বালানন্দ ব্রহ্মচারী হাসপাতালের আবহে বেশ একটা অনায়াস সহজতা ছিল। যেহেতু এটি একটি প্রথাগত ডাক্তারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় তাই সিনিয়র ডাক্তারদের কাছে প্রতি পদে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের দায় ছিল না আমাদের মতো রেসিডেনসিয়াল মেডিক্যাল অফিসারদের।
সিনিয়র চিকিৎসকরা ব্যস্ত থাকতেন প্র্যাকটিসে, তাঁদের নিজস্ব চেম্বার থেকে রোগী পাঠাতেন হাসপাতালে — আর ইনডোরে ভর্তি রোগী সামলাবার দায়িত্ব ছিল আমাদের উপর। অ্যাডমিটেড রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে তাঁরা পরামর্শ দিতেন ঠিকই, কিন্তু সেই চিকিৎসার পদ্ধতি এবং প্রয়োগের ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল।
পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন এক প্রবীণ শিশু চিকিৎসক, ডাক্তার দিলীপ সাহা। আমার জীবনে আমি এমন স্বল্পবাক, নিরীহ, শান্তশিষ্ট, সুভদ্র মানুষ খুব কম দেখেছি।
ওঁর উল্লেখ করতে গিয়ে ডাক্তার অনুতোষ দত্ত একবার বলেছিলেন — “মাটির ভগবান দেখেছ কোনোদিন? ঐ দিলীপ সাহাকে দেখো”–
এহেন চিকিৎসকের অধীনে কাজ করতে, নতুন কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে নিতে আমার কোনো অসুবিধেই হয়নি। আসলে ওঁর সঙ্গে তো আমার আরাধ্য জীবনদেবতা আর একনিষ্ঠ একলব্যের সম্পর্ক ছিল না, তাই স্বাচ্ছন্দ্যে ঘাটতি পড়েনি কোনোদিন।
বালানন্দ হাসপাতালে আমি আমার পূর্বপরিচিত কোনো ডাক্তারকে সহকর্মী হিসেবে পেলাম না, সব অচেনা মানুষ। অথচ সেখানে কিন্তু আমার বন্ধুর অভাব হলো না।
হাসপাতালে আরএমও অনেকজনই ছিল, কিন্তু লেডি আরএমও ছিল কেবল শিশুরোগ এবং চক্ষু বিভাগে। আমি আর মিসিসিপি। ডাক্তার মিসিসিপি ঘোষ। বর্তমানে অবশ্য মিসিসিপি রায়চৌধুরী, আমেরিকার সেই দীর্ঘকায় স্রোতস্বিনীর মতই দীর্ঘনাম্নী হয়েছে সে এখন।
আমাদের কোয়ার্টার ছিল হাসপাতালের ছ’তলার ছাদে। অ্যাসবেস্টসের চালে ছাওয়া এক কামরার ছোট্ট ঘর, সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম। সামনে ঢালা ছাদ, উন্মুক্ত প্রান্তরের মতো। তার কিনারের এক মানুষ উঁচু পাঁচিলের বাইরেই ছিল বেহালার বেঁটে স্কাইলাইন। সামনের ডায়মন্ড হারবার রোডের ট্রামলাইন থেকে ভেসে আসা ট্রামের ঘণ্টির আওয়াজ, নিচে আয়ামাসিদের রসালাপ, কিচেন থেকে ভেসে আসা বাঙালি রান্নার সুবাস, পাঠকপাড়ার মোড়ে স্থানীয় ছেলেদের হল্লা — এইসবের মধ্যেই হলো আমার প্রথম সত্যিকারের স্বাধীনতার উদযাপন, আমার নিজস্ব ঠিকানায় — মা বাবার শাসনের সীমানার বাইরে। রাসকিন বন্ডের রুম অন দ্য রুফের চেয়ে আমার এই ছাদের ঘরের মাধুর্য বিন্দুমাত্র কম ছিল না কিন্তু।
বালানন্দ হাসপাতালে যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের নতুন বাড়ির গৃহপ্রবেশ হয়ে গেল। ছোটোখাটো অসুখ বিসুখে পাড়ার লোক আমাকে দেখাতে আসত ঠিকই — তবে নৈহাটির প্রাইভেট প্র্যাকটিসের তিক্ত স্মৃতি আমার মনে তখনো দগদগে, তাই কোনো ওষুধের দোকানে আর বসিনি আমি। বাড়িতেই ঘরোয়াভাবে দেখতাম দু’চারজন চেনা- আধচেনা পড়শিকে।
এর মধ্যে একজন অল্পবয়স্ক লেডি ডাক্তার কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিশিয়ান হয়ে বালানন্দে জয়েন করলেন। সেই ডক্টর সুস্মিতা ব্যানার্জির হাত ধরে আমার এতদিনের পরিচিত সাবেকি শিশুচিকিৎসার গন্ডিটা নিমেষের মধ্যে কয়েক যোজন বিস্তৃত হয়ে গেল। আমি জানলাম নিওন্যাটালজি বা সদ্যোজাতের নিবিড় চিকিৎসার অআকখ, পরিচয় হলো ফটোথেরাপি মেশিন আর মাইক্রোড্রিপ সেটের সঙ্গে, চব্বিশ গেজের জেলকো আকছার ব্যবহার করে প্রি-ম্যাচিয়োর বাচ্চাদের ইন্ট্রাভেনাস চ্যানেল করতে শিখলাম অবলীলায়।
একদিন গাইনি ওটি থেকে ইমার্জেন্সি কল এলো। এক প্রসূতির সিজার হবে আট মাসে,কারণ আলট্রাসোনোগ্রাফি করে দেখা গিয়েছে, যে পেটে তিনটি শিশু রয়েছে — অর্থাৎ টুইন নয়, ট্রিপলেট। সুতরাং বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করে, সময়ের অনেক আগে সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সুস্মিতা ম্যাডামের সঙ্গে আমিও হাজির হলাম ওটিতে। যথাসময়ে ডেলিভারি হলো। দেখা গেল, তিনটি শিশুর ওজন যথাক্রমে এক কিলো তিনশো, এক কিলো দু’শো এবং ন’শো গ্রাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনটি শিশুই জীবিত।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঐ আঙুলের মতো সরু কব্জিতে, সুতোর মতো ক্ষীণ শিরায় তৈরি করে ফেললাম চ্যানেল – হ্যাঁ, ঐ ন’শো গ্রাম ওজনের শিশুটিরও। চালু হলো অক্সিজেন, রুম হিটার, ফটোথেরাপি, নানা রকম ওষুধপত্র। তারপর শুরু হলো অসম্ভবের সঙ্গে লড়াই।
ন’শো গ্রামের শিশুটি বাঁচেনি, কিন্তু প্রায় মাসখানেকের যুদ্ধের পরে অন্য দুটি শিশু ডিসচার্জ করার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেল। তাদের ওজন তখন যথাক্রমে দু’কিলো একশো গ্রাম এবং এক কিলো আটশো গ্রামে দাঁড়িয়েছে।
ছুটির দিনে কিন্তু তরুণী মায়ের মুখে হাসি দেখতে পেলাম না। মেয়েটিকে তার মা বাবা নিতে এসেছিলেন। শিশুদের বাবার খোঁজ করলে, মেয়েটির বাবা করুণ মুখে জানালেন, তাঁদের মেয়ের প্রথম সন্তান একটি কন্যা। দ্বিতীয়বার তিন তিনটে বাচ্চাই মেয়ে হওয়ার খবর পেয়ে জামাই আর দেখতে আসেনি। তিন জনের একজন মরেছে বলে তাকে সংবাদ পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু আগের একজন আর এই দু’জন – সব মিলিয়ে তিনটি কন্যাসন্তানের বাবা হওয়ার গভীর বেদনায় সেই বীরপুরুষ আর এ মুখো হয়নি, কোনোদিন হবে সে নিশ্চয়তাও নেই।
ন্যাশনাল মেডিক্যাল আর জে এন এমের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বালানন্দের দিনগুলোর আরও একটা গভীর ফারাক ছিল। আগে আমার সহকর্মীদের মধ্যে ডাক্তার ও সিস্টার ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কারোর নাম জানতাম না আমি — সত্যি বলতে কি জানার আগ্রহও সেভাবে হয়নি। কলেজে প্রফেসর, বন্ধু আর সিনিয়র দাদা-দিদিদের নিয়ে একটা বৃত্ত ছিল আমার। তার বাইরে খুব একটা চেনার চেষ্টা করিনি কাউকে। তাছাড়া খানিকটা অন্তর্মুখীও ছিলাম বৈকি।
আর কল্যাণীর হাসপাতালে তো স্যার আর তাঁর কাজ — এর বাইরে চোখ মেলে পৃথিবীটার দিকে ভাল করে চেয়ে দেখার অবকাশই দিইনি নিজেকে!
কিন্তু এই আটপৌরে হাসপাতালে এসে আমি যেন কিছুটা বদলে গেলাম।
আমার ছোট্ট পকেট ডায়েরিটাতে ডাক্তার অনুতোষ দত্ত, দিলীপ সাহা, মিসিসিপি ঘোষের নাম-ফোন নম্বরের পাশাপাশি লেখা হলো প্যাথলজির টেকনিশিয়ান সুভাষদা, আমার ছ’তলার কোয়ার্টারের সুইপার দীপালি, লিফটম্যান বিজয় আর ড্রাইভার আদক দা’র নাম আর যোগাযোগের নম্বর। হ্যাঁ, প্রয়োজনে তো অবশ্যই, তবে সেটাই সব নয়। আমি যেন নিজের চারপাশের অদৃশ্য দেওয়ালটা নিজেই ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছিলাম। এই একলষেঁড়ে ‘আমি’টার যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল ঐ চার দেওয়ালের নির্জনতার মধ্যে।
মিসিসিপি বলত — “তুমি বড় হয়ে উঠছ সুকন্যাদি!”
বড় হওয়া মানে যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়া, অনির্দিষ্ট মন খারাপের মুখোমুখি হওয়া, মাপা আবেগের মুখোমুখি হওয়া। বড় হওয়া মানে মৃত্যুরও মুখোমুখি হওয়া।
ডাক্তার শংকর বসাক ছিল বালানন্দের আইসিসিইউয়ের আরএমও। সপ্তাহে দু’দিন কি তিনদিন বারো ঘন্টার শিফটে কাজ করত সে। সামনাসামনি কোনোদিন কথাবার্তা হয়নি তার সঙ্গে।
একদিন শুনলাম সে অসুস্থ। জ্বর হয়েছে। ছুটি নিলো ক’দিনের। তারপর শুনলাম, জ্বর বেড়ে যাওয়ায়, নিজে থেকেই হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছে।
ভাবলাম আউটডোর শেষ করে একবার দেখতে যাবো। হাজার হোক, সহকর্মী।
আউটডোরের পরে একটা সিজারিয়ান অপারেশন ছিল, পেডিয়াট্রিক্সের লোক হিসেবে হাজির থাকতে হয়েছিল সেখানে। বেরিয়ে শুনলাম বসাকের অবস্থার অবনতি হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া দিচ্ছে না শরীর, বুকের এক্স-রেও খুব শোচনীয়। ইউরিনের পরিমাণ গত ছ’ঘন্টায় আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গিয়েছে। আরও শুনলাম, তার জ্ঞান কিন্তু রয়েছে টনটনে। নিজের এক্স-রে প্লেট দেখে নিজেই ‘ভালো বুঝছি না’ বলে মন খারাপ করে গুম হয়ে শুয়ে পড়েছিল দুপুরে, সিস্টারদের অনেক সাধাসাধিতেও খায়নি কিছু।
এর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কোমায় চলে যায় শংকর বসাক। তার জ্ঞান আর ফেরেনি। সেপটিসিমিয়ার কারণ খুঁজে পাননি ডাক্তাররা। সহ চিকিৎসকরা গাফিলতির অভিযোগে সরব হয়েছিলাম — লাভ কিছু হয়নি। বৃদ্ধ বাবা মা ছাড়া তার হয়ে লড়বার আর কেউ ছিল না।
আমরা, বালানন্দের সব কর্মচারীরা ডক্টর বসাকের জন্য একটা ফান্ড তৈরি করলাম। যার যতটুকু সাধ্য যেন ডোনেট করে সেই ফান্ডে, এই আবেদন রাখলাম সকলের কাছে। শংকর বসাকের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশে — কলকাতায় স্থিতু হবার ইচ্ছে বুকে নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল আর নার্সিং হোমে খেপ খাটতে শুরু করেছিল সে, টাকা রোজগারের তাগিদে। শেষে গড়িয়ার বোড়ালের রক্ষিতের মোড়ের কাছে এক ফালি জমি কিনতে সক্ষম হয়। আশা ছিল, আরো কিছু পয়সাকড়ি জমলে পাকা বাড়ি তৈরিতে হাত লাগাবে। বুড়ো বাপ মাকে বাংলাদেশ থেকে আনিয়েও নিয়েছিল সেই ভেবে।
তারপর — নিয়তির ডাকে সব যোগাড়যন্ত্র ফেলে রেখে, কাউকে কিচ্ছু না বলে কোন ঠিকানাহীন দিকশূন্যপুরে যে হারিয়ে গেল, কে জানে?
ডাক্তার অনুতোষ দত্ত একটি অফিশিয়াল কনডোলেন্স লেটার লিখে, শংকর বসাকের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন স্থির করলেন। আর সেই বার্তাবাহক মনোনীত হলাম আমি। সঙ্গী হলেন আরও একজন সিনিয়র ডাক্তার, চন্দন সাহা।
দুই অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সেই কূল হারানো, নিঃস্ব দৃষ্টি আর হাঁ করে আমাদের হাতের সেই সাদা খামের শোকবার্তার দিকে চেয়ে থাকা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
আমার ক্যালিডোস্কোপিক জীবনের নানা রঙের ঘটনাও সেই অসীম বেদনার্ত ক্ষণটিকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি কখনো।
আজও শংকর বসাকের মর্মান্তিক মৃত্যুর আকস্মিকতার স্মৃতি আমাকে সেদিনের মতোই আছড়ে ফেলে অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে। আমি ডুবে যেতে থাকি,তলিয়ে যেতে থাকি, প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চাই জীবনের অন্তিম খড়কুটোকে। পারি না।
এই একটি ঘটনা আমাকে যেন ঝুঁটি ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল কঠিন বাস্তবের সামনে।
“লুক, সুকন্যা — লাইফ ইজ নট এ সিন্ডারেলা স্টোরি!”
আমার পায়ের তলায় শক্ত মাটি চাই, অস্থায়ী চাকরির তাঁবু থেকে বেরিয়ে পোক্ত একটা ছাদের ঘরের আশ্রয় চাই আমার। আমার নিজের তৈরি আশ্রয় — কিন্তু কেবল নিজের জন্য নয়, ঐ মানুষ দুটোর জন্য, যাদের চোখে ও’রকম অসহায়, রিক্ত দৃষ্টি আমি সহ্য করতে পারব না কোনোদিন।
আমি কি হতে চেয়েছিলাম আর কি হতে পারিনি তাই নিয়ে আকাশকুসুম ভেবে বেলা গড়িয়ে দিয়েছি অনেক — এবার কাজের পালা। যেটুকু সামান্য পুঁজি রয়েছে আমার, সেটুকুর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার পালা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেলথ সার্ভিস ক্যাডারের লিখিত পরীক্ষার জন্য অ্যাপ্লাই করে দিলাম শেষ পর্যন্ত।
বড় হওয়া মানে যে নিজের এবং বাবা মায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবার জন্য নিজের অনিচ্ছুক কাঁধ দুটোকে মজবুত করে তৈরি করা, সেটা বড্ড হঠাৎ করেই বুঝে গিয়েছিলাম আমি।
(ক্রমশ)









