১৮৪৮ এ দুই জার্মান দার্শনিক এবং সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস – ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস তাঁদের রচিত কমিউনিষ্ট ম্যানিফেস্টো – র উপস্থাপনায় বলেছিলেন যে ইউরোপ কমিউনিজমের ভূত দেখছে। রোজা লাক্সেমবার্গ, কার্ল লিবনেখত প্রমুখ বিপ্লবী নেতৃত্বের প্রবল চেষ্টা সত্ত্বেও জার্মানিতে উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর সেই ইউরোপের একাংশ (রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশ) ১৯১৭ এ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করে কমিউনিজমকে বরণ করে নেয়। ১৯৪০ এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ব ইউরোপের পূর্ব জার্মানি (জি ডি আর), পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং বলকান অঞ্চলের যুগোস্লাভিয়া ও আলবেনিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় সেই কমিউনিজমকেই গ্রহণ করে। আবার ১৯৪৮ থেকে জোসেপ ব্রিজ টিটোর নেতৃত্বে যুগোস্লাভিয়া এবং তারপর এনভার হালিল হোজার নেতৃত্বে আলবেনিয়া জোসেফ ভিসারিওনভিচ স্ট্যালিনের কমিউনিষ্ট নেতৃত্বের মূল বলয় থেকে বেরিয়ে এসে পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কমিউনিজম অনুশীলন করেন।
আবার ১৯৯১ এর শেষ লগ্নে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে যে কমিউনিজমের ভূত তাড়ানো শুরু হয় সেটি সমস্ত পূর্ব ইউরোপীয় ও বলকান অঞ্চলের দেশগুলি থেকেও কমিউনিজমের ভূত তাড়িয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়াকে টুকরো টুকরো করে দেয়। ইউরোপে অবস্থিত এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন, মোল্ডোভিয়া; ট্রান্স ককেশীয় অঞ্চলের জর্জিয়া, আর্মেনিয়া প্রমুখ সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিকগুলি সোভিয়েত ইউনিয়ন (ইউ এস এস আর) থেকে স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে বেলারুশ বাদে বাকিরা মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদের দিকে ঝোঁকে। রাশিয়ান এস এস আর কমিউনিজম বিযুক্ত হয়ে হয়ে যায় রাশিয়ান ফেডারেশন।
৩৫ বছর পর আবার ২০২২ থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ এবং পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার যুদ্ধগুলির পরোক্ষ প্রভাব; অর্থনীতির মন্দার বিপ্রতীপে অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি; ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিনের আগ্রাসী বাণিজ্য, শুল্ক ও গ্রিনল্যান্ড দখলের অভিপসা সহ যুদ্ধ নীতি এবং এর ফলে সমস্ত ইউরোপ জুড়ে যে আতঙ্ক, অস্থিরতা; নতুন করে আফ্রিকা ও অন্যত্র থেকে শরণার্থীর ভিড়; তেল – গ্যাস, আবাসন, কর্মসংস্থান সহ নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির সংকট; রাষ্ট্রগুলির নাগরিক পরিষেবায় কাটছাঁট; আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার খরচ ইত্যাদি নতুন করে দিকে দিকে যে গণ আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে তাতে ছাত্র, নব প্রজন্ম, সাধারণ নাগরিক, অভিবাসীদের অংশগ্রহণ ব্যাপক।
তাই দেখে কেউ কেউ ভাবছেন ইউরোপে কমিউনিজমের পুনরুত্থান হচ্ছে। কিন্তু বিষয়গুলি মোটেই একমাত্রিক বা সরল রৈখিক নয়, বরং জটিল, উদ্বায়ী এবং প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল। আমরা এখানে সাধারণভাবে এবং বলকান, পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম ইউরোপের, ইউরোপের তিনটি অংশের আন্দোলনরত তিনটি দেশের বিশেষ অবস্থাগুলিকে প্রাথমিকভাবে বোঝার চেষ্টা করব।
ধনী, উন্নত ও সৌন্দর্যময় ইউরোপে এত অশান্তি কেন?:
সাধারণ বিষয়গুলি (Common Issues) –
(এক) বিপরীত ঔপনিবেশিকতা (Reverse Colonization): কোন কিছুই স্থির নয়, সবকিছুই পরিবর্তনশীল। এমনিতেই প্রাচ্যের তুলনায় ইউরোপ অনেক নবীন সভ্যতা। তার উপর গ্রিক – রোমান অগ্রগতির উত্তরাধিকারকে পিছনে ফেলে মধ্য যুগে অশিক্ষা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার, দারিদ্র্য, মহামারী ইত্যাদি নিয়ে ইউরোপ নিমজ্জিত হল এক অন্ধকার যুগে (Dark Age)। মোটামুটি ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই অন্ধকার থেকে উঠে এল চরম ধর্মান্ধ ও গোঁড়া খ্রিস্টান রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপের নেতৃত্বে ডোমিনিকান সহ বিভিন্ন গোত্রের ভয়ংকর সব ধর্মরক্ষাকারী বাহিনী। যারা ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে পাগান ধর্মাবলম্বী দিকপাল গণিতজ্ঞা, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও অধ্যাপিকা হাইপেশিয়া কে নৃশংস অত্যাচার করে হত্যা করে এবং আলেকজান্দ্রিয়ার জগৎবিখ্যাত লাইব্রেরি টিকে পুড়িয়ে দেয়। তারপর মাতিলদা অফ ম্যাগডেবার্গ, মার্গারিটা পোরেতে, জোয়ান অফ আর্ক, যান হাস, থমাস মুঞ্জে, গ্যালিলিও গ্যালেলাই, মাইকেল সারভেটাস, জিওনার্ডো দ্য ব্রুনো সহ লক্ষ লক্ষ মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানী, প্রতিবাদী, পাগান ধর্মাবলম্বীকে ধর্মদ্রোহিতার (Heresey) অপরাধে হত্যা বা কারারুদ্ধ করে দমন করা হয় (Inquisition), শুরু করে লেভান্ত জুড়ে জুরুজালেমের অধিকার নিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে দীর্ঘ ধর্মযুদ্ধ (Crusade)। বহুজনের প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ ইউরোপ কে অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ ঘটায় ১৪০০ শতাব্দীর ইতালির রেঁনেসা (Reneissance), ১৭৬০ – ১৮৪০ ব্যাপী ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) এবং ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯ – ‘ ৯৯)।
এগুলির উপর ভর করে কৃষি, শিল্প (Industry); চারু কলা (Arts), সাহিত্য; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি; অর্থনীতি, সামরিক শক্তি – সব দিক দিয়ে ইউরোপের বিপুল অগ্রগতি ঘটে। এরপর নতুন কাঁচামাল ও সম্পদ, সস্তা শ্রমিক ও দাস, নতুন নতুন বাজার দখল ও সৃষ্টি করতে বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তি তাদের শক্তিশালী নৌবহরের মাধ্যমে আবিশ্ব তোলপাড় করে বিশ্বের সমস্ত অঞ্চল ও সেখানকার সমস্ত সম্পদ বলপূর্বক দখল করে নেয়। শুরু হয় উপনিবেশের (Cololnizarion) যুগ এবং লুঠ করা এই ধন সম্পদে ইউরোপ প্রাচুর্যে উপচে পড়ে। উদাহরণ, সেই সময় বিশ্বের সবচাইতে সম্পদশালী ও ধনী দেশ ভারতকে লুঠ ও শোষণ করে ব্রিটেন হয়ে যায় বিশ্বের সবচাইতে ধনী দেশ।
সেইসময় থেকে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক দেশগুলি নিজেদের প্রয়োজনেই উপনিবেশগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণে দাস, শ্রমিক ও মেধা সম্পদকে নিজেদের দেশে নিয়ে এসে নানারকম বিশেষত দৈহিক শ্রমের কাজে লাগায়। সেই অভিবাসীদের কয়েক প্রজন্মের সন্তানসন্ততিরা এখন ঐ ইউরোপীয় দেশগুলির বড় জনসংখ্যা, নাগরিক এবং প্রভাবশালী ভোটার। যেমন ব্রিটেনে পাকিস্তানি, ভারতীয়, বাংলাদেশী; জার্মানিতে তুর্কি, সিরিয়ান; ফ্রান্সে আলজিরিয়ান, মরোক্কান, টিউনিশিয়ান; নেদারল্যান্ডসে সুরিনামিজ; স্পেন ও পর্তুগালে মরোক্কান প্রমুখ।
তবে কিছু ব্যতিক্রম বাদে এরা এখনও শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মূলত অসংগঠিত শ্রমিক কর্মচারী। এখন অর্থ, স্থান, জলবায়ু ও অন্যান্য সংকটে জেরবার ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীরা এবং সেখানকার সরকারগুলি সমস্ত সমস্যার কারণ হিসাবে এই অভিবাসীদেরকেই (Immigrants) কেবল দায়ী করছেন এবং তীব্র হচ্ছে জাতি বিদ্বেষ ও কঠোরতর হচ্ছে অভিবাসী বিরোধী আইন ও ব্যবস্থা। আবার এই অভিবাসীদের সিংহভাগ মুসলমান ধর্মাবলম্বী তাই খ্রিস্টধর্মী ইউরোপে নতুন করে শুরু হয়েছে ইসলাম ভীতি (Islamophobia)।
(দুই) পুঁজিবাদের প্রাণভোমরা (Driving Force) বাজার অর্থনীতি (Market Economy) সহ সব কিছুর ধারণ ক্ষমতার শেষে পৌঁছনো (Reaching to the Saturation Points): স্থান, বাসস্থান, সম্পদ, শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, পরিষেবা, অর্থনীতি, বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, চারু কলা – সাহিত্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, পরিবেশ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা – সবকিছুই তার ধারণ ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে সীমিত (Stagnant) বা স্থির (Static) বা ধীর লয়ের (Slow Down) হয়ে গেছে। যা জন্ম দিয়ে চলেছে গুরুতর সামাজিক সংকটের।
(তিন) অর্থনীতির অবনমন (Economic Downfall): ঐ ধারণ ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে অর্থনীতির আর বিকাশ হচ্ছে না। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার চাইতেও চিন শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তিতে এক বড় প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছে যার Belt & Road Initiatives এর অঙ্গ China – Europe Express (Steel Camel Caravan) দিয়ে সস্তা পণ্যে ইউরোপের বাজারগুলি ভরিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সহযোগীর থেকে বেশি প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ট্রাম্পের বাণিজ্য ও শুল্ক নীতি বিপদের কারণ হয়েছে। এছাড়াও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (EU) অন্তর্গত দেশগুলির মধ্যেকার টানাপোড়েন, EU – র সঙ্গে ইংল্যান্ড সহ EU বহির্ভূত দেশগুলির সংঘাত; এছাড়াও ইউক্রেনের ও সেখান থেকে চলে আসা শরণার্থীদের দায় ও ব্যয়ভার; NATO – র অংশীদারত্ব কিংবা ভবিষ্যতে রুশ বা মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা বা বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়া প্রভৃতি আর্থিক সংকটের সৃষ্টি করেছে। ফলে সব সরকারকেই কঠোর আর্থিক নীতি ও বাজেট কাটছাঁট (Austerity Measures) নিতে হচ্ছে। তাই একদিকে কমে যাচ্ছে সরকারি পরিষেবা, অন্যদিকে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ। এগুলি ক্রমশ সাধারণের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ার ফলেও ইউরোপ জুড়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।
(চার) বিশ্ব জুড়ে ধারাবাহিক অস্থিরতা এবং সেই কারণে ধারাবাহিক অভিবাসন (World Wide Turmoil and consequent Mass Exodus): অতীতে বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও সামরিক শক্তিগুলির দখলদারির অংশ হয়ে উঠলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন ও সোভিয়েত রাশিয়া দুই বৃহৎ শক্তির ক্রমাগত ঠাণ্ডা লড়াই (Cold War) এর সবচাইতে বড় পরীক্ষাগার ও ভুক্তভুগী হয়ে ওঠে ইউরোপ। সেই সময় সোভিয়েতের উপগ্রহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি (Warsaw Pact Countries) থেকে উন্নত অর্থনীতি ও মুক্ত গণতন্ত্রের আশায় সেখানকার বাসিন্দাদের একাংশের পশ্চিম ইউরোপে দুঃসাহসী পালিয়ে আসা যা দুর্ভেদ্য বার্লিন প্রাচীর দিয়েও আটকানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মূলত অর্থনীতিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গ্রিস, টার্কি থেকে আরম্ভ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নাগরিকদের নিয়মিত পশ্চিম ইউরোপে অভিবাসন।
(পাঁচ) সাম্প্রতিক মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ: আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন,প্যালেস্তাইন প্রভৃতি দেশে যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের কারণে প্রচুর শরণার্থী ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছেন। সেরকম যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধে দীর্ণ আফ্রিকা থেকেও। জীবন তুচ্ছ করে উত্তাল সমুদ্রে ভেলায় চেপে, ট্রাক বা জাহাজের খোলে লুকিয়ে মরিয়া শরণার্থীরা ইউরোপে চলে আসছেন। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং প্রায় ছয় বছর ধরে চলা যুদ্ধে তছনছ ইউক্রেন থেকে অনেক নাগরিক পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছেন। বাড়ছে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির উপর জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ এবং ফলশ্রুতি রাজনৈতিক অস্থিরতা।
জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি র মত বড় অর্থনীতির ও উন্নত দেশগুলি ছাড়াও সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্পেন প্রভৃতি ভাল অর্থনীতির উন্নত ও ধনী দেশগুলিতেও এর প্রভাব পড়ছে। চমৎকার নিসর্গ সৌন্দর্য ও আবহাওয়া; উন্নত শিল্প কৃষি ও বাণিজ্য, শিক্ষিত অল্প ও সুশৃঙ্খল জনসংখ্যা; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পরিবহন ও প্রশাসনিক সুব্যবস্থা; উৎকৃষ্ট শিল্প – সংস্কৃতি – ক্রীড়া ইত্যাদি নিয়ে এই দেশগুলির ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়ছে। এছাড়াও প্রভাব পড়েছে মানব সম্পদে সেরা, ধনী, উন্নত, চির শান্তির শীতল নর্ডিক দেশ আইসল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ড নতুন করে ন্যাটোতে ঢুকেছে। ভোগ ও ভ্রমণের এবং তৃতীয় বিশ্বের ধনীদের অর্থ রাখার জায়গা লাক্সেমবার্গ, লিচেনস্টেইন, মোনাকো, সান মারিনো, অ্যান্ডোরা প্রমুখ ছোট ছোট শান্তিপূর্ণ ইউরোপীয় দেশগুলিও সমস্যার মুখে। হরমুজের মত কৃষ্ণ সাগর বিবাদনাম রুশ – ইউক্রেনীয় ড্রোন – টর্পেডো হানায় বিপর্যস্ত। চেরনোবিলের পর যুদ্ধে ইউক্রেনের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রগুলির তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানো এবং রুশ পারমাণবিক বোমার ভয়ে ইউরোপ কাঁপছে।
তিনটি উত্তাল ইউরোপীয় দেশ: আমরা এবার বলকান, পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম ইউরোপের তিনটি উত্তাল দেশের বিশেষ অবস্থা নিয়ে সংক্ষেপে কথা বলি।
(এক) সার্বিয়া: বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সার্ব দের এই অঞ্চল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুগোশ্লাভ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হয় সমাজতান্ত্রিক যুগোশ্লাভিয়া। ১৯৪৫ – ‘ ৮০ যার শাসক ছিলেন মার্শাল টিটো। কিন্তু ১৯৯০ র পর যুদ্ধ ও জাতি দাঙ্গার মধ্যে দিয়ে যুগোশ্লাভিয়া ভেঙ্গে স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া ও হারজেগোভিনা, মন্টেনেগ্রো, নর্থ ম্যাসিডোনিয়া ও কসোভো – জাতি রাষ্ট্রগুলি তৈরি হয়।
২০১২ থেকে এখানকার সার্বিয়া রাষ্ট্রের ক্ষমতায় ‘ সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ‘ এবং তাদের নেতা আলেকজান্ডার ভুচিচ ২০১৪ থেকে ‘১৭ দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং ২০১৭ ও ২০২২ এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি রুশ ও চিন পন্থী। তার সময় চিন তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর অঙ্গ হিসাবে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের সঙ্গে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে র মধ্যে দ্রুতগামী রেল ব্যবস্থা (High Speed Rail) গড়ে তোলে।
প্রায় ১৪ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা, দমন নীতি এবং সরকারের দুর্নীতি জনমানসে প্রবল বিক্ষোভের সঞ্চার করে। এরমধ্যে ২০২৪ এর ১ নভেম্বর নোভি সাদ রেল স্টেশনের ছাউনি ভেঙ্গে ১৬ জনের মৃত্যু ছাত্রদের পথে নেমে বিক্ষোভে সামিল করে। সেখানে আস্তেআস্তে বুদ্ধিজীবী, পেশাদার, অধ্যাপক, চিকিৎসক, খেলোয়াড়, প্রাক্তন আমলা, অর্থনীতিবিদ সাধারণ মানুষ যুক্ত হতে শুরু করেন। সকাল ১১.৫২ মিনিটে দুর্ঘটনা টি ঘটেছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী রা প্রতিদিন ঐ সময় ১৬ মিনিট রাস্তা অবরোধ করে প্রতীকী প্রতিবাদ দেখাতে শুরু করেন। ম্যরাথন দৌড়ের মত জনপ্রিয় বিষয় সংগঠিত করে সর্বত্র প্রচার শুরু করে দেন। এরপর লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের সমাবেশে আসতে থাকেন।
তাদের দাবি ছিল: (১) সরকারি কেনাকাটায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, (২) সমস্ত সরকারি প্রকল্পের অডিট, (৩) সংবাদ জগতকে মুক্ত করা, (৪) ১২ মাস কাজ করার পর অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ী করা, (৫) সাধ্যের মধ্যে আবাসনের ব্যবস্থা ইত্যাদি।
এরপর ছাত্র ও অন্যান্যরা ‘ স্টুডেন্ট লিস্ট ‘ দল তৈরি করে সংসদের নির্বাচনে দাঁড়ায়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ২৫০ আসনের মধ্যে ১৪০ টি আসনে জয়লাভ করে তারা সরকার গঠন করতে চলেছেন। বেলগ্রেড সহ দেশের সর্বত্র জনগণ রাস্তায় নেমে উৎসব করছেন। ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি জিতেছে ১০৪ টি আসন। ‘ স্টুডেন্ট লিস্ট ‘ রুশ ও চিন বিরোধী EU ও মার্কিন পন্থী। তাদের নেতা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ৫৬ বছর বয়সী ইলিজা সারডানোভিক।
(খ) পোল্যান্ড: উত্তরের বাল্টিক সাগর সংলগ্ন পূর্ব ইউরোপের এই দেশটি ইউরোপের মধ্যে পঞ্চম বৃহৎ ও পঞ্চম জনবহুল। ইউক্রেন সীমান্ত সংলগ্ন, রুশ সীমান্তও কাছাকাছি। অতীতে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আগ্রাসনের শিকার হয়ে ভার্সাই সন্ধি অনুযায়ী ১৯১৯ এ পুনর্গঠিত হয়ে সেকেন্ড পোলিশ রিপাবলিক গড়ে ওঠে যা বেশ কয়েকটি সোভিয়েত সামরিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করে। পরে ১৯৩৯ এ নাজি জার্মানির পোল্যান্ড আগ্রাসনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। পোল্যান্ডের ইহুদিরা বেশ কিছু নাজি হলোকাস্টের শিকার। একই বছর সোভিয়েত রাশিয়া পোল্যান্ড আক্রমণ করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তির জয় ও অক্ষ শক্তির পরাজয়ের পর ১৯৪৪ – র ওয়ারশ চুক্তির মাধ্যমে পোল্যান্ডকে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক জোটের মধ্যে নিয়ে আসা হয়।
আবার পোল্যান্ডেই পূর্ব ইউরোপে ১৯৮৯ তে প্রথম কমিউনিষ্ট শাসন অবসানে উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৮০ থেকে ডক শ্রমিক নেতা লেচ ওয়ালেচার নেতৃত্বে সলিডারিটি আন্দোলনের সূচনা। ১৯৯৯ তে পোল্যান্ড ন্যাটোভুক্ত এবং ২০০০ এ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১১ এ পোল্যান্ডের ক্ষমতায় আসে EU পন্থী ‘ ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি (Civil Platform) ‘ ডোনাল্ড টাস্ক র নেতৃত্বে। ২০১৫ থেকে ‘ ২৩ ক্ষমতায় থাকে কিছুটা রুশপন্থী ‘ ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (PiS) ‘। ২০২৩ এ ডোনাল্ড টাস্ক পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউক্রেন থেকে বিপুল পরিমাণ উদ্বাস্তুর আগমন, ঘরের পাশে ইউক্রেনে যুদ্ধ, শক্তি ও অর্থনৈতিক সংকট, পোল্যান্ডের মাটিতে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন এই সময়কার বড় ঘটনা। কিন্তু আরও বড় ঘটনা একদিকে শাসক Civic Platform ও বিরোধী PiS এবং প্রেসিডেন্ট
কারোল নাভ্রতস্কি ও প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক – র বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রেসিডেন্ট – প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে মধ্যে দ্বন্দ্ব – সংঘাত এবং সমাজের আড়াআড়ি বিভাজন। যার প্রভাব রাস্তায় গণআন্দোলনে পড়েছে।
(৩) ফ্রান্স: লিবার্টি, ইকোয়ালিটি, ফ্র্যাটারনিটি – র দেশ; শিল্প, সাহিত্য, চারুকলা, সংস্কৃতির পীঠস্থান; শিল্পোন্নত ধনী দেশ। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি, চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক এবং পারমাণবিক শক্তি। বিশ্বের উন্নত মানের যাত্রী বিমান Airbus এর প্রস্তুত কারক Eurocopter কিংবা আধুনিক যুদ্ধ বিমান Rafale এর নির্মাতা সংস্থা Daussent ফ্রান্সে অবস্হিত। এতটাই মানবতাবাদী, উদারতাবাদী, সহিষ্ণু দেশ যে ৬৯ মিলিয়ন জনসংখ্যার ৪০% অভিবাসী যেখানে ইতালিয়ান, আর্মেনিয়ান, টার্কি রা যেমন আছেন তেমনই আছেন প্রচুর পরিমাণ আলজিরিয়ান, মরোক্কান সহ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এবং অবশ্যই প্রচুর মিশ্র প্রজাতির মানুষ।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট ইত্যাদির মধ্যে বাম ও দক্ষিণ পন্থীদের মধ্যে আড়াআড়ি সামাজিক বিভাজনের মধ্যে এক কেন্দ্রবাদী (Centrist) ৩৭ বছরের ঝকঝকে তরুণ ব্যাংকার ইমানুয়েল ম্যক্রন দুদিকে ভারসাম্য বজায় রেখে ২০১৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। দ্বিতীয় হলেন অতি দক্ষিণপন্থী Resemblement Nationale (RN) নেত্রী মারিন লি পেন। ম্যক্রন এসে বিভিন্ন কর কমানো, ব্যবসার স্বার্থে পুঁজি ও শ্রমের গতি সহজ করা, বীমার পরিধি বৃদ্ধি ইত্যাদি বেশ কিছু আর্থিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক, শ্রম, প্রশাসনিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, অভিবাসী সংক্রান্ত সংস্কার করে মূলত শিল্প – বাণিজ্যের সুবিধা সৃষ্টি করে (Macronism) সাড়া ফেলে দিলেন। আবার পেট্রো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শক্তিশালী ইয়েলো ভেস্ট (Gilet Jaunes) গণ আন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করলেন।
তাঁর প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় পর্বে ম্যক্রন ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন শুল্ক, বাণিজ্য, বিদেশ ও যুদ্ধনীতিকে সমালোচনা করে; ইউরোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে; ইউক্রেনকে সমর্থন জানিয়ে এবং মার্কিন নির্দেশ সত্ত্বেও ইরান যুদ্ধে না জড়িয়ে; লেবাননে ইজরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ধিক্কার জানিয়ে নিজস্বতা বজায় রাখলেও ঘরের মাঠে তার কেন্দ্রবাদী নীতি ক্রমশ দক্ষিণপন্থী বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেটের পক্ষে গিয়ে সামাজিক অসাম্য ও অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলল। সীমিত ধনীরা আরও ধনী হয়ে চললেন, বড় সংখ্যক গরীব মানুষ যাদের বড় অংশ কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী ও শ্রমিক, তারা আরও গরীব হয়ে চললেন। ধনী অভিজাতদের হর্ম্য প্রাসাদ ও ভোগের ফোয়ারার বিপরীতে প্যারিস সহ বড় বড় শহরগুলির ঘিঞ্জি অস্বাস্থ্যকর ঘেটোগুলি অপরাধ ও পাপের আস্তানা হয়ে উঠল।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শক্তি সংকট ও অর্থনীতির মন্দার আবহে পেট্রল ও অন্যান্য দ্রব্য মূল্যের ব্যাপক বৃদ্ধি, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, আবাসন সমস্যা, কাজ হারানো ও কর্ম সংস্থানের অভাব, মাইনে ফ্রিজ হওয়া, পুঁজিপতিদের স্বার্থে শ্রমের উদারীকরণ, পেনশন ও বীমা সংকোচ, ধনীদের কর ছাড়, গণপরিষেবা কাটছাঁট, লাভজনক সরকারি সংস্থার বেসরকারিকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে উপর্যুপুরি তাপ প্রবাহ (Heat Waves) ইত্যাদি সাধারণ জনজীবনকে দুর্বিষহ করে দিল যা একের পর এক নাগরিক ও শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম দিল যেগুলি ম্যক্রন সরকার পুলিশ ও বিশেষ নিরাপত্তাবাহিনী দিয়ে দমন করলেন। তার আমলে বেড়ে গেল বেপরোয়া অপরাধের সংখ্যা। তার এই নব উদারবাদী নীতির ফলে ফ্রান্সের পাবলিক ঋণ পৌঁছে গেল চার ট্রিলিয়ন ডলারে যা জিডিপির ১২০%।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও ব্যয় সংকোচ ও অবহেলা, সরকারি স্কুলগুলির প্রতি অযত্ন যেখানে সাধারণ পরিবারের সন্তানরা পড়েন, প্রচুর শিক্ষকপদ খালি অথচ নতুন শিক্ষক নেওয়া বন্ধ করা, স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, উপযুক্ত কাজ না পাওয়া ইত্যাদি সমস্যা ছিলই, পাশাপাশি ছিল ধনীদের সন্তানদের জন্য মূল্যবান এলিট প্রাইভেট স্কুলগুলির বাড়বাড়ন্ত। ম্যক্রন নিজেও এখানকার ছাত্র।
এরপর দীর্ঘ গ্রীষ্মের ছুটির পর শরতে সেপ্টেম্বর মাসে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলগুলিতে আনন্দের পুনঃপ্রবেশের (La Rentree) সময় দেখা গেল স্কুলগুলির ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়ছে, জানালা দরজা ঠিকমত বন্ধ করা যাচ্ছে না, টয়লেটগুলি অপরিচ্ছন্ন ও
ময়লা জমে ব্যবহারের অনুপযুক্ত, স্কুলের মধ্যে ইঁদুর আরশোলা ঘুরে বেড়াচ্ছে, ক্লাসে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে, সমস্ত বিষয় পড়ানোর মত শিক্ষক নেই, পর্যাপ্ত নার্স নেই, এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে শীতে প্রবল শীত আর গরমে প্রবল গরম। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথমে Lycee Saint – Exupery High School এর ছাত্রছাত্রীরা পথে নেমে বিক্ষোভ দেখান। তারপর এই ছাত্র আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র এবং ৬০০ টির বেশি স্কুল ও ১২ টির বেশি বিশ্ব বিদ্যালয়ে। এবার এতে অংশ নেন অভিভাবক, সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও বাম সংগঠনগুলি, গ্রিন পার্টি, প্রাক্তন ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা। প্রধান বামপন্থী দল La France Insomise (LFI) বা France Unbound এবং তাদের নেতা জা লুক মেলেনকন যোগ দেওয়ায় আন্দোলনের গুরুত্ব বাড়ে।
আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলি ছিল: বিদ্যালয় শিক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু সুরক্ষা, সামাজিক অসাম্য দূর করা, জীবন যাপনের খরচ বৃদ্ধি রোধ করা ইত্যাদি। ১৭ অক্টোবর আট লাখের বেশি জনতা পথে নামেন। পুলিশের কঠোর দমন পীড়নে আন্দোলন কোথাও কোথাও হিংসাত্মক হয়ে ওঠে এবং বেশ কিছু জায়গায় অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশের স্টান গ্রেনেড প্রভৃতির আঘাতে বেশ কিছু ছাত্র গুরুতর আহত হয়। ৮০০০ এর বেশি আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয়। আন্দোলনের সুযোগে অপরাধীরা বেশ কিছু মূল্যবান বিপণি লুঠ করে। দক্ষিণপন্থী RN নেত্রী লি পেন অভিবাসীদের দোষারোপ করে ম্যক্রন সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরেন। যদিও তার বিপুল আর্থিক করচুপি ও ইহুদি বিদ্বেষী অতীত প্রকাশ পাওয়ায় জনপ্রিয়তায় কালি পড়েছে। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ম্যক্রন সরকারের দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা করেন বামপন্থী LFI নেতা মেলেনকন। যদিও বেশিরভাগ বয়স্ক মানুষের দেশ ফ্রান্সে আগামী বছর নির্বাচনে এই ছাত্রছাত্রীরা ভোট দিতে পারবেন না, তথাপি ম্যক্রন সরকারের বিরূদ্ধে ব্যাপক গণ আন্দোলন দক্ষিণপন্থী এবং ম্যক্রনপন্থী কেন্দ্র বাদীদের কপালে ইতিমধ্যেই ভাঁজ ফেলেছে।
০৩.১১.২০২৬











