নিজ বাসস্থানের সন্নিকটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করছেন – তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসুরো গলায় গান গাইছেন কুনাল ঘোষ ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (যিনি, যদ্দূর সম্ভব, ওই মুহূর্তে অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না)… অথচ সামনে তেমন লোকসমাগম নেই… এসব দেখতে দেখতে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
এক্ষেত্রে খিল্লি করা যেতেই পারত। কিন্তু সত্যি বলছি, তেমন ইচ্ছে জাগছে না। গুছিয়ে লেখার মতোও কিছু নেই, তবু কয়েকটা কথা, মনে হলো, খুব গুরুত্বপূর্ণ – যা সবারই মনে রাখার মতো।
১. ক্ষমতা হাতে আসামাত্র – পাকা কাঁঠালের গন্ধে অজানা ঠিকানা থেকে ভনভন করে মাছি উড়ে আসার মতোই – আশেপাশে অজস্র তোষামুদে উমেদারের ভিড় জমে। আপনি যদি সেই মোসাহেবের দল দ্বারা পরিবৃত হয়ে পড়েন, তাহলে তা আপনার দৃষ্টি ও বোধকে আচ্ছন্ন ও আবৃত করে ফেলবে – আপনি বাস্তব থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাবেন।
২. আমলারা সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করেন – কিন্তু ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের পাওয়ার স্ট্রাকচার এমনই যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের কোনও আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় না। অন্তত ব্যক্তিগত অনুভূতি আদানপ্রদানের স্তরে ঘনিষ্ঠতা তো হয়ই না। ব্যতিক্রম কেউ কেউ থাকেন – কিন্তু ব্যতিক্রম তো নিয়মকেই প্রতিষ্ঠা করে, তাই না? আর মন্ত্রী-সান্ত্রীদের সঙ্গে যে আমলাদের (অর্থাৎ সিনিয়র লেভেলের ইয়ে) সরাসরি কথা হয়, তাঁরা তো, সম্ভবত অনিবার্যভাবেই, জনবিচ্ছিন্ন (কেননা, তাঁদের কাছে যাঁরা রিপোর্ট করেন তাঁরা এতখানিই তটস্থ থাকেন যে যেটুকু সত্যি অধস্তন অফিসাররা জানেন সেটুকুও জানাতে সাহস পান না) – তাঁদের ফিডব্যাক বা ইনপুট প্রাথমিকভাবে অবিশ্বাস করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ – তাঁদের পরামর্শ রাজনৈতিকভাবে (এমনকি সাধারণ মানুষের জন্যও) লাভজনক হওয়াটা নিতান্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা।
অপরদিকে রাজনৈতিক কর্মী স্থানীয় সমাজেরই একজন। সৎ কর্মী হলে তো বটেই, এমনকি যে কর্মী তোলাবাজি বা দাদাগিরি করছে সে-ও পুরোপুরি সমাজবিচ্ছিন্ন হয় না। অন্তত সাধারণ মানুষ কী ভাবছে, সে বিষয়ে গড়পড়তা আমলার তুলনায় যেকোনও কর্মী, এমনকি নিতান্ত অপদার্থ যে কর্মী, সে-ও বেশী খবর রাখে।
রাজনৈতিক দল যখন আমলা-নির্ভর হয়ে পড়ে, তখন আপাতদৃষ্টিতে ‘সরকারি কাজে গতি এসেছে’ জাতীয় বার্তা মিডিয়া ছড়াতে থাকলেও, তা দলকে জনবিচ্ছিন্ন করে। মানুষের ক্ষোভ বা চাহিদা, কোনোটির আন্দাজই দলের নেতৃত্বের কাছে থাকে না।
৩. পুলিশ চাকরি করেন। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মন জুগিয়ে চলতে পারলে পদোন্নতি হয় – উল্টোটা ঘটলে ফালতু হ্যাপা। মন জোগানোর জন্য অধিকাংশই চেষ্টার ত্রুটি রাখেন না – যাঁরা জুগিয়ে চলতে পারেন না, তাঁরা এত দূরে নিক্ষিপ্ত হন যে সেসব কণ্ঠ শ্রুতিগোচর হয় না। (সৎ সরকারি কর্মীর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।)
এমতাবস্থায়, পুলিশের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও জনসংযোগের সুবাদে কেউ যদি এমন কিছু খবর পান যা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মনপসন্দ না হওয়াই সম্ভব, তাহলে তিনি ঝুঁকি না নিয়ে খবরটা চেপে যেতে চাইবেন, এমনটাই স্বাভাবিক। আর দলের হয়ে তোলাবাজির দায়িত্ব পালন করেন যেসব পুলিশকর্মী, তাঁদের কাছ থেকে খবর পেতে চাইলে তো খুবই মুশকিল।
তো আরও অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে এই পয়েন্টগুলো মিলে…
একজন জননেত্রী (হ্যাঁ, হাজার অপছন্দ সত্ত্বেও এই কথাটা অনস্বীকার্য যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকৃত অর্থেই, জননেত্রী) দেড় দশক ক্ষমতায় থেকে, এতখানিই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন যে… এত বড় পতনের আভাস তিনি পাননি… পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবার আঁচ তিনি পাননি।
রবীন্দ্রনাথে নিমজ্জিত জয় গোস্বামী আজকের রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে আসেননি, যদ্দূর জানি। কবীর সুমন দু’কলি গেয়ে গেছেন বলেও শুনিনি। আজ যদি খুব বৃষ্টিও হতো, তাহলেও মাননীয়া চেয়ার মোছার জন্য সুবোধ সরকারকে পেতেন না। বা আবুল বাশার। অথবা শুভাপ্রসন্ন। নাচে-গানে-আমোদে-প্রমোদে যাঁরা ভরিয়ে রাখতেন রাজনৈতিক মঞ্চ, সেসব গাইয়ে-বাজিয়ে-অভিনেতা-কবি-লেখক-নট-শিক্ষক- অধ্যাপক-ডাক্তার-আমলা (চাকুরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত)… এককথায় চামচা… কেউ কোত্থাও নেই।
অন্তরাল থেকে কলকাঠি নাড়া আলাপন কিংবা মনোজ অথবা হরিকৃষ্ণ বা সুরজিৎ – ইচ্ছে করেই পদবিগুলো দিলাম না, কেননা মাননীয়া স্নেহের বশে এঁদের এমন করেই ডাকতেন… সবাই জাস্ট দুষ্টু লোকেদের মতো করে ভ্যানিশ হয়ে গেছেন।
সবমিলিয়ে, ব্যাপারটা শিক্ষণীয় বইকি! যেকোনও রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক কর্মী, সব্বার পক্ষে – এমনকি ব্যক্তিজীবনে অনুসরণ করার ক্ষেত্রেও – শিক্ষণীয়।










খুব ভাল লেখা