শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে ধনধান্য অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হল এক মহতী সরকারি অনুষ্ঠান-মমতা দিবস। ঠিক ই বুঝেছেন। অর্ধ সত্য বললাম। এই নাম রাজ্যের উন্নয়ন বিরোধী কুচক্রীদের দেওয়া। না, এখনো কোন অনুষ্ঠানের সরকারি নাম এটা হয়নি, ২০২৬ সালের পরে হবে সম্ভবত। অনুষ্ঠানের নাম ছিল শিক্ষক দিবস এবং কৃতী ছাত্র –ছাত্রী দের সংবর্ধনা।
বিরাট প্রেক্ষাগৃহে লোকে লোকারণ্য – ছাত্র ছাত্রী শিক্ষক অভিভাবক সরকারী আমলা কর্মচারী বিপুল অভ্যাগত, মন্ত্রী সান্ত্রী – সে এক এলাহি কাণ্ড। কন্যার সুবাদে জগতের এই আনন্দযজ্ঞে ‘আম্মো’ (সৌজন্যে সৈয়দ মুজতবা আলি) এক খান নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। এই আয়োজনে হাজির না হলে জীবনে অনেক কিছু জানা দেখা বোঝা বাকি থেকে যেত। প্রশ্ন হল ধান ভানতে শিবের গীত করছি কেন। ব্যক্তিগত জানা অজানা নিয়ে আর পাঁচ জন মানুষের অযথা সময় নষ্ট কেন!
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোচনা এই জন্য প্রাসঙ্গিক যে এই জাতীয় সরকারি উদ্যোগ গুলি এক একটা eye opener. চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় হাজার অভয়া কাণ্ড ঘটিয়েও কেন এবং কী ভাবে সরকার চালানো যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষের চাকরি চুরি করেও কী করে রাজ্য চালানো যায়।
এবার অনুষ্ঠানে ফিরি। একটু শুরু থেকে বলি। প্রভূত নিরাপত্তার ঘেরাটোপ পেরিয়ে অভিভাবক দের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে সঙ্গীত মুখরিত প্রেক্ষাগৃহে দুরুদুরু বক্ষে একটি আসন দখল করে নেওয়ার পর দূরবর্তী প্রকাণ্ড মঞ্চে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পাই মঞ্চ আলোকিত করে আছেন বহু জ্ঞানী গুণী মণীষীরা, জ্ঞান কম থাকার জন্য যাঁদের অনেককেই চিনিনা। মঞ্চের কোনায়, সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা, যাদের কারোর মুখই দেখা যাচ্ছেনা, কারণ তারা মুখ্য বিষয় নয় । বেথুন কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্রীরা, অসাধারণ পেশাদারি দক্ষতায় গাইছে- “অন্তর মম বিকশিত কর অন্তরতর হে”। উদ্বোধনী সঙ্গীত শুনে মন ভাল হবার পরেই হোঁচট – এটা উদ্বোধনী নয়, উদ্বোধনীর মক শো। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে ছোট রা সকাল ৯ টার আগে থেকে একবার গান শুনিয়ে মঞ্চেই চিত্রার্পিতের ন্যায় খাড়া হয়ে মন্ত্রীর অপেক্ষায় থাকল। এর পর মঞ্চের বিরাট স্ক্রিনে দুই রাউন্ড কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথী এবং বিনামূল্যে জামা, জুতো , খাতা, বই, ছাতা, ট্যাব, ক্রেডিট কার্ড, সাইকেল ইত্যাদির পরিসংখ্যান এর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশান হল। এগারোটার কাছাকাছি পৌঁছালেন মহামহিম রাজাধিরাজ শ্রীল শ্রীযুক্ত শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু। মঞ্চের কোনায় কাষ্ঠপুত্তলিবৎ দণ্ডায়মান মানবশিশু রা সুললিত কণ্ঠে গেয়ে উঠল উদ্বোধনী সঙ্গীত। মন্ত্রী সান্ত্রী ছিলেন আরও গুটি কয় – একদা গায়ক অধুনা মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং একদা বিপ্লবী অধুনা ক্ষমতাপন্থী পূর্ণেন্দু বসু। সকলের বক্তৃতা শেষ । বিভিন্ন বোর্ডের প্রথম স্থানাধিকারীদের এক এক করে দ্রুত স্টেজে ডেকে শিক্ষা মন্ত্রী বাঁধানো শংসা পত্র নিয়ে তড়িঘড়ি ছবি তুলে ফেলেছেন। হলুদ কুপনের মারফত লাইন দিয়ে কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করা মেডাল, ঘড়ি, সুদৃশ্য জুট ব্যাগ এ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ‘কবিতাবিতান’ (ইংরেজি), রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ এবং সরকারি কাজের খতিয়ান ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে অভিভূত হয়ে বসে আছে রাজ্য এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সংবর্ধনায় যোগ দিতে আসা বাংলার কৃতী ছাত্র ছাত্রীরা। তারা কেউ ই আর ডাক পেল না মঞ্চে ওঠার। তাদের ভুমিকা ছিল দর্শকের। এই সুমহান কর্মযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে রইল।
এর পর দীর্ঘ সময় ধরে চলল শিক্ষারত্ন পুরস্কার প্রদান। এই বছর এই পুরস্কার প্রাপক নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন সন্দেহ নেই। বিগত এক বছরের ঝোড়ো সময়ে যাঁরা প্রশ্নহীন দলীয় আনুগত্য দেখিয়েছেন তাঁদের পুরস্কৃত করা সরকারি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। “আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান / দিও তোমার জগতসভায় এইটুকু মোর স্থান”। শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান কী বা কত টা এ প্রশ্ন করার ধৃষ্টতা দেখাব না।
এর পর এক হিরন্ময় অপেক্ষা। তিনি আসছেন। আকাশে বাতাসে বেজে উঠল আলোর বেনু। এই অধীর প্রতীক্ষার সময়ে আরও দু’বার প্রকাণ্ড LED স্ক্রিনে বিভিন্ন অনুদান প্রকল্প। তারপর সেই অনন্য মুহূর্ত। হাত নাড়তে হাত নাড়তে মঞ্চে উঠে রাধাকৃষ্ণানের ছবি তে মাল্যদান পর্বের পরেই বিশিষ্ট শিক্ষিকা পুরস্কার গ্রহণ করলেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী! গায়ক লেখক চিত্রকর এর পর সেরা শিক্ষক ! অনুষ্ঠানের ঘোষক জানালেন পূর্বতন মন্মথনাথ ইনস্টিটিউশন এ ১৯৭৫-৭৮ অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। অধুনা ভবানিপুর ইনস্টিটিউশন এর প্রধান শিক্ষিকা এবং গভর্নিং বডি প্রেসিডেন্ট বেশ কিছু কচি কাঁচা কে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে এসে সেরা শিক্ষক সম্মানপত্র দিয়ে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের সুপ্রিমো কে। এর পর ভাষণ । তাঁর জন্য আলাদা পোডিয়াম। চাকরি চুরি মামলার নিদান দিয়ে দিলেন। Tainted untainted সকলেই চাকরি পাবে! এখানে নয় তো ওখানে । ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক একই সঙ্গে সতীদাহ এবং বাল্যবিবাহ- দুটোই রদ করালেন তিনি। বিদ্যাসাগরের সাক্ষাৎ উত্তরসুরী হিসাবে বাল্যবিবাহ আবার কমিয়ে স্কুল ড্রপ আউট এর সংখ্যা শূন্য করে দিয়েছেন – এই জাতীয় নানাবিধ আকর্ষণীয় বক্তব্য তো উনি রেখেই থাকেন। বক্তৃতার মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রী একবার ধমক খেলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বলার সময় প্রস্তাবিত গুলির সংখ্যা না ধরায়। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ইন্দ্রনীল সেন গান ধরলেন- জয়বাংলা। দিদিই লেখক, দিদি ই সুরকার- “প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর/ তুমি দেহ মোরে কথা তুমি দেহ মোরে সুর”।
সরকারি রাজসূয় যজ্ঞ – মূল লক্ষ্য সরকারের কাজ এবং মুখ্যমন্ত্রীর কীর্তি ও মহিমা প্রচার। এর জন্য হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। সরকারি নির্দেশে বাংলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা সরকার থেকে পাঠানো লিঙ্কে ঢুকে অনলাইন উপস্থিতি জানাতে বাধ্য হয়েছেন। উপলক্ষ্য কৃতী সংবর্ধনা। উদ্দেশ্য আর ঘোষিত লক্ষ্যের মিল না থাকলে যেমন হয় তেমনই হয়েছে। কোথাও কোন সমন্বয় নেই। চরম অব্যবস্থা, দিশাহীন প্রাণহীন অনুষ্ঠান, কিন্তু তবুও সফল এই spectacle। হাজার হাজার মানুষ বিরাট মুগ্ধতা নিয়ে সরকারের উন্নয়ন এর ধারাবাহিক বিবরণ চাক্ষুষ করেছে। মাননীয়ার দোর্দণ্ড প্রতাপ আর মমতাময়ী রূপের যুগলবন্দীতে অভিভূত হয়েছে।
নিয়মিত ভাবে অর্থহীন শব্দের খেলা, ইতিহাসের প্রলাপ আর মন্ত্রী আমলা কে অশোভন ধমক – এই দিয়ে বার বার অনুষ্ঠানে বাজিমাৎ করা সম্ভব হত না এক দৃঢ়প্রোথিত অনুদানভিত্তিক ছদ্ম জনবাদ এর ভিত্তি না থাকলে । গ্রাম গঞ্জ মফস্বল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে অনুদান । অনুদানের রাজনীতি নিয়ে মজা করা সহজ। কিন্তু বাস্তব কে অস্বীকার করার জায়গা নেই যে নিচের তলার একটা বড় অংশের কাছে পৌঁছেছে এর সুফল। মানুষ মুখ আর মুখোশের তফাৎ বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছে। ভিক্ষার দান নয়, মানুষ যে সুবিধা পাচ্ছে, সে তার নিজের শ্রমের অর্জন – এই বোধ তৈরি করার জন্য যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রয়োজন তা ছিল না বলেই গ্রামে গঞ্জে মানুষ নতজানু হয়ে সরকারের দান গ্রহণ করে ভোট বাক্সে কৃতজ্ঞতা জানাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রাজনৈতিক অধিকার, শ্রেণী সংগ্রামের লড়াই এর ধারণা ফিকে হতে শুরু করেছিল ২০১১ র বহু আগেই, সরকার কে চোখের মণির মত রক্ষা না করে মানুষ কে রক্ষা করতে হবে, রাজনৈতিক চেতনার প্রসার করতে হবে – এই জরুরি কথা গুলি হারিয়ে গিয়ে রাজনীতি শুধু ব্যালট বক্সের আশপাশেই ঘোরা ফেরা করত পালা বদলের বহু আগেই। আর সেই সুযোগেই দিদির সম্মোহনী জাদু বাংলার মাঠ পাথার বন্দরে ঘাঁটি গেড়ে বসে পড়ল। পাইয়ে দেবার রাজনীতির ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে এক নতুন ধারার রাজনীতির সূচনা করলেন মাননীয়া, ভূতপূর্ব বামমনস্ক অধুনা মমতাবাদী তাত্ত্বিক নেতা যার নাম দিয়েছেন ‘জনবাদী রাজনীতি’। এই জনবাদ নিয়ে হাসা যায়, কিন্তু এর বিরুদ্ধে লড়া কঠিন। মাথা বিকিয়ে নিঃশর্ত আত্ম সমর্পণের এক অসাধারন গনতন্ত্রীকরণ হয়েছে। গ্রামের কৃষক কলের শ্রমিক বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক, উপাচার্য থেকে শুরু করে মন্ত্রী আমলা প্রায় সকলেরই জীবন ব্রত “ আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার পরে”। বাংলায় শুধু একদিন নয়, সারা বছরই মমতা দিবস । তাই শিক্ষক দিবসের পোস্টারের এক কোনায় পার্শ্বচরিত্রে রাধাকৃষ্ণান, কেন্দ্রীয় চরিত্র মাননীয়া।
দিদির বিরূপ সমালোচকদের জবাব দিয়ে ‘ওঠ বজ্র কণ্ঠে গাও বাংলার গান’ শুনিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করলেন ইন্দ্রনীল সেন। এই ’জয় বাংলা’ গান টি অচিরেই বাংলার জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেতে চলেছে। ‘জাগো বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে শুরু হওয়া বাংলার এই জাগরণ তো আসলে জেগে থাকার নয়, বশীকরণ মন্ত্রে ঘুমিয়ে পড়ার। গভীর তমিস্রা ঢেকে দিচ্ছে আমাদের রাজনীতি , আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের চেতনা । কোন যৌথ সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রয়াস ছাড়া কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে এই মারণঘুম থেকে বাংলা ও বাঙালিকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব বলে মনে হয় না।










