আমাদের মতো (কু)সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে মরণোত্তর দেহদান একটা সামাজিক আন্দোলন। এবং এই আন্দোলনের সামাজিক স্বীকৃতি সম্ভব হয়েছিল এই রাজ্যে তখনই যখন বামপন্থী রাজনীতির সরকার ক্ষমতায় ছিল। যখন এই আন্দোলন শুরু হয় তখন এখানে অ্যানাটমি বিভাগের পঠনপাঠনের জন্য শব ব্যবচ্ছেদ আবশ্যক ছিল, যে শব ব্যবচ্ছেদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অবিস্মরণীয় — মেডিক্যাল কলেজ ও মধুসূদন গুপ্তর ভূমিকা আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অভূতপূর্ব ও চিরস্মরণীয়।
ফলে ঐতিহাসিকভাবেই শব ব্যবচ্ছেদ এক সংস্কার মুক্তির প্রক্রিয়া।
এটা ঠিকই যে সব হাসপাতালে শব সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই, এবং ইদানীং ঐ ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া শেখানোর চল হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সেভাবে এখন হাসপাতালে পড়ে থেকে কাজ শেখেন না, তারা বিভিন্ন টিউটোরিয়াল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু তার জন্য তো আর মেডিক্যাল কলেজগুলোর ক্লাশরুম বাতিল বলে ঘোষণা করা যায় না।
শব ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়ে এদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানের যে অগ্রগতি হয়েছিল, সেটা শুধু মেডিক্যাল কলেজের প্রাঙ্গণে সীমিত ছিল না, ধীরে ধীরে তা এক সামাজিক অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। এবং মরণোত্তর দেহদান সামাজিক আন্দোলন হিশেবে সফল না হলে অঙ্গদান সেভাবে সমাজে গৃহীত হতো না।
নিশ্চিতভাবেই অঙ্গদান অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়, যার জন্য পরিকাঠামো আরও বিস্তৃত ও উন্নত হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু বাকি কারোর নামোল্লেখ না করে শুধু জ্যোতি বসুর নাম সামনে এনে মরণোত্তর দেহদানের সামাজিক ভূমিকাকে সমালোচনা করা তথা খাটো করে দেখানো সম্পূর্ণই রাজনৈতিক।
বিজেপি তথা আরএসএস এক পশ্চাৎমুখী মানসিকতার ধারক ও বাহক। সারা দেশে অপবিজ্ঞান চাষ করে কুশিক্ষার বিস্তার ঘটাতে আরএসএস ব্যবহার করে তাদের মধ্যে থাকা তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোকদের।আজ না হয় শব ব্যবচ্ছেদ করার প্রয়োজন নেই বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মনে হয়েছে, কিন্তু যখন প্রয়োজন ছিল তখনও কি কোনো হিন্দুত্ববাদী আরএসএস বা বিজেপির পাণ্ডা মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেছে? আমার জানা নেই।
ফলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই সমালোচনা এই সময়ের জন্য নয়, আসল লক্ষ্য এই সামাজিক আন্দোলনকে ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করা।
এই সমালোচনা রাজনৈতিক, এই সমালোচনা সামাজিক রক্ষণশীলতার পরিচায়ক।
একটা ছোট্ট সংযোজন:
বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তক আমার গুরু রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য প্রয়াত হয়েছিলেন ২ অক্টোবর, সেদিন আবার পুজোর সপ্তমী। নীলরতন সরকার হাসপাতালে সরকারি ছুটি উপলক্ষে কোনো কর্মীই পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে, সকাল এগারোটা থেকে শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে পাঁচটার পরে ডোমের আবির্ভাব হলো। দেহদানের পর্ব মিটে গেলে সেই ব্যক্তি ও তার সহকর্মীরা আমাদের বললেন, _স্যার আপনারা লাল পার্টির লোক না? নইলে কেউ এতক্ষণ অপেক্ষা করত না, শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিত।
তখনই গান হচ্ছিল,
সনাতন জীর্ণ কুআচার
চূর্ণ করি জাগো জনগণ ✊🏼










