ভূমিকা
এতোকাল চে গুয়েভারার জীবন পড়েছি,কাপ্তান আমুন্ডসেন,ভ.ই.লেনিন, ডাক্তার নরম্যান বেথুন কিম্বা স্টিফেন হকিংয়ের জীবনী পড়েছি। পড়েছি মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মহাত্মা গান্ধী কিম্বা আমাদের প্রাণের মানুষ নেতাজি সুভাষের জীবন?
আমার আরেক ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ একটু আলাদা থাকুন। উনি অনন্য।সবার থেকে আলাদা। ওনাকে উন্মুক্ত প্রান্তরে মানায় এই ছোট্ট লেখায় আনার ধৃষ্টতা আমার নেই। শুধু এই লেখায় ব্যবহৃত একটা উদ্ধৃতি আবার ব্যবহার করি। রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বর সম্পর্কে বলেছিলেন:-“ব্রাহ্মণপন্ডিত যে চটি জুতা ও মোটা ধুতিচাদর পরিয়া সম্মানলাভ করেন, বিদ্যাসাগর রাজদ্বারেও তাহা ত্যাগ করিবার আবশ্যকতা বোধ করেন নাই।তাঁহার নিজের সমাজে যখন ইহাই ভদ্রবেশ, তখন তিনি অন্য বেশ পরিয়া আপন সমাজ এবং সেই সঙ্গে আপনার(নিজের) অবমাননা করিতে চাহেন নাই।সাদা ধুতি ও সাদা চাদরকে ঈশ্বরচন্দ্র যে-গৌরব অর্পণ করিয়াছিলেন, আমাদের বর্তমান রাজাদের ছদ্মবেশে আমরা আপনাদিগকে সে-গৌরব দিতে পারি না; বরঞ্চ এই কৃষ্ণচর্মের ওপর দ্বিগুণতর কলঙ্ক লেপন করি।এই আমাদের অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখন্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না।”
হঠাৎ মনে হলো অথচ যে মানুষটা খেউড় আর অশ্লীলতায় ভরা বাংলা ভাষায় সমুদ্রের গভীরতা আনলো, বাংলা ভাষার আকাশের দিগন্ত অনন্ত করে’ দিলো, সমস্ত পৃথিবীর সাহিত্যকে বাংলায় নিয়ে এলো তার কথা তো কিছুই জানি না।
যার লেখা বই পড়ে’ আমার হাতেখড়ি হলো তাকে তো ঠিক চিনি না।
পড়তে পড়তে দেখলাম অসূর্যম্পশ্যা(সূর্য দেখাও যার বারণ)বাংলার মেয়েদের তিনি লেখাপড়া শেখালেন -তাদের জন্য দিবারাত্র পরিশ্রম করে’ নিজের জীবদ্দশায় প্রায় তিনশো বালিকা বিদ্যালয় (এর আগে ধর্মীয় কারণে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাই নিষিদ্ধ ছিলো- ইশকুল তো ছিলোই না, আসলে সব ধর্মই নারীশিক্ষার বিরোধী) খুললেন-বাংলার মেয়েরা ঘোমটা ঢাকা অন্দরমহল থেকে নেমে এলো খোলা আকাশের নিচে -চোখ তুলে তাকালো সূর্যের দিকে-তাকে তো ঠিক করে’ জানি না।
লোকটা ঐসব বিদ্রোহী, বিপ্লবী কিচ্ছু ছিলো না -ইংরাজের দেওয়া মাইনেতে সংসার চালাতো অথচ লালমুখো সাহেবের মুখের ওপর টেবিলে তালতলার শুঁড়তোলা জুতো সমেত পা তুলে দিতে ভয় পায়নি, দ্বিতীয় চিন্তা করেনি-একে নিয়ে তো কিছুই জানি না।
এ কি বিরাট বড়লোকের সন্তান ছিলো?এ কি সুদর্শন, সুপুরুষ, সুবক্তা ছিলো?
ভেবে দেখলাম এই লোকটার লেখা বই পড়ে’, আমাদের লেখাপড়ার শুরু অথচ একেই আমরা দূরে ঠেলে রেখেছি।
তারপর থেকে একটা ঘোরের মতো লোকটার সম্বন্ধে পড়ে চলেছি। আমার দুর্ভাগ্য আমি ঐ সময়ে জন্মাইনি। নিজের চোখে এমন একটা আশ্চর্য লড়াই দেখতে পাইনি।
আজ তাই যখন ঐন্দ্রিল বললো ঈশ্বরের ওপর এই লেখাটি ও পুস্তকাকারে বার করবে তখন আমি ধন্য হলাম। আমার লেখা ধন্য হলো।
হে পাঠিকা একটা প্রশ্ন করবো?
আপনার লেখাপড়া শেখার জন্য সব থেকে বেশী অবদান কার?
আপনার ইশকুলে যাওয়ার জন্য কে নিজের জীবন দিয়েছিলেন? আজ্ঞে না এটা ভাষার অলঙ্কার নয়। বাস্তবে নিজের চেষ্টায় খোলা উত্তরপাড়া বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে আমার ঈশ্বর এক দুর্ঘটনায় পড়েন এবং সেটাই ওনার মৃত্যুর কারণ।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হলো ঈশ্বর- আমার একাকী ঈশ্বর। আগেকার মা বাবারা চাইলেও কন্যাকে লেখাপড়া শেখাতে পারতেন না। সমাজে পতিত হতেন।ঐ এক তোৎলা বেঁটে বামুন একা সমাজের সব নিগড় ভেঙে নারীশিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছিলো।
আপনার ঠাকুর ঘরে তো
শতকোটি দেবদেবী-
কেউ গেরুয়া বসন
কেউ বা আছেন জটাধারী
কেউ রয়েছেন এলোকেশী।
ধূপধুনো সন্ধ্যারতি
মনে পড়ে?
ঈশ্বর আছে
মুখ লুকিয়ে
কেবলমাত্র
হাতেখড়ির প্রথম পাতায়?
প্রথম দিনের ঐ সেই বই
গোলাপি মলাট
বর্ণপরিচয়?
যখন আপনি বাজার থেকে
ফল কিনেছেন
পুজোর মালা
ফুলের গোছা;
স্নানের পরে সিক্ত চুলে
নত মাথায় প্রণাম করেন –
পুজোর পরে আপিস যাবেন
শাঁখায় লাগান সিঁদুর ছোঁয়া?
কিম্বা যাবেন শিশুর স্কুলে
ছুটি হলে
আনার জন্য
নিজের বাচ্চা
নিজের ঘরে?
সন্ধেবেলা দেখিয়ে দেবেন
হোমওয়ার্ক আর প্রজেক্টগুলো?
একটি বার কি মনে পড়ে?
একলা একা এক ঈশ্বর
দুহাত দিয়ে পথ গড়েছে
অন্ধকারে অন্ধকারে।
সেই পথেতেই হাঁটছো তুমি
সেই পথেতেই তোমার পড়া,
বাজার করা,
ইশকুল আর আমের আচার?
এই টুকু মনে করিয়ে দিতেই আমার এই লেখা।তাই এই ঈশ্বরের স্মৃতিচারণ।তাই আমার এই পূজা।











