
মানবকের শিক্ষা পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক অনেক প্রত্যাশা। আমরাতো আদতে সামাজিক প্রাণি। তাই মানুষের শিক্ষার বিষয়টি কখনোই সামাজিক প্রত্যাশা বিমুক্ত প্রক্রিয়া হওয়া বোধকরি সম্ভব নয়। আমাদের পরিবারগুলো ঐ বৃহত্তর নাগরিক সমাজেরই প্রতিরূপ, আর তাই অভিভাবকদের স্বপ্নিল চোখে অঞ্জনের মতো লেগে থাকে কিছু আশা, স্বপ্ন, ভালোবাসা। এইসবই তরতরিয়ে বাড়তে থাকে বাড়ির সন্তানটি বিদ্যালয় পরিসরে প্রবেশের পর। সন্তানকে ঘিরে ফুলেফেঁপে ওঠা ঘুমিয়ে থাকা প্রত্যাশাগুলো একটু একটু করে যেন পাঁপড়ি মেলতে থাকে শিক্ষার আলো এসে পড়ার পর। ঈশ্বর পাটনীর চাওয়া ছিল একদম সোজা সাপটা। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে । এটুকুতেই হয়তো সন্তুষ্ট থাকতেন এক কালের অভিভাবকুল।
কিন্তু প্রত্যাশার তো শেষ নেই। বহতা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে বদলে যায় মানুষের চাওয়া পাওয়ার সহজ সরল সমীকরণগুলো। সু… এর মায়ের প্রত্যাশা দিয়ে গোটা সমাজের প্রত্যাশাকে মাপতে বসলে নির্ঘাত ফেল হয়ে যাবো।
শিক্ষক তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে কতগুলো নির্দিষ্ট প্রত্যাশা থাকে অভিভাবকদের। যে মহত্তম মানবিক নির্মাণের কথা বলা হয় সেই নির্মাণেরও কতগুলো বিশেষ পদ্ধতি প্রকরণ রয়েছে যা নিয়মিত অনুশীলিত হয় সরস্বতীর আখড়ায় । প্রত্যেক অভিভাবকই চান তাঁর সন্তান উচ্চ গুণগত মানের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুক অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের শেখা যেন দীর্ঘ ফলদায়ী হয়। জীবনের সমস্ত চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সফলতার শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছতে ঠিক যেমনটি প্রয়োজন বিদ্যালয় যেন তেমন শিক্ষায় পারঙ্গম করে তুলতে পারে তাঁদের প্রিয় সন্তানদের। এখানেই বারংবার উঠে আসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষতার বিষয়টি। এই মৌলিক সামাজিক প্রত্যাশার কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। আজও সমাজ প্রত্যাশা করে যে বিদ্যায়তন কেন্দ্রিক পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন উৎকৃষ্ট মানবসম্পদে পরিণত হয়। যে চিরায়ত মূল্যবোধগুলোকে অবলম্বন করে চলতে চলতে আজ আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি সেই মূল্যবোধগুলোর যথাযথ চর্চা যেন হয় প্রতিষ্ঠানের নিমগ্ন পরিসরে। এই সব বিষয়ে সমাজের চাহিদা বা প্রত্যাশাগুলো যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলকুল বদলে গেছে তেমনটাতো মোটেই নয় হয়তো তার কিছুটা চরিত্র বদলে গেছে, হয়তো আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে স্থূল প্রত্যাশার ক্ষেত্রগুলো।
সময়তো সব কিছু বদলে দেয় – সমাজ, সামাজিক চাওয়া পাওয়া, ব্যষ্টি ও সমষ্টিগত চাহিদা , প্রচলিত মূল্যবোধের স্তর, বিদ্যালয়ের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্বাস , গুরুমশাইদের ওপর শিক্ষার্থীদের বিশ্বস্ততা, নির্ভরতা — সবকিছুই । তাই সেকালের পুরনো মাপনি দিয়ে এসবকে মাপতে বসলে নির্ঘাত হতাশ হতে হবে এমন। অনেকে এসব দেখে হতাশ হয়ে পড়েন, বলেন সব গোল্লায় গেল। এই ভাবনার সবটাই অস্বীকার করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে এটাই শেষ কথা তেমনটাও যে মানতে মন চায় না। তাহলে ….?
একবার এক অভিভাবক সভায় বলেছিলাম – মাননীয় অভিভাবকবৃন্দ আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন, ভরসা রাখুন, প্রাতিষ্ঠানিক বিধি ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বস্ত থাকুন কেননা এই আমরা শিক্ষকেরাই কেবল মাত্র আগামী দিনের সমাজের ভাবী চলনের গতিপ্রকৃতির স্পন্দন অনুভব করতে পারি। We can feel the impulse of the future society. আপনারা আপনাদের সন্তানকে দেখেন ক্ষুদ্র পারিবারিক আবহে।আর আমরা তাদের দেখি বৃহত্তর সমাজের আয়নায়। ভুল ত্রুটি যাই ঘটুক না কেন আমরাই পারি সেসব পরিমার্জন করে, পরিশোধন করে এক নতুন সমাজ গড়তে। এই প্রত্যয় প্রাতিষ্ঠানিক স্তর থেকে উঠে এলে তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। আজ বরং নিগূঢ় নিমগ্ন নবীন প্রত্যাশায়
ভরপুর থাকুক আমাদের সকলের মন ও চেতনা। আমরা আমাদের মিলিত সাধনায় নিশ্চয়ই উত্তীর্ণ হবো।
সেদিনও আমরা কজন ঘরে বসে কথা বলছি। এক ভদ্রলোক ঘরে এলেন। আমাদের পাশেই বসতে বললাম। পরিচয় জানতে চাইলে বললেন – আমি …ন এর বাবা। “ও …ন ! ওতো ভালো ছেলে। তবে….”– এটুকু বলেই থেমে যাই। এরপর ভদ্রলোক নাগাড়ে বলে চলেন…ন কে নিয়ে তাঁর অজস্র পরিকল্পনার কথা এবং এসব রূপায়ণের জন্য কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তার লম্বা ফিরিস্তি। আমরা সবাই থম্ মেরে বসে থাকি। একসময় বাধ্য হয়েই বলি – এতো রাজকীয় আয়োজন! তাহলে আমাদের কাছে এলেন কেন?” এবার ভদ্রলোক একটু দমে গেলেন। তারপর বললেন – “না ! আপনাদের জানিয়ে গেলাম যাতে আপনাদের ওকে ঠিকমতো ‘ফলো’ করতে সুবিধা হয়।”
প্রথম দিনও সু…এর মাকে কিছু বলতে পারিনি,আজও পারলাম না….ন এর বাবাকে কিছু বলতে। মাঝের সময় কেবল আমাদের দুই প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেয়। সময় বয়ে চলে নিজের নিয়মে।
জানুয়ারি ২১, ২০২৫










প্রথম উদাহরণ এখন দুর্লভ হলেও হারিয়ে যায়নি। এমন মুহূর্তগুলি কিম্বা স্টুডেন্টের সঙ্গে মনের সংযোগের মুহূর্তগুলি একই সঙ্গে অনির্বচনীয় আনন্দ দেয় ও দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। তবে সামাজিক অবস্থান দ্বিতীয় উদাহরণ ছড়িয়ে আরো অনেকদূর চলে গেছে। এখন বস্তুত সমাজের কোন প্রত্যাশাই নেই স্কুলের কাছে।স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগও নেই। আমার পরিচিত একটি ক্লাস টেনের মেয়ের বন্ধুকে টিচাররা বলেছেন হ্যাঁরে অমুকের মুখটাই তো কোনদিন দেখলাম না রে। ভালো রেজাল্ট করবে জানি ।কাগজে টাগজে বেরোলে তো চিনতেই পারবো না!
সময়ের পরিবর্তনের সাথেসাথে অভিভাবকদের মানসিকতার স্তরেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। একটা বড়ো সংখ্যক অভিভাবকরা বিদ্যালয়কে আর মানুষ গড়ার আঁতুরঘর বলে মনে করছেন না। কেন করছেন না তা অবশ্যই অনুসন্ধানের বিষয়। সমান্তরাল বিকল্প শিখন ব্যবস্থার ঢালাও আয়োজন বিদ্যালয়গুলোকে অর্থহীন প্রতিপন্ন করছে। কাগজে নাম তোলার জন্য অভিভাবকদের তরফেও ঢালাও আয়োজনের ব্যবস্থা। হাজিরার বিষয়ে শিক্ষার্থী,অভিভাবক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা প্রশাসন – সকলেই অসচেতন। এই অচলাবস্থা নিরসনের জন্য চাই সর্বস্তরের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও আন্তরিক প্রয়াস ।
Oshadharon lekha! Darun laglo!
ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম ।
প্রথম অভিজ্ঞতাটা বুকে ধাক্কা দিয়ে গেলো; অপ্রত্যাশিত ঘটনা বলে নয় – ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সাযুজ্যের কারণে।
তবে সৌমেনবাবুর মন্তব্যটা রুক্ষ বাস্তব। কিন্তু কেন এমন হলো? শহুরে অভিভাবকদের কি মনে হয় যে পয়সা ঢেলে পাওয়া শিক্ষারই দাম আছে কেবল?
আর, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে এই বিষয়ক পরিস্থিতি কতোটা আলাদা?
কেন এমন হলো? এই মুহূর্তে প্রবাসে থেকেও তোমার উদ্বেগ, উৎকন্ঠা আমার মন ছুঁয়ে যায়। সৌমেন বাবু এখনও চরকা চালিয়ে যাচ্ছেন পরম যত্নে । তাঁর মনেও ক্ষোভ আছে, তবে তাতে নিয়মিত বারি সিঞ্চন করতে হয়। একালে গ্রাম শহরের বিভাজন রেখা আর আগের মতো স্পষ্ট নয়। এই ব্যাপারে আমরা সবাই সমান। দুঃখটা এখানেই।
ভালো থেকো।নিয়ত পাঠে থেকো।
Changing society and changing socioeconomic structure modifies human desires. I can’t judge it as good or bad, it is perhaps not a grayscale, rather is a natural array of shades.