(এক) তাঁকে স্মরণ এবং প্রণাম
“ইছামতী একটি ছোট নদী। অন্তত যশোর জেলার মধ্য দিয়ে এর যে অংশ প্রবাহিত, সেটুকু। দক্ষিণে ইছামতী কুমির – কামট – হাঙ্গর – সঙ্কুল বিরাট নোনা গাঙে পরিণত হয়ে কোথায় কোন সুন্দরবনে সুদরি – গরান গাছের জঙ্গলের আড়ালে বঙ্গোপসাগরে মিশে গিয়েচে, সে খবর যশোর জেলার গ্রাম্য অঞ্চলের কোনো লোকই রাখে না।
ইছামতীর যে অংশ নদীয়া ও যশোর জেলার মধ্যে অবস্থিত, সে অংশটুকুর রূপ সত্যিই এত চমৎকার, যাঁরা দেখবার সুযোগ পেয়েচেন তাঁরা জানেন। কিন্তু তাঁরাই সবচেয়ে ভালো করে উপলব্ধি করবেন, যাঁরা অনেকদিন ধরে বাস করচেন এ অঞ্চলে। ভগবানের একটি অপূর্ব শিল্প এর দুই তীর, বনবনানীতে সবুজ, পক্ষী-কাকলিতে মুখর।
মড়িঘাটা কি বাজিতপুরের ঘাট থেকে নৌকো করে চলে যেও চাঁদুড়িয়ার ঘাট পর্যন্ত – দেখতে পাবে দুধারে পলতেমাদার গাছের লাল ফুল, জলজ বন্যেবুড়োর ঝোপ, টোপাপানার দাম, বুনো তিৎপল্লা লতার হলদে ফুলের শোভা, কোথাও উঁচু পাড়ে প্রাচীন বট – অশ্বত্থের ছায়াভরা উলুটি – বাচড়া – বৈঁচি ঝোপ, বাঁশঝাড়, গাঙশালিখের গর্ত, সুকুমার সভাবিতান। গাঙের পাড়ে লোকের বসতি কম, শুধুই দূর্বাঘাসের সবুজ চরভূমি, শুধুই চখা বালির ঘাট, বনকুসুমে ভর্তি ঝোপ, বিহঙ্গ – কাকলি – মুখর বনান্তস্থলী। গ্রামের ঘাটে কোথাও দু’দশখানা ডিঙি নৌকো বাঁধা রয়েচে। ক্বচিৎ উঁচু শিমুল গাছের আঁকাবাঁকা শুকনো ডালে শকুনি বসে আছে সমাধিস্থ অবস্থায় – ঠিক যেন চীনা চিত্রকরের অঙ্কিত ছবি। কোনো ঘাটে মেয়েরা নাইচে, কাঁখে কলসি ভরে জল নিয়ে ডাঙায় উঠে, স্নানরতা সঙ্গিনীর সঙ্গে কথাবার্তা কইচে। এক – আধ জায়গায় গাঙের উঁচু পাড়ের কিনারায় মাঠের মধ্যে কোনো গ্রামের প্রাইমারি ইস্কুল; লম্বা ধরনের চালাঘর, দরমার কিংবা কঞ্চির বেড়ার ঝাঁপ দিয়ে ঘেরা; আসবাবপত্রের মধ্যে দেখা যাবে ভাঙ্গা নড়বড়ে একখানা চেয়ার দড়ি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা, আর খানকতক বেঞ্চি।
সবুজ চরভূমির তৃণক্ষেত্রে যখন সুমুখ জ্যোৎস্নারাত্রির জ্যোৎস্না পড়বে, গ্রীষ্মদিনে সাদা থোকা থোকা আকন্দফুল ফুটে থাকবে, সোঁদালি ফুলের ঝাড় দুলবে নিকটবর্তী বনঝোপ থেকে নদীর মৃদু বাতাসে, তখন নদীপথ – যাত্রীরা দেখতে পাবে নদীর ধারে পুরোনো পোড়ো ভিটের ঈষদুচ্চ পোতা, বর্তমানে হয়ত আকন্দঝোপে ঢেকে ফেলেচে তাদের বেশি অংশটা, হয়ত দু-একটা উইয়ের ঢিপি গজিয়েচে কোনো কোনো ভিটের পোতায়। এইসব ভিটে দেখে তুমি স্বপ্ন দেখবে অতীত দিনগুলির, স্বপ্ন দেখবে সেইসব মা ও ছেলের, ভাই ও বোনের, যাদের জীবন ছিল একদিন এইসব বাস্তুভিটের সঙ্গে জড়িয়ে। কত সুখদুঃখের অলিখিত ইতিহাস বর্ষাকালে জলধারাঙ্কিত ক্ষীণ রেখার মতো আঁকা হয় শতাব্দীতে শতাব্দীতে এদের বুকে। সূর্য আলো দেয়, হেমন্তের আকাশ শিশির বর্ষণ করে, জ্যোৎস্না-পক্ষের চাঁদ জ্যোৎস্না ঢালে এদের বুকে।
সেইসব বাণী, সেইসব ইতিহাস আমাদের আসল জাতীয় ইতিহাস। মূক – জনগণের ইতিহাস, রাজা – রাজড়াদের বিজয়কাহিনী নয়। ”
– ইছামতী – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
(দুই) এক উজ্জ্বল সোনালি সকাল
তার সঙ্গে শীতের হিমেল পরশ। বড়ই উপভোগ্য এই সময়ের গ্রাম বাংলা। সালটা ১৯৯৯। কর্মসূত্রে সেই সময় নদীয়া জেলার রানাঘাটে। ছুটির সকালে রানাঘাট – বনগাঁ সড়ক ধরে চলে এলাম গোপালনগরের বারাকপুর গ্রামে। বিভূতিভূষণের গৃহে।
সেই টিনের চালা মাটির ঘরটি তখনও বিদ্যমান। ডাঃ আবিরলাল মুখোপাধ্যায় এবং সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর ‘ পথের পাঁচালী ‘ সংগঠন সংরক্ষণে সহায়তা করেছেন। পাশের গৃহ থেকে বিভূতিভূষণের ভাইঝি বেরিয়ে এলেন।
একেবারে এক মুখশ্রী, এক রকম দীর্ঘাঙ্গী বলিষ্ঠ কাঠামো, শ্যামলা রং। দিদি আমাদের ঘর খুলে দিয়ে যত্ন করে সব দেখালেন। পরম যতনে সব রক্ষা করেছেন। বিভূতিভূষণের কিছু অমূল্য অঙ্কনও দেখালেন।
তাঁর ঘর দেখে আশপাশটা দেখলাম। তারপর দিদি কে বললাম, ” কোন পথ দিয়ে বিভূতিভূষণ ইছামতী ঘাটে যেতেন? ” দিদি হাসি মুখে আমাদের এবাড়ি সেবাড়ি, গাছ গাছালির মধ্যে দিয়ে এক সরু মেঠো পথে কাছেই ইছামতী তীরে নিয়ে গেলেন। সম্মুখে কুলু কুলু ধারায় বয়ে চলেছে শীর্ণকায়া ইছামতী। নীচে ঘাট। একটা ডিঙি বাঁধা। কিছুটা দূরে এক মৎস্যজীবী নৌকা থেকে মাছ ধরছেন। ওপারে গাছপালার পর কৃষি ক্ষেত। কৃষকেরা কাজ করছেন। ঘাটের কাছে একটা গাছ। দিদি বললেন, ” তিনি এই ঘাটে স্নান করতেন। তাছাড়াও বাড়িতে থাকলে এই গাছতলায় এসে বসতেন। ” আমরা নদীতীরের সেই গাছ তলায় দাঁড়িয়ে তাঁকে অনুভবের চেষ্টা করলাম।
(তিন) এক শীতের দুপুর
সালটা সম্ভবত ২০১০। মাথাভাঙ্গা – চূর্ণী – ইছামতী নদীর দূষণের প্রতিবাদে স্থানীয় মৎস্যজীবী এবং পরিবেশ কর্মীরা আন্দোলন করছেন। সেই উপলক্ষ্যে মাঝদিয়ায় একটা কনভেনশন হচ্ছে। পরিবেশ কর্মীদের সঙ্গে এসেছি। দুপুরে খাওয়ার পর মাথাভাঙ্গা – চূর্ণী – ইছামতীর মোহনা দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম ইছামতীর উৎসটাই বুজিয়ে দিয়ে তার উপর রেল সেতু করা হয়েছে। অতীতে পূর্ব বাংলা থেকে বড় বড় স্টিমার স্রোতস্বিনী ইছামতী দিয়ে চলাচল করত। অন্যান্য মাছের সঙ্গে প্রচুর চিংড়ি বা ইছা মাছ পাওয়া যেত এই নদীতে। বাণিজ্যিক স্বার্থে এতদঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ নদীর মাথা কেটে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
(চার) এক বর্ষার বিকেল
আমার দুই তরুণ বন্ধুকে বিভূতিভূষণের গৃহ দেখাতে নিয়ে চলেছি। এ বিষয়ে তাদের অনেক গল্প বলেছি। তাদের যথেষ্ট উৎসাহ। সালটা ২০২৩। সদ্য পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়ে গেছে। সেই রানাঘাট – বনগাঁ সড়ক। কিন্ত সমস্ত কিছু পাল্টে গেছে। দুদিকে দোতলা – তিনতলা সব বাড়ি, দোকান। রাস্তায় প্রচুর গাড়ি ও বাইক। হেলিকপ্টার অটো। শ্যামলী পরিবহনের ভলভো বাস। পঞ্চায়েতে জেতার কারণে সর্বত্র তারস্বরে মাইক বাজছে।
পরিবর্তনের ফলে বিভূতিভূষণের বাড়ির কাছটায় এসে একটু গুলিয়ে গেল। লোকজনকে জিজ্ঞেস করায় তারা আকাশ থেকে পড়ছেন, তাদের গন্তব্য পঞ্চায়েত নির্বাচনের বিজয় উৎসব, যেখানে সম্ভবত নগদ প্রাপ্তি যোগ আছে। এক বৃদ্ধ বলতে পারলেন।
পিচ রাস্তা ধরে সেখানে পৌঁছলাম। চারিদিকে পাকা বাড়ি। উল্টো দিকে পিএইচই – র একটা উঁচু জলের ট্যাঙ্ক। বিভূতিভূষণের সেই গৃহের জায়গায় একতলা এক পাকা ঘর। তালা দেওয়া। কেউ থাকেন না। চারিদিক ইটের পাঁচিল। লাগোয়া পরপর বাড়ি। সামনের বাগানে অযত্নের ছাপ। সেখান থেকে মূল রাস্তা ধরে ইছামতী কে দেখতে গেলাম। সেই ঘাট রূদ্ধ করে এক কংক্রিটের নীল – সাদা পার্ক, নাম বিভূতিভূষণ উদ্যান। সেখানে বিভূতিভূষণের এক বিশাল মূর্তি। একটা নীল – সাদা রঙের দোতলা বাড়ি, পার্কে তালা লাগানো, সেখানে কোন শিশু বা বৃদ্ধ কাউকে দেখা গেল না। কাছে ইছামতীর উপর একটা ব্রিজ হয়েছে। সেই ব্রিজের মাঝে গিয়ে দেখলাম তির তির করে প্রবহমান যন্ত্রণাক্লিষ্ট ইছামতী।
(পাঁচ) আরেক বর্ষার সকাল
আরংঘাটা স্টেশনে নেমে মুখার্জিদা আর আমি শেয়ারের অটো তে করে চলেছি বাংলাদেশ সীমান্তে দত্তপুলিয়ায়। সেখানে মহিলাদের সমবায়, আশা কর্মীদের প্রশিক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ প্রমুখ বিবিধ কাজে ব্যাপৃত জনপ্রিয় ‘ শ্রীমা মহিলা সমিতি ‘। তারা আয়োজন করেছেন ‘ খাল – বিল, চুনো মাছ উৎসব ‘।
রাস্তার দুপাশে এখনও বড় বড় কিছু শিরিষ গাছ অটুট আছে। উৎসবে তো যাবই, তার আগে বিভূতিভূষণের ইছামতী কে দেখব না? দত্তপুলিয়া মোড়েই পেলাম প্রবীণ অটো চালক শ্রীজীব বিশ্বাস কে। ওপাড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে তার পিতা – মাতা প্রাণ হাতে এপাড়ে চলে এসেছিলেন। বাংলাদেশ সীমান্ত বলায় বিশ্বাস মশায় বললেন যে অনতিদূরে যেখানে অনুষ্ঠান হচ্ছে সেখানেই বিএসএফ ক্যাম্প, তারপরেই ধানক্ষেতের ওপারে বাংলাদেশ। বললাম ইছামতী নদী দিয়ে যেখানে সীমান্ত সেখানে যেতে চাই।
তারপর বিশ্বাস মশায় বনগাঁ – কৃষ্ণনগর পাকা সড়ক থেকে নেমে গ্রামের পথ ধরলেন। জনবসতি, বাঁশ ঝাড়, পুকুর, বিল, সবুজ ক্ষেত পেরিয়ে আমরা এগোতে লাগলাম। পাট শুকোনো সবে শেষ হয়েছে। তার গন্ধটা আছে। আছে জায়গায় জায়গায় পাট কাঠির ঢিপি। এরপর আমরা সীমান্তে চলে এলাম।
গাছ গাছালি জঙ্গলের মধ্যে কাঁটা তারের বেড়া। বিভিন্ন পয়েন্টে বিএসএফ এর জওয়ানরা ডিউটি দিচ্ছেন। নো ম্যানস ল্যান্ডের ১৫০ গজের মধ্যে থেকে সমস্ত ভারতীয়দের বাড়ি সরিয়ে বেড়ার এপাড়ে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলাদেশের দিকে সে বালাই নেই। ঝোপঝাড়, জঙ্গল, বাঁশ বন, কলা বন ইত্যাদির ফাঁকে ইছামতী লুকোচুরি খেলছে।
মুখার্জি দা তাঁর পরিচয়পত্র দেখিয়ে অনুমতির ব্যবস্থা করলেন। আমাদের এসকর্ট করে চললেন এসএলআর ধারী এক তাগড়া জওয়ান। নির্জন এই জঙ্গুলে পথ। বড় – ছোট, চেনা – অচেনা সব গাছ। এবড়ো খেবড়ো মেঠো পথের একটা দিকে ঝোপঝাড় – হাওড়, অন্যদিকে সবজির ক্ষেত। পটল, বেগুন, লঙ্কা কত কি চাষ হচ্ছে? তারপর নাবাল জমিতে চোখ জুড়ানো সবুজ ধানক্ষেত। ধারেকাছে কোন মানুষ নেই।
কিছুটা পথ পেরিয়ে জঙ্গলে মোড়া বিভূতিভূষণের ইছামতী কে দেখতে পেলাম। তিনি নেই। নদীর প্রতিও কারো যত্ন নেই। সেই সুযোগে নদীকে ঢেকে ফেলেছে কচুরিপানা। শীর্ণ নদীর ওপাড়েই বাংলাদেশ।
ফেরার পথে এক পরিত্যক্ত ভাঙ্গা বাড়ির পাশ দিয়ে এলাম। কোন স্বচ্ছল গৃহস্থকে হয়তো রাজনৈতিক কারণে তার বাস্তু ছেড়ে চিরকালের জন্যে চলে যেতে হয়েছে। রয়েছে একা এক ফুল গাছ। বনতল সাদা ফুলে ফুলে ঢাকা।










