চোখ কথা বলে। চোখের এই নীরব ভাষা বোঝার জন্য কানের প্রয়োজন নেই। এই মায়াবী নীরব ভাষা বোঝার জন্য চাই একটা উর্বর হৃদয়, জগতের ঊষা লগ্ন থেকে গোধূলির আলোর তারতম্য, তারায় ভরা রাতের আকাশ সব কিছুর অনুভূতি আমরা পাই চোখের মাধ্যমে।
কিন্তু যাদের এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে গেছে তাদের জীবনের নিকষ কালো আঁধার কি কোনো দিন আলোর রোশনাই দেখতে পাবেনা? প্রচুর সাহিত্যিক উদাহরণ শুধু চোখ নিয়ে লেখা যায় কিন্তু এটা সাহিত্য লেখার জায়গা নয়। বিজ্ঞান ভিত্তিক তথ্য প্রস্তুত করা এখানে প্রধান উদেশ্য।
আজ বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের তথ্য প্রস্তুত করছি। আমরা সবাই জানি নেত্রদানের মাধ্যমে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু কে কবে নেত্রদান করবে ঠিক নেই, তার কারণ এখনো আমাদের দেশে নেত্রদানের হার খুব কম। তাহলে বিজ্ঞান কি উপায় আবিষ্কার করলো? চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের নাম ‘বায়োনিক চোখ’।
এই সমস্যা ভাবিয়ে তুলেছিল অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটির কিছু গবেষকদের। প্রায় এক দশক ধরে তাঁরা চালাচ্ছিলেন কৃত্রিম চোখ বা ‘বায়োনিক আই’ নিয়ে গবেষণা। সেই গবেষণা সফল হয়েছে। প্রস্তুত হয়ে গেছে, পৃথিবীর প্রথম “বায়োনিক আই” বা কৃত্রিম চোখ। এই কৃত্রিম চোখ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সহজেই দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা আবার দৃষ্টি ফিরে পাবেন।
বায়োনিক আই বা নকল চোখ কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে গেলে, আমাদের আগে বুঝতে হবে, আমাদের চোখ কিভাবে কাজ করে।
আমাদের চোখে আলো পড়লে, চোখের লেন্স এবং কর্নিয়া সেই আলোকে চোখের ভেতরে রেটিনার উপর ফোকাস করে। আমাদের চোখে রেটিনা নামের স্তরটি, আলোক সংবেদী কোষ দ্বারা গঠিতr Dr। এই রেটিনা বাইরের জগত থেকে প্রাপ্ত আলো এবং ছবিকে ইলেকট্রিক সিগন্যাল বা স্নায়ু স্পন্দনে (Neural Impulses) রূপান্তর করে। এই স্নায়ু স্পন্দন, দর্শন স্নায়ু (Optic Nerve) বরাবর আমাদের মস্তিষ্কের থ্যালামাস নামের একটি জায়গায় পৌঁছায়। সেখান থেকে ওই সিগন্যাল বা স্নায়ু স্পন্দন আমাদের মস্তিষ্কের পিছনের দিকে, ভিজুয়াল কর্টেক্স নামে একটি জায়গায় পৌঁছে যায়। ভিজুয়াল কর্টেক্স-এ আমাদের দেখা বস্তুর প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। ফলে, আমরা বস্তুর রং, আকৃতি, গতিবেগ ইত্যাদি বুঝতে পারি।
বায়োনিক আই কিভাবে কাজ করে?
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই অন্ধত্বের মূল কারণ হলো, ক্ষতিগ্রস্ত লেন্স বা খারাপ হয়ে যাওয়া কর্নিয়া। এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘বায়োনিক আই’।
এই ‘বায়োনিক আই’ সিস্টেমটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত।
1) চশমা সহ একটি হেড গিয়ার: এর প্রধান অংশগুলি হল– একটি ভিডিও ক্যামেরা, একটি ভিজুয়াল প্রসেসর সফটওয়্যার এবং একটি ওয়ারলেস ট্রান্সমিটার। এটি দেখতে অনেকটা চশমার মতো। এই যন্ত্রটি সাধারণ চশমার মতোই পরতে হয়।
2) ‘বায়োনিক আই’ বা নকল চোখ: এর প্রধান অংশগুলি হল– ওয়ারলেস সিগন্যাল রিসিভার, সার্কিট সহ কয়েক জোড়া টাইলস, চুলের মতো সরু কিছু ইলেক্ট্রোড। এই যন্ত্রটিকে দেখতে অনেকটা আমাদের চোখের মতো। অপারেশন এর মাধ্যমে আসল চোখের জায়গায় এটিকে লাগিয়ে দেওয়া হয়।
বায়োনিক আই এর কার্যপ্রণালী:
চশমার সামনে রয়েছে একটি ছোট ভিডিও ক্যামেরা। এই ক্যামেরা দিয়ে গৃহীত হবে ছবি। এরপর এই ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি রেখে অতিরিক্ত অংশগুলি বাদ দিয়ে দেওয়ার জন্য (চিত্রকে কম্প্রেস করার জন্য) পাঠানো হবে, হেড গিয়ারে থাকা প্রায় স্মার্টফোনের সমান আকারের, একটি ভিজুয়াল প্রসেসর, কম্প্রেস হওয়া ছবি, ওয়ারলেস ট্রান্সমিটারের সাহায্যে পাঠিয়ে দেওয়া হবে অপারেশন করে বসানো, ‘বায়োনিক আই’ বা নকল চোখে। এই ‘বায়োনিক আই’ এর ভেতরে থাকা, বিশেষ সার্কিট দিয়ে তৈরি টাইলসগুলো কাজ করবে রেটিনার মতই। এগুলোর কাজ আগত আলো বা চিত্রকে স্নায়ু স্পন্দনে (Neural Impulses) রূপান্তর করা। চুলের মতো সরু কিছু ইলেক্ট্রোড এই স্নায়ু স্পন্দনকে দর্শন স্নায়ু (Optic Nerve) বরাবর আমাদের মস্তিষ্কে পাঠায়। চোখের সামনে থাকা বস্তুর প্রতিবিম্ব গঠিত হয় সর্বোচ্চ 473 টি আলোক বিন্দু (phosphenes) দ্বারা। যা সামনের থাকা বস্তুকে মোটামুটি চিনতে সহায়তা করবে।
যদিও এখনো এই টেকনোলজি এতটা উন্নত হয়নি যে পুরোপুরি অন্ধত্বকে দূর করতে পারবে। আমাদের স্বাভাবিক ভাবে দেখতে হলে, প্রায় 10 লক্ষ আলোক বিন্দু দ্বারা উৎপন্ন চিত্র দরকার। এই ‘বায়োনিক আই’ যন্ত্র দিয়ে সর্বাধিক 473 টি আলোক বিন্দু দারা চিত্র গঠিত হয়। ইলেক্ট্রোডের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, আলোক বিন্দু সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য গবেষণা চলছে। গবেষণাটির হিউম্যান ট্রায়ালও সফল হয়েছে। বর্তমানে যে পর্যায়ে গবেষণাটি পৌঁছে গেছে, তাতে যে কোনো অন্ধ ব্যক্তি, সামনে থাকা বস্তু সম্পর্কে মোটামুটি একটি চিত্র দেখতে পাবে। ফলে তাদের একলা চলা ফেরা করতে কোন রকম অসুবিধা হবে না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা সেই দিন দেখতে পাবো, যেদিন অন্ধত্ব নামের কোন সমস্যা আর পৃথিবীতে থাকবে না।











