কপিলেশ্বর ভট্টাচার্য নামের এক ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। উনি রাজ্য সরকারের অধীনে একটি বড় দপ্তরে ভালো পদে চাকরী করতেন। কিন্তু সময়ের থেকে এগিয়ে, অনেক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একটি মত প্রকাশ করে মহামান্য মুখ্যমন্ত্রী ডা বিধান চন্দ্র রায় মশাইয়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। আজকাল হলে তো আর কথাই ছিল না; ডা রায় বলেছিলেন, “লোকটা পাগল হয়ে গেছে, ওকে পাগলা গারদে রাখা উচিত।” ডা রায়ের জীবন কালে, ওনার মতের বিরুদ্ধে বলার মত বুকের পাটা আর কোন সরকারী আমলা বা কর্মচারীর ছিল বলে আমার জানা নেই। কিন্তু নিজের কারিগরী শিক্ষা আর দূরদৃষ্টির জন্য, কপিলবাবু সোজা কথা সোজা বলে দিয়েছিলেন। আমরা যখন সবাই স্রোতের অনুকূলে গা ভাসাতে অভ্যস্ত, কপিলবাবুর সেই স্রোতের বিপরীতে চলার দুঃসাহসিক কাজকে পাগলামি বলেই মনে হয়।
কি বলেছিলেন উনি? আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে, ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে গঙ্গার জল অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলে কি বিপদ হতে পারে, সেই কথাই বলেছিলেন, ইঞ্জিনিয়ার কপিলেশ্বর ভট্টাচার্য। অবশ্যই ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর উপর সেতু হয়ে, উত্তর বঙ্গের সাথে দক্ষিণ বঙ্গের যোগাযোগ যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আমরা যারা মনিহারী ঘাটে গঙ্গা নদী পেরিয়ে অন্য পারে গিয়ে আর একটি রেল গাড়ীতে চাপার হাঙ্গামা দেখিনি, তাদের পক্ষে এই উন্নতির বিশাল পরিবর্তন বোঝা সম্ভব নয়। নদীর উপর সেতু নির্মাণ আর নদীর উপর বাঁধ দিয়ে জল আটকানো এক ব্যাপার নয়। অবশ্যই ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে জল কলকাতার দিকে ঘুরিয়ে না দিলে বেশ কিছু বছর আগে কলকাতা বন্দর বন্ধই হয়ে যেত। তবুও তো হলদিয়া বন্দরের দরকার হয়েছে।
এই নদীর উপর সেতু বা কলকাতা বন্দরের নাব্যতা যেমন ফারাক্কা বাঁধের ইতিবাচক দিক, এর ক্ষতিকর দিক কিন্তু কম নয়। কপিলেশ্বরবাবু এই ক্ষতি অর্থাৎ বিপদের কথা বলেছিলেন। আর এই বিপদের কথা বলে নিজেই বিপদে পড়ে গেছলেন। আমরা স্কুলের বইতে নদীর উপর বাঁধ এর যে যে উপকারিতার কথা পড়ে মুখস্ত করেছি তার অন্যতম একটি ছিল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ। এর থেকে বড় নির্মম রসিকতা আর হয় না। “ম্যান মেড বন্যা” এখন বাঙালির একটি পরিচিত শব্দবন্ধ। কথাটির প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগ যাই হোক না কেন, নদী বাঁধ যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, এই কথাটি এখন প্রমাণিত। কপিলবাবু এই বিপদের কথা বলেছিলেন। উনি যে ফারাক্কা বাঁধের বিপদের কথা বলেছিলেন সেটাও কিন্তু এখন প্রমাণিত। গত বছর কুড়ি-পঁচিশ ধরেই মালদা আর মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষ বন্যা আর নদীর ভাঙনে জেরবার হচ্ছে।
এই রকম আর একটি সরকারী প্রকল্পের সুদূর প্রসারী বিপদের কথা পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কেউ ভাবেনি। স্বাধীনতার আগে পরে, কয়েক দশক ধরে ম্যালেরিয়া মহামারীর আকার নিয়েছিল। সেই সময় মশা নিয়ন্ত্রণ করতে ডি ডি টি মহৌষধের মত কাজ করেছিল। ব্যাপক ভাবে ডি ডি টি ছড়িয়ে দারুণভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। ম্যালেরিয়া বেশ নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। সরকারী ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রকল্প কিন্তু অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে। ম্যালেরিয়ার অনেক উন্নত চিকিৎসার জন্য এখন এই রোগ মহামারীর আকার নেয় না ঠিকই, কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। এদিকে সেই সত্তর বছর আগে ছড়ানো ডি ডি টি এক মহা বিপদ হয়ে হাজির হয়েছে। শহরে আর গ্রামে ছড়ানো ডি ডি টি বৃষ্টির জলে ধুয়ে একটু একটু করে পুকুর, নদী খাল বিল হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। সেই ডি ডি টি মাছেদের শরীরে মিশেছে। সেই মাছ এখন আমাদের খাদ্য তালিকায় স্থান করেছে। অতি সামান্য পরিমাণে হলেও মাছের মাধ্যমে ডি ডি টি আমাদের শরীরে ঢুকছে। এর থেকে বেশ কিছু রোগের সৃষ্টি হয়েছে। এমন কি কোন কোন ক্যান্সারের কারণ হিসেবে এই ডি ডি টির দিকে আঙুল উঠেছে। আজকের আশীর্বাদ আগামী দিনে কেমন অভিশাপ হয়ে যেতে পারে তার দুটি উদাহরণ দেখলাম।
এই রকম আর একটি বিপজ্জনক জিনিস হল প্লাষ্টিক। এখন তো প্লাষ্টিক বন্ধ করতে নানান রকম প্রচার, এমনকি আইন পর্যন্ত করতে হচ্ছে। প্লাষ্টিক দূষণ থেকে ক্যান্সার হতে পারে, এটা আমরা সবাই জেনে গেছি। প্লাস্টিকের আর একটি ভয়ানক বিপদের কথা আমি বছর বারো তের আগে জেনেছি। সায়েন্স কলেজের ছাত্র, এক গবেষক তাঁর গবেষণা নিয়ে একটি প্রকৃতি -পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সম্মেলনে বলেছিলেন। প্লাস্টিকের “Endocrine Modulation Factor” নিয়ে উনি সাবধান করেছিলেন। এমনকি আমরা যে প্লাস্টিকের বোতলের জল খাই, এর থেকেও অতি সামান্য পরিমাণে প্লাষ্টিক আমাদের শরীরে ঢুকছে। এর থেকেও ডায়াবেটিসের মত হরমোন ঘটিত রোগ হতে পারে। এখনও লাখ লাখ লোক প্লাষ্টিকের বোতলে জল খাচ্ছে, তাতেই প্লাষ্টিক ভালো জিনিস বলে প্রমাণিত হয় না।
এবার আসি জিন মডিফায়েড শস্য বা উচ্চ ফলনশীল জিনিসগুলির প্রসঙ্গে। বর্তমানের আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বিরাট দিক ধরে আছে ভারতের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যের ব্যাপারটি। আমেরিকা তাদের জিন মডিফায়েড বা ‘জি এম’ জিনিসপত্র ভারতে বিক্রী করতে চায়। শুধুই বাজারের ব্যাপার নয়; ঐ সকল জি এম জিনিস স্বাস্থ্যের ওপর সাংঘাতিক রকমের বাজে প্রভাব বিস্তার করে। জি এম খাদ্য, এমনকি ক্যান্সারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই জন্য বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি মেনে নিয়েও ভারত সরকার ঐ সকল জি এম জিনিস এদেশে আমদানি করতে রাজী নয়। তাহলে কি আমাদের দেশে কোন জি এম খাদ্য পাওয়া যায় না? অনেক কিছুই এখানেও ব্যাপক ভাবে চলছে। আমরা প্রতিদিন সেগুলি খাচ্ছি। উচ্চ ফলনশীল অনেক কিছু শস্য, মাছ, ডিম, মাংস ঠিক সেই অর্থে জি এম না হলেও, তাদের ক্ষতির দিকটা ঐ জি এম খাদ্য শস্যের মতোই। সার আর কীটনাশক ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত পণ্য আমাদের দেশের বাজার ছেয়ে আছে। এই যে ক্যানসার, ডায়াবেটিসের মত অসুখ আজ আমাদের দেশে প্রায় মহামারীর আকার ধারণ করেছে, এর একটা কারণ এই উচ্চফলনশীল খাদ্যের ব্যাবহার।
আমার এক বন্ধু দুদিন আগে বলেছিলেন, উনি এই রাজ্যের পোল্ট্রি শিল্পের একটি বড় পদে আছেন। সম্প্রতি ওদের সংগঠনের একটি বিশাল সম্মেলন হল কলকাতায়। এই শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজারে ঘুরছে। হাজার হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কর্ম সংস্থান হচ্ছে। এখন এই ব্রয়লার মুরগির ডিম আর মাংস আমাদের দেশের সিংহ ভাগ আমিষ জাতীয় খাদ্যের যোগান দিচ্ছে। ‘অন্ধ্রের মাছ’ বলে যে উচ্চ ফলনশীল জাতের মাছ নিয়ে আমরা উন্নাসিক, এই ব্রয়লার মুরগীও তো সেই একই রকম জিনিস। দ্রুত মুনাফার জন্য কি কি প্রযূক্তি ব্যবহার করা হয়, আমরা কি জানি? কিছু কিছু পোল্ট্রি মাংসের দোকানদার আমাকে বলেছেন, “অন্য দোকানে সস্তায় দিচ্ছে, খেয়ে দেখেছেন? হোমিওপ্যাথি ওষুধ এর গন্ধ পাবেন!” হোমিওপ্যাথি ওষুধ মুরগীকে খাওয়ানো হয় কি না আমি জানি না। কিন্তু দ্রুত ওজন বাড়াতে বিভিন্ন রকমের ওষুধ, হরমোন ইত্যাদি ব্যাবহার করতে হবেই। এই সব ওষুধ বা হরমোনের সুদূর প্রসারী প্রভাব আমাদের উপর কতোটা সেই ব্যাপারটি ভাবার সময় হয়েছে।
যে মানুষটির দূরদৃষ্টির প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম তাঁর কথায় ফিরে আসি। নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তাৎক্ষণিক অনেক লাভ পাওয়া তো গেছেই। কিন্তু চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর যে বিপদগুলি এখন আমরা দেখছি ,সেইসব বিপদ দেখার জন্য সেই মুখ্যমন্ত্রীও নেই, সেই ভবিষ্যত দ্রষ্টা মানুষটিও নেই। এই কপিলবাবুর মত মানুষদের কপালে চিরদিন গঞ্জনা, ভর্ৎসনাই জুটেছে। পৃথিবীসুদ্ধ লোকে দেখছে, প্রতিদিন সূর্য পৃথিবীকে পাক মারছে, আর একটা পাগল বলে কি না, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে!!!!! কি অন্যায়! কি অন্যায়! মার ব্যাটা ব্রুনোকে পুড়িয়ে।
স্রোতের বিপরীতে হাঁটার বিপদ পদে পদে। তবুও তো কেউ না কেউ আমাদের সাবধান করে। প্রতিষ্ঠানিক খুন তো সেই এক সক্রেটিসের খুনেই থেমে যায়নি। আমাদের চোখের সামনে, আমাদের ডাক্তার মেয়েটি খুন হয়ে গেল! বাজারে চালু সাপের বিষের ওষুধ কাজ করছে না, এই কথাটি বলে আমার মত সামান্য লোককে কম গালাগালি খেতে হয়নি। এক সাংবাদিক তো লিখেই দিল , “রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বদনাম করার জন্য এসব রটানো হচ্ছে।” আমার বাবা মায়ের অশেষ পুণ্য বলে আমি আমার স্বাস্থ্য ভবনের কিছু কর্তা ব্যক্তিদের বোঝাতে পেরেছিলাম। এই রাজ্যের নিজস্ব সাপের বিষের ওষুধ, এন্টিভেনম তৈরীর জন্য দুটি কোম্পানিকে বরাত দেওয়া হয়েছে। কোন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা কোন শিল্পের সঙ্গে আমার কোন শত্রুতা নেই। শুধু একটু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মুনাফা করতে অনুরোধ করছি।
১৩.২.২০২৬.











একটা ভুল থেকে গেছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে বলার জন্য পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, ব্রুনোকে। সক্রেটিস নয়। এই ভুলের জন্য আমি দুঃখিত। দয়াল বন্ধু মজুমদার
সংশোধন করে দিলাম।