জুলাইয়ের শুরু থেকেই অন্নপূর্ণা যোজনার ‘টাকা না পেয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বহরমপুর, উত্তরপাড়া, বোলপুর, রামপুরহাট, শান্তিপুর, বিষ্ণুপুর, দত্তপুকুর, ঘাটাল, মেখলিগঞ্জ, পুরশুড়া- বহু জায়গায় বিডিও অফিস ঘেরাও করেছেন মহিলারা। রাজ্য বাজেটে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩৬,০০০ কোটি টাকা। জুন থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের হিসাব ধরলে মোটামুটি ১৪ জুলাই, ২০২৬ আনন্দবাজার পত্রিকা৷ উত্তর সম্পাদকীয় কোটি মহিলাকে মাসে ৩,০০০ টাকা দেওয়া সম্ভব। অথচ লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধা পেতেন প্রায় ২.৪ কোটি মহিলা। কয়েক জন পুরুষ কারচুপি করে সেই ভাতা তুলছিলেন- এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কিন্তু প্রায় এক কোটি মহিলা যে তালিকার বাইরে চলে গেলেন, তাঁরা সকলেই কি অযোগ্য?
সরকার এখনও এ বিষয়ে স্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা দেয়নি। অভিযোগ উঠছে, বহু অফলাইন আবেদন এখনও পঞ্চায়েত বা পুরসভার অফিসেই পড়ে রয়েছে, অথচ যাঁরা অনলাইনে আবেদন করেছেন, তাঁদের অনেকের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছেছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের আবেদন মূলত দুয়ারে সরকার শিবিরে অফলাইনেই নেওয়া হত। গ্রামের বহু মহিলার কাছে অনলাইন আবেদন এখনও সহজ নয়।
শুরুতে বলা হয়েছিল, লক্ষ্মীর ভান্ডারের সব প্রাপকই অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন। পরে বিজেপির একাধিক নেতা-মন্ত্রী মৌখিক ভাবে বিভিন্ন যোগ্যতার শর্তের কথা বলতে শুরু করেন। তাঁদের বক্তব্যের সারমর্ম স্পষ্ট- আয়করদাতাদের পরিবারকে এই প্রকল্পের বাইরে রাখা হবে, যদিও সরকারি নির্দেশিকায় বিষয়টি দীর্ঘ দিন স্পষ্ট করা হয়নি। বাস্তবে দেখা গেল, সরকারি চাকুরেদের এবং আয়করদাতাদের পরিবারের বহু মহিলা টাকা পাননি। সম্প্রতি জানা গেল, আশাকর্মী ও প্যারাটিচাররাও এই যোজনার অন্তর্ভুক্ত হবেন না। তাঁরা তো স্থায়ী সরকারি কর্মী নন- প্রথম দল ‘স্বেচ্ছাসেবক’, দ্বিতীয় দলটি চুক্তিভিত্তিক কর্মী। মাইনেও যৎসামান্য। তাঁরাও বাদ পড়ছেন কেন?
লক্ষ্মীর ভান্ডারের দেড় পাতার ফর্মের সঙ্গে অন্নপূর্ণার এগারো পাতার ফর্মের পার্থক্য শুধু আকারে নয়, দর্শনেও। লক্ষ্মীর ভান্ডারের আবেদন শুরু হত সম্ভাব্য প্রাপকের নাম এবং তাঁর স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের তথ্য দিয়ে। অন্নপূর্ণার ক্ষেত্রে ফর্মের অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে পরিবারের তথাকথিত ‘পারিবারিক মাথা’-র পরিচয়, আয়, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি এবং আর্থিক অবস্থার খুঁটিনাটি। সেই ব্যক্তির অধীনে সর্বাধিক পাঁচ জন মহিলার নাম ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে কেন্দ্রে ব্যক্তি নন, পরিবার। আর পরিবারের মধ্যেও কেন্দ্রে নারী নন, আছেন ‘পারিবারিক মাথা’।
স্পষ্টতই, এই ফর্মে নারীকে স্বতন্ত্র নাগরিক হিসাবে নয়, পরিবারের এক ‘অধীন’ সদস্য হিসাবেই দেখা হয়েছে। দেশে প্রতি তিন জন নারীর এক জন গৃহহিংসার শিকার। অধিকাংশ পরিবারেই তথাকথিত ‘পারিবারিক মাথা’ পুরুষ। তা হলে প্রশ্ন ওঠে, আয়করদাতা স্বামীর সম্পদ বা আয়ের ভিত্তিতে স্ত্রীর সামাজিক সুরক্ষার অধিকার নির্ধারিত হবে কেন? জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পত্তি যদি নারীর নামে না থেকে তাঁর বাবা, স্বামী বা শ্বশুরের নামে থাকে, তা হলে তার প্রভাব তাঁর প্রাপ্যের উপরে পড়বে কেন? কল্যাণমূলক প্রকল্পের কেন্দ্রে ব্যক্তি-নারী থাকবেন, না কি পরিবার- অন্নপূর্ণা যোজনা আবার আমাদের এই মৌলিক প্রশ্নের সম্মুখীন করল।
২০১৯ সালে ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভলপিং সোসাইটিজ়’-এর তত্ত্বাবধানে ‘লোকনীতি’র ভোট-পরবর্তী সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, তৃণমূল পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের ভোট বেশি পেয়েছিল। লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প তার একটি বড় কারণ ছিল। পরে নানা ঘটনায়, বিশেষত নারীর-নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করে। কিন্তু, প্রকল্পের রাজনৈতিক লাভটি কারও নজর এড়ায়নি।
এ কারণেই মেয়েদের উদ্দেশে সরাসরি নগদ ভাতা দেওয়ার প্রবণতা এখন প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কর্নাটকে কংগ্রেস, মধ্যপ্রদেশে বিজেপি, তামিলনাডুতে ভূতপূর্ব ডিএমকে সরকার বা দিল্লিতে ভূতপূর্ব আম আদমি পার্টির সরকার- নানা রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকারই এই পথ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াতে মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া কার্যকর হতে পারে। আবার নারীবাদী মহলেও এই ধরনের প্রকল্পের সমর্থন রয়েছে। কারণ, গৃহশ্রমের পূর্ণ মজুরি না হলেও, এটি সেই অদৃশ্য শ্রমের একটি আংশিক সামাজিক স্বীকৃতি।
পরিবারে রান্নাবান্না, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার, সন্তান প্রতিপালন, বৃদ্ধদের দেখাশোনা- নারীরা প্রতি দিন যে বিপুল শ্রম দেন, তার কোনও আর্থিক মূল্য নির্ধারিত হয় না। লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প অনেক নারীর হাতে প্রথম বারের মতো কিছু নিজস্ব নগদ অর্থ তুলে দিয়েছিল। প্রতীচী ট্রাস্টের সমীক্ষাও দেখিয়েছে, সেই অর্থ সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এই ভাতা কেবল অনুদান ছিল না; বহু নারীর সীমিত আর্থিক স্বাধীনতারও ভিত্তি ছিল।
গার্হস্থ শ্রমে বৈষম্য আজও বাস্তব। বাইরে কাজ করা নারী-শ্রমিকের কর্মদিবস ঘরে ফিরে শেষ হয় না। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী নারীদেরও। তাই নারীদের উদ্দেশে দেওয়া এই ধরনের ভাতা কেবল দারিদ্র লাঘবের কর্মসূচি নয়, সামাজিক স্বীকৃতিরও একটি উপায়। সেই কারণেই এ ধরনের প্রকল্পে ব্যক্তি-নারীর অধিকারকে পরিবারের আর্থিক অবস্থার আড়ালে সরিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্ন উঠবেই। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বর্তমান বিতর্কের মূলেও রয়েছে সেই প্রশ্ন।
১৪ জুলাই, ২০২৬ আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তর সম্পাদকীয় রূপে প্রকাশিত।।











