অভয়ার বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা স্বতঃস্ফূর্ত অভয়া আন্দোলন যাতে সময়ের স্রোতে হারিয়ে না যায় তাই ২০২৪ এর ২৮শে অক্টোবর গড়ে ওঠে অভয়া মঞ্চ। ২০২৪ এর অক্টোবর থেকে আজ অবধি এই দেড় বছরের বেশি সময়ের পথচলা সহজ ছিলনা। দ্রোহের কার্নিভালের আগুন বুকে নিয়ে এই মঞ্চ অভয়ার বিচারের দাবিতে ছুটে বেড়িয়েছে মহানগর থেকে রাজধানী শহরে, অভয়ার বিচার আর অভয়াদের সুরক্ষার দাবিকে ছড়িয়ে দিয়েছে গ্রাম শহর মাঠ পাথার বন্দরে। বহু প্রতিবন্ধকতা, ক্ষমতার বহু আস্ফালনকে অগ্রাহ্য করে নারী আর প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের অধিকার রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর কাজ করেছে এই মঞ্চ।
২০২৬ এর নির্বাচনে এক আপাত সংকটের মুখোমুখি হয় মঞ্চ। প্রমাণ লোপাট করা রাজ্য প্রশাসনকে সব রকমের সহযোগিতা করে কেন্দ্রীয় সংস্থা সি বি আই বিচারকে বিশ বাঁও জলে ঠেলে দেয়। একাধিক বার চেষ্টা করেও আর জি করের নির্যাতিত চিকিৎসকের মা বাবা সাক্ষাৎ পান না প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। নাগপুর প্রধান জানিয়ে দেন তাঁরা রাজ্যপ্রশাসনের পক্ষে। উন্নাও, হাথরস, কাঠুয়া, বিলকিস বানো কাণ্ড ঘটানো দলের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক আচরণ। দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং আন্দোলন ভাঙার চক্রান্তের ফসল ফলে বিজেপির প্রার্থী তালিকায়।
বিপুল ভোটে জয়ী হন রত্না দেবনাথ। কিন্তু ২১ মাস ধরে ঘটে চলা অভূতপূর্ব অভয়া আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ মানুষের আবেগ, রক্ত আর ঘামকে অস্বীকার করে, আন্দোলনকারীদের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে হারিয়ে দেন অভয়াকে। রাজনীতির পাশা খেলার গুটিতে পরিণত হয় অভয়ার বিচার। অভয়ার বিচার না পাওয়ার ক্ষেত্রে যারা রাজ্য সরকারের সঙ্গে জোট বেঁধে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল তারাই এখন সহসা গৈরিক সাধু সেজে ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা দেখাতে উদগ্রীব, যদিও ন্যায়ের রাস্তায় কতটা এগোতে পারা যাবে কেউ জানে না।
অভয়া মঞ্চ অনেক আক্রমণের পথ পেরিয়ে এসেছে। আরো অনেক দুর্গম পথ পেরোনো বাকি। শুধু একজন অভয়া নয়, সব অভয়াদের পাশে থেকে লড়াইয়ের জন্য তৈরি এই মঞ্চ নির্বাচনের গড্ডলিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে নিজের পথে এগিয়ে গেছে, বিষের তীরকে উপড়ে ফেলেছে কিন্তু পাল্টা তীর ছোঁড়েনি। লক্ষ্যে অবিচল থাকার আত্মবিশ্বাস অভয়া মঞ্চের শক্তি। তাই বিজেপির একই সঙ্গে দেবনাথ পরিবার এবং বাংলা বিজয়ের পরেও অভয়া মঞ্চের কোন অস্তিত্বের সংকট হয় না।
৪ মে ২০২৬ গেরুয়া সুনামির কয়েকদিন পরেই ৯ মে অভয়া মঞ্চ রবীন্দ্রস্মরণের মাধ্যমে সংগ্রাম জারি রাখার শপথ নেয়, দানবের সাথে সংগ্রামের ডাক দেয়। মঞ্চের অন্যতম আহবায়ক ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ কর্মসূচি সূচনা করে বলেন নির্বাচনের আগে স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদকে বর্জন করার আহ্বান করেছিলাম আমরা। সর্বত্র সন্ত্রাসে আক্রান্ত, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ স্বৈরাচারকে বর্জন করেছেন। কিন্তু এই রাজ্যের ক্ষমতায় এসেছে এক ফ্যাসিবাদী শক্তি। তাই আমাদের লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। লড়াই চলবে। মঞ্চের সাংস্কৃতিক বাহিনী দেবাশিস সিনহা আর অরিন্দম দাসের পরিকল্পনায়, রূপকথা আর ডক্টর তরুণ কান্তি করের নেতৃত্বে ‘দ্রোহে, শপথে রবিস্মরণ’ মঞ্চস্থ করে। গড়িয়া অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সংস্থার ‘উল্টো স্রোত’ এর তিনজন শিল্পী রবীন্দ্র রচনার অংশ আর গান নিয়ে পরিবেশনা করেন এক বলিষ্ঠ দ্রোহগাথা।
এই কর্মসূচি শেষ হয় মঞ্চের আহবায়ক মণীষা আদকের অসামান্য বক্তৃতা দিয়ে। নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষের উপর সমাজ, রাষ্ট্রের নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অভয়া মঞ্চ। অভয়া নির্ভয়াদের এই সংগ্রাম সব মেয়েকে ভয়হীন করার জন্য। সব প্রান্তিক যৌনতার মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি দেবার জন্য। তাই মঞ্চ রাজ্যের নির্বাচনী অশ্বমেধের মধ্যেও ছুটে যায় যাদবপুরের ধর্ষিত বালিকার কাছে, ছুটে যায় লক্ষ্মীকান্তপুরের প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার দু’টি মানুষের পাশে, তাঁদের ভালোবাসার ঘর বাঁধতে সাহায্য করে। এই রকম আরো বহু অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাবে অভয়া মঞ্চ। বজ্রানলে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে আধিপত্য আর ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষদের পথ দেখাবে।











