আমরা সবাই একটা ভীষণ মনখারাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি… একটা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি যা আমাদের প্রজন্মের লোকজনের কাছে নতুন… আমাদের ভয় করছে… মৃত্যু ভয়, পরিবার নিয়ে ভয়, অনিশ্চয়তা নিয়ে ভয়… বাড়ি থেকে বেরোতে না পারা, বন্ধুদের সাথে দেখা না হওয়া, স্কুল-কলেজ-অফিস সামাজিক মেলামেশা বন্ধ হয়েছে প্রায় মাস খানেক… ক্রমশ আমরা একলা হয়ে পড়ছি, আর এই একাকিত্ব মনখারাপকে আরেকটু উস্কে দিচ্ছে !
এতদিন আমরা ভয় পেলে কাছের মানুষের কাছে ছুটে গেছি, আশ্রয় পেতে চেয়েছি তাদের কাছে অথচ এই প্রথম এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে কাছে যাওয়া বারণ… ছোঁয়া বারণ… যেখানে একলা থাকতে বলা হচ্ছে… !
কিন্তু সত্যি করে ভেবে দেখুন তো… আপনি কি আজ একলা হলেন?? একলা কি আপনি অনেকদিন আগেই হয়ে যান নি?? এই যে একাকিত্ব, এই যে হতাশা, বিষণ্ণতটা… এ কি দীর্ঘদিনের চরম আত্মকেন্দ্রিকতার ফসল নয়??
আমরা ভীষণ বিচ্ছিন্ন, ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক… নইলে কেউ ভাবতে পেরেছিলো যে “Physical distancing” এর concept টাকে আমরা অস্পৃশ্যতায় পর্যবসিত করবো ! Corona একটা stigma হয়ে যাবে ! !
অথচ সেটাই হলো… এমনতো কথা ছিলোনা… !
দিকে দিকে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থকর্মীররা এই অস্পৃশ্যতার শিকার হচ্ছেন, কোথাও তাদের বাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে, কোথাও গাড়িতে উঠতে দেয়া হচ্ছেনা, কোথাও corona যুদ্ধে মৃত ডাক্তারবাবুর মৃতদেহের উপর আক্রমণ হচ্ছে…
অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি যে এসব করে আমরা শুধুই স্বাস্থকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে দিচ্ছি তাই নয়, তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করছি এবং সেই সঙ্গে নিজেদেরকেও কি আরেকটু বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিনা?? আরও একলা হয়ে যাচ্ছিনা কি??
পৃথিবীর কোনো দেশেই এই মহামারীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাস্থকর্মীদের এতো অপমান, এতো আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়নি, যতটা ভারতবর্ষে হচ্ছে, এতে ডাক্তারদের মানসিক হতাশা, অসহায়তা কোন পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে সেই আলোচনা, এই লেখার উদ্দেশ্য নয়… আমি জানতে চাইছি আপনি কি ভালো থাকছেন??
আপনার প্রতিবেশী ডাক্তারবাবু বা আপনার পাড়ার নার্স দিদি কে আপনি তাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু সামাজিক সম্পর্কগুলো থেকে আপনিও কি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন না?? ক্রমশ আপনার গন্ডিটা ছোটো হতে হতে নিজের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেনা কি?? এতে আপনি ভালো থাকবেন??
এর চেয়ে যদি নিজেকে এই সমগ্র মানবজাতির একজন ভাবতেন… যদি ভাবতেন আপনার পাড়ার ডাক্তারবাবু আপনার নিজের না হলেও, আপনার মতোই আরেকজন মানুষ বা কারোর প্রিয়জনের চিকিৎসা করছেন, আর কিচ্ছু না পারি, ওনাকে কাজ করার আরেকটু উৎসাহ দেই, ওনাকে সহযোগিতা করি… তাহলে দেখতেন এতটা একলা লাগতো না… ! যদি ভাবতে পারতেন যে পুলিশ কর্মী আজ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে lockdown বজায় রাখছেন তিনি আপনার পরিবারের জন্য লড়ছেন, দেখতেন এতটা একলা লাগতো না… যদি সাফাই কর্মীদের প্ৰতি কৃতজ্ঞ বোধ করতেন, দেখতেন একলা লাগতোনা… যদি হাজার হাজার অভুক্ত শ্রমিকের হেটে বাড়ি ফেরা আর জমায়েত-এর দৃশ্যদেখে ওদের “আগাছা” নয়, ওদের নিজেদের একজন ভাবতেন, যদি ভাবতেন “ওরা কাজ করে ” বলেই দেশটা চলছে… তাহলে দেখতেন হয়তো এতটা একলা লাগতোনা…. মানব সভ্যতার এই সংকটজন মুহূর্তে আপনি যত দ্বেষ-বিদ্বেষ হিংসা অসহিষ্ণুতা নিয়ে চৰ্চা করবেন তত অসহায় বোধ করবেন, তত একাকিত্ব বাড়তে থাকবে…. তার জায়গায় যদি ভাবেন যে জীবাণুর বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে সমস্ত মানুষ লড়ছে নিজের নিজের মতো করে, নিজের সবটুকু দিয়ে, নিজেকে যদি এই লড়াইয়ের একজন ভাবেন আর পাশের জনকে ভাবেন সহযোদ্ধা, তাহলে দেখবেন physical distancing টা এতটা বেদনাদায়ক হবেনা… !
আসলে মানুষ-এর কিছু “positive emotion “মানুষকে আরেকটা মানুষের সাথে বেঁধে রাখে… যেমন ধরুন… ভালোবাসা, সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা, সহানুভূতি…. এই positive emotion গুলোও কিন্তু আমাদের ভালো থাকার চাবিকাঠি… আর উল্টোদিকের হিংসা, ক্রোধ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ আমাদের মনটাকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে চলে, আরও একাকিত্ব, আরও বিচ্ছিন্ন, আর অসহায়, আরও মনখারাপ…. !
আমরা মানসিক ভাবে একাকী হয়েছি অনেকদিন… এই মহামারী আমাদের শারীরিক দূরত্ব তৈরি করতে বাধ্য করেছে মাত্র…. তবে বিশ্বাস করুন সামাজিক সংহতি-ই মুক্তির পথ… !!










