কিছুদিন আগেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী, পাশে নারায়ণ স্বরূপ নিগমকে বসিয়ে সংবাদমাধ্যমে বলছিলেন, সরকার বদলালেও থ্রেট কালচার এখনও বিদ্যমান। মন্ত্রীর সেই বক্তব্য শুনে অবশ্য বোঝার উপায় ছিল না যে, থ্রেট কালচারের নতুন সংস্করণ চালু করার প্রস্তুতি তাঁর নিজের দফতরেই চলছে। মাত্র ছ’মাসের মধ্যেই সেই সংস্কৃতির দাঁত-নখ বেরোতে শুরু করেছে।
এবারের ঘটনা WBJDF-এর সহযোদ্ধা ডা. অগ্নিবীণ কুণ্ডুকে ঘিরে।
২০২৫ সালের ২২ তারিখে মেডিসিনে PGT ডিগ্রি সম্পন্ন করে তিনি স্বাস্থ্য ভবনে পুনরায় সরকারি কাজে যোগদান করেন। এরপর ইজতেমা ডিউটি, দিঘার রথযাত্রার ডিউটি, কিছুদিন সাগর দত্ত হাসপাতালে কাজ এবং পরবর্তীতে অস্থায়ীভাবে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন। রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিপুল ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অগ্নিবীণের মতো বহু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে এভাবে কোনও স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছাড়াই, প্রয়োজনমতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করার পুরনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি এই সরকারও বজায় রেখেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠকেও আমরা এই সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম।
গত ২৫ অক্টোবর, রবিবার, চোরবাগানের সপ্তমীর দিন মর্মান্তিক মৃত্যুমিছিলের পর হাসপাতালের পরিকাঠামোর কঙ্কালসার চিত্র আমাদের ইন্টার্ন ছোট ভাইয়েরা অসহায়ভাবে তুলে ধরেছিল। তার সমর্থনে WBJDF-এর পক্ষ থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন ডা. অগ্নিবীণ কুণ্ডু সহ অনেকে। এর ঠিক দু’দিন পর, মঙ্গলবার, স্বাস্থ্য ভবন থেকে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। হঠাৎ তাঁর বর্তমান কাজের পরিধি, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি জানতে চাওয়া হয়। কথাবার্তার ধরন ও ইঙ্গিত থেকে আশঙ্কা তৈরি হয়, মিষ্টি কথার আড়ালে কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এরপরই সামনে আসে দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে তাঁকে মাত্র দু’মাসের জন্য অস্থায়ীভাবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত।
এই ঘটনায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, দুর্গাপুজো ও কালীপুজোর মাঝের এই সময়ে দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে ঠিক কী বিশেষ প্রয়োজনে তাঁকে মাত্র দু’মাসের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক যুক্তি কী?
দ্বিতীয়ত, আগের সরকারের আমলে দেবাশিস, আসফাক কিংবা অনিকেতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে নিয়মবহির্ভূত বদলির প্রতিবাদে আমরা বারবার বলেছি, বদলির একটি স্বচ্ছ, নির্দিষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতি থাকা উচিত। সরকার বদলেছে, কিন্তু কোন নিয়মে, কীসের ভিত্তিতে এই বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা আজও অজানা। পুরনো সরকারের আমলে যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, নতুন সরকারের আমলেও সেই একই প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে কেন?
তৃতীয়ত, প্রতিবাদ কোনও অপরাধ নয়। একজন চিকিৎসক এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, হাসপাতালের পরিকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরা এবং সঠিক পদক্ষেপের পক্ষে দাঁড়ানো গণতান্ত্রিক অধিকার। সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া সরকারের বিরোধিতা করা নয়। বরং একটি নির্বাচিত সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করাই এমন প্রতিবাদের উদ্দেশ্য।
চতুর্থত, সরকারি বদলির নির্দেশ সাধারণত দফতরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। একাধিক বদলির নির্দেশ প্রকাশিত হলেও ডা. অগ্নিবিন কুণ্ডুর বদলির নির্দেশটি সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ৯টার সময় সেই নির্দেশ তাঁর হাতে আসে। প্রশ্ন হলো, এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ তৈরি হলো কেন?
আমরা জানি, স্বাস্থ্য দফতরের তরফে একে একটি ‘রুটিন বদলি প্রক্রিয়া’ বলে ব্যাখ্যা করা হবে, এবং সরকারি চিকিৎসকরা গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যায় না বলে অপব্যাখ্যা করা হবে। অতীতে এমন ব্যাখ্যা আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্তকে রুটিন বললেই তার পিছনের যুক্তি, প্রক্রিয়া এবং সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। আমরা এও বলতে চাই, যে গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাওয়া নিয়ে সকল সরকারি চিকিৎসক মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে চাকরিতে ঢোকার সময়। কিন্তু সেই বদলির নির্দিষ্ট লিখিত নিয়ম থাকা প্রয়োজন। তার বদলে সেই বিগত আমলের মতন প্রতিহিংসামূলক বদলির কুপ্রক্রিয়া চলতে থাকলে, তাকে আমরা তীব্রভাবে ধিক্কার জানাই।
ব্যক্তিবিশেষের বদলির প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্নটি হলো, নতুন সরকারের আমলেও কি প্রতিবাদী চিকিৎসকদের প্রশাসনিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলার পুরনো কৌশল ফিরে আসছে? আগের সরকারের আমলে যে প্রশাসনিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছে, সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হলে সরকার বদলের অর্থ কী?
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহাশয়, থ্রেট কালচার শুধু হাসপাতালের কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাদাগিরি নয়। প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে প্রশ্ন তোলা, প্রতিবাদ করা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টাও থ্রেট কালচারেরই একটি রূপ। নাম বদলে, ভাষা বদলে, পদ্ধতি বদলে সেই সংস্কৃতি চলতে থাকলে তাকে নতুন কিছু বলা যায় না।
সরকার বদলেছে। প্রশাসনিক সংস্কৃতিটাও বদলাক। প্রতিবাদকে বিরুদ্ধাচরণ হিসেবে না দেখে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখতে শিখুন।
থ্রেট কালচার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। নিজের প্রশাসনের মধ্যে তার চর্চা বন্ধ করাটাই আসল পরীক্ষা।













