India Today এর এক সংবাদে প্রকাশ ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ এর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বিভিন্ন আই আই টিতে আত্মহত্যার মোট সংখ্যা হলো ১৭১, তার মধ্যে গত ১১ বছরে মোট ১২০ জন। অর্থাৎ পূর্ববর্তী দশকের থেকে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৫ সালে শুধু খড়্গপুর আই আই টিতেই মারা গেছে ৭ জন, তার মধ্যে অন্ততঃ ৫ জন নিশ্চিতভাবে আত্মহত্যার কারণে। সব কটি আই আই টি মিলিয়ে এ বছরে এখনো পর্যন্ত সংখ্যাটা ১৪ (অক্টোবরের শেষে ধানবাদ IIt-ISM এর ঘটনাটি ধরে), যার মধ্যে খড়গপুর ও বোম্বে আই আই টিতে পরিসংখ্যান তিনটি করে। ২২, ২৩, ২৪ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ১৪ প্রতি বছরে, গত বছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৬। আর এ বছরে তো এখনো ২ মাস বাকি আছে …….
২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হেডলাইন সারা ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঐদিনের কাগজেই আর একটা সংবাদও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সেই প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, গত বছর ৮ ডিসেম্বরে লোকসভায় এক প্রশ্নোত্তরে জানানো হয়, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত বিভিন্ন আই আই টি তে আত্মহননকারী ৪৫ জনের মধ্যে ২৮ জন SC, ST ও OBC সম্প্রদায়ের, ১৬ জন জেনারেল ক্যাটেগরির, একজন EWS( economically weaker section)। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ সালে ১৩ জনের মধ্যে SC, ST, OBC ও General এর ছাত্র ছিল যথাক্রমে ২, ৩, ৪ ও ৪।
সংখ্যাগুলির প্রয়োজন দুটি কারণে। এক, SC, ST ও OBC এর এই বিষয়ে মোট শতাংশ নিশ্চিতভাবে আই আই টি তে তাদের ছাত্রসংখ্যার অনুপাতে যথেষ্ট বেশি। আর দুই, এর মধ্যে জেনারেল ক্যাটেগরির সংখ্যাও যথেষ্ট উদ্বেগজনক, সরকারি মতেই ২০-২১ সাল থেকে ২৪-২৫ সালের মধ্যে মোট ১৬ জন(plus একজন EWS) !!
সবচেয়ে উদ্বেগজনক জিনিস হলো, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া almost routine.. মার্কস্ আশানুরূপ না থাকলে,আই আই টির ঊচ্চস্তরের শিক্ষার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অক্ষমতা, আর সেটা না হলে মানে মার্কস যথেষ্ট ভালো থাকলে, পারিবারিক সমস্যা!! অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের কোনো ভূমিকাই নেই !! অভিভাবকদেরই নিশ্চয়ই উচিত হয়নি, এরকম অপ্রস্তুত ছাত্রদের এখানে পড়তে পাঠানো, অথবা উচিত ছিল তাদের ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খোঁজখবর করার !! প্রতিষ্ঠানের আবার কীসের দায়িত্ব ?! মুম্বাই এর সাম্প্রতিক ঘটনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াও সেই লাইনেই ছিল। ChatGPT থেকে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল’, তাকে বলা হলো যে পরীক্ষা দিতে না পারলেও তার কোনো ক্ষতি হবে না। তাও সে গিয়ে আত্মহত্যা করলো, কী করা যাবে ? এই উত্তর কিন্তু instant বেরিয়ে এলো, তদন্ত কমিটি-কমিশন এসবের কোনো ব্যাপারই নেই। সত্যিই আই আই টি বোম্বের মতো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষাহলে ফোন নিয়ে কীভাবে ঢোকা যায় আর তা দেখে দেখে লেখা যায় বোধোগম্য হলো না, যেমন বোঝা যায় না সেখানে invigilator এর দায়িত্ব কেন বিভাগীয় প্রধানকেই নিতে হয়। আর, এ রকম গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তার অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারে কোনো ক্ষতি হবেনা, এই সিদ্ধান্তও কি তিনি নিতে সক্ষম বা দায়িত্বপ্রাপ্ত? বিভাগীয় প্রধানের উক্তিতেই ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে, নিশ্চয়ই সেটা প্রমাণিত নয়। কিন্তু তড়িঘড়ি নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার প্রচেষ্টাটাই ভীষণভাবে দৃষ্টিকটু। পরবর্তী কালে সেই বয়ানটা প্রত্যাহিত হয়েছে, কিন্তু সেটা তো চাপে পড়ে, স্বাভাবিক ভাবে তো নয়।
প্রশ্নটা এখানেই, কেন একটা অতি উৎকর্ষের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুঁজে বার করার চেষ্টা করবে না সমস্যাটা ঠিক কোথায় হচ্ছে? হতেই পারে মূল সমস্যার সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত নয়, it might be fall out or outcome of a prevailing system, কিন্তু কাউকে না কাউকে তো সিরিয়াসলি দেখতে হবে, what exactly is going wrong, অন্ততঃ আশু কর্তব্য কী কী, সেটা জানাটাও তো নিশ্চিতভাবে প্রয়োজনীয়।
শ্রীরবিশঙ্করজীকে দিয়ে ভাষণ দিয়ে বা ইসকনের সাধুদের দিয়ে spiritual counselling করে তার সমাধান হবে কি? জানিনা এদের কর্তৃপক্ষ সত্যিই কী ভাবছেন বা আদৌ ভাবছেন কিনা।
গত আগষ্ট মাসে দিল্লী আই আই টিতে আত্মহত্যা করে হৃষিকেশ কুমার, আড়াই বছরের মধ্যে অষ্টম আত্মহত্যার ঘটনা, একই প্রতিষ্ঠানে। মারাত্মক অভিযোগ যে,ছেলেটি মানসিক অসুখে আক্রান্ত জানা সত্ত্বেও তাকে নানা ভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয় কর্তৃপক্ষের তরফে। ছাত্রদের আন্দোলনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দিয়ে তদন্ত করালেও, এবং তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা পড়া সত্ত্বেও, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। কবে আসবে বা আদৌ আসবে কিনা জানা নেই!!
একটা কথা ইদানীং কালে সমাজ মাধ্যমে খুব দেখছি যে এর জন্য দায়ী রিজার্ভেশন সিস্টেম বা ‘কোটা’। কম মেধার ছাত্ররা অতি উচ্চ শিক্ষায় খাপ খাওয়াতে পারছে না। ‘কোটা’ তো আমাদের সময়েও মেডিকেল কলেজে ছিল’, সেখানে তো সামনের সারির ছেলেমেয়েরা আসতো। SC, ST থেকে বহু ছাত্রই অসম্ভব ভালো রেজাল্ট করেছে, এই কারণে কারুর অসুবিধা হয়েছে বলে কখনো দেখিনি। হ্যাঁ, যারা পড়াশোনার থেকে অন্য জিনিসকে অগ্রাধিকার দিয়েছে(সম্ভবত আমিও), কোটা বা অ-কোটা যাই হোক তারা পিছিয়ে পড়েছে। আসলে মেধার কি সত্যিই বিরাট তফাৎ আছে বিভিন্ন স্তরের মানুষে? প্রত্যেককে সমান সুযোগ, সমান পরিবেশ, শিক্ষার সমান সুযোগ না দিলে তো তার উত্তর দেওয়া খুব মুশকিল। আর, রিজার্ভেশনের কোটা সম্পর্কে যখন বলা হয়, তখন নিশ্চয়ই ‘ধনবান কোটা’র কথাও বলা উচিত। প্রাইভেট কলেজগুলিতে শুধুমাত্র পিতার অর্থের দাপটে ম্যানেজমেন্ট কোটায় চান্স পাওয়াটাও নিশ্চয়ই মেধা বা ‘মেরিটে’র প্রতি যথেষ্ট সদ্ব্যবহার/সুবিচার করে না। কিন্তু এই নিয়ে উচ্চবাচ্য বিশেষ হতে দেখি না।
আসলে রিজার্ভেশন চালু হয়েছিল পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়গুলিকে সামনে আনার জন্য। সেটা কতোকাল থাকবে ও কাদের জন্য থাকবে, সেটা ঠিক করার কথা সমাজতত্ত্ববিদ বা সমাজবিজ্ঞানীদের। তো কী করা যাবে, সেটা চলে গেছে রাজনীতিবিদ বা ভোটবাক্সের কারিগরদের কাছে। তাই যুক্তিযুক্ত অবস্থান নির্ণয় খুব কঠিন প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।
তবে, আই আই টি তে রিজার্ভেশনের ছাত্রদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক ভাবে বেশি হলেও, জেনারেল ক্যাটেগরি তার থেকে মোটেই মুক্ত নয়, ৪৫ জনের মধ্যে অন্তত ১৬ জন তো বটেই। খুব কম সংখ্যায় কি? তাছাড়া, SC,ST, OBC ছাত্রদের তরফে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তারা লাগাতর ভাবে অপমানিত হয় তাদের রিজার্ভড ক্যাটেগরি থেকে আসার কারণে, বিশেষত তাদের শিক্ষক বা গাইডের কাছ থেকে। এটা কতোটা বাস্তব বা কতোটা মনে হওয়া, তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু রোহিত ভেমুলা বা আমাদের রাজ্যে চুণী কোটালের উদাহরণ তো ভুলে যাওয়ার নয়। জাতিগত অপমানের জন্যই আত্মহত্যা করেছে এটা যেমন নিশ্চিতভাবে বলা খুব মুশকিল, তেমনই এটা আদৌ কোনো contributory factor নয় সেটাও কি এককথায় সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব? ‘তোমার দ্বারা কিছু হবে না’, শুধু এই বাক্যটা যে কতোটা আঘাত করতে পারে একটা তরুণ মনে, সেটা বোঝার মানসিকতা আশা করবো সমস্ত শিক্ষককুলের আছে।
না, শিক্ষকের কী কী গুণ থাকা দরকার তা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। বরং, চিরকাল জনগণের কাছ থেকে শুনে/শিখে এসেছি ডাক্তারদের কী কী গুণাবলী থাকা অতি প্রয়োজন, বিশেষত ব্যবহার সক্রান্ত বিষয়ে। তাই, আমার কোনো রকম অভীপ্সা নেই অন্য এক পেশার মানুষদের নিয়ে আলোচনা করি। তবে, শিক্ষক-অশিক্ষক, শিক্ষিত -অশিক্ষিত যাই হোন, basic sensitivity বা নূন্যতম সংবেদনশীলতা তো সমস্ত মানুষের কাছেই আশা করা যায়! যদিও যত দিন যাচ্ছে সেটুকু আশা করার পরিবেশও বোধহয় হারিয়ে যাচ্ছে……..
কী করা যাবে ?!!
একটা জিনিস পরিষ্কার থাকা উচিত, যে ছাত্রছাত্রীরা আত্মহত্যা করে বিশেষত ক্যাম্পাসে তাদের মতো স্বার্থপর পৃথিবীতে নেই। কারণ তারা শুধু নিজের অসাফল্য, হতাশা বিশেষ করে অপমানকেই বড় করে দেখলো, একবারও ভাবলো না বাকি জীবনটা তাদের মা-বাবার কীকরে কাটবে? প্রতিটা ক্ষণ প্রতিটা সময় সবচেয়ে বেশি দোষ দেবে নিজেদের, কেন তারা স্বপ্ন দেখেছিল’ তাদের সন্তান একটা বলবার মতো কিছু হবে।
……………
……………….
নিচের প্রতিবেদনের একটি দুদিন আগে আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয়, আর অপরটি আজকের Telegraph পত্রিকার reporting…….













