আমরা আগের দিনের ‘ জনস্বাস্থ্য, জুমলা ও বাণিজ্যিক পত্রিকা ‘ প্রবন্ধে স্বাস্থ্য বিমার নামে যে জুমলা বা প্রবঞ্চনা সেটি উন্মোচিত করেছিলাম।
এটি ঠিকই কোন মডেল ই এককভাবে সর্বপ্রাণহরা (Panacea) নয়। তথাপি বিমা মডেলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক ব্যয়বৃদ্ধি ও দুর্নীতির সম্ভবনা। যেরকম অত্যন্ত ব্যয়বহুল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যার প্রবঞ্চনার শিকার সেখানকার সমাজের দরিদ্রতর কৃষ্ণ বর্ণের, অভিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষ। ২০১০ এ তদানীন্তন কৃষ্ণাঙ্গ (প্রথম ও একমাত্র) মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা Obamacare সংস্কার এনে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বৃহৎ স্বাস্থ্য বিমা সংস্থা, বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি, বৃহৎ স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের বাধায় এগোতে পারেন নি।
আমাদের দেশে ও রাজ্যেও কোন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে ভর্তি করে চিকিৎসার জন্য কোন হাসপাতালে গেলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করবে রোগীর কোন স্বাস্থ্য বিমা রয়েছে কিনা। রোগী বা রোগীর বাড়ির লোক প্রভাবশালী না হলে সরকারি স্বাস্থ্য বিমা ‘ স্বাস্থ্য সাথী ‘ অথবা ‘ আয়ুষ্মান ভারত ‘ নিয়ে পাত্তা দেবে না। যদি কোন কর্পোরেট সংস্থার বিমা থাকে তাহলে তাদের ব্যবহার দ্রুত মোলায়েম হয়ে অতি যত্নবান হয়ে দামি বেডে ভর্তির জন্য সক্রিয় হয়ে উঠবে। এখন তো ভারত সরকারের নীতি অনুযায়ী মার্কিন সহ বহুজাতিক স্বাস্থ্য বিমার দানব গুলি ভারতীয় বিমা সংস্থার মালিকানা কিনে নিতে সক্ষম। এবার ধরুন কোন অস্ত্রপচারের ঐ হাসপাতালের চারদিনের প্যাকেজ ৩৯০০০ টাকা, স্বাস্থ্য বিমার কারণে ছাড়া পাওয়ার সময় ওটি হয়ত দাঁড়াবে ১,৬৭,০০০ টাকা। এ এক অদ্ভুত ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মুনাফা আদায়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি যার প্রতিটি স্তরে দালাল, ডাক্তার, টিপিএ, হাসপাতাল মালিক, বিমা কোম্পানি আপনাদের পকেট ফাঁকা করে দেওয়ার চেষ্টা করে যাবে।
সব জেনে বুঝেও ১৯৮৩, ২০০২ ও ২০১৭ এর জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির নির্দেশিকা উপেক্ষা করে ভারতের মত দরিদ্র ও সবচাইতে জনবহুল দেশে যেখানে চিকিৎসায় অতিরিক্ত খরচের (Out of pocket expenditure) জন্য দারিদ্রায়ন (Pauperisation) বিশ্বের মধ্যে সব চাইতে বেশি সেখানে মোদি – মমতা প্রভৃতি তথাকথিত জনবাদী (Populist) সরকার গুলি একদিকে শক্তিশালী সর্বজনীন নিঃশুল্ক সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও কর্পোরেটকরণের গতি বৃদ্ধি করছেন অন্যদিকে এই ব্যয়বহুল দুর্নীতিভরা বিমা মডেলগুলি সাড়ম্বরে দেশবাসীদের উপহার দিয়ে চলেছেন। অন্যদিকে না বুঝে নিজেরা মরে অসহায় দেশবাসী তাদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে চলেছেন।
এ যেন এই ব্যবস্থার আরেক জুমলা ন্যায্য মূল্যের ওষুধের মত। ঐ দোকানগুলিতে ঢুকে দেশবাসী ভাবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী কত সদাশয় যে ওষুধের আসল মূল্যের চাইতে ৭৯% কম দামে আমাদের ওষুধ দিচ্ছেন। কারণ তাদের পক্ষে এর মধ্যেকার লোক ঠকানো ফাটকা অর্থনীতি বোঝা সম্ভব নয়। সেরকম একটি চিকিৎসার জন্য কোন হাসপাতালে ঘোষিত চার্জ ৩৯,০০০ থেকে বিমার জাদুস্পর্শে মুহূর্তে ১,৬৭,০০০ হয়ে গেল। ধোকা খেয়ে গুণগার দিতে দিতে আম জনতার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় যে অন্তরালে এই সংস্থাগুলির সঙ্গে সরকার, শাসক দল এবং নেতাদের কি ধরনের লাভজনক লেনদেন রয়েছে। আর আম জনতার অর্থে নেতা – মন্ত্রীদের নিজেদের জন্য এআইআইএমএস, মেদান্ত, কোকিলাবেন, অ্যাপোলো, আইপিজিএমইআর কলকাতা প্রভৃতিতে অথবা নিজেদের গৃহে বা আবাসনে নিঃশুল্ক সর্বাধুনিক ফাইভ স্টার চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। যা ইচ্ছামত নিতে অমিত শাহ থেকে বাংলার ব্যানার্জী পরিবার, মদন মিত্র, অনুব্রত মণ্ডল, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় মল্লিক প্রমুখ কে আমরা বারবার দেখেছি।
সমাজতান্ত্রিক (Socialist) স্বাস্হ্য মডেল: রাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক বৈষম্যমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR), যুগোস্লাভিয়া, চিন, কিউবা, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে এই শক্তিশালী, সর্বজনীন, নিঃশুল্ক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছিল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের স্বাক্ষর রেখেছিল। যদিও এই ব্যবস্থাটির মধ্যে বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে পার্টি আমলাদের পরিচালনা, প্রতিযোগিতার অভাব প্রভৃতি সমস্যা ছিল। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া, পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলি থেকে সমাজতন্ত্রের অবসান; চিন ও ভিয়েতনামে ধনতন্ত্রের আবাহন; কিউবায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও অর্থনৈতিক অবনতি এই মডেলটিকে সংকটগ্রস্ত করে।
ইউনিভার্সাল হেল্থ কাভারেজ: সেদিক দিয়ে এই মডেল টি অনেক পরীক্ষিত। কানাডা, ব্রাজিল; যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স সহ বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ; অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সহ প্রায় শতাধিক দেশে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সফলভাবে প্রচলিত।
UHC এর বৈশিষ্ট্য হল: (১) এখানে অতিরিক্ত বা out of pocket খরচের তো প্রশ্নই নেই চিকিৎসার জন্য পৃথক কোন খরচ নেই। (২) সরকার তার আর্থিক বাজেটের থেকে এর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখেন। যেটি সরকারের বিভিন্ন আয় ও কর থেকে উঠে আসে। (৩) এই চিকিসা সর্বজনীন, নিঃশুল্ক এবং শক্তিশালী। দেশের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এর কাঠামো ও রেফারেল ব্যবস্থা এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। (৪) সরকার নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ পরিষদ এটি পরিচালনা করেন যার লক্ষ্য উৎকর্ষ, দক্ষতা এবং সকলের জন্য সব ধরনের স্বাস্থ্য পরিষেবা। (৫) সাধারণ রোগ থেকে গুরুতর রোগ, সাধারণ ক্লিনিক থেকে অ্যাপেক্স হাসপাতাল প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীরা চিকিৎসা পেয়ে থাকেন। (৬) গ্রাম থেকে শহর, দরিদ্র থেকে ধনী চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী সকলে সর্বোচ্চ চিকিৎসা পেয়ে থাকেন।
আমাদের দেশের বিভিন্ন জন স্বাস্থ্য সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে UHC লাগু করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু vested interest এর কারণে রাজনীতিকরা নানানরকম ফন্দিফিকির করে এটি পিছিয়ে দিচ্ছেন। এর চরম মাশুল দিচ্ছেন দেশবাসী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রা হিসাব কষে সরকারকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে বাজেটের মাত্র ২% এর কিছু বেশি বরাদ্দ করলেই আমাদের দেশে এটি চালু করা সম্ভব। অথচ বর্তমান কেন্দ্র সরকার স্বাস্থ্যে যে ২% এর মত বাজেট বরাদ্দ হত সেটিও কমিয়ে দিয়ে চিন ও পাকিস্তান সীমান্তে অশান্তি বজায় রেখে সামরিক বরাদ্দ অনেক বৃদ্ধি করে মার্কিন চাপে সেখানকার বহুমূল্যের সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রতি মনোযোগী হয়েছে। সুতরাং জনস্বাস্থ্য কর্মীদের সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তাদের স্বার্থে UHC চালু করার আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।












