পঞ্চায়েত যৌথ কর্মচারী সমিতির দ্বাদশ রাজ্য সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে সলিল শোভন রায় আর প্রতুল ভদ্র মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল অভয়া স্মরণ।
‘শহীদ স্মরণে আপন মরণে রক্ত ঋণ শোধ কর’ এই শপথ নিয়ে শহীদবেদীতে মাল্যদানের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ রায়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পরিচয় শাখা অভয়ার হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি অসাধারণ নাটক পরিবেশন করে। নাটকটির নাম ‘কথা বলুন’। অভিনয়, কোরিওগ্রাফি এবং সঙ্গীতের ব্যবহার নাটকটিকে এক অন্য মাত্রা দেয়। ধর্ষিতা নারীর কন্ঠে ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’, মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রক্তলাঞ্ছিত শ্বেত অঞ্চল, আর সেই কাপড় গায়ে জড়িয়ে মৃত জড়বৎ মানুষের স্তূপের উপর ধর্ষিতা অভয়ার মৃতদেহ এক শ্বাসরোধকারী নৈঃশব্দ নিয়ে আসে সম্মেলন প্রাঙ্গণে।
অভয়া স্মরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অভয়া মঞ্চের তিন জন কনভেনর – ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ, ডক্টর তমোনাশ চৌধুরী, মণীষা আদক। অন্য বক্তারা ছিলেন ভারতী মুৎসুদ্দী, ডক্টর উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়, ডক্টর পবিত্র গোস্বামী, দেবাশীষ হালদার, অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র এবং অভয়া আন্দোলনের কর্মী গার্গী রায় এবং গোপা মুখার্জী।
ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ বলেন অভয়া আন্দোলন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। কিছুদিন আগেও আমরা যারা এক মঞ্চে আসার কথা ভাবতেও পারতাম না তারা এখন একসঙ্গে লড়াই করছি। সব প্রতিবাদীদের ঐক্যবদ্ধ করেছে অভয়া আন্দোলন। এটা আন্দোলনের এক বড় সাফল্য।
মণীষা আদক প্রাচীন গ্রীসের প্রথম মহিলা চিকিৎসক অ্যাগনোডিসের কথা বলেন। খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এথেন্সে পুরুষের বেশ পরিধান করে চিকিৎসা করতেন অ্যাগনোডিস। মহিলাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষা এবং চিকিৎসক হিসেবে কাজ করা আইনবিরুদ্ধ ছিল। বেআইনি কাজের জন্য অভিযুক্ত অ্যাগনোডিসের পাশে এসে দাঁড়ান বহু মহিলা যাঁরা অ্যাগনোডিসের চিকিৎসায় উপকৃত হয়েছিলেন। জুলিয়াস হিগিনাসের লেখায় প্রথম অ্যাগনোডিসের নাম পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক ভাবে এই কাহিনীর সত্যতা প্রমাণিত না হলেও কিংবদন্তী চরিত্র হিসাবে অ্যাগনোডিসের গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসার ক্ষেত্রে মেয়েদের প্রবেশের ক্ষেত্রে এই কাহিনী অনেক আলোচনার দরজা খুলে দেয়। বর্তমান সমাজের লিঙ্গভিত্তিক কর্মবিভাজনকে প্রশ্ন করেন মণীষা আদক। ভারতী মুৎসুদ্দী বলেন আর জি কর ঘটনার যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে আমাদের বিদ্ধ করে, এই নৃশংসতা আমাদের ঘুমোতে দেয় না কিন্তু শাসক গোষ্ঠীর স্নেহধন্যরা আর জি কর কাণ্ড থেকে উৎসাহ নেয়, বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসরাজ চালায় ‘আর জি কর করে দেব’ এই হুমকি দিয়ে। বিচার না হলে এই সন্ত্রাস বাড়তে থাকবে। তাই বিচারের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এক সঙ্গে।
ডক্টর দেবাশিস হালদার বলেন অভয়ার নৃশংস হত্যা ও ধর্ষণ এর বিচারের দাবিতে, থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে WBJDF ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বিচার এখনো মেলেনি তার দায় সরকার এবং বিচার ব্যবস্থার। বিচার ব্যবস্থার গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণ মানুষকে জানাতে হবে। WBJDF শেষ পর্যন্ত লড়াই চালাবে। সব লড়াই এর নেতৃত্ব তাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয় কিন্তু থ্রেট কালচার বিরোধী সব লড়াইয়ে JDF পাশে থাকবে।
ডক্টর পবিত্র গোস্বামী বলেন যে বাংলায় নারীদের সম্মান ভূলুণ্ঠিত । একেবারে শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল অভয়ার ঘটনা সাধারণ কোন ঘটনা নয়। প্রশাসনের মদত ছাড়া এই খুন ধর্ষণ সম্ভব নয়। আমরা প্রতিবাদ মিছিল করে গেলে হাসপাতালের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্দীপ ঘোষের স্নেহধন্য কুখ্যাত আশিস পান্ডে আর তার শাগরেদরা লাঠির আঘাতে আমার মাথা ফাটিয়ে দেয়। তবু আমরা পিছিয়ে আসিনি, লড়াই এর জমি ছাড়িনি।
অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র বলেন বাংলায় স্বৈরাচারী অপশাসন চলছে। এই দুর্বৃত্তরাজের অবসান দরকার।
ডক্টর উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন আমাদের কন্যাসমা ছাত্রী অভয়ার এই পরিণতি অকল্পনীয়। শুধু অভয়া নয়, বাংলার সর্বত্র ধর্ষিতা নির্যাতিতা নারীর আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। মঞ্চে যে নাটকটিতে তারই ছবি দেখা গেল। যে কোন সৎ সংবেদনশীল মানুষের উচিৎ এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে শামিল হওয়া ।
গার্গী রায় বলেন রাজ্যে নারী নির্যাতন ক্রমবর্ধমান। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। প্রতিদিন স্কুল ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ছে অথচ ড্রপ আউটের সংখ্যা শূন্য বলে মিথ্যাচার করছেন রাজ্যপ্রধান। এই সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের এক জোট হয়ে করতে হবে। তিনি একটি গল্পের কথা উল্লেখ করেন যেখানে জঙ্গলে আগুন নেভানোর জন্য একটি ছোট পাখি বারে বারে একটু একটু করে জল মুখে নিয়ে জ্বলন্ত শিখাকে নেভানোর চেষ্টা করে যায় প্রাণভয় তুচ্ছ করে। আমাদের লড়াইকে ওই হার না মানা পাখির সঙ্গে তুলনা করেন গার্গী। এই ভাবেই আমাদের সন্ত্রাসের আগুন নেভাতে হবে, এই ভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জ্বালাতে হবে নিভন্ত চুল্লিতে বিদ্রোহের আগুন।
গোপা মুখার্জী বলেন অভয়া আন্দোলন ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এই ক্ষমতাতন্ত্র দুর্নীতিতে মদত দেয়, নারীধর্ষণের ঢালাও ক্ষেত্র তৈরি করে। তাই সমাজটা বদলাতে গেলে ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারী পুরুষ একসঙ্গে লড়তে হবে। সারা বিশ্বে, ভারতবর্ষে দক্ষিণ পন্থার আগ্রাসী ছায়া। কখনও বামপন্থার ছদ্মবেশে দক্ষিণপন্থা মানুষকে বেঁধে ফেলছে, অনুদানের রাজনীতি আর নানা উপায়ে লড়াইয়ের পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। তাই আমাদের চিনে নিতে হবে কোন লড়াইটা আসল আর কোন লড়াইটা ছদ্ম লড়াই। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে বুঝতে হবে আন্দোলনকে ভিতর থেকে ভেঙ্গে দেবার চক্রান্ত কোথায় কী ভাবে হচ্ছে। যে মিছিল শাসককে সাহায্য করে সে মিছিলে আমরা হাঁটব না। লড়াকু মানুষেরঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই বাঁচার একমাত্র পথ।
ডক্টর তমোনাশ চৌধুরী বলেন অভয়া আন্দোলন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে। ইতিহাস প্রমাণ করবে আমরা মানুষের পক্ষে মানুষের স্বার্থে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। লড়াই আমরা ছাড়ব না, শেষ দিন পর্যন্ত আমরা রাস্তায় থাকব।
বক্তারা পঞ্চায়েত কর্মচারী সমিতি সমূহের যৌথ কমিটির সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা আর অভিনন্দন জানান। অভয়া মঞ্চের লড়াইকে রাজপথ থেকে আলপথে নিয়ে যাবার শপথকে বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করছে এই সংগঠন। অভয়া মঞ্চের অন্যতম শক্তি স্তম্ভ পঞ্চায়েত সমিতি সমূহের যৌথ কমিটি।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ রায় বক্তাদের সকলকে ক্রাই অফ দ্যা আওয়ার আবক্ষ প্রতিকৃতি উপহার দিয়ে বলেন, অভয়ার এই আবক্ষ যেন প্রতি মুহূর্তে আমাদের অভয়ার যন্ত্রণা আর বিদ্রোহের কথা মনে করিয়ে দেয়। অভয়া আমাদের কাছে স্পর্ধা আর দ্রোহের প্রতীক।
প্রশাসনের অংশ হয়েও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইকে পঞ্চায়েত সমিতি সমূহের যৌথ কমিটির সদস্যরা জীবন জীবিকার সংগ্রামের অংশ করে নিয়েছেন । লক্ষ কোটি মানুষের এই অপরাজেয় প্রত্যয়ই একদিন দিন বদলের অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলবে –
“পুবের আকাশ রাঙ্গা হল সাথী
ঘুমাওনা আর জাগো রে”।।










