্জাতিক মঞ্চ গড়ে তোলেন। দেশে বিদেশে প্রেসিডেন্ট হিসাবে লুলার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পায়।
২০১১ – ‘২২ পর্যায়: অন্যদিকে মার্কিন, বৃহৎ পুঁজি, কর্পোরেট, ব্রাজিলের পুঁজিপতি ব্যবসায়ীদের চক্ষুশূল হন। দেশের মধ্যে নানারকম অশান্তির চেষ্টা হয়। Hydrodam নির্মাণ এবং Bio – ethanol Fuel চালু নিয়ে বিতর্ক হয়। Mansalao Vote Buying এবং Operation Car Wash দুটি দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে বিরোধীরা তাঁকে বিদ্ধ করেন। লুলার গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে যা তিনি চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর সেই সময় তাঁর চিফ অফ স্টাফ, প্রাক্তন মন্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রাক্তন সামরিক একনায়কতন্ত্র বিরোধী সশস্ত্র বাম বিপ্লবী গেরিলা আন্দোলনের কারাবরণ করা নেত্রী ও অর্থনীতিক দিলমা রাসেফে র (জন্ম ১৯৪৭) হাতে নেতৃত্ব তুলে দেন। রাসেফ ২০১১ ও ২০১৬ – র জনপ্রিয় ভোটে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তাঁর সময়েও বেশ কিছু আর্থিক ও সামাজিক সংস্কার করা হয়। বিদ্যুৎ বিল ও আয়কর কমানো, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় Consumer Basket জোগানো ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অর্থনীতির শ্রীবৃদ্ধি হয়। তাঁর সময়ে ব্রাজিলে ২০১৪ তে ফুটবল বিশ্বকাপ ও ২০১৬ তে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়। লসিকা গ্রন্থির ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও চিকিৎসা করে তিনি আরোগ্যলাভ করেন। কিন্তু Petrobas কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁর বিরূদ্ধে বিরোধীরা হৈ চৈ শুরু করে দেয়। এছড়াও অ্যামাজন অঞ্চলে জনজাতি দের উচ্ছেদ করে বাঁধ নির্মাণ সহ তাঁর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দেয়। তাঁর বিরূদ্ধে আন্দোলন শুরু হয় এবং তিনি জনপ্রিয়তা হারান।
শেষে ২০১৬ তে তাঁকে ইমপিচ করে মাইকেল টেমরকে তত্ত্বাবধায়ক প্রেসিডেন্ট করা হয়। ২০১৮ এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা আবার প্রার্থী হতে গেলে তাঁকে দাঁড়াতে দেওয়া হয় না, উল্টে Car Wash কেলেঙ্কারিতে যুক্ত করে কারারুদ্ধ করা হয়। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে প্রমাণাভাবে ২০১৯ এ লুলা কারামুক্ত হন। ততদিনে মার্কিন মদতপুষ্ট প্রাক্তন সামরিক অফিসার জাইর বোলসোনারো ২০১৮ তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে স্বৈরাচারী শাসন চালান। তাঁর সময়ে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে ঢালাও বেসরকারিকরণ এবং অ্যামাজন অঞ্চলে জঙ্গল সাফ করে বড় বড় পশু খামার ইত্যাদি গড়ে ওঠে।
লুলার পুনর্নির্বাচন: ২০২২ এর নির্বাচনে ব্রাজিলের জনগণ বোলসোনারোকে পরাজিত করে লুলা কে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করলে বোলসোনারো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। এই পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতি এবং পরিবেশ রক্ষা গুরুত্ব পায়। কর সংস্কার করা হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্রাজিল স্বাধীন নিরপেক্ষ ভূমিকা নেন। ইউক্রেন ও মধ্য এশিয়ার যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও সহযোগী দিলমা রোসেফ কে লুলা কেন্দ্রীয় ফেডারেল ব্যাংকের প্রধান পদে বসান।
চার আঙুল নিয়ে চতুর্থবার: তাই ২০২৬ এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প থেকে নেতানিয়াহু বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, পুঁজিবাদের তাবৎ প্রতিনিধিরা লুলাকে পরাজিত করার যাবতীয় চেষ্টা চালান। জাইর পুত্র ফ্লাভিও বোলসোনারোকে লিবারাল পার্টির হয়ে তাঁর বিরূদ্ধে দাঁড় করিয়ে সমস্ত সহায়তা দেওয়া হয়। অন্যদিকে লুলার নেতৃত্বে Workers’ Party, Communist Party, Green Party, Sustainable Network এবং Social Democratic Party – র একাংশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে Frederacao Brasil da Esperanca (Brazil of Hope Federation OR FE Brasil) গড়ে তুলে নির্বাচনী লড়াই চলিয়ে ফ্লাভিও কে পরাস্ত করেন। ফ্লাভিও বাবার মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রতে পালিয়ে যান। লুলা চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কিছু প্রশ্ন: (১) ২০২৬ এর নির্বাচনে জয়ের ব্যবধান কিন্তু খুব কম। মাত্র সাড়ে চার লক্ষ ভোট। লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯% এবং ফ্লাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২১% ভোট।
(২) লুলা র বয়স এখনই ৮০ বছর।
(৩) টলটলায়মান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। ইউক্রেন, পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকায় বিরামহীন যুদ্ধ। যা ইজরায়েল ও মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আরও তীব্র হতে পারে। কুবা (Cuba) যেকোন সময় ভেনেজুয়েলার মত মার্কিনের দখলে চলে যেতে পারে। এল সালভাদোর এর মার্কিন ভাড়াটে সেনারা ইতিমধ্যে হাইতি তে অবতরণ করেছে।
(৪) বিশ্ব জুড়ে আর্থিক, শক্তি ও পরিবেশগত সংকট।
এমতাবস্থায় একপাশে স্ত্রী জিঞ্জা এবং অন্যপাশে নির্বাচনে তাঁর রানিং মেট জেরাল্ড আকমিনকে সঙ্গে নিয়ে লুলার হাসি আর কতদিন অক্ষয় থাকবে?
বিশ্বজুড়ে এই প্রবল সংকটের মধ্যেও ব্রাজিলবাসী লুলার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের উপর ভরসা রেখেছেন, আমাদেরও ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের উপর আস্থা রাখতে হবে।
৩১.১০.২৬











