নিচের গল্পটা আমার লেখা, কিন্তু সুকন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নয়। যে বন্ধুরা আমার লেখা মাঝেমধ্যে হলেও পড়ে থাকেন, তাঁদের মধ্যে কেউ যদি বুঝতে পারেন কেন এটা সুকন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা নয়, তাহলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
যদিও এত দীর্ঘ লেখা আদৌ কেউ পড়তে না চাইলে অভিমান, অনুযোগ কিচ্ছুই করার নেই লেখকের।
হ্যাঁ, এটা এক্কেবারেই এআই-এর সাহায্যে লেখা নয়, সেটি প্রথমেই পরিষ্কার করে বলে নিলাম।
লগ্নভ্রষ্টা
*******
১
আমার বিয়ের রাতে বাসর জাগা হয়নি। দুই কামরার মিল কোয়ার্টারে চড়াইপাখির মতো ‘বাসা’ বাঁধা যায় — মেয়ের বিয়েতে লোক নিমন্ত্রণ করা যায় না।
বাবা যে বড় ‘ভিলা’টা ভাড়া করেছিল, সেটা তার খরচ করার সাধ্যের বাইরে। আত্মীয়দের ভুরুতে সন্দেহের ভাঁজ আর চোখে প্রশ্ন ঘনিয়েছিল, কারণ
বিয়ের আচার অনুষ্ঠান চলাকালীনই বাবা সব অভ্যাগতদের তাড়া দিচ্ছিল খাওয়াদাওয়া করে নেওয়ার জন্য। বিয়ে দেখতে আগ্রহী মামীমা-জ্যেঠিমারা অসন্তুষ্ট হয়েছিল — বাবা আমল দেয়নি।
বিয়ে মিটলে বন্ধুনী আর তুতো বোনেদের বাসর জাগার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে বাবা বলেছিল — ‘সেসব হবেটবে না। হল্ টা রাত বারোটা অবধি ভাড়া নেওয়া — বারোটা এক হলেই ক্যালেণ্ডারে তারিখ বদলে যাবে, তখন আরো একদিনের ভাড়া পাওনা হয়ে যাবে মালিকের। তোদের ফষ্টিনষ্টির খেসারত দিতে আমি কড়ি গুনব নাকি?’
আমার নতুন বিয়ে করা বর কথাটা শুনে দুঃখ পেলেও আমি পাইনি। তখন তো জানিই যে এটা একটা পুতুলখেলার বিয়ে। এই অচেনা লোকটার সঙ্গে থোড়াই থাকব আমি? রাকেশের সঙ্গে আমার ভালবাসা বাবা-মা প্রথম থেকে মেনে নিলে এইসব লোকদেখানো বিয়ে ফিয়ের নাটক করার কোনও দরকারই ছিল না।
কালরাত্রিতে বর-বউকে একঘরে থাকতে নেই। কিন্তু পাখির বাসায় সেই আড়াল কোথায়?
শেষরাতে বসার ঘরের মেঝেতে ঢালা বিছানায় সবাই যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, আমার পাশে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসা বরকে বলেই দিয়েছিলাম সেই কথা — ‘তুমি হয়ত দুঃখ পাবে, প্রচণ্ড রাগও করবে আমার উপর — কিন্তু সত্যিই আমার কাছে আর কোনও অপশন ছিল না। বিয়েটা বাপ মায়ের হাতে বলে ওরা জোর খাটাতে পারল। ডিভোর্সটা কিন্তু আমার হাতে, এখানে ওদের কিছু করার নেই।’
সুমন, আমার বর কোনও প্রশ্ন করেনি — অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল — আমার সিঁথিতে তখন ওরই পরিয়ে দেওয়া সিঁদুর কুটকুট করছে।
২
শ্বশুরবাড়ি থেকে অষ্টমঙ্গলা করতে বাপের বাড়ি এসে আমি আর ফিরে যাওয়ার গরজ দেখালাম না।
সুমন বার বার আমাকে নিতে আসত আর আমি হাজার রকম অজুহাতে ফিরিয়ে দিতাম ওকে।
মাকে শুনিয়েছিলাম, ভাসুরের নজর খারাপ, একলা পেলেই গায়ে হাত দেয়, শাশুড়ি পেটভ’রে ভাত খেতে দেয় না — বলে, এমনিতেই গোলগাল, বেশি ভাত খেলে আরও মুটোবে, আমার ছিপছিপে ছেলের পাশে মানাবে না। ননদ দু’টো তত্ত্বের সব শাড়ি আর কসমেটিকস নিজেদের ঘরে নিয়ে গিয়ে আলমারিতে ভরেছে, বড় জা ভীষণ কূটকচালি করে — আরও কত হাবিজাবি অভিযোগের পসরা যে খুলে বসেছিলাম মায়ের কাছে তার ইয়ত্তা নেই।
তবুও যেদিন আমার বিউটিশিয়ান কোর্সের সঙ্গিনী লতাদির সঙ্গে সাহস করে বেরিয়ে সিভিল লইয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, মা-বাবাও হাঁ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু তাদের পরামর্শ আমি কানে নিলে তো? আমার হৃদয় জুড়ে তখন শুধুই রাকেশ – তার সুঠাম চেহারা, ঝকঝকে চোখের আমন্ত্রণ আর ওদের বিশাল কোয়ার্টারের আলো আঁধারি নিভৃতিতে আদিম শরীরী আদর! আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, ও যে কটন মিলটার জেনারেল ম্যানেজারের ছেলে, সেখানে আমার বাবা সামান্য সিকিউরিটি সুপারভাইজারের চাকরি করে — রাকেশদের অবাঙালি বড়লোক পরিবারে আমার বা আমার বাবা-মায়ের কোনও ‘অওকাত’ নেই।
ডিভোর্সের নোটিস পাওয়ার পরে সুমন আর আসেনি আমাকে ফেরাতে। অবশ্য কনটেস্টও করেনি। করলে আমি ফেঁসে যেতাম। আমার উকিলবাবু বলেছিলেন, ওর ঘর করতে না চাওয়ার কোনও সলিড গ্রাউণ্ড আমার নেই, বরং অ্যাডাল্টারির চার্জ এনে ও আমাকে আইনত প্যাঁচে ফেলতে পারে। যাক গে, কি হলে কি হতে পারত, সেসব ভাবার সময় তখন আমার ছিল না।
এক বছর সেপারেশনে থাকার পরে বিচ্ছেদ মঞ্জুরির কাগজটা পেয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে প্রথম দেখা করতে ছুটেছিলাম রাকেশের সঙ্গে।
‘ইয়ে তো জবরদস্ত খুশি কি বাত হ্যায় চন্দ্রা! চলো, নতুন গাড়িটায় কাল কোথাও একটা হোল ডে ট্রিপ মেরে আসি। দিনভ’র ঘুমেঙ্গে, দুপুরে লাঞ্চ করে হোটেলে রেস্ট’ — তারপর চোখ টিপে ঠোঁট মুচড়ে হেসেছিল ও –‘একদিনের জন্য একটা ঘর ভাড়া করছি — থোড়া আয়েশ তো বনতা হ্যায় ইয়ার!’
আমি ওর হাতের বাঁধনের মধ্যে গলে যেতে যেতে হাসিমুখেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম – ‘উয়ো সব তো ঠিক হ্যায়, মগর শাদি? আমাকে বিয়ে কবে করছ রাকেশ? এখন তো আর আইনি বাধাও নেই।’
ওর বাঁধন শিথিল হয়েছিল ধীরে ধীরে। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে পকেট চাপড়ে বার করেছিল সিগারেট আর বিলিতি লাইটার।
‘এক কো ছোড় সকতি, কেয়া ভরোসা শাদি কে বাদ মুঝে ভি নহী ছোড়োগে? তোমাকে নিয়ে মস্তি করা যায় চন্দ্রা, বিশ্বাস করে ঘর করা যায় না। ম্যায় উল্লু লগতা হুঁ কেয়া?’
৩
বিয়েতে বাবার দেওয়া গয়না তো আমার কাছেই ছিল, শ্বশুরবাড়ির আশীর্বাদীগুলো ওরা আর ফেরত নেয়নি। আমার উকিল বলেছিল ওগুলো নাকি স্ত্রীধন — আমারই প্রাপ্য।
বাবা রিটায়ার করার পরে গঙ্গার ধারের মফস্বল টাউন ছেড়ে আমরা চলে গেলাম জেলা শহরে, একটা ভাড়া বাড়িতে। কারোর স্ত্রী হতে না পারলেও ‘স্ত্রী-ধন’ বিক্রি করে, ব্যাঙ্ক থেকে কিছু লোন নিয়ে সাহস করে খুলে ফেললাম ছোট্ট একচিলতে বিউটি পার্লার। আর তাতে ঢালতে আরম্ভ করলাম আমার সবচাইতে বড় পুঁজি, আমার পরিশ্রম আর শিক্ষা।
প্রথমদিকে আলাদা লোক রাখার ক্ষমতা ছিল না, একাই কাজ করতাম — বাবা হিসেবটিসেব দেখে দিত।
অতীতের কথা মনে আসত না তা নয়, তবে সেই চিন্তাগুলোকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দিতাম না। দাঁতে দাঁত চেপে তখন কেবল পার্লারটাকে দাঁড় করানোর লড়াই।
বছর কয়েকের মধ্যে দাঁড়িয়েও গেল আমার ব্যবসা।
প্রথমে ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ হলো। তারপর দু’জন স্থানীয় সাহায্যকারিণী রাখলাম। মিতালি আর স্বপ্নাকে শেখাতে শেখাতেই বুঝে গেলাম, আমার মধ্যে কেবল শেখার নয়, শেখানোর ক্ষমতাও রয়েছে।
একটা ঘরে কুলোলো না, পাশে আরও একটা বড় বারান্দাওয়ালা ঘর নিলাম। তারপর উচ্চাশার ডানায় উড়াল দিয়ে খুলে ফেললাম বিউটি কারিকুলাম শেখানোর ছোটখাটো একটা সেন্টার। নিজের নামের ‘চন্দ্রাণী গ্ল্যামার হাউসে’র পাশেই উদ্বোধন হলো ‘চন্দ্রাণী বিউটি ট্রেনিং স্কুলে’র।
ছাত্রী বাড়তে লাগল একটি দু’টি করে।
শহরের উপকণ্ঠে কাঠা তিনেক জমির উপরে একটা পুরোনো খোলামেলা বাড়ি কিনে ফেললাম সস্তায়। সারাজীবন পাখির বাসায় কাটানো বাবা-মা একটু ফেলে ছড়িয়ে বাঁচুক এবার।
আমার সাফল্যের সুখ দেখার জন্য বাবা কিন্তু বেশিদিন রইল না, একদিন বিনা নোটিসে ঘুমের মধ্যেই চলে গেল পৃথিবী ছেড়ে। খুব একটা শূন্যতা অনুভব করলাম না। শুধু মনে হলো অর্থনৈতিক নিক্তিতে আমাদের চিরকাল খাটো করে আসা আত্মীয়স্বজনদের বাবার শ্রাদ্ধের জাঁকজমক দেখিয়ে থমকে দিতে হবে।
ষোড়শোপচারে শ্রাদ্ধকর্ম হলো। তারপরে নতুন কেনা বাড়ির ছাদে প্যাণ্ডেল খাটিয়ে খাওয়াদাওয়া। ক্যাটারারকে সব দায়িত্ব দিলেও মিষ্টির ব্যাপারটা নিজের হাতে রেখেছিলাম।
চল্লিশ কিলোমিটার দূরের কৃষ্ণনগর থেকে অর্ডারি একনম্বরি সরপুরিয়া এলো বিকেল গড়িয়ে, যখন নিমন্ত্রিতেরা ফেরার জন্য উসখুস করছে। না এলেই বোধহয় ভাল ছিল।
জ্যেষ্ঠের তীব্র দহনে দু’শো পিস পচে যাওয়া মহার্ঘ্য মিষ্টান্নের গা গুলোনো দুর্গন্ধে শ্রাদ্ধবাসরেই সকলের অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড় হয়েছিল — কী বিপত্তি!
৪
দিন নিজের নিয়মে গড়ায়, তবে সময় আমার মুখে তেমন করে ছাপ ফেলতে পারে না — প্রসাধন দিয়ে যত্ন করে ঢেকে রাখি। অবকাশের একাকিত্ব কাটানোর জন্য বাড়িতে একটা অ্যাণ্ড্রয়েড ফোন আর একটা কানঝোলা বিগল কুকুরের বাচ্চা আসে। পুরোনো বাড়ি বদলে এখন আমি আমার পার্লারের কাছেই একটা থ্রি বিএইচকে ফ্ল্যাট নিয়েছি।
কুকুরছানা অবিশ্যি বেশিদিন সহ্য করতে পারিনি আমি। কোলে নাও, আদর করো, কোথাও বেরোবার আগে তার কাঁউমাঁউ আপত্তি শোনো, নিয়মমাফিক ভেটের কাছে ছোটো — অত আমার পোষালো না। মাস দুয়েক পরে শখ মিটে গেলে ওপরের ফ্ল্যাটের সুনীতাকে দিয়ে দিলাম। মেয়েটা জন্তুজানোয়ার ভালবাসে।
রিতু, শবনম, মৌটুসি – পার্লারের মেয়েগুলো আমাকে ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট খুলে দিল, কয়েকমাসের মধ্যে নিজেই বেশ সড়গড় হয়ে গেলাম। কলকাতা ছাড়াও অন্যান্য শহরের ব্রাইডাল সাজ আর মেক আপ আর্টিস্টদের পেজে ঘুরঘুর করি — আইডিয়া তুলতে তো আর পয়সা লাগে না। ফেসবুকে প্রোফাইল পছন্দ হলেই অচেনা মানুষদের ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই। কেউ অ্যাকসেপ্ট করে, বেশির ভাগই এড়িয়ে যায়। আমি তো সাজগোজের ছবি আর ভিডিও দেওয়া ছাড়া অন্য কিছু পারি না, ভারিভরন্ত পোস্ট করা লোকজন আমাকে গ্রাহ্য করবেই বা কেন?
মা থুম মেরে টিভির পর্দায় চোখ সাঁটিয়ে দিন কাবার করে দেয় — একটা সর্বক্ষণের আয়া রেখেছি, ওর সঙ্গেই যা দুটো একটা কথা বলে।
একদিন ফেসবুক ঘাঁটতে ঘাঁটতেই একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল। বিয়ের সাজে একটা অল্পবয়সী মেয়ের প্রোফাইল – পাশে একজন বয়স্ক পুরুষ দাঁড়িয়ে, দু’জনেই হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মেয়েটাকে চিনি না, তবে লোকটা আমার ছেড়ে দেওয়া বর সুমন — এতকাল পরেও ঠিক চিনতে পেরেছি।
তাড়াতাড়ি ওর প্রোফাইলে গিয়ে দেখলাম লক করা রয়েছে।
আমাদের সেই মফস্বলী টাউন ছেড়ে আসার পরে কয়েকবছর লতাদির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। সুমন ফের বিয়ে করেছিল শুনেছিলাম। এটা তাহলে ওর মেয়ে! খটখটে চোখে খুঁটিয়ে দেখতে থাকি ছবিটা। বেশ দেখতে তো সুমনের মেয়েকে। আমার বুকের মধ্যে গোপন ঈর্ষার একটা কাঁটা খচখচ করে ওঠে। না, সুমনের দ্বিতীয় স্ত্রী কতটা সুন্দর, এই মেয়েটা তো আমার পেটেও হতে পারত — এইসব ভাবনা থেকে জ্বলুনি হয় না আমার। আমি ভাবতে থাকি, কোন মেকওভার পার্লার এত নিখুঁত কনে সাজিয়েছে? আমার পার্লার কি এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারত? নাকি হেরে যেত?
ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম, তাই মায়ামাসির দরজা ধাক্কানো শুনতে পাইনি প্রথমে। রাতে আমি নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে শুই। দিনভ’র পরিশ্রমের পরে পাশের ঘরে মায়ের কাশির শব্দ, পেচ্ছাপ আর বেডসোরের পাউডার-ওষুধের মিশ্রিত গন্ধে কেমন বিবমিষা আসে আমার।
ঘুম ভেঙে যখন পাশের ঘরে পৌঁছলাম তখন মায়ের প্রবল শ্বাসের টান উঠেছে। মায়ামাসি অভ্যস্ত হাতে ভাড়া করা অক্সিজেন সিলিণ্ডারের নল গুঁজেছে বটে মায়ের নাকে, তবে তাতে রোগী একতিল স্বস্তি পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
পাড়ার ক্লাবেই অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, কর্পোরেট হাসপাতালও কাছেই। ফ্যামিলি ফ্লোটার ইনশিওরেন্সের দৌলতে খরচের চিন্তাও তেমন নেই।
মাকে ভর্তি করিয়ে হাসপাতালের ঝাঁ চকচকে রিসেপশনে এসে বসেছি। কাল পার্লার খুলতে পারব কিনা কে জানে! সকালটা অবশ্য অন্যান্য স্টাইলিস্টরা চালিয়ে নিতে পারবে। তবে বিয়ের লগনসা চলছে, ব্রাইডাল মেক আপের তিনটে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়েছি — সবই অবশ্য বিকেলে। কনের সাজ আমি নিজের হাতে করাই পছন্দ করি, অন্যরা অ্যাসিস্ট করে। কাল কি যেতে পারব? ভাবনাগুলো সবে গুছিয়ে আনতে শুরু করেছিলাম — রিসেপশন থেকে কল এলো।
ছুটলাম ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে। সারা শরীরে নানা রকম যন্ত্রপাতি লাগিয়ে মা শুয়ে আছে ফটফটে সাদা বিছানায়। রোগ তার সবটুকু কুশ্রীতা লেপে দিয়েছে মায়ের সর্বাঙ্গে, কোনও সৌজন্য দেখায়নি। আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। লক্ষ্য করলাম না যে মায়ের শুকিয়ে যাওয়া বুকে আর কোনও ওঠাপড়া নেই। বেডের পাশে লম্বা সাদা অ্যাপ্রন পরা বড় ডাক্তারবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন। এঁকে চিনি। ডঃ ঘোষ। মাকে কয়েকবার দেখিয়েছিলাম। সময়োচিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে ডঃ ঘোষ জানালেন —
“কিছু করা গেল না। অ্যাটাকটা বোধহয় প্রথম রাত্তিরেই হয়েছে। আর একটু আগে নিয়ে এলে চেষ্টা করা যেত। জানেনই তো, প্রথম এক ঘন্টাই হচ্ছে চিকিৎসার গোল্ডেন আওয়ার। আপনি খানিক আগেও কিচ্ছু বুঝতে পারেননি? এনি আনন্যাচারাল সিম্পটম? নো? নাথিং?”
৫
‘কোথাও ঘুরে আসুন না ম্যাডাম। একা থাকেন, বোরিং ও তো লাগে।’ —
রাত্রে আমার ফ্ল্যাটে সেদিনের ট্রানজাকশনের হিসেব দিতে এসে বলে ফেলল শবনম। ‘তা ছাড়া, এখন তো আপনার কোনও লায়াবিলিটিজ়ও নেই, ঝাড়া হাত পা –‘
ওর দিকে তাকালাম ঠাণ্ডা চোখে। আমার চাহনিতে এমন কিছু ছিল, চুপ করে গেল মেয়েটা।
শবনম বেরিয়ে যাওয়ার পরে ওর কথাগুলো তোলাপাড়া করলাম মনে মনে।
ছোটবেলায় মা বাবার সঙ্গে একবার দার্জিলিং আর বার দুয়েক পুরী, যৌবনে বাড়িতে লুকিয়ে রাকেশের সঙ্গে কয়েকবার কলকাতা সফর – এই বাদ দিয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার নেই। তাগিদও ছিল না অবশ্য এতকাল।
এখন আমি বাহান্ন। মেনোপজ় হয়ে গেলেও হাঁটু বা কোমরের ব্যথা জানান দেয়নি এখনও, প্রেশার সুগার নর্মাল, একবারও ডেন্টিস্টের চেম্বারে যেতে হয়নি, চোখে কেবল চালশের চশমা উঠেছে একটা। আমি স্বনির্ভর, কারো মুখাপেক্ষী নই, পার্লার আর ট্রেনিং সেন্টার দিন কয়েক বন্ধ রাখলে না খেতে পেয়ে মরার ভয় নেই। অসংখ্য ভ্রমণ সংস্থা রয়েছে, যারা আমার মতো একলা মহিলাদের বেড়ানোর ব্যবস্থা করে, ফেসবুকের দৌলতে সেসব আমার জানা। এবার শুধু যোগাযোগের ওয়াস্তা। কোথাও একটা ঘুরে আসব বলেই মনস্থির করে ফেললাম শেষমেশ।
ভাদ্রের গোড়ার দিকে পাহাড়ে আসা ঠিক হয়নি, সেটা ঋষিকেশ থেকে গৌরীকুণ্ড যাওয়ার পথেই টের পেয়েছিলাম। দেবীপ্রয়াগ অবধি ঝকঝকে ওয়েদার — মেঘ ঘনাতে আরম্ভ করল তার পরেই। শ্রীনগর হয়ে যখন রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছলাম, তখন বিকেল পাঁচটাতেই রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।
রুদ্রপ্রয়াগে আমার রাত্রিবাস করার কথা। পরদিন ভোরবেলা যাত্রা করব গৌরীকুণ্ডের উদ্দেশে। রাত আটটা নাগাদ মুষলধারে বৃষ্টি নামল। হোটেলের ঘরের কাঁচের জানলার পাতলা পর্দার ভিতর দিয়ে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখতে দেখতে মোটা লেপের নিচেও কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম আমি।
আধো ঘুম, আধো জাগরণে রাতটা কাটিয়ে ভোরবেলা হোটেলের নিচে নেমে দেখি বৃষ্টির মধ্যেই ‘জয় কেদার’ হাঁক দিয়ে তীর্থযাত্রী বোঝাই চারচাকা গাড়ি আর বাসগুলো গৌরীকুণ্ডের দিকে রওনা দেবার উদ্যোগ করছে।
আমার ভাড়ার জিপের গাড়োয়ালি ড্রাইভার নবীন এগিয়ে এলো।
‘ম্যাডামজি, হালত আচ্ছা নহী লগ রহা হ্যায়। এক দিন রুদ্রপ্রয়াগ মে হি রুক যায়েঁ?’
আমার সন্দেহসঙ্কুল মন বলল, ব্যাটার এক্সট্রা একদিনের পয়সা খ্যাঁচার মতলব!
‘এত গাড়ি যখন যাচ্ছে, আমিও যাব। খামোখা রুদ্রপ্রয়াগে একটা দিন নষ্ট করতে রাজি নই।’
নিরুপায় নবীন ঘাড় ঝাঁকালো। প্যাসেঞ্জারের মর্জির উপর তো আর কথা চলে না।
তিলওয়াড়া ছাড়াবার পরেই বৃষ্টির জোর গেল বেড়ে। সেই সঙ্গে কানে এলো একটা অস্পষ্ট গুমগুম শব্দ, যেন বহুদূরে কোথাও বোমাবর্ষণ হচ্ছে। গুপ্তকাশী অবধি আর পৌঁছনো গেল না। পাহাড়ি পথের বাঁকে দেখতে পেলাম দূরে মন্দাকিনীর স্রোত একশো গুণ ফুলে ফেঁপে পাগলের মতো এদিকপানে ছুটে আসছে।
নবীন ‘হে ভগওয়ান’ বলে রাস্তার মাঝখানেই গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে নেমে পড়ল। তারপর আমার জানলার কাছে এসে কানফাটানো চিৎকার করে বলল — ‘জলদি নিকলকে পাসওয়ালা পহাড় মে চড় যাইয়ে অগর জান বচানা হো তো’ —
আর একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ঐ মুষলধারা বর্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
হাতব্যাগটা আঁকড়ে আমিও নামলাম গাড়ি থেকে। ট্রলিটার কথা মনে পড়ল, কিন্তু সেটা বয়ে পাহাড়ে ওঠার ক্ষমতা আমার নেই। কেবল নিজেকে নিয়ে ওঠার শক্তিও আছে কি?
হাত বাড়িয়ে বুঝলাম বাঁ পাশেই পাহাড়ের পাথুরে দেওয়াল — জলে আর শ্যাওলায় পিছল হয়ে রয়েছে। পিছিয়ে গিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলাম পাহাড়ের দেওয়াল ধরে ধরে — যেখানে একটু ঢালু পাবো, উঠে যেতে চেষ্টা করব। ভয়াল মন্দাকিনী দ্রুত তাড়া করে আসছে পিছনে, কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে লাভ নেই। আমি তখন প্রাণপণে তিলওয়াড়ার দিকে নেমে যেতে যেতে পাশের পাহাড়ে একটা পা রাখার খাঁজ খুঁজছিলাম। পেয়েও গেলাম হাতড়ে হাতড়ে। ব্যাগের স্ট্র্যাপটা গলায় আর কাঁধে বামুনের পৈতের মতো গলিয়ে নিয়ে পাহাড়ে ওঠার মরিয়া প্রয়াস শুরু হলো আমার। জীবনেও কখনও ট্রেকিং করিনি – দশ হাত উঠলে পাঁচ হাত পিছলে নেমে আসি। কখনও ফার্নের চাপড়া, কখনও ঝুরো পাথর — যা পাচ্ছি, হাতের মুঠোয় আঁকড়ে আরও উপরে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কলজে ফেটে আসছে, গলা শুকনো, হাতের তালু ফেটে রক্ত বেরিয়ে গিয়েছে, তবু চেষ্টা ছাড়তে পারছি না। অবশেষে শক্ত কোনও কিছুর নাগাল পেলাম — একটা পাহাড়ি গাছের গুঁড়ি। সেটা ধরে আরও খানিকটা উপরে উঠে পরপর অনেকগুলো গাছ পেলাম। এটা একটা বার্চ গাছের বন। বৃষ্টির তোড়টাও এখানে অপেক্ষাকৃত কম। কয়েকটা গাছ ধরে ধরে আরও খানিকটা উঠে দম সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেল। একটা গাছের গোড়া দু’হাতে শক্ত করে বেড় দিয়ে ধরে বসলাম। সঙ্গের ব্যাগে যে জলের বোতল রয়েছে, সেটা বিলকুল ভুলে গিয়েছি ততক্ষণে। একটা প্রবলতর গর্জন শুনে নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা ঘুরে গেল। কিছুক্ষণ আগেই যে রাস্তা থেকে উঠে এসেছি, ঘোলা জলোচ্ছ্বাস তাকে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেই স্রোতে খেলনার মতো ভেসে যাচ্ছে গাড়ি, বাস, বাড়ির চাল, হয়ত বা মানুষও।
তীব্র ভয়ের আর্তনাদ করে ঘুরে বসে আমি আবার হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করলাম। আরও উঁচুতে উঠতে হবে, অনেক উঁচুতে। পৃথিবীর নোংরা কাদাজলে দমবন্ধ হয়ে কুৎসিতভাবে মরতে পারব না আমি, কিছুতেই পারব না।
দেরাদুনের জলি গ্রান্ট এয়ারপোর্টে মেঝেতে থেবড়ে বসেছিলাম। বিপর্যয়ের পরে তিনদিন কেটে গিয়েছে। সেই অভিশপ্ত সকালের পুরো চব্বিশ ঘন্টা পরে তিলওয়াড়ার কাছে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার আমাকে আর আমার মতো দৈবাৎ বেঁচে যাওয়া কিছু পর্যটককে উদ্ধার করে। ওরা শুকনো পোশাক আর কম্বল দিয়েছে। খাবার আর ওষুধও দিয়েছে। আমার গায়ে এখনও জ্বর, হাতের পাতায় ক্ষত, হাঁটুতে চোট। কিন্তু হাতব্যাগে রাখা ক্যাশ টাকা, ক্রেডিট কার্ড অক্ষত রয়েছে।
দিল্লির ফ্লাইটের জন্য অনন্ত অপেক্ষা করতে করতেই শুনতে পেলাম, বিপর্যয়ে তেরোশো মানুষ আর অসংখ্য গরুছাগল মারা গিয়েছে, কেদারনাথ মন্দির বাদে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে পুরো জনপদ, পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নাকি নিখোঁজ — হয়ত চিরকালের জন্যই।
আচমকা আমার ভয়ানক হাসি পেল। প্রথমে ফিকফিক করে, তারপর ঠোঁট মুচকে, অবশেষে উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলাম আমি।
সারাজীবন ধরে চা খেতে গিয়ে কাপ আর ঠোঁটের মধ্যবর্তী ফাঁকটা আমি ভরাট করে উঠতে পারিনি কোনওদিন। ঠিক তেমন করেই জীবনের মতো মৃত্যুও আমাকে ফাঁকি দিয়ে, বেমক্কা বোকা বানিয়ে, পাশ কাটিয়ে দিব্যি বেরিয়ে গেল, আমি কিস্যু করতে পারলাম না।
এতবড় মশকরাতেও হাসি পাবে না, তো কীসে পাবে, শুনি?
হাসির তোড়ে শুনতে পেলাম না, এক সেনা অফিসার কোনও অ্যাটেণ্ড্যান্টকে হুকুম করছেন — ‘তুরন্ত ইনহেঁ ডিসপেনসারি মে লে যাও। শায়দ শক কে ওয়জে সে টেমপোরারি ইনস্যানিটি হো গ্যয়া — অন ডিউটি ডক্টর কো বোলো জরুরত পড়নে পর গরমিন্ট অসপাতাল মে অ্যাডমিট করনা পড়েগা’।
আশপাশের করুণ, সচকিত চাহনিকে অগ্রাহ্য করে আমি তখনও হেসেই চলেছি।
——










