রামকমল সেনের লেখা ঔষধ সার সংগ্রহ (১৮১৯, বঙ্গাব্দ ১২২৬) একটি ৯৫ পৃষ্ঠার পুস্তিকা। এতে মোট ৫৬ রকম ওষুধ এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ার বিবরণ আছে। ১০৭ বছর পরে এই পুস্তিকা নিয়ে আলোচনা করব কেন? এর উত্তর স্তরায়িত হয়ে আছে সেসময়ের কলকাতার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইতিহাসে, স্তরায়িত হয়ে আছে ১৯শ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ মেডিসিনের বৈশিষ্ট্যে। স্তরায়িত হয়ে আছে রামকমলের সমকালীন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে।[1]
আমরা বইটির আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে এসমস্ত দিকগুলোও সাধ্যমতো বোঝার চেষ্টা করব। নীচে বইটির ”Title page”-এর ছবি দেওয়া হল। 
এখানে আপাতত দুটি জায়গায় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি – প্রথমত, “তাহার নাম উৎপত্তি গুণ ও অধিকার” – বাক্যে এরকম একটি ব্যবহার প্রাচীন আয়ুর্বেদের কথা স্মরণ করায়। চরক সংহিতা-র সূত্রস্থান-এ সাংখ্য দর্শন থেকে গৃহীত এই “গুণ”[2]-এর বিষয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে; এবং “অধিকার”-ও আয়ুর্বেদের একটি প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, ভূমিকার একদম শেষে “বাহুল্য রূপে ছাপা হইবেক.” – এই অংশটি খেয়াল করলে দেখুন দাঁড়ি চিহ্ন নেই, আছে ইংরেজিতে ব্যবহৃত full stop। বাঙলায় তখনো যতিচিহ্নের ব্যবহারের কোন standardized চেহারা তৈরি হয় নি। বিদ্যাসাগরের কাজ অনেক দূরে সেসময়ে।
রামকমলের টেক্সটে যতিচিহ্নের ব্যবহার আরও ২টি উদাহরণ দেওয়া যাক – যেখানে ইংরেজি বাক্যবিন্যাসের অনুকরণে কেবলমাত্র সেমিকোলোন এবং full stop-এর ব্যবহার করা হয়েছে।

এখানে লক্ষ্যণীয়, পরপর ৩ বছর – বিদ্যা নিন্দা (১৮১৮), ঔষধ সার সংগ্রহ (১৮১৯), বিদ্যাহারাবলী (১৮২০) – ৩টি চিকিৎসা-সংক্রান্ত বই প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঔষধ সার সংগ্রহ (১৮১৯) ব্যতিক্রমী এই অর্থে যে প্রথমত একজন বাঙালির লেখা, এবং দ্বিতীয়ত, সমস্ত শিক্ষিত মানুষের সাধারণ ও ঘরোয়া চিকিৎসার উপযোগী করে সহজবোধ্য ভাষায় লেখা। ফেলিক্স কেরির বইটি অ্যানাটমি এবং শবব্যবচ্ছেদ সংক্রান্ত। ফলে এ দুটি বইয়ের মাঝে চরিত্রগত পার্থক্য আছে।
একজন গবেষকের পর্যবেক্ষণে – “To translate a book on medical science into Bengali grom a foreign language was itself a difficult task. It more so especially in the days when Bengali prose was in its infancy. … Since Ramkamal was the author of a book, the subject which had never been dealt with in the Bengali language by any person before him, he had to follow a style peculiarly his own in writing useful prose to express his ideas. In that sense he was a path-finder and a pioneer.”[4]
রামকমল সেন ও তৎকালীন কলকাতা
(রামকমল সেন – উইকিমিডিয়া কমনস)
রামকমলের জীবন সম্পর্কে (আমি ১৮১৯ সাল পর্যন্ত সময়কালকে হিসেবে ধরেছি, কারণ তাঁর পুস্তিকা প্রকাশের পরবর্তী সময়কাল আমাদের আলোচনার পরিধির বাইরে) একাধিক পুস্তক, গবেষণা পত্র এবং প্রবন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে প্যারীচাঁদ মিত্র-র লেখা জীবনী সম্ভবত সর্বপ্রথম (১৮৭০?)। পরে এর বাংলা অনুবাদ হয়।[5]
এই পুস্তকের ভূমিকায় যোগেশচন্দ্র বাগল জানান – “পুণ্যশ্লোক রামকমল সেন একজন প্রতিভাবান কর্মকুশল ব্যক্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যে সমস্ত শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-মূলক অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান আয়োজিত হয়, তার সঙ্গে রামকমলের ঘনিষ্ঠ সংযোগ সাধিত হয়েছিল। … কিছুদিন আগে পর্যন্তও রামকমল সেন সম্বন্ধে বাংলাভাষীর জ্ঞান ছিল নিতান্ত ভাসা ভাসা। প্যারীচাঁদের রচনা ইংরেজীতে লেখা, বাংলাভাষীর নিকট এর বিষয়বস্তু প্রায়ই ছিল অজ্ঞাত।” এরপরে শিবনাথ শাস্ত্রীর বইয়ে রামকমল সেন এবং রাজা রাধাকান্ত দেবের বিষয়ে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনার জন্য উষ্মা প্রকাশ করেছেন।[6]
কলকাতায় ১৮০১ সালে এসে কলুটোলায় রামজয় দত্তের কাছে ইংরেজী শিখতে শুরু করেন।[7] “১৮০২ খ্রীষ্টাব্দে ১০ই ডিসেম্বর মিঃ নামির এক অফিসে চাকরি নিলেন তিনি … ১৮০৪ খ্রীষ্টাব্দে মাসিক ৮ টাকা বেতনে হিন্দুস্থানী প্রেসে তিনি কাজ করতে থাকেন। তারপর ১৮০৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি চাঁদনি হাসপাতালের কাজে নিযুক্ত হন। ১৮১২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কর্নেল রামসের অধীনে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে যোগ দেন। ১৮১৮ হইতে ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটিতে মাসিক ১২ টাকা বেতনে কেরানীর কাজ করতে থাকেন।”[8] এখানে আমরা রামকমলের জীবনপঞ্জী থেকে বিরতি নিচ্ছি। সম্ভবত চাঁদনি হাসপাতালের কাজের অভিজ্ঞতা তাকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়ে উৎসাহিত করে থাকবে। এছাড়াও “প্রাচীন বাঙলা ভাষায় ও সংস্কৃতে তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল।”[9] এর দরুন অনুবাদের ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদের সংস্কৃত শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর কোন অসুবিধে হয়নি।
আশা করি, একটি উদাহরণ এক্ষেত্রে সুপ্রযুক্ত হবে। তাঁর পুস্তিকার ২৯ নম্বর এন্ট্রিতে তিনি যা লিখেছেন তার চিত্র এখানে দিলাম।[10]
আমরা আবার ঔষধ সার সংগ্রহ-এ প্রত্যাবর্তন করি। পূর্বোল্লেখিত অংশটুকুর গুরুত্ব অনুবাদ এবং শব্দের ব্যবহার থেকে বোধগম্য হয়। “He picked up words from English, Arabic, Persian and Sanskrit languages which could convey the exact idea and at the same time would be clearly intelligible to the readers without any difficulty. He retained foreign terms as were in use and unnecessarily did not, for the sake of purity of the language of Gaur, choose to make his translation pedantic.”[13]
এখানে আরেকটি বিষয় সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-বুক সোসাইটির বই প্রকাশের ফলে কলকাতা ও বিভিন্ন অঞ্চলের উদীয়মান নব্য শিক্ষিত সমাজের মাঝে বই পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে শুরু করল। ফলে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে এক নতুন সমীকরণ তথা পরস্পর-সংযুক্ততার নতুন চিত্র জন্ম নিল।
ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার > ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা > বহুসংখ্যক ছাপা বই (পুরনো single-copy ম্যানাসক্রিপ্টের পরিবর্তে) > নতুন পাঠক সমাজ > ইংরেজি ভাবধারা এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি-রীতিনীতির নির্মাণ > নতুন পাঠক গোষ্ঠীর জন্ম > “print capitalism” তথা মুদ্রণ পুজিতন্ত্রের বিস্তার। এরকম এক সন্ধিক্ষণে রামকমলের মতো ব্যক্তিত্বদের উদ্ভব ও বিকাশ। স্কুল-বুক সোসাইটির তরফে কত সংখ্যক বই একেবারে গোড়ার যুগে ছাপা হয়েছিল তার একটা চিত্র আমাদের বক্তব্য বুঝতে সাহায্য করবে।
গণিতাঙ্ক। Harley’s Arithmatic. For the use of the Bengalee Schools, 1819 – মুদ্রণ সংখ্যা জানা নেই।
ভূগোল বৃত্তান্ত। Geography, interspersed with information historical and miscellaneous, 1819 – ২০০০ কপি ছাপা হয়েছিল,
পাঠশালা বসাইবার ও বালকদের শিখাইবার ধারার বিবরণ, ১৮১৯ – মুদ্রণ সংখ্যা ৫০০।
নীতি কথা, প্রথম ভাগ। Fables in the Bengalee Language, for the use of Schools. Second Part – রাধাকান্ত দেব, ১৮১৯ – মুদ্রণ সংখ্যা ৪০০০।
নীতি কথা, দ্বিতীয় ভাগ, or Fables in the Bengalee Language, for the use Schools. Second Part –রাধাকান্ত দেব, ১৮১৯ – মুদ্রণ সংখ্যা ৪০০০।
মনোরঞ্জনেতিহাস, or Please Tales. Stories designed to improve the understanding and direct the conduct of young persons – তারাচাঁদ দত্ত, ১৮১৯ – মুদ্রণ সংখ্যা অবিজ্ঞাপিত।[14]
উপরের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, রামকমলের পুস্তিকাটি যে বছর (১৮১৯) প্রকাশিত হয় সেই একই বছরে যে সমস্ত পুস্তক ছাপা হয়েছে সেগুলো মূলত পাঠ্যপুস্তক এবং এদের সংখ্যা ১১০০০ থেকে ১৫০০০ কপি। এত পাঠ্যপুস্তকের সম্ভারের মাঝে চিকিৎসা-সংক্রান্ত রামকমলের বই একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
স্মরণে রাখতে হবে “গ্রাম কলকাতা”র সেসময়ে “শহর/নগর কলকাতা”য় উৎক্রমণ ঘটছে।
(সেসময়ের কলকাতার একটি চিত্র)
নীচে পুরনো কলকাতার ম্যাপের চিত্র দিলাম।
(গড়ে ওঠার সময়ের কলকাতার ম্যাপ – Battle Plan for the Intelligence of the Military Operations at Calcutta When Attacked and Taken By Seerajah Dowlett Engraving dated C. 1760। সৌঃ অ্যান্টিক ম্যাপ অনলাইন)
(পুরনো ওল্ড কোর্ট হাউস – নগর কলকাতা গড়ে উঠছে)
(অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে কিংবা ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার চিত্র। শিল্পীঃ টমাস ড্যানিয়েল (১৭৪৯-১৮৪০)। ড্যানিয়েলের সমস্ত চিত্রই তাঁর Oriental Scenery. One Hundred and Fifty Views of the Architecture, Antiquities, and Landscape Scenery of Hindoostan (1827) গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।)
আরেকটু বিশদে এই উৎক্রমণের বিষয়টি বলা যাক। কেমন ছিল সেসময়ের কলকাতার জনসংখ্যা এবং অসুস্থতার চিত্র? ১৮২২ সালে কলকাতার জনসংখ্যা ছিল ৭০০,০০০। কিন্তু পরবর্তীতে আরও সঠিক হিসেব বলছে – “Christians, 13, 138; Mahommedans, 48,152; Hindus, 118,203; Chinese, 414; making a total of 179,917 only. Besides the resident population, about 100,000 persons enter Calcutta city daily, from the suburbs and opposite side of the river.”[15] সহজ হিসেব হল, যত সংখ্যক কলকাতার স্থায়ী তার অর্ধেকের বেশি মানুষ সম্ভবত বিভিন্ন কাজের সন্ধানে শহরে প্রতিদিন প্রবেশ করত।
এবারে দেখা যাক কলকাতার বাসিন্দা বা আগত মানুষদের অসুখ-সংক্রান্ত অবস্থা কেমন ছিল – “Every one knows that this city contains thousands of poor strangers, of all ranks, without wealth, connexion,
or friends, who when afflicted with disease, fly from the city, and receiving medicine, and the prescribed regimen elsewhere, recover : but some die on the road, and many perish for want of two pice worth of medicine. Those who live from hand to mouth cannot obtain proper food or medicine, and for them there is no relief. Those who have no attendance, and no means of obtaining medicine, perish of course by hundreds in the city.”[16]
প্রশ্ন উঠবে, রামকমলের বই আলোচনা করতে গিয়ে এত কথা বলছি কেন? এ বিষয়গুলো এ জন্যই প্রয়োজনীয় যে ১৮১৯ সালে কলকাতা নগর/শহর-এর গোড়াপত্তনের সময়কালের পরিস্থিতি সম্যকভাবে না বুঝলে পুস্তিকাটির প্রকৃত গুরুত্ব আমরা অনুধাবন করতে অসমর্থ হব। কোথায় এই পুস্তিকাটির অনন্যতা এবং কোথায় এর প্রয়োজনীয়তা – দুটো বিষয়ই হারিয়ে বাবে।
১৮শ শতকের শেষে এবং ১৯শ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত চিত্র
কলকাতায় প্রথম হাসপাতাল তৈরি হয় ১৭০৭ সালের শেষে বা ১৭০৮-এর শুরুতে। এ হাসপাতালে শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের, বিশেষত নাবিকদের, চিকিৎসা হত।[17] ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ১৬ অক্টোবর, ১৭০৭-এর একটি অর্ডারে বলা হল – “Haveing abundance of our Soldiers & Seamen yearly Sick, & this year more pticularly our Soldiers, & the Doctr representing to us, that for want of an Hospitall or Convenient Lodgeing for them is mostly the occasion of their Sickness, and such a place will be highly necessary as well for the Garrison and Sloops as Company’s Charter party Shiipping to keep the men in health, tis therefore agreed that a convenient spot of ground near the ffort be pitcht upon to build an Hospitall on,”[18] (বানান অপরিবর্তিত)
ক্যাপ্টেন আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন সাহেব সেসময়ে (১৭০৮ সাল নাগাদ) কলকাতার হাসপাতাল নিয়ে এক কৌতুককর মন্তব্য করেন – “The Company has a pretty good Hospital at Calcutta, where many go in to undergo the Penance of Physick, but few come out to give Account of its Operation.” অর্থাৎ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি যথেষ্ট চমৎকার হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে বহু মানুষই রোগের চিকিৎসার জন্য যায়, কিন্তু খুব স্বল্প সংখ্যকই ফিরে আসে হাসপাতালের ভেতরের খবর দেবার জন্য।[19] বিবেচনার দায়িত্ব পাঠকের।
তবে প্রথম “Calcutta hospital” ১৭৫৬-র জুন মাসে সিরাজ-উদ্-দৌলার আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়।[20] এরপরে হাসপাতাল তৈরি হয় “at Ghireti for sipahis.”[21] প্রথম “Native Hospital” তৈরি হয় ১৭৯২-এর শেষে বা ১৭৯৩-এর শুরুতে।[22]
১৭৬৭ সালে “মেডিসিনস, প্রাইস অ্যান্ড ক্লাস” শিরোনামে একটি ছোট সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে – “এটা বিবেচনার মধ্যে রয়েছে যে প্রায় পাঁচ হাজার ইউরোপীয় প্রতি বছর Hon’ble Company-র মেডিসিন নেয়, এছাড়াও রয়েছে সিপাহী এবং কোম্পানির কাজে নিযুক্ত অন্যান্য কালো মানুষেরা।”[23]
প্রায় ৫০০০ ইউরোপীয় এবং ভারতীয়র জন্য মেডিসিনের প্রয়োজন পড়ছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফ থেকে যথেষ্ট সরবরাহ না থাকার ফলে বেশি দামে প্রাইভেট সরবরাহকারিদের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছিল।
আরেকটি খবরের শিরোনাম “Medicine for Jagat Set” (৪৯৪ নম্বর এন্ট্রি)। আমরা প্রায় সবাই জগৎ শেঠের কথা জানি – পলাশির যুদ্ধে ইংরেজের বন্ধু হিসেবে সিরাজ-উদ্-দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তাঁকে সেসময়ের বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ব্যাংকার বললে অত্যুক্তি হবেনা।
যাহোক, এ সংবাদে (১৭৬৭) বলা হচ্ছে যে জগৎ শেঠের জন্য যে যে মেডিসিনগুলো পাঠানো হয়েছে সেগুলো হল – (১) তেল (সম্ভবত তিসির তেল), (২) পশুর শিংয়ের নির্যাস (“extract of horn”), এবং (৩) অন্যান্য মেডিসিন, যেগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়নি।[24]
এরপরে ৪৯৫ নম্বর এন্ট্রিতে সংবাদ হচ্ছে “A Doctor wanted to apply medicine to Jagat Set” (প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩৪-২৩৫)। ১৭৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জগৎ শেঠ তাঁর চিঠিতে লিখছেন – “২০ তারিখ, শনিবার, সকাল ৬টার সময় আমি সমতল ভূমিতে পা হড়কে পড়ে যাই এবং এর ফলে আমার কাঁধের জয়েন্ট সরে যায় (disjointed)। ২ ঘন্টা আমার কোন জ্ঞান ছিলনা … এরপরে আমাকে মেডিসিন দেওয়া হলেও আমার হাত ব্যবহার করতে পারছিনা … but your favour I have received the use of it again, and I beg you will enquire and send me what other medicines may be necessary to remove the pain, and write me concerning the application, and also send a Doctor that perfectly under stands the nature of the medicines. By your complying with these requests, after my recovery, as long as I have life I shall retain a grateful sense of it.”[25] সহজ কথা হল, সার্জারির জগতে ব্রিটিশ মেডিসিনের ঔকর্ষ সন্দেহাতীতভাবে থাকলেও মেডিসিনের জগতে ব্রিটিশদের অবস্থা যথেষ্ট শোচনীয় অবস্থায় ছিল। সেজন্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে পশুর শিংয়ের নির্যাস অব্দি মেডিসিন হিসেবে ব্যবহার করা হত।
(রিচার্ড ও’শনেসি-র করা সুবিশাল চোয়ালের টিউমারের অপারেশনের চিত্র – ১৮৩০-এর দশক)
এই পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক সি এ বেইলির পর্যবেক্ষণ হল – “When the British denounced Indian backwardness in theory, they meant their continued adherence to Aristotelian humoral notions which had only recently been abandoned in Europe. The insecurity of European knowledge was a potent element in their rages.”[26] অর্থাৎ সার্জারির ঔৎকর্ষ সত্বেও মেডিসিনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের সাফল্যের অনিশচয়তা ভারতের ওষধি নিয়ে ক্রোধের একটি বড়ো কারণ ছিল।
সেসময়ে যে হাসপাতালগুলো তৈরি হয়েছিল সেসব জায়গায় চিকিৎসার চেহারা এবং চরিত্র কেমন ছিল? নীচের দুটি চিত্র দেখে নেওয়া যাক।
(ক্রফোর্ড, HIMS, vol. 2, p. 425)
পরের চিত্রটি একই পুস্তকের পৃষ্ঠা ৪২৬ থেকে নেওয়া হয়েছে।
এরকম এক প্রেক্ষাপটে কতকগুলো অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছনো যেতে পারে।
(১) গ্রাম থেকে নগর কলকাতা হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ এবং রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
(২) এদের কোন institutional চিকিৎসা-পদ্ধতি এবং চিকিৎসাব্যবস্থা নেই।
(৩) হাতে গোণা যে দুয়েকটি হাসপাতাল “নেটিভ”দের জন্য তৈরি হয়েছে সেখানে প্রতিদিন যে ১০০,০০০ লোক শহরতলি এবং গঙ্গার পশ্চিমপার থেকে আসত,[27] সে পরিস্থিতিতে অঙ্গুলিমেয় এই চিকিৎসার সংস্থান কতটুকু সাহায্য করতে পারত?
(৪) এরকম এক পরিস্থিতিতে দরকার ছিল ঘরোয়া চিকিৎসার মাধ্যমে রোগকে প্রাথমিক স্তরে প্রতিহত করা বা সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে জোর দেওয়ার ক্ষেত্রে। এই ঘরোয়া চিকিৎসা জড়িবুটি (nostrums) ছিলনা। পাশ্চাত্যে এবং নিজের দেশে পরীক্ষিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান (empirical knowledge)-প্রসূত ফসল হিসেবে ছিল প্রতিটি ওষুধের বিবরণ এবং কার্যকারিতা।
(৫) এখানেই রামকমল সেনের সবিশেষ কৃতিত্ব যে, নিজে চিকিৎসক না হয়েও একজন চিকিৎসাব্রতী শিক্ষাব্রতী সমাজ সংস্কারক হয়ে এই মূল্যবান কাজটি সমাধা করেছিলেন।
রামকমলের আগে ১৮১৩ সালে “Madras Establishment”-এর “Superintending Surgeon” Whitelaw Ainslie ভারতের জন্য ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়া-র অনুকরণে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।[28]

এক্ষেত্রে ২টি বিষয় লক্ষ্যণীয় – (১) ভারতবর্ষের বাজারে তখন রোগের নিরাময়কারী প্রচুর ওষধি পাওয়া যেত যেগুলোকে তিনি চেষ্টা করেছিলেন ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়া-তে যুক্ত করতে, এবং (২) এসবকিছুর প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য ছিল “comfort of the sick”।
নিজে চিকিৎসক না হয়েও রামকমল বাজারে সহজলভ্য এবং কার্যকরী মেডিসিনের অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে একটি পুস্তিকা রচনা করলেন যা বাংলাভাষীদের জন্য বিশেষ কার্যকরী এবং “গোবৈদ্য” তথা হাতুড়েদের হাত থেকে বাংলায় পড়াশুনো করতে পারে এরকম শিক্ষিত মানুষদের একটা বড় অংশকে রক্ষা করতে পারে। এবং রামকমলের রচনা কোন জড়িবুটি-সংক্রান্ত নয়।
কেমন ছিল বাংলার গ্রামীণ এবং শহরাঞ্চলেও চিকিৎসার ধরন? এর একটি মনোজ্ঞ বিবরণ দিয়েছেন ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের (ভারত তথা এশিয়ার প্রথম আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ) উজ্জ্বল ছাত্র সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী। তিনি ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ঊনবিংশ শতকের শুরুতে বাংলার চিকিৎসার জগৎটি কেমন ছিল তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছিলেন।[30] তাঁর এই প্রবন্ধে দু’জন আয়ুর্বেদজ্ঞের কথা – রামদুর্লভ সেন এবং নীলাম্বর সেন – শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, নীলাম্বর সেন কোন গ্রামে রোগী দেখতে গেলে গ্রামের লোকজন তাঁকে চোখের দেখা দেখার জন্য রাস্তার দু’পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকত। তিনি রোগের “prognosis”-এর ওপরে জোর দিতেন। চক্রবর্তী একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন – “The case was then in the last stage of dysentery and so, finding that he could do nothing in the way of cure, he boldly foretold the day and hour of death, which proved to be correct.”[31]
এ তো গেল একদিকের চিত্র। কিন্তু সংখ্যায় অনেক ভারী অন্যান্য অশিক্ষিত চিকিৎসকদেরর অবস্থা কী ছিল? চক্রবর্তী প্রায় ২০ রকমের বিভিন্ন ধরনের ভ্রাম্যমান চিকিৎসাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি/দলের উল্লেখ করেছেন – (১) কবিরাজ, (২) “Barbar-Surgeons”, (৩) টীকাদার, (৪) ধাত্রী, (৫) ভ্রাম্যমান চোখের ডাক্তার যারা ছানির অপারেশন করত, (৬) “itinerant phlebotomists” যারা যেকোন ব্যথায় রক্তমোক্ষণ করাতো, (৭) “itinerant cuppers”, (৮) “itinerant lithotomists” যারা মূত্রথলি থেকে পাথর বের করত, (৯) “itinerant leech-men”, (১০) “itinerant devotees”, (১১) “itinerant exorcisers”, (১২) ওঝা, (১৩) “acupuncture-men”, (১৪) “issue-men” যারা হাতে এবং পায়ে অধিক রক্তক্ষরণের জন্য ব্যবস্থা নিত, (১৪) মহিলা ডাক্তার যারা মেয়েদের প্রজননযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে কাজ করত, (১৫) ভ্রাম্যমান “aurists” যারা কানের সমস্যা দেখত, (১৬) দাঁত তোলার ভ্রাম্যমান দল এবং আরও অন্যান্যরা।[32] গ্রামের তো বটেই, শহরেরও এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এরকম চিকিৎসার গ্রহীতা ছিল। এই সমগ্র বিষয়গুলো মিলে আরেকটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে রামকমলের পুস্তিকার গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে।
এবার দেখা যাক “গ্রাম কলকাতা” নগর কলকাতায় উত্তরণের সময়কালের স্বাস্থ্যের চিত্র। শিবনাথ শাস্ত্রী জানাচ্ছেন – “অতঃপর কলিকাতার তদানীন্তন স্বাস্থ্যের অবস্থার বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক।” দেওয়ান কার্ত্তিকেয়চন্দ্রকে উদ্ধৃত করে শাস্ত্রী জানাচ্ছেন – “তৎকালে মফঃস্বলের যে সকল লোক প্রথমে কলকাতা যাইতেন তাঁহাদের মধ্যে অনেকেরই অজীর্ণ রোগ হইত। এ পীড়াকে ‘লোণা লাগা’ কহিত। যাঁহারা তথায় অল্পকাল থাকিয়াই প্রত্যাগমন করিতেন, তাঁহারা বাটী আসিয়া লোণা কাটাইবার নিমিত্ত কাঁচা থোড় খাইতেন, ঘোল ও কল্মির ঝোল পান করিতেন এবং গাত্রে কাঁচা হরিদ্রা মাখিতেন। অত্যলপ গুরুপাক দ্রব্যেই আমার অসুখ হইত, একারণ আমি আহারের বিষয়ে অত্যন্ত সাবধান থাকিতাম। তথাপি দুই মাসের মধ্যে আমার অরুচি জন্মিল; এবং ক্রমশঃ বল এককালে গেল। মৃপাত্রে অধিক দিন লবণ থাকিলে যেমন তাহা জীর্ণ হইয়া যায়, আমার শরীর ঠিক সেইরূপ হইল। কোনও উপকার না হওয়াতে নৌকাযোগে গৃহাভিমুখে যাত্রা করিলাম। পরদিন হইতেই শরীর সুস্থ হইতে আরম্ভ করিল।”[33]
পরবর্তীতে শাস্ত্রী যোগ করছেন – “এখন মফঃস্বল হইতে পীড়িত হইয়া লোকে সুস্থ হইবার জন্য কলিকাতা নগরীতে আগমন করে; তখন কলিকাতাতে দুইমাস থাকিলেই লোকের শরীর ভগ্ন হইত এবং কলিকাতা হইতে বাহির হইলে তৎপর দিনই শরীর সুস্থ হইতে আরম্ভ হইত। সে সময়ে কলিকাতার যে অবস্থা ছিল তাহাতে এরূপ ঘটনা কিছুই বিচিত্র ছিল না। তখন জলের কল ছিল না, প্রত্যেক ভবনে এক একটি কূপ ও প্রত্যেক পল্লীতে দুই-চারিটি পুষ্করিণী ছিল।… এই পুষ্করিণীগুলি জ্বরের উৎসস্বরূপ ছিল … এখনকার ফুটপাতের পরিবর্ত্তে প্রত্যেক রাজপথের পার্শ্বে এক একটি সুবিস্তীর্ণ নর্দ্দামা ছিল।… প্রতি গৃহেই পথের পার্শ্বে এক একটি শৌচাগার ছিল। তাহাদের অনেকের মুখ দিনরাত্রি অনাবৃত থাকিত। নাসারন্ধ্র উত্তমরূপে বস্ত্র দ্বারা আবৃত না করিয়া সেই সকল পথ দিয়া চলিতে পারা যাইত না। মাছি ও মশার উপদ্রবে দিন-রাত্রির মধ্যে কখনই নিরুদ্বেগে বসিয়া কাজ করিতে পারা যাইত না।… সহরের স্বাস্থ্যের অবস্থা যেরূপ ছিল, নীতির অবস্থা ত্তদপেক্ষা উন্নত ছিল না।”[34]
এগুলোও আরেক প্রেক্ষিত যার বিপরীতে পাঠ করা যায় ঔষধ সার সংগ্রহ।
ঔষধ সার সংগ্রহ
এই পুস্তিকার ৭ নম্বর শীর্ষক এন্ট্রির শিরোনাম “SALT সাল্ট – লবন”। তিনি ৪ রকমের লবনের কথা বলেছেন – (১) গ্লোবরসাল্ট Glauber Salts, (২) রোচেলসাল্ট Rochille Salts, (৩) এপসম সাল্ট Epsom Salts, (৪) চেল্টনহমসাল্ট Cheltenham Salts। এরপরে প্রতিটি লবনের আলাদা আলাদা গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। চেলতেনহাম সাল্টের গুণ বলতে গিয়ে বলেছেন – “৩০ রত্তি পরিমাণ লবণ কোন গেলাষ কিম্বা বোতল পাত্রে সার্দ্ধপোয়া জল দিয়া কোন দ্রব্য দ্বারা ক্ষণকাল আলোড়ন করিবেক, লবণ দ্রব হইলে ঐ লবোদক প্রাতে অভুক্ত পঁচিশপল অনন্তরে দুইবার পান করিবেক, ইহাতে ভেদ হয়, অর্থাৎ কোষ্ঠ পরিষ্কার হয় এবং অগ্নি বৃদ্ধি করায়.”[35] (বানান ও যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত। নজরটান আমার দেওয়া।) “অগ্নি বৃদ্ধি করায়” শব্দবন্ধের ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদের ছাপ সুপরিস্ফুট।
৮ নম্বর এন্ট্রিতে রয়েছে “ANTIBILOUS PILL. এন্টিবিলিষ পীল – পিত্তঘ্ন বড়ি”[36]। এই শিরোনামে পুনরায় আয়ুর্বেদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
১০ নম্বর এন্ট্রিতে রয়েছে “CALOMEL কালমিল – পারা”[37]। এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে – “কালমিল খাইলে রোগির আহার অতি লঘু করা আবশ্যক, তাহার মধ্যে আতপ তণ্ডুলের সুপাক অন্ন আর দুগ্ধ ও চিনি সচরাচর ব্যবহার করিয়া থাকে, মৎস মাংসাদি গুরুপাক দ্রব্য ভোজন ত্যাগ করিবেক, মস্তক গাত্র ও পাদ অনাবৃত রাখিবেক না, স্নান ও শীতক্রিয়া আর নিম্ন কিংবা শীতল স্থানে ও শয্যাতে থাকন কিংবা শয়ন নিষিদ্ধ, অর্থাৎ সর্ব্বদা গ্রীষ্মেতে থাকিবেক.”[38] (যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত। নজরটান আমার।) এখানে একটি বিষয় বিশেষ মনোযোগ দেবার মতো – “আতপ তণ্ডুলের সুপাক অন্ন” ব্যবহারের মধ্য দিয়ে লেখক আয়ুর্বেদের আনয়ন করছেন এবং, সহজেই বোধগম্য, ওষুধের ব্যবহারবিধির ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়া থেকে একটি refraction এবং mutation ঘটছে। ব্যবহারবিধির দেশজকরণ হচ্ছে।
১৪ নম্বর এন্ট্রি হচ্ছে “PERUVIAN BARK বার্ক”[39]। এর বিবরণ দিতে গিয়ে বলছেন – “ইহার বর্ণ হরিদ্রাক্ত কটা, কিঞ্চিৎ তিক্ত ও কষায় মিশ্রিত বিস্বাদ, বিবর্ত্ত জ্বরাধিকারে এ বার্ক মহৌষধি, অর্থাৎ কম্পজ্বরে ও দ্ব্যাহিক ত্র্যাহিক ইত্যাদি জওরে খাইলে মহৎ উপকার করে, বার্ক সেবন করিবার রীতি এই, প্রথমত রোগিকে এরণ্ড তৈল কিম্বা অন্য স্নিগ্ধভেদক ঔষধ খাওয়াইয়া উদর পরিষ্কার হইলে … তখন এক শিকি পরিমাণ বার্কের গুড়া কিঞ্চিৎ তক্র সহিত কিম্বা জলে দ্রব করিয়া খাওয়াইবেক…দুই তোলা গুড়া তিন পোয়া জলে জলে কোন আবৃত পাত্রে পচিশ পল জাল দিবেক…”[40] (বানান ও যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত)।
১৮ নম্বর এন্ট্রি হচ্ছে “LAUDANUM লাডনম”।[41] বিবরণে বলা হয়েছে – “আফিম আর ইস্পিরিট ওয়াইন সংযোগ দ্বারা লাডনম হয় … অতি বেদনাতে ৩০ হইতে ৬০ ফোঁটা লাডনম কিঞ্চিৎ জলে মিশাইয়া খাইলে বড় উপকার করে … ওলাওঠা রোগেতে লাডনম প্রধান ঔষধ … পীড়ার প্রথমাবস্থাতে অর্থাৎ হস্ত পাদাগ্র শীতল হওনের পূর্ব্ব ৪০ হইতে ৬০ ফোঁটা লাডনম ব্রান্ডসরাপ কিম্বা উষ্ণজলে মিশাইয়া খাওয়াইবেক…”[42]
১৯ নম্বর এন্ট্রি হচ্ছে “SPIRIT OF HARTSHORN হার্টহারণ ইস্পিরিট”। এর বিবরণে বলা হয়েছে – “হরিণের শৃঙ্গ ভস্ম হইতে জাত ক্ষার খড়ি মাটী আর জল সংযোগ করিয়া চোয়ান দ্বারা হার্টহারণ ইস্পিরিট জন্মে … মূর্চ্ছা হইয়া অজ্ঞান হয় কিম্বা স্পন্দ রহিত হইলে ইহার ঘ্রাণে তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হয়, ও বলের সংস্থান হয়.”[43] এখানে যতিচিহ্নের খেয়াল করুন – শুধুমাত্র comma এবং full stop ব্যবহার করা হয়েছে, বাংলাভাষার গঠনশৈলি তখনো শৈশবে রয়েছে। আমার আলোচনায় এর আগে জগৎ শেঠকে পাঠানো (১৭৬০ সাল) “horn extracts” বা শিংযের নির্যাসের উল্লেখ করেছিলাম। এখানে তার সঙ্গে সাযুজ্য দেখা যাচ্ছে। এরপরে “চিরতা”, “গন্ধকের মলম” “rhubarb”, “volatile alkali”, “Anodyne Blasam বেদনানাশক আরক”, “Cpmpound of Jalap Powder”, “সালসারপাঁচ”, “Taratal Emetic”, “Vitrioloc Ether”, “Mercurial Pill” ইত্যাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রামকমল আলোচনা করেছেন।
ঔষধ সার সংগ্রহ-এর ২৯ নম্বর এন্ট্রি “RINGWORM OINTMENT দদ্রু নাশক মলম”। আমাদের আলোচনার গোড়ার দিকে বলেছিলাম যে, এক্ষেত্রে “অন্তত ২৬টি সংস্কৃত শব্দ ছাড়াও কয়েকটি ফার্সি এবং আরবি শব্দ যেমন “মলম”, “সাবান” ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ্য এবং বিশেষণ পদ প্রধানত সংস্কৃত থেকে এবং দুয়েকটি ক্ষেত্রে আরবি এবং ফার্সি থেকে।” সেটি এবার বিশদে দেখা যাক।
রামকমলের পুস্তিকাটি নিয়ে শেষ গুরত্বপূর্ণ আলোচনা করা দরকার ৪৬ নম্বর এন্ট্রি “DECOCTION OF POMEGRANTE ROOT দাড়িম্ব শীকড়ের ছালের পাচন” নিয়ে।[44] এর বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে – “কৃমি রোগের মহৌষধি, ঔষধের মাত্রা ও সেবন করিবার রীতি নিয়মাবধারণ করণের পূর্বে কৃমি রোগের (যাহাতে এ ঔষধ বিশেষত ব্যবহার্য্য) যে যে (২) অদ্ভুত ব্যাপার হইয়াছে, তাহার বিবরণ কিঞ্চিৎ লেখা আবশ্যক হয়, কারণ তাহা না জানিলে এ সামান্য ঔষধে শ্রদ্ধা হইতে পারে না…”[45] রামকমল লিখছেন – “কৃমী রোগ প্রায়ী (বানান খেয়াল করুন) বালকের হইয়া থাকে … কিন্তু যুবা কিম্বা বৃদ্ধের কৃমি রোগ হইলে উপদ্রোহ ভিন্ন হয় … ইংরাজী চিকিৎসকেরা ইহার আশ্চর্য্য প্রকরণ ব্যক্ত করিয়াছেন, কৃমী পীড়া অথবা কৃমী শূল ইংরাজীতে টেনিয়া ও টেপওয়ার্ম কহে…।“ (নজরটান আমার)
এই অবধি বর্ণনার পরে রামকমল লিখছেন – “ইং ১৮১৫ সালে কলিকাতাতে এক ব্যক্তি এই রোগেতে ১ মাস পীড়িত ছিল, সে পূর্বোক্ত পাচন (“দাড়িম্ব বৃক্ষের শীকড়ের বল্কল জ্বাল দিয়া সিদ্ধ করিলে পাচন হয়, তাহাকে ডিকাক্সন অফ পমগ্রানট রুট কহে” – রামকমল) খাইল, তাহাতে দুইটা কৃমি নির্গত হইল, সে কৃমির বর্ণ চাঁপাফুলের ন্যায়, আকার ফিতের ন্যায় পাতলা, একটার মস্তক ছিল না, তাহার পরিমাণ ২২ হাত লম্বা, সে কীট অদ্যাপি এসিএটিক সোসাইটীর ঘরে বর্ত্তমান আছে, একটা কৃমির মস্তকনা নির্গত হইবাতে পরদিন ঐ পাচন খাইলেক, তাহাতে ছিন্ন কৃমি ও আরো ক্ষুদ্র সমূহর কীট নির্গত হইয়া সে ব্যক্তি সুস্থ হইয়াছে।”[46]
আরও লিখছেন – “ইং ১৮১০ সালে আর এক ব্যক্তি ঐ কৃমিরোগী ছিল, উদর বেদনা সখামচানি মধ্যে মধ্যে উদরাময় হইত, বহুকাল ব্যাপিয়া রোগ থাকাতে পূর্বকথিত পাচন খাইলেক, তাহাতে তাহার একটা কৃমি নির্গত হইল্যে, তাহার প্রস্ত ১।। অঙ্গুলি লম্বা ১০।। হাত…”[47] লিখছেন – “পাচন প্রস্তুতকরণের রীতি এই, ২১ তোলা দাড়িম্বের শীকরের ছাল ১।। সের জলে সিদ্ধ করিবেক, পাদাবশেষ থাকিতে নামাইয়া বস্ত্রে ছাকিয়া পাচন লইবেক, সে পাচন তোলক প্রমাণ এক দণ্ডনান্তরে প্রাতে অভুক্ত খাইবেক … এ ওষধিতে অপকার না করিয়া কৃমির নাশ করে ও প্রাণ রক্ষা করে.”[48]
আমার ঔষধ সার সংগ্রহ নিয়ে খণ্ডিত আলোচনা এখানে শেষ করছি। খণ্ডিত এই কারণে যে, মোট ৫৬টি এন্ট্রির মধ্যে আমি অর্ধেকের কম অংশ নিয়ে আলোচনা করেছি – বিশেষ বিশেষ অংশের গুরুত্ব বুঝে। কিন্তু এই আলোচনা আমাদের সামনে পরিস্ফুট করে – (১) সেসময়ের দুর্বল ব্রিটিশ মেডিসিন এবং ভারতে প্রাধান্যকারী জড়িবুটি (nostrums)-নির্ভর চিকিৎসার পরিবর্তে শিক্ষিত জনসমাজের জন্য একটি সুশৃঙ্খল (methodical) এবং সময়ের বিচারে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাপদ্ধতি প্রকাশ করা, (২) এই পুস্তিকাটি সেসময়ের বাংলা ভাষার প্রয়োগ বিধি, বাক্যগঠন, যতিচিহ্নের শৈশব-চিহ্ন পরিস্ফুট করে, এবং (৩) কলকাতা তথা বাংলার চিকিৎসার ইতিহাস এবং হালহকিকৎ আমাদের সামনে তুলে ধরে। এজন্য ১০০ বছর সময়েরও বেশি পরে এই বইটির গুরুত্ব অসীম।
_______________________________________________
[1] ঐতিহাসিক তথ্য জানাচ্ছে, রামকমলের ঔষধ সার সংগ্রহ প্রকাশের আগের বছরে (১৮১৮) বিদ্যা নিন্দা (Videá Nindá) প্রকাশিত হয়েছিল। সে পুস্তকে বলা হয়েছিল – “১০০ জনের জীবন ধ্বংস করলে একজন চিকিৎসক হয়, ১০০০ জনের মৃত্যুতে একজন ডাক্তার হয় (the destruction of 100 lives makes a physician, of 1,000 a doctor) – J. Long, A Descriptive Catalogue of Bengali Works, Containing a Classified list of Fourteen Hundred Bengali Books and Pamphlets, 1855, p. 32. রামকমলের পুস্তিকা সম্পর্কে বলা হয় – “he have the names, origin, use and mode of application of 56 different medicines, such as jalap, rhubarb, castor oil, chiretta, calomel, mercury, &c. &c.”, ibid, pp. 32-33. ১৮২৩ সালে প্রকাশিত হয় রোগান্তক সার, ১৮২৬-এ ডঃ ব্রেটনের Vocabulary of Medical Terms…, ibid, p. 33.
[2][2] Monier-Williams, A Sanskrit English Dictionary-তে ৫ নম্বর এন্ট্রিতে গুণ-এর সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়েছে – “an ingredient or constituent of Prakriti, chief quality of all existing beings (viz. sattva, rajas, & tamas, i.e. goodness, passion, and darkness, or virtue, foulness, and ignorance) – পৃঃ ৩৫৭।
[3] Sushil Kumar De, History of Bengali Literature in the Nineteenth Century, 1800-1825 (Calcutta: University of Calcutta, 1919), p. 251.
[4] Prdyot Kumar Ray, Dewan Ramcomul Sen and His Times (Calcutta: Modern Book Agency, 1990), p. 177.
[5] প্যারীচাঁদ মিত্র, রামকমল সেন, অনুঃ সুশীলকুমার গুপ্ত, সম্পাদনাঃ যোগেশ্চন্দ্র বাগল (কলিকাতাঃ সম্বোধি পাব্লিকেশনস, ১৯৫৭)।
[6] শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন-বঙ্গসমাজ, দ্বিতীয় সংস্করণ (কলিকাতাঃ S. K. Lahiri &Co., 1909)
[7] মিত্র, রামকমল সেন, পৃঃ ৬।
[8] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭-৮।
[9] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৮।
[10] রামকমল সেন, ঔষধ সার সংগ্রহ, পৃঃ ৫০। (পরববর্তীতে শুধুমাত্র ঔষধ সার সংগ্রহ ব্যবহার করা হবে)
[11] A. F. Salahuddin Ahmed, Social Ideas and Social Change in Bengal, 1818-1835, 2nd edn. (India: Riddhi, 1976), p. 6.
[12] Ibid, p. 24.
[13] Ray, Dewan Ramcomul Sen and His Times, p. 178.
[14] Abhijit Gupta, “The Calcutta School-Book Society and the Production of Knowledge”, English Studies in Africa June 20214, 57 (1): 55-65. Quotation on pp. 61-62.
[15] William Milburn, Oriental Commerce; or the East India Trader’s Complete Guide… (London: Kingsbury, Parbury, and Allen, 1825), p. 255.
[16] James Peggs, India’s Cries to British Humanity, Relative to Infanticide, British Connection with Idolatory, Ghaut Murders, Suttee, Slavery, and Colonization in India (London: Simpkin and Marshall, 1832), p. 203.
[17] D. G. Crawoford, A History of the Indian Medical Service, 1600-1913 (hereafter HIMS), in 2 volumes, vol. 2 (London: W. Thacker &Co., 1914), p. 418.
[18] প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪১৮।
[19] আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, A New Account of the East Indies, Being the Observations and Remarks, Vol. II, ১৭২৭, পৃঃ ১১।
[20] HIMS, vol. 2, p. 421.
[21] Ibid, p. 422.
[22] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪২৪।
[23] Revd. J. Long, Selections from Unpublished Records of Government for the Year 1748 to 1767…, Vol. 1, 1869, পৃঃ ৫১৪।
[24] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩৪।
[25] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩৪-২৩৫।
[26] C. A. Bayly, Empire and Information. Intelligence Gathering and Social Communication in India, 178-1870, 1999, পৃঃ ২৮১।
[27] Milburn, Oriental Commerce, পৃঃ ২৫৫ (পূর্বোদ্ধৃত)।
[28] Whitelaw Ainslie, Materia Medica of Hindoostan and Artisna’s and Agriculturist’s Nomenclature (Madras: Government Press, 1813)।
[29] Ibid, pp. i-ii.
[30] S. G. Chuckerbutty, “The Present State of the Medical Profession in Bengal”, British Medical Journal 2 February 1864, Vol. 2 (186), pp. 86–88.
[31] Ibid.
[32] প্রাগুক্ত।
[33] শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী ও তৎকাললীন বঙ্গসমাজ (কলকাতাঃ নিউ এজ পাবলিশার্স, ২০০৭), পৃঃ ৩৫।
[34] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৫-৩৬।
[35] ঔষধ সার সংগ্রহ, ১৮১৯, পৃঃ ১১-১৪।
[36] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৪।
[37] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯-২৩।
[38] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২।
[39] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৭-৩০।
[40] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৭-২৯।
[41] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৪-৩৬।
[42] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৪-৩৫।
[43] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৬।
[44] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭৫-৭৯।
[45] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭৫-৭৬।
[46] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭৭-৭৮।
[47] প্রাগুক্ত, পৃঃ.৭৮।
[48] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭৮-৭৯।





















