সেদিন রবিবার, আমি
আমার উত্তর প্রজন্মের নরম কচি হাতখানি
নিজের পুরুষ্টু হাতের মুঠোয় ধরে –
গ্রামের বাজারে যাব বলে
বেরিয়ে পড়লাম।
সরু রাস্তায় পা দিয়েই দেখা হয়
সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুষ্ক প্রাণহীন গাছেদের সঙ্গে।
আমার ছোট্ট সঙ্গিকে ডেকে বললাম –
দেখো দেখো,এখানেই বয়ে যেত
আমাদের গ্রামের ছোট্ট নদীখানি,
সামনের ওই নাবাল জমির ঠিক পরেই
যে গভীর খাদান ,
গিলে ফেলেছে এখানে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোকে, আমি
হঠাৎ চিৎকার করে উঠি, আমার কন্যা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জোরে আঁকড়ে ধরে আমার শঙ্কিত হাত,
সামনের ধুসর বিস্তৃত কবরখানায় নজর আটকে যায়,
আমি কম্প্র কন্ঠে কন্যাকে বলি , তুমি কি দেখেছো?
এখানেই তোমার পূর্বপুরুষরা চিরশয়ানে শায়িত,
আমার ছোট্ট সঙ্গিনী হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে যায় সেখানে,
আমরা বাজারে পৌঁছে গেছি।
এই কবিতাটির শীর্ষক The River, The Mountain, The Bazaar। কবি জাসিন্তা কারকেট্টা। কবিতার প্রতিটি ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে নিজের অতি পরিচিত পরিবেশ পরিমণ্ডলের প্রতি কবির গভীর সমবেদনা এবং দীর্ঘশ্বাস। উত্তর প্রজন্মের কাছে পৃথিবীর কোন্ ছবি রেখে যাচ্ছি আমরা? জাসিন্তা নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করছেন। বাজার এখানে প্রতীক, সব শূন্যতাকে পেরিয়ে আমরা সবাই বাজারের অশালীন মুখরিত কোলাহলে মজে আছি ।
কিশোরীবেলা থেকেই জাসিন্তার ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হবার। এমন ইচ্ছের পেছনে কারণও ছিল যথেষ্ট। ছোটো থেকেই জাসিন্তা মনে মনে সাংবাদিক হবার কথা ভাবতেন। তাঁর প্রতিনিয়ত মনে হতো যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের ওপর যে অন্যায় অবিচার দীর্ঘদিন ধরে চলছে তার কথা বাজারি পত্রিকাগুলো কখনোই সঠিকভাবে তুলে ধরে না। তিনি সাংবাদিক হয়ে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। এই মুহূর্তে জাসিন্তা দ্যা ওয়ার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত।
জাসিন্তা একজন প্রতিবাদী লেখিকা। জাসিন্তার কবিতা ও লেখার মাধ্যমে তিনি তাঁর সমাজের ওপর চলা দীর্ঘ অবিচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। যে প্রাকৃতিক পরিবেশে জাসিন্তার ছোটো থেকে বড়ো হয়ে ওঠা, সেই পরিবেশকে নষ্ট করে ফেলছে আধুনিক জীবন যাপনের রীতি পদ্ধতি। ওঁরাও সমাজকেও লেগেছে তার ছোঁওয়া। জাসিন্তার লেখালেখির মধ্যে আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদার কথা বারংবার উঠে এসেছে। বক্তব্যের স্পষ্টতা ও দৃঢ়তার কারণে জাসিন্তার লেখা ব্যাপকভাবে অনুদিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের ওপর যে অত্যাচার অবিচারের পর্ব চলছে দুনিয়াজুড়ে জাসিন্তার রচনা এসবের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। আর তাই বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনা। এটা সকলের কাছেই পরম গৌরবের বিষয়।
খুব সম্প্রতি জাসিন্তা কারকেট্টার এক আন্তরিক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পৃথা,পৃথা ব্যানার্জি। ইনিও সাংবাদিক। বিখ্যাত পরিবেশ পত্রিকা ডাউন টু আর্থ ‘ এর পক্ষ থেকে জাসিন্তা কারকেট্টার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। এই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে জাসিন্তার অভিমানিনী মনের গভীরে বিস্ফোরকের মতো আগলে রাখা কিছু কথা। প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, তাঁর নিবিড় অনুভবের কথা মনখুলে আলোচনা করেছেন জাসিন্তা। আজকের নিবন্ধে সেই আলাপের কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করবো। চারিদিকে যখন আস্ফালন আর অনর্থক হৈচৈ কলরব তখন জাসিন্তা কারকেট্টার সংবেদী মনের অন্তর্লীন অনুভবের শরিক হতে বোধহয় খুব খারাপ লাগবেনা আমাদের।
আলোচনার মূল অংশে যাবার আগে আমরা জাসিন্তার আরও একটি কবিতা পড়ে নেবো। কবিতার শীর্ষক পেড়ো নে তুমসে কেয়া কহা? গাছেরা তোমাকে কী বলেছে? হিন্দি ভাষায় লেখা এই কবিতাটিতে জাসিন্তা এক অদ্ভুত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন যখন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির রূপায়ণের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতি পরিবেশের অবক্ষয়কে ঠেকাতে চাইছি। অথচ আমরা আমাদের কৃতকর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছি না।
গাছ লাগানোর কথা বলেনি,
কেবলমাত্র বেদখল হয়ে যাওয়া নিজেদের ভাগের
জমিটা ফেরত চেয়েছে, যেখানে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো নিজেরাই বেড়ে উঠতে পারবে।
তোমরা তাদের হকের জমিকে দখল করে আছো। আর
তারস্বরে চিৎকার করে বলছো- গাছ লাগাও,ধরতীকে বাঁচাও।
বেঁচে থাকার জন্য
শ্বাস নিয়েও এখন
তোমরা খুব মুশকিলে
শ্বাস ছাড়ার অভ্যাস করছো।
গাছেদের ভাগের জমি ছেড়ে দেওয়া
তোমরা কি মেনে নিতে পারবে বলে মনে হয়?
পৃথা ব্যানার্জি – আপনার অনেক কবিতাতেই আদিবাসী সমাজের ওপর এবং তাঁদের একান্ত প্রাকৃতিক পরিমন্ডলের ওপর ধনতন্ত্রের আগ্রাসী প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। এমন ভাবনার পেছনে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা যদি আমাদের কিছু বলেন তাহলে আপনার লেখাকে বুঝতে সুবিধা হয়।
জাসিন্তা কারকেট্টা – আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। থাকি ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার চক্রধরপুরে। বাড়ি থেকে আমাকে প্রতিদিন এক ঘন্টার ট্রেন যাত্রা করে মনোহরপুর ব্লকে আমার স্কুলে যেতে হতো। সেখানেই আমি হো আদিবাসী গোষ্ঠীর সুপ্রাচীন কোলহান রাজ্যের কথা প্রথম শুনি । নৃতাত্ত্বিক অস্ট্রো এশিয়াটিক মুন্ডা সম্প্রদায়ের এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তাঁদের বাসভূমি,প্রকৃতি পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকার সাথেসাথে এক উন্নত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। মনোহরপুর অঞ্চলটি এশিয়ার বৃহত্তম শাল গাছের অরণ্যভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিল। শাল গাছকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষরা পুজো করে। পরবর্তীতে এখানেই চিরিয়া গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে ভারতের সবথেকে বড়ো লৌহ আকরিক খনি। এলাকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটার সম্ভাবনা স্পষ্ট হতেই বিস্তৃত হলো হাওড়া -নাগপুর শাখার রেলপথ। সম্পদের টানে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান ও গুজরাট থেকে বহুসংখ্যক মানুষ এসে ভিড় জমালো এখানে। সারান্ডার গভীর জঙ্গল উজাড় করা কাঠের স্লিপারের ওপর পাতা হলো ইস্পাতের লাইন। যোগাযোগের সহজতা টেনে আনলো আরও বহু মানুষকে। গুজরাটের উদ্যোগপতিরা মনোহরপুরের মাটিতে গড়ে তুলল করাতকল। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় সস্তার শ্রমিক জুটে গেল দেদার। ব্যবসার জন্য সুদূর মারওয়ার প্রদেশ থেকে আসা মানুষেরা কারবার ফেঁদে বসলো। আর এই সব মানুষের সংস্পর্শে আসা মনোহরপুর তার সাবেকি গ্রাম্যতা ঘুচিয়ে ধীরে ধীরে শহুরে আচকানের আড়ালে নিজের শরীরটাকে মুড়ে ফেলল। তবে ক্ষমতার রাশ রইলো রাজস্থান থেকে আসা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মানুষদের হাতে : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের এলাকায় কেবলমাত্র পুঁজির জোরে তাঁরাই হয়ে উঠলো জমিদার,রাজা ।
মনোহরপুর অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করতো পোরহাটের রাজপরিবারের সদস্যরা, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তাঁরাই খাজনা আদায় করতো। পরবর্তী সময়ে জমিদারি প্রথার বা রাজন্য প্রথার বিলোপ সাধন করা হলেও এইসব মানুষেরা নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম রেখে ব্যবসা চালিয়ে আসছে। এসবের মধ্যেই মনোহরপুর এলাকার সম্পদের অবাধ ভান্ডারের মালিকানা দখলকে কেন্দ্র করে অবৈধভাবে শুরু হয়ে গেল ক্ষমতালোভী মানুষদের দাপাদাপি – মাইনিং, বাজার,কাঠ আর টেন্ডু পাতার ব্যবসা হয়ে উঠলো কর্তৃত্ব দখলের ভরকেন্দ্র। এই শহরের বুকেই আমার কাকা একটি জমি বিবাদের জেরে শক্তিশালী উচ্চ – বর্গের মানুষদের দ্বারা গণ – প্রহারের শিকার হন। আমার মেজো ঠাকুমাকে কয়েদ করা হলো। আদিবাসীরা ভালো ফসলের আশায় নরবলি দেয় জাতীয় মনগড়া অবাস্তব গল্প প্রচার করা হলো । স্থানীয় সংবাদপত্রে এইসব মিথ্যা অপপ্রচার ছাপা হলো মোটা শিরোনামে। আমাদের গ্রামের মানুষজন এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উদ্যোগী হতেই আমাদের সবাইকে শাসানো হলো, হুমকি দিয়ে বলা হলো কারকেট্টা গোষ্ঠীর মানুষদের এই এলাকাছাড়া করে দেওয়া হবে। এই সংঘাতের সময়ে সারান্ডার জঙ্গলে থাকা কিছু নকশাল গোষ্টীর সদস্য আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে এলো। তাঁরা ঘোষণা করলো – যদি এখানে কারকেট্টা সম্প্রদায়ের কোনো মানুষকে আবার খুন করা হয়, তাহলে উচ্চ বর্ণের মানুষদের এই এলাকাছাড়া করা হবে। এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতে গোটা এলাকা জুড়ে এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বহাল রইলো।
এই সময়ে আমি একটা ছোটোদের পত্রিকায় লেখালেখি করতাম। এই সব ঘটনা আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।আমি উপলব্ধি করলাম যে আমাদের সমাজের মানুষেরা নিজেদের কথা লিখেছেন না, ফলে প্রতিপক্ষের লোকজন যা বলছে তাই মান্যতা পাচ্ছে অন্যদের কাছে। এসবের বিরুদ্ধে মুখ খোলার তাগিদটা অনুভব করতেই আমি সচেতনভাবে লেখালেখির মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে দিই। ওই ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে আমি লেখালেখিকে নিছক শখ হিসেবে না ভেবে, আমাদের সমাজের নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদের কন্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরা শুরু করি।এখান থেকেই আমার নতুন পথচলা শুরু হয়েছে।
পৃথা ব্যানার্জি – আপনার কবিতা কীভাবে আপনার ভেতরে জমে থাকা ক্রোধ ও অনুভূতিকে প্রকাশ করার সাথে সাথে,অন্যদের প্রাণিত করে বলে আপনি মনে করেন?
জাসিন্তা কারকেট্টা — আমি যদি সেই বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে কলম তুলে না ধরতাম, তাহলে হয়তো আমার হাতে উঠে আসতো অগ্নিবর্ষী বন্দুক। খুব অল্প বয়স থেকেই আমি আমার ভেতরে থাকা জাসিন্তার সঙ্গে নিয়ত বোঝাপড়া করি। সেই সময় থেকেই আবেগ আর অনুভূতিগুলো আমার মনের ভেতরে ঝড় তুলতে থাকে। আমি বেশ কিছুদিন নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছিলাম কিন্তু আমার লেখার শব্দগুলো কাগজের ওপর একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চলেছিল। আমার স্কুলের সহপাঠিনীরা বলতো,” তোমার শব্দগুলো তীক্ষ্ণ শরের মতো আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে।”
স্কুলের কারও সঙ্গে আমার মতপার্থক্য হলে তাঁরা চোখা চোখা বাক্য আমার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করতো, আর আমি আমার ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য কিছু লিখে তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিতাম। হয়রান হয়ে তাঁরা বলতো – “তুমি এভাবে না লিখে মুখে কথা বলে আমাদের সঙ্গে লড়াই করো । তোমার লেখা আমাদের আরও বেশি ব্যথা দেয়।”
মনের এই প্রবল সংক্ষোভের সময় প্রকৃতি আর লেখালেখিই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয়। এরাই আমাকে রক্ষা করেছে। আমার চারদিকে ঘটে যাওয়া হিংসাত্মক ঘটনাকে মোকাবিলা করার জন্য পাল্টা মারমুখী হিংসক হয়ে ওঠা কোনোমতেই আমার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা। তার পরিবর্তে আমি লেখালেখিকেই আঁকড়ে ধরলাম সমস্ত হৃদয় দিয়ে ঠিক যেভাবে একটি নদী অনেক মানুষের জীবনকে সিক্ত করে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায় ঠিক সেভাবেই। লেখালেখির ফলে আমার ভেতরে যে ভয়গুলো বাসা বেঁধেছিল,তারা সব বিদায় নিল। এই অবকাশে আমি দেহ মন ও আত্মাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করতে সক্ষম হলাম। এই অনুভূতি আমাকে আরও ভালো মানুষ হতে সাহায্য করেছে। আমি মনে করি যে কোনো শৈলীর লেখালেখি অর্থহীন বলে মনে হয় যদি না তা আমাদের আরও ভালো মানুষ হতে সাহায্য করে।
পৃথা ব্যানার্জি – আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা কীভাবে তাঁদের একান্ত পরিবেশের অবনমন ও পরিবর্তনের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়? আপনি কি এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে নথিভুক্ত করেছেন?
জাসিন্তা কারকেট্টা — আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষরা প্রকৃতির মাঝে, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখতে অভ্যস্ত। তাই তাঁরা তাঁদের সহজাত স্বতঃস্ফূর্ততা, সারল্য, সততা, সত্যবাদিতা এবং অকপট মুখের হাসি বজায় রাখতে জানে।
আদিবাসীদের এতোদিনের চেনা পরিবেশকে তথাকথিত সভ্য সমাজের মানুষেরা যথেচ্ছভাবে ধ্বংস করেছে, তাঁদের প্রিয় আবাসভূমি থেকে উৎখাত করেছে।এর প্রতিক্রিয়া হয়েছে মারাত্মক। লোভী মানুষের অনুপ্রবেশ ও পরবর্তীতে আগ্রাসনের কারণে দুর্নীতি, ঘৃণা,বিদ্বেষ ,লোভ, আত্মহত্যা, মহিলাদের শোষণ, গণ ধর্ষণ এবং অন্যান্য শহুরে পাপ ও অনাচার আদিবাসীদের মধ্যে প্রসার লাভ করেছে। উন্নয়নের নামে আমাদের ন্যায্য অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে রঙিন মোড়কে মুড়ে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় জীবনের মূল স্রোতের সঙ্গে মিশিয়ে না দিয়ে আমাদের উপেক্ষা আর শোষণ করা হচ্ছে আজও । জাতীয় উন্নয়নের যূপকাষ্ঠে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের ক্ষেত্রীয় অধিকারকে আহুতি দেওয়া হচ্ছে আজও। এই বঞ্চনার কারণে আদিবাসীদের আজ নতুন দলিত সমাজের অংশীদার করে তোলা হচ্ছে – সমস্ত রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের জাতি গড়ার লক্ষ্যে সুলভ শ্রমিকশ্রেণিতে পরিণত করা হয়েছে। এঁরাই হলো পয়প্রণালীর সাফাই কর্মী থেকে শুরু করে যত রকমের শ্রমনির্ভর কাজের মুখ্য ভূমিকা পালনকারী। এমন এক ন্যক্কারজনক পরিবেশে এঁদের থাকতে বাধ্য করা হয় যা মানুষের বসবাসের পক্ষে উপযোগী নয়।
এমনই এক প্রতিকুলতার মাঝে থেকেও যে আমি নিজের কাজ করে যেতে পারছি তার কারণ হলো প্রকৃতির সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক এবং তাঁর সাহচর্যে নিজেকে পরিচালনা করার অন্তর্লীন তাগিদ। একজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে আমি সবসময়ই মুক্ত পরিবেশের মধ্যে থেকেছি যা আমাকে সমস্ত সন্তাপ থেকে বিমুক্ত রেখেছে। এই সান্নিধ্যের কারণেই আমি নিজের নিষ্পাপ সত্তাকে নষ্ট হতে দিই নি।
পৃথা ব্যানার্জি – আপনি এর আগে জঙ্গল ও নদীর ওপর চলা অনিয়ম প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য এবং সামাজিক অন্যায়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এগুলো কীভাবে পরস্পর সম্পর্কিত বলে আপনি মনে করেন?
জাসিন্তা কারকেট্টা – আসলে আমরা কখনোই ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও সামাজিক অবিচারকে আলাদা করে ভাবতে পারিনা – এরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে আন্তর্সম্পর্কিত। যেভাবে আমরা প্রকৃতির প্রতি আচরণ করি তা একজন মানুষের প্রতি আমাদের আচরণের প্রতিফলন। যেদিন থেকে মানুষ নিজেকে প্রকৃতির থেকে বড়ো বলে ভাবতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই সে নিজের স্থান মানবিকতারও ওপরে বলে মনে করছে। এই মানসিক উচ্চমন্যতা বোধের দরুণ সে এই পরম সত্যটাকে বেমালুম ভুলে গেছে যে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে,এরা আন্তর্সম্পর্কিত। এই শৃঙ্খলার সাথে সহযোগিতা করেই মানুষকে টিকে থাকতে হয়, টিকে থাকতে হবে। সুতরাং যখন আমি নদীর ওপর, পাহাড় বা অরণ্যের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের ছারখার করে দেবার বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করি, তখন বুঝতে হবে যে আমি মানুষের ওপর নেমে আসা মানুষের অত্যাচারেরও প্রতিবাদ করছি। প্রকৃতির শৃঙ্খলাকে নষ্ট করে ফেললে এই অঞ্চলের প্রতিটি গোষ্ঠীকে সেই অত্যাচার অবিচারের শিকার হতে হবে। আজ যা এখানে ঘটছে একদিন তার প্রতিফল ভুগতে হবে গোটা মানব সভ্যতাকে। এমনটাই অনিবার্য।
জাসিন্তা কারকেট্টা – আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে দেশের বহু সংখ্যক মানুষ স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাঁরা দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমস্যা নিয়ে খুব বেশি জানেন না। কবিতার মধ্যে দিয়েই তাঁরা সেই বিষয়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন যদিও তেমন সুযোগ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কবিতা তাঁদের বিষয়গুলো নিয়ে শোনার, পড়ার ও হৃদয় দিয়ে অনুভব করার সুযোগ করে দেয়। আমি আমাদের দেশে এবং বিদেশে এমন অনেক অনেক মানুষের দেখা পেয়েছি যাঁরা আমার কবিতা শুনে অঝোরে চোখের জল ফেলেছে। কবিতা সেতুর কাজ করে – মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন ঘটায়, সমস্ত বাধা অতিক্রম করে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে মানুষকে আবদ্ধ করে। নিশ্চিতভাবেই এরফলে সামাজিক সমতা বিধানের পথ সুগম হয়।
ভাষা প্রসঙ্গে আপনার প্রশ্নের উত্তরে জানাই, আমি কেবল হিন্দিতেই লেখালেখি করি যদিও আমি সাঁওতালি বলতে পারি এবং অনেক বছরের চেষ্টায় কুরুখ ভাষা বুঝতে পারি। আমার লেখা বই সাঁওতালি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আমার মনে হয় যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা হিন্দি থেকে অনেক স্বতন্ত্র। আদিবাসীদের ভাষা অনেক বেশি লিঙ্গ সংবেদী যা প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং ভাষার ব্যঞ্জনা অনেক বিস্তৃত। আদিবাসীদের ভাষায় অনেক গভীর প্রজ্ঞা জড়িয়ে আছে। তাই আগামী দিনে এইসব ভাষা হারিয়ে গেলে মানবসমাজ অনেক গভীর জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত হবে।
জাসিন্তা কারকেট্টা – আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তাঁদের আবাসিক এলাকার পাহাড়, নদী,জঙ্গলের ওপর তাঁদের চিরায়ত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর লড়াই করে চলেছে। সংবিধানের ষষ্ঠ শিডিউলে লাদাখের অন্তর্ভুক্তি হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদী আন্দোলনেরই ফসল। আমরা যদি একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখবো দেশে এই মুহূর্তে দুটি স্বতন্ত্র বিপরীতমুখী জীবন দর্শন সক্রিয় রয়েছে : প্রথমটির লক্ষ্য হলো এক্সপ্লয়টেশন এবং মুনাফা অর্জন আর অন্যটির বিশ্বাসের শিকড় আমাদের চিরায়ত উপলব্ধিগুলোকে আজও সম্মান করে এবং মনে করে মানুষের ঐহিক ও পারত্রিক অস্তিত্ব প্রকৃতি পরিবেশের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ , ফলে মানুষের সংরক্ষণ করার অর্থই হলো প্রকৃতির সংরক্ষণ করা। গোটা দুনিয়া জুড়েই এই দুই মতাদর্শের মধ্যে সংঘাত চলছে এবং এদেশের আদিবাসী মানুষরাও এই দ্বন্দ্বের রঙ্গমঞ্চে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় লড়াই করছে।
এই কথাটা মনে রাখতে হবে যে, যা কিছুই ঘটুক না কেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই দেশের যাপন ধারায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। এই মানুষেরাই প্রতিনিয়ত গলা উঁচিয়ে দেশের সরকারের সমস্ত পরিবেশ বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। তাঁদের হৃত অধিকার ফিরিয়ে দেবার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলবে, সরব হবে প্রকৃতি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দাবিতে। লড়াইয়ের ময়দান থেকে আদিবাসীরা পিছু হটতে জানেনা।
তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া
ডাউন টু আর্থ পত্রিকা












