
নতুন বছরের শুরুতে গ্যাডগিল স্যারের চলে যাবার আঘাত সামলাতে না সামলাতেই আবারও একটা বেদনা ভরা বিদায় সংবাদ এসে আমাদের ছুঁয়ে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। চলে গেলেন প্রকৃতি পরিবেশের আরও এক নিমগ্ন নিরলস সেবক জি.রাজকুমার। খুব পরিচিত নাম নিশ্চয়ই নয় আমাদের মতো হিসেবি মানুষজনের কাছে। কিন্তু নীলগিরি পর্বতকে ভালোবেসে জড়িয়ে থাকা মানুষজন তাঁর এই অসময়ে চলে যাওয়ায় বাকরুদ্ধ, শোক বিধুর। সমস্ত রকম প্রচারের আলোকে দূরে সরিয়ে রেখে নীরবে নিভৃতে জি. রাজকুমার নীলগিরি জুড়ে ফুটে থাকা কুরিঞ্জি ফুলের সংরক্ষণে লড়াই করে গেছেন ধারাবাহিকভাবে। এই কাজে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কোনো বাঁধাই তাকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। তাই লোকজনের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল “ কুরিঞ্জি রাজকুমার” হিসেবে। নীলগিরি পাহাড়ের ঢাল জুড়ে বিছিয়ে থাকা অজস্র ফুলের পুষ্পিত শোভা যে একবার প্রত্যক্ষ করেছে সে আর অন্য কিছুতেই মন বসাতে পারেনি। এমনটাই ঘটেছিল প্রয়াত রাজকুমার সাহেবের বেলাতেও।
কুরিঞ্জি ফুল। বিজ্ঞানীদের কাছে এই ফুলের পরিচিতি অবশ্য Strobilanthes kunthiana নামে। তামিলনাড়ু আর কেরালার মানুষজনের কাছে যে ফুলের নাম কুরিঞ্জি , কর্ণাটকের মানুষেরা তাকেই আদর করে ডাকে গুরিগে বলে। সহ্যাদ্রির শোলা বনভূমির অনন্য আবাসিক কুরিঞ্জি আসলে হলো Acanthaceae পরিবারের এক পরিচিত গুল্ম সদস্য। অবশ্য এই ফুলের আসল মজা হলো অন্য জায়গায়। কুরিঞ্জি ফুল বারো বছর অন্তর অন্তর পাঁপড়ি মেলে, নয়নাভিরাম শোভায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দীর্ঘ বারো বছর ধরে তার শোভায় মন ভরানোর জন্য অপেক্ষা করে থাকে নীলগিরির পাহাড়তলির গুণমুগ্ধ ভক্তরা। কুরিঞ্জি তাই পৃথিবীর বিরলতম ফুলেদের একটি।
তবে এইসময়ের পৃথিবীতে কেউই আর নিরাপদ নয়, নীলা কুরিঞ্জিও নয়। আর এখানেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কুরিঞ্জি রাজকুমার– সদ্য প্রয়াত এই মানুষটি। মাত্র ৭০ বছর বয়সেই নীলা কুরিঞ্জি ফুলের মোহময়ী শোভার মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন মানুষটি – জি. রাজকুমার।
তাঁর প্রয়াণের পর জি. রাজকুমারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী ও চিত্রগ্রাহক সুরেশ এলামন জানাচ্ছেন – “ ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি এই এলাকাটি ঘুরে দেখেন এবং তাঁর বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। তাঁর বর্ণনা শুনে আমরা এতোটাই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম যে কয়েকদিনের মধ্যেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে আমরা চার বন্ধু কোদাইকানালে গিয়ে হাজির হলাম। সেখান থেকে ট্রেক করে আমরা ক্লাভারা এবং পুন্ডি পাহাড়ের পাকদণ্ডী পেরিয়ে মুন্নার গিয়ে পৌঁছলাম।”
“যুবক রাজকুমার এই এলাকার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তাকে সুরক্ষিত রাখার কথা তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন। একদল মুনাফালোভী মানুষের হাত থেকে ধরিত্রী মায়ের এই আশ্চর্য সম্পদকে সুরক্ষিত রাখতে রাজকুমার ছিলেন এক অক্লান্ত যোদ্ধা। অকৃত্রিম ভালোবাসার আত্মজন। আজ নীলা কুরিঞ্জি পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের এক অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছে কেবলমাত্র জি. রাজকুমারের নিরন্তর প্রয়াসের কারণেই।” – স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে এলামন সাহেবের বক্তব্য।
কর্মসূত্রে স্টেট ব্যাংক অব ত্রিবাঙ্কোরের কর্মচারী হলেও মনেপ্রাণে রাজকুমার সাহেব ছিলেন প্রকৃতি পরিবেশের এক একনিষ্ঠ সেবক। কুরিঞ্জির জন্য তাঁর নিখাদ ভালোবাসা তাঁকে অমর করে রাখবে কুরিঞ্জি প্রেমীদের কাছে। ভালো থাকবেন রাজকুমার সাহেব। আপনার মতো মানুষের বিদায়ে আরও রিক্ত নিঃস্ব হয়ে গেল আমাদের পৃথিবী। ভালো মানুষের বড়ো অভাব আজকের পৃথিবীতে। আপনার বিদায় সেই শূন্যতাকে আরও গহীন করে তুললো। আপনাকে কুর্ণিশ জানাই।
তথ্যসূত্র: দ্যা হিন্দু পত্রিকা
জানুয়ারি,১৭, ২০২৬
পূর্ব প্রকাশিত












আচ্ছা এমন সব প্রচেষ্টা কি বঙ্গদেশে হয়না? প্রশ্ন জাগছে
শুরু করলেই হয়। আমরা আসলে অন্য কিছু নিয়ে মজে থাকতে ভালোবাসি। বঙ্গদেশে এমন কিছুর কাহিনি নজরে এলে অবশ্যই কলম ধরবো।
ধন্যবাদ দাদা প্রকৃতির এই বিচিত্র খেলার সাথে পরিচয় করানোর জন্যে। সাথে সাথে এরম মানুষের উদ্যোগ আর লড়াই করে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে প্রকৃতিকে আগলে রাখতে।
ভালো থাকবেন কুরিঞ্জি রাজকুমার।।।।।
আমরা কি সত্যিই উদ্বুদ্ধ হবার কথা ভাবছি? আমি সন্দিহান। রাজকুমার সাহেবের প্রচেষ্টা প্রচারের অপেক্ষা করেনি। ভালো কাজ যাঁরা করেন তাঁরা বোধহয় নীরবে নিভৃতেই থাকতে পছন্দ করেন। গ্যাডগিল স্যারের পর রাজকুমার সাহেবের চলে যাওয়া বড়ো শূন্যতা সৃষ্টি করলো।