নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের সময় বলে কিছু হয়না — সকল সুখের রসনাবিলাসের মধ্যেই অল্পবিস্তর দুঃখকষ্টের ফোড়ন থাকে, থাকতেই হয়। নয়ত বড় পানসে হয়ে যায় জীবনের স্বাদ।
বালানন্দ হাসপাতালে আমার চাকরির দিনগুলো অবিমিশ্র সুখের ছিল না ঠিকই, তবে আনন্দ আর নিরানন্দের একটা স্বস্তিকর সামঞ্জস্য ছিল।
আমাদের বাড়িটা তখন একতলার মাটির টান ছাড়িয়ে আকাশের দিতে উদ্ধত হাত ছুঁড়ছে, বাবা মায়ের উচ্চাশার স্বাক্ষর লেখা হচ্ছে দোতলার গাঁথনিতে। বাবা আমার রোজগারের টাকার পরোয়া না করে সব জমা পুঁজি ঢেলে ফেলেছে বাড়িতে, আমার উপর জমা অভিমানেই কিনা কে জানে!
আমি সারা সপ্তাহ হাসপাতালে থাকলেও বাড়ি আসতাম প্রতি শনিবারে। শনি রবি বাড়িতে কাটিয়ে সোমবার ফের ফিরে যেতাম আমার ছাদের ঘরে।
তখন মোবাইলের যুগ শুরু হয়নি — বালানন্দের ল্যান্ডলাইন থেকে প্রতি রাতে বাড়িতে ফোন করে কথাবার্তা হতো মায়ের সঙ্গে। মিনিট পাঁচ দশের কুশল বিনিময় – নিষ্প্রাণ, গতানুগতিক।
তাই জানতে পারিনি বাবা আবার একটা চাকরি নিয়েছে। মধ্যমগ্রামে – একটা প্রাইভেট ফার্মে, লিগ্যাল কনসালট্যান্ট হিসেবে। বাষট্টি বছর বয়সে, হার্টে ইসকিমিয়ার কামড় নিয়ে রোজ এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুর থেকে মধ্যমগ্রাম যাতায়াত করছে দু’খানা বাস পাল্টে। আমার জলে ভরে আসা চোখ দুটো থেকে রূপকথার মায়াকাজলের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিল এই খবরটা।
চোয়াল শক্ত করে মুদিয়ালির পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাদা বাড়িটায় ঝোলানো রাজ্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ডাক্তারদের ফার্স্ট লিস্ট দেখতে গেলাম আমি। সেই তালিকার মাঝামাঝি জায়গায় আবিষ্কার করলাম নিজেকে।
প্রাইভেট হাসপাতাল আর নার্সিংহোমের দরজায় দরজায় ঘুরে গ্রাসাচ্ছাদন জোটানোর দিন শেষ। শেষ রিনিউয়াল না হবার, ঝট করে চাকরি খোয়ানোর, বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট না হওয়ার অনিশ্চয়তা। এবার শেষ হবে বাবা মায়ের দৃষ্টির অব্যক্ত অভিমান আর অনুযোগের। বাবাকে আর ভাবতে হবে না সুদূর ভবিষ্যতের কথা – “চাকরি না করলে খাবো কি? শুধু ভয় করে শরীর যদি আর না দেয়?”
চিন্তা কোরো না বাবা, তোমার অভিমন্যু এবার ঢুকে পড়ছে চক্রব্যূহে, তোমাদের সব দুশ্চিন্তার বিনাশ না করা অবধি তার শান্তি নেই। নিজের কথা সে অনেক ভেবেছে এতকাল, আর নয়। যে পথ ধরে সে এতকাল হেঁটে এসেছে অনিচ্ছায়, এখন আর চেষ্টা করলেও ফিরে যেতে পারবে না। ফিরতে সে চায়ও না – সামনের অযুত সম্ভাবনা তাকে ডাকছে। সে এগিয়ে যাবে, দেখবে, কি আছে পথের শেষে।
আমার সরকারি চাকরি প্রাপ্তির খবরে বালানন্দ হাসপাতালে একটু চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো। মিসিসিপি ভীষণ খুশি হলো। “এই চাকরিটার তোমার ভীষণ দরকার ছিল সুকু”—পি এস সি-র প্রথম লিস্টে আমার নাম বেরোবার পরে এটাই ছিল ওর প্রথম প্রতিক্রিয়া।
স্বল্পবাক ডক্টর দিলীপ সাহা বললেন – “মা-বাবাকে সাধ্যমত দেখাশোনা করতে চেয়েছিলে, ভগবান কেমন তার ব্যবস্থা করে দিলেন দেখো।”
ডক্টর অনুতোষ দত্ত কিন্তু খুশি হন নি। বেশ রাগত গলায় বলেছিলেন -“এখানে কি অসুবিধে হচ্ছিল শুনি? যাও, গ্রামে যাও, মজা টের পাবে। সরকার তো ঠিক সময়ে মাইনে টাইনে কিছুই দেবে না, গ্রামের লোক চিকিৎসা টিকিৎসা করিয়ে ক্ষেতের কুমড়ো, পটল, ঢ্যাঁড়শ, মুলো এইসব দিয়ে যাবে – তাই রেঁধে খেতে হবে! বুঝবে ঠেলা!”
গাইনির ডাক্তার রঞ্জিত বিশ্বাস, আমার খুব প্রিয় রঞ্জিতদা মিষ্টি হেসে বললেন — “গাঁয়ে কিন্তু বেশির ভাগই গাইনি আর লেবার পেশেন্ট। কিস্যু তো জানো না, অন্তত নর্মাল ডেলিভারি আর এপিসিওটমি সেলাইটা একটু ঝালিয়ে নিও আমাদের কাছে। নয়ত মুশকিলে পড়বে ভাই।”
সেই শুনে আমার শুকনো মুখ দেখে গাইনির আরএমও বিনয় অভয় দিল —“অত ভেবো না তো! আমি জানি হেলথ সেন্টারে সব ডেলিভারি সিস্টার দিদিরা করান, তোমাকে হাতই দিতে হবে না — আর, গণ্ডগোলের কেস দেখলে স্রেফ দু’লাইন লিখে ডিসট্রিক্ট বা সাব ডিভিশনে রেফার করে দেবে। ব্যস, ঝামেলা ফিনিশ!”
শুনে আমি হাসলাম বটে, কিন্তু দুশ্চিন্তাটা রয়েই গেল। ও’রকম বেড়াল পার করার মতো পেশেন্টের দায়িত্ব ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলা যায় নাকি? ইশ, হাতে কলমে গাইনেকলজি বিষয়টা শিখতে কেন যে এত অনীহা ছিল আমার। এখন কে শেখাবে আমাকে হাতে ধরে? কে?
ফার্স্ট লিস্ট বেরোনোর পরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেতে পেতে আরও ছ’মাস গড়িয়ে গেল। অবশেষে উনিশশো আটানব্বইয়ের নভেম্বর মাসের গোড়ায় জানতে পারলাম যে উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালে, জেনারেল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে আমাকে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
যবে থেকে চাকরির পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে, আমার সম্ভাব্য পোস্টিং এর জায়গা নিয়ে বাড়িতে একটা চাপা টেনশন ছিল। আমি জানতাম, বাড়ির ঠিকানা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা হওয়ায় এই জেলার কোথাও আমার পোস্টিং হবে না, কারণ চাকরির শর্তই ছিল তেমন যে, কাউকে হোম ডিসট্রিক্ট দেওয়া হবে না। আমি বাঁকুড়া বা বীরভূমের কথা ভেবে রেখেছিলাম। মুর্শিদাবাদ বা মালদা হতে পারে এমনও প্রত্যাশা ছিল। আসলে আদ্যন্ত শহুরে ‘আমি’-র কাছে এই জেলাগুলো ছিল চেনা নাম। তাই উত্তর দিনাজপুর শুনে আমি ভীষণই দমে গেলাম। মালদারও উত্তরে, বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা এই অল্পচর্চিত জেলাটি আমার সীমিত জ্ঞানে তার ঝাপসা উপস্থিতি আর আবছা ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে আমাকে যুগপৎ আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ করতে লাগল।
আমার চিরকঠিন মা পর্যন্ত পোস্টিংএর জায়গার নাম শুনে স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাকুল গলায় বলে উঠেছিল, “উত্তর দিনাজপুর! সে আবার কোথায় রে? মালদা থেকেও আরও দু’ঘন্টার পথ শুনছি — সে তো অনেক দূর, খুকু!”
আমি অবাক হয়েছিলাম।”দূর তো কি হয়েছে মা? তোমরাও তো থাকবে আমার সঙ্গে।”
মা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলেছিল -“তোর বাবা চাকরিটা ছাড়বে না রে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এত কষ্ট করে বাড়ি করালো, থাকবে না সেই বাড়িতে? আর তোর বাবাকে এই বয়সে একা ফেলে আমি যেতে পারি তোর সঙ্গে, বল? আমরা তো মাঝে মাঝেই যাবো তোর কাছে – তুইও আসবি এখানে। এমনিতেও তো তুই সেই হোস্টেল লাইফ থেকেই বাড়িছাড়া, এখনো তো সেই শনি রোববারেই বাড়ি আসিস—”
মায়ের কথাগুলো কি সেভাবে আঘাত করেছিল আমাকে? না তো! চিরকালের স্বপ্নজীবী সুকন্যার চোখে তখন অন্য এক অনাস্বাদিত জগতের হাতছানি —
একটা ছিমছাম ছোটো একতলা কোয়ার্টার, তার জাফরি কাটা খুপরি জানলায় ফুলছাপা পর্দা, লোহার সিঙ্গল খাটে টানটান করে পাতা জয়পুরি চাদর, একফালি রান্নাঘরের কোণে জলের কলসি আর কেরোসিনের স্টোভের পাশে বেতের টুকরিতে গুছিয়ে রাখা অল্প শাক সবজি —
সেই কোয়ার্টারের সামনে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা মস্ত ঘোড়ানিম গাছ, আর তার নিচে, গায়ে কমলা রঙের শাল জড়িয়ে কাঁচা রোদ্দুর ছড়ানো ভোরবেলায়, নরম ঘাসে পা ডুবিয়ে হাঁটছি আমি। আমার ফেটে যাওয়া গোড়ালিতে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে ভোরের শিশির —
উনিশ শো আটানব্বইয়ের নভেম্বর মাসের বারো তারিখে, উত্তর দিনাজপুরের জেলা সদর রায়গঞ্জের কর্ণজোড়ায় সিএমওএইচ অফিসে সরকারি চাকরির যোগদানের নথিতে সই করলাম আমি।
আর তার তিন দিন পরে, রায়গঞ্জ থেকে আরও পঁচিশ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট একটা হাটুরে মফস্বল শহরের অন্ধকার হাইওয়ের ধারে, বাস গুমটির সামনে থেকে কলকাতার বাসে চেপে বসল বাবা-মা। আমি একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কলকাতা থেকে সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরত্বের একটা অচেনা আধাশহরের জনবিরল রাস্তায়, বহু দূরে, জমাট অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে একটা দূরপাল্লার বাসের রক্তচক্ষু টেললাইট।

হেমন্তের তারাখসা আকাশের ছাদের নীচে আমার ভীরু চোখ থেকে গড়িয়ে আসা দু’ফোঁটা গোপন অশ্রুর সাক্ষী হয়ে রইল একটা অচেনা, টিমটিমে মফস্বল শহর — কালিয়াগঞ্জ।
(ক্রমশ)










