কিছুদিন আগে জন্মাষ্টমীর দিন কলকাতার বিভিন্ন নার্সিংহোমে একদিনে প্রায় দশ কুড়িটা করে সিজার হয়েছিল। সাধারণত প্রতিদিন যা হয় তার দুই থেকে তিনগুণ। আজ গণেশ চতুর্থী এই সংখ্যাটা কিছু কিছু জায়গায় প্রায় চার গুণ পৌঁছে গেছে আর যদি হবু মায়েদের নামগুলো দেখা হয় সেগুলো ‘নন বেঙ্গলি’ নয়, বাঙালি নাম। আজ ডাক্তাররা নেতাদের পিছনে ফেলে দিয়েছে। তারা পুজো উদ্বোধনের ফিতে যত কাটছে তার থেকে বেশি ডাক্তাররা পেট কাটছে!
এবার ভাবার সময় এসেছে। যখনই এই সংখ্যাটা খুব বেড়ে যায় অপারেশন থিয়েটার, ওটি ইন্সট্রুমেন্টের স্টেরিলিটি মেনটেন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অপারেশনের পরেও অনকল ডাক্তার ও নার্সের উপরে প্রচন্ড চাপ পড়ে। এতগুলো মা আর বাচ্চাকে ঠিকঠাক করে দেখার দায়িত্ব। মুনাফার জন্য কোন হাসপাতালকে বলতে শুনলাম না এই সংখ্যার পরে অপারেশন করা মা বাচ্চা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এর সাথে আর একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে ‘ভালো সময়’ বাচ্চাকে ডেলিভারি করানো, জ্যোতিষী টাইম বলে দেয়। যাকে বলা হয় পন্ডিতের টাইমে বাচ্চা বের করা বা আস্ট্রো সিজার। এমন দুটো ঘটনা আলোচনা করবো।
সেদিন একটা হাসপাতালে ভালো দিন বলে গোটা কুড়ি সিজার। একজন মায়ের ডেলিভারি দুপুর দুটোয় করার কথা কারণ ওই সময়টা ভালো। সেই সময় এমার্জেন্সি ওটি থাকার জন্য সেই সিজারটা করতে দেরি হয়। তার জন্য রোগীর বাড়ি লোকজন অসম্ভব ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাদের সাজ পোশাক দেখে ভদ্র শিক্ষিত মনে হচ্ছিল কিন্তু তাদের আচার- আচরণে তা প্রকাশ পাচ্ছিল না। তাদের কাছে একটা মায়ের জীবনের থেকে অনেক বেশি জরুরী জ্যোতিষী দেওয়ার সময় তাদের বাচ্চাকে বের করা। সমাজের কী অধঃপতন!
আর একদিন দুপুর ১১ টার মধ্যে বাচ্চা ডেলিভারী করার কথা। কিন্তু সার্জন অন্য অপারেশনে কম্প্লিকেশনের মধ্যে পড়ে যাওয়ার জন্য আসতে দেরি করেন। এক্ষেত্রে রোগীর বাড়ির লোক যারা নিজেরাও স্বাস্থ্য পরিষেবার সাথে যুক্ত হাসপাতালের স্টাফেদের সাথে অত্যন্ত অভদ্র ব্যবহার করতে থাকেন। আসলে ক্রাইসিসের সময় আমাদের শিক্ষা, আমাদের সংস্কার ,আমাদের ব্যবহারগুলো প্রকাশ পায়। এই দিনগুলোয় ওটি এতো ব্যস্ত থাকে হাসপাতালে ইমারজেন্সি ওটির স্লট পাওয়া যায় না।
অনেকেই এবার বলবেন এটা হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কী দোষ নেই? নিশ্চয়ই আছে, কারণ এই অন্যায় আবদারগুলো মেটাতে গিয়ে আমরা নিজেদেরকে এবং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপরে হয়তো চাপ সৃষ্টি করছি। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই নিজের স্বাস্থ্য, নিজের স্বার্থ না বুঝি কে বুঝবে? আমাদের সব সময় বোঝা উচিত যদি কমপ্লিকেশনস কিছু হয় তাহলে আমাদের শরীরের ওপরেই হবে, মা বাচ্চার ওপরেই হবে। কেন একটা হুজুগে আমরা পা দেবো। এই ট্রেন্ডটা আগে ছিল না এখন ক্রমশ বাড়ছে। শিক্ষা, বিজ্ঞানের সাথে কুসংস্কারে কি সুন্দর মেলবন্ধন। এবার আমরা এআই দিয়ে ঠিকুজি কুষ্ঠী করবো।










