সম্ভবত এস আইআার করে তৃণমূলকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে মমতার এই দাবির বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ কেউ দেখলাম বলছেন, পশ্চিম বঙ্গের এসআইআর নাকি ঠিকঠাক হয়েছে। গোলমাল যা হচ্ছে তা আসলে ভোটের পরে ইলেকশন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। তাই?
দেখুন মমতা এবার হারতেনই। যে পরিমাণ দুর্নীতি, একনায়কতান্ত্রিকতা ফেরেব্বাজি তিনি ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা করেছেন তাতে বাংলার মানুষের বিরাট একটা অংশ তাঁর বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আবার ইলেকশান কমিশন কেন্দ্রিয় শাসক দলকে এই রাজ্যে জেতার ব্যাপারে সর্বোতোভাবে সাহায্যের চেষ্টা করেছে এ ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। সে সাহায্যের কতটা এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে তাদের কাজে লেগেছে সেই চুলচেরা হিসেবে আমি যাচ্ছি না। মমতা এবার হারতেনই, তার পরাজয়ের প্রয়োজনও ছিল। কিন্তু এসআইআর করার নামে গণতন্ত্রকে চুরমার করে দেওয়ার যে অপচেষ্টা ইলেকশান কমিশন অন্য রাজ্যে করেছে সেটা করেছে এখানেও এটুকুই কেবল বলতে চাইছি।
এসআইআর লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিককে অকারণ লাইনে দাঁড় করিয়েছে, সে যন্ত্রণার ইতিহাস নাহয় ভুলেছি আমরা কিন্ত তা যে লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তাঁদের অতল আঁধারে ঠেলে দিয়েছে , সেটা কী করে ভুলি?
প্রথমত এই এসআইআর হল কেন? ভোটার লিস্ট সংশোধন সারা বছরের একটা চলমান প্রক্রিয়া। মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ভোটার, ভূয়ো ভোটার, ‘ঘুসপেটিয়া’ ইত্যাদিদের ভোটের দামামা বাজার অনেক আগেই নির্বাচন কমিশন বাদ দিয়ে নির্বাচন তালিকার প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ফেলতে পারত। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে কাজটা করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কমে যেত, এ নিয়ে সমালোচনার জায়গা থাকত না। কিন্তু সেটা হল না কেন? এর উত্তরের ভেতরেই আছে নির্বাচন কমিশনের দুরভিসন্ধি।
লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নামক এক অদ্ভুতুড়ে অভিসন্ধির জাঁতাকলে ফেলে লক্ষ লক্ষ নাগরিকের নাম নির্বাচনের কয়েকমাস আগে বাদ দিয়ে দিতে পারলে স্রেফ সময়ের অভাবেই তাঁদের নাম কাগজপত্তর যাচাই করে আবার তালিকায় ফেরানো যাবে না, এই ছিল পরিকল্পনা। সেভাবেই চলছিল সব। কিন্তু এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই নাম বাদের তালিকা নিয়ে হস্তক্ষেপ করে সুপ্রিম কোর্ট। ভেবে দেখুন সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনের ঠিক আগে আগে বিচারপতিদের যাচাই করবার জন্য যে বাদ দেওয়া নাগরিকের তালিকা দিয়েছিল সেখানে নাম ছিল প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের। বিচারপতিরা সময় পেয়েছিলেন মেরেকেটে ৪০ দিন এবং বিচারপতিদের সংখ্যা ছিল ৫৩০ জন সম্ভবত। হিসেব করে দেখুন প্রত্যেক বিচারপতি যদি খাওয়া, বাথরুম, ইত্যাদির জন্যও দু পাঁচ মিনিটের সামান্য ব্রেক না নিয়ে প্রতিদিন টানা ১০ ঘন্টা করে ৪০ দিন ধরেই কাজ করেন তাহলে এই ৬০ লক্ষ মানুষের নথি যাচাই করার সময় পাওয়া যাবে মাথা পিছু মাত্র দু মিনিটের কাছাকাছি। এভাবে কাজ করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব? আর দু মিনিটে সব নথি যাচাই করাও প্রাকটিক্যালি কতটা সম্ভব? লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক হয়ত সে কারণেই রয়ে গেলেন নির্বাচন তালিকার বাইরে। এদের নথি যাচাই ঠিকমত হয়নি বলেই পরবর্তীকালের ট্রাইবুনালে এপর্ষন্ত ১০০০-এর ওপর ওপর যাদের নথি যাচাই হয়েছে তাঁদের ৯৪ শতাংশই আবার ঢুকে গেছেন ভোটার তালিকায়।
দ্বিতীয়ত বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের এসআাইআর-এ যত নাম বাদ গেছে তার দায় ইলেকশান কমিশনের নয়, কারণ বাদ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচিত বিচারপতিরা। রিয়েলি? সকল পরিকল্পনা করে, সময়ের পরিসরকে একেবারে ছোট করে, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির খুড়োর কল লাগিয়ে প্রকান্ড এই ঘোঁটটাকেই পাকিয়ে তুলেছিল তাহলে কে? আসলে সুপ্রিম কোর্ট যদি শেষ মুহূর্তে হস্তক্ষেপ না করত তাহলে এই বাদ পড়ার তালিকা হত আরো অনেক অনেক দীর্ঘ। কারণ দেখুন অভিযোগ উঠেছে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মধ্যরাতের পর ERONET পোর্টালে ভোটারদের নথি আপলোডের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ইআরও ও এইআরও-রা এরপর আর নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে পারছিলেন না। যেসব ভোটারকে ইআরও-রা ইতিমধ্যে যোগ্য বলে চিহ্নিত করেছিলেন, তাঁদের অনেকের নাম আবার Under Adjudication বিভাগে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ ছিল। আবার বিচারকরা যে ৩৩ লক্ষ নাগরিককে ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে এনেছিলেন তাদের ভেতর থেকে ভোটের পর ১৬ লক্ষকে যাতে আবার বাদ দেওয়া যায় তার জন্য ভোটের পর ট্রাইবুনালে আবেদন করেছে এই ইলেকশান কমিশন। কেন? এ থেকেই তাদের অভিসন্ধি পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা যেন তেন প্রকারেন এই বাংলায় বৈধ নাগরিকদের বিরাট একটা অংশকে ভোটার তালিকার বাইরে রাখতে চেয়েছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এসআাইআর শুরু করে সময়কে সীমাবদ্ধ করে ফেলা, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির উদ্ভব, ইআরও-দের উপেক্ষা সবই এই দুরভিসন্ধি-পরিকল্পনার অঙ্গ। তাতে নির্বাচন কমিশন অবশ্যই সফল। এই রাজ্যের প্রায় ২২ লক্ষ বেনাগরিক হয়ে যাওয়া মানুষ হত্যে দিয়ে ট্রাইবুনালের দরজায় কড়া নেড়েই চলেছেন নেড়েই চলেছেন। যে গতিতে ট্রাইবুনালে আবেদনের নিষ্পত্তি হচ্ছে তাতে নাকি সমস্ত ফয়সালা হতে ২৫ বছর লেগে যাবে। ফলে তাঁদের এ জনমে আর ভোট দেওয়া হবে কিনা, ঘুসপেটিয়া বলে ডিটেনশান ক্যাম্প চালান করে দেওয়া হবে কি না কিংবা তাঁদের নাগরিক অধিকার কতটুকু আছে এই তথাকথিত রাষ্ট্রবাদী সনাতনীদের প্রশাসনে তা নিশ্চিত নয়।
একটা রাষ্ট্রের তার নাগরিকের প্রতি এর চেয়ে ঘোরতর অন্যায় আর কী হতে পারে! এর জন্য কোনো নিন্দাই যথেষ্ট নয় এবং অবশ্যই নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য যাঁরা একাজে নির্দেশ দিয়েছেন বা সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি প্রাপ্য।










