আশ্বিনের প্রাক শারদীয়া সন্ধে, বুধবার
অনেকদিন ডায়েরি লেখা হয়নি। বিষয়বস্তুর অভাব ঘটেনি, মনকে সংহত করতে অপারগ হয়েছি।
পথে আলো, ঘাটে আলো, হাটে-বাটে-মাঠে আলো, আকাশে বাতাসে ঈশ্বর তথা মনুষ্যসৃষ্ট হাজার আলোকমঞ্জীরের অভিঘাতে চোখ এবং মন দুই-ই ধাঁধিয়ে গিয়েছে।
আচ্ছা, ঠিক যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে আজ আমার মনের ভাব প্রকাশ করছি, দশ বছর পরে পশ্চিমবাংলায় এমন করে কেউ ডায়েরি লিখবে? এমন উদ্ভট সব শব্দমালা গেঁথে গেঁথে ভরিয়ে তুলবে লেখার সাজি? সংশয় হয়।
গতকাল সন্ধেবেলা আলোকিত রেড রোড ধরে আসতে আসতে রাজ্যের প্রতিটি জেলার সুচিত্রিত এবং সুসজ্জিত ফ্লেক্স চোখে পড়ল রাস্তার দু’ধারে। উত্তর দিনাজপুর নামটি দেখে চোখ অজান্তেই ঝাপসা হয়ে গেল। অথচ নিশ্চিত জানি, মানসপটে যে গ্রাম্য, পিছিয়ে পড়া জেলাটি তার সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিয়ে পরম মমতায় সারাজীবনের জন্য আঁকা হয়ে গিয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান উন্নত উত্তর দিনাজপুরের বিশেষ সাদৃশ্য নেই। তাতে কী?
এখনও দুর্গাপুজো বলতে বাবার সঙ্গে রিকশায় যেতে যেতে আধো অন্ধকার বিটি রোডের ধারে সবুজ টিউবলাইট আর রঙবেরঙের টুনিবাল্বে সাজানো ন্যাশনাল টোব্যাকোর মাঠের মৃন্ময়ী মায়ের মুখই প্রথম ভেসে ওঠে মনে।
কলেজজীবনে পুজোর একটা দিনে মায়ের সঙ্গে মিল কোয়ার্টার থেকে রিকশা করে আশেপাশের ঠাকুর দেখা ছিল অবশ্যকর্তব্য – রিকশাওয়ালা ঘন্টা পিছু কত করে নিত আজ আর মনে নেই।
কালিয়াগঞ্জেও পুজোয় মাকে নিয়ে বেরোতাম – দাসমুন্সি বাড়ির একচালার প্রতিমা, শেঠকলোনির জগমগে বোম্বাই অনুকরণের আলোকসম্পাতের সঙ্গতে আধুনিক দেবীমূর্তি, মহেন্দ্রগঞ্জ আর ইশকুলপাড়ার সাবেকি ঠাকুর – সব দেখার বাহন সেই একই, রিকশা।
সারদাপার্কে এসেছি তিরিশ বছর হয়ে গেল। বাবা যে বছর চলে গেল, সেই বছরই শেষবার মাকে নিয়ে রিকশা চেপে দুর্গাঠাকুর দেখা আমার। শিবরামপুর ক্লাব, কেঠোপোল সম্মিলনী, শকুন্তলা পার্ক এভারগ্রিন ছাড়িয়ে রায়দিঘির শীতলামন্দির অবধি গিয়েছিলাম মনে আছে। ফেরার পথে রাস্তার ধারের দোকান থেকে চিলিচিকেন কিনে নিয়ে আসা হয়েছিল, রাতে রুটির সঙ্গে খেয়েছিলাম তিনজনে। সেটা ছিল অষ্টমী। দশমীতে টিভির মেট্রো চ্যানেলে দেখিয়েছিল ‘সোনার কেল্লা’। তিনজনে বসার ঘরে থেবড়ে বসে বহুবার দেখা ছবি দেখেছিলাম একসঙ্গে – শেষবারের মতো।
একাদশীতে বাবা ভর্তি হতে গেল হাসপাতালে। সেটা অক্টোবরের চব্বিশ তারিখ। এগারো দিন পরে ছুটি হয়ে গেল বাবার – বোহেমিয়ান বুড়ো চলে গেল নিরুদ্দেশে।
আর কখনও রিকশা চড়ে ঠাকুর দেখা হয়নি আমার। রিকশার সংখ্যাই কমে গিয়েছে কত।
নিজের সাধের চারচাকা কেনার আগে, বেহালা চৌরাস্তা থেকে অটোতে এসে বেশিরভাগ দিনই নেমে পড়তাম শিবরামপুর চৌমাথায়। বাজারহাট করার থাকত কিছু না কিছু। বাড়িটা পাড়ার অনেকটা অন্দরে হওয়ায়, শিবরামপুর থেকে রিকশা নিতেই হতো। কয়েকজন চালকের সঙ্গে রীতিমতো আলাপ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল, পারস্পরিক সুখদুঃখের গল্প হতো অনেক।
“মা এখন কেমন আছে, দিদি?”
“আপনার বাবা মস্ত বাজাড়ু ছিলেন কিন্তু, ফি রোববার আসতেন – বাড়ির গেটে নেমে আর ব্যাগ বইতে পারতেন না, আমি কতবার পৌঁছে দিয়েছি রান্নাঘর অবধি”।
“মেয়েটা এবার উচ্চমাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করেছে, জানেন তো? এই যোতশিবরামপুর গার্লসে প্রথম পাঁচজনের মধ্যে আছে – ওকে বিবেকানন্দ কলেজে ভর্তি করে দেব ভাবছি। আমাদের ঘরে তো আর ডাক্তার বদ্যি তৈরি করতে পারব না – গ্র্যাজুয়েট অন্তত হোক, কী বলেন দিদি?”
ওঁদের আমি দাদা বলে সম্বোধন করতাম, ওঁরা দিদি বলেই ডাকতেন আমাকে।
আমি গাড়িটা কেনায় খুব দুঃখিত হয়েছিলেন, মনে আছে।
সেদিন শিবরামপুর চৌমাথা পেরোনোর সময় স্ট্যাণ্ডে একজন পুরোনো ‘দাদা’কে দেখতে পেলাম – পা-দানিতে বসে রয়েছেন মাথা নামিয়ে। যাপনক্লান্তি কী হরণ করে নিয়েছে তাঁর স্বপ্ন দেখার শক্তিকে? নেমে জিজ্ঞাসা করা আর হয়ে ওঠেনি। কত প্রশ্নের উত্তর এমন অজানাই থেকে যায়, যাবেও।
পুজোর জৌলুস আর রঙ, আলো আর উচ্ছ্বাস বেড়েছে না কমেছে, দেশের বিক্ষুব্ধ অস্থির আর্থসামাজিক পরিবেশে স্বস্তি আসছে না চলে যাচ্ছে, সমাজমাধ্যমে অধৈর্য ঘৃণা ও বিতণ্ডার চাষ সাময়িক না চিরস্থায়ী – এই সব কূট তর্কে যেতে চায় না উদাসীন মন।
আনন্দ কৃপণ, নিঃশব্দ পদক্ষেপে আমার আঙিনা পেরিয়ে যায় অলক্ষে – তাকে পিঁড়ি পেতে বসতে দেওয়ার তাগিদ আমারও থাকে না বড় একটা।
আমার কাছে এখন আনন্দ বলতে নীরক্ত ব্লাডব্যাঙ্ক থেকে জনাকয় থ্যালাসেমিয়ার শিশুর বরাদ্দ রক্তটুকুর জোগাড় করে দিতে পারা। সারাবছর ধরে যে কয়েকটি অভাবী মানুষ তাদের ‘অড জব’গুলি সার্থকভাবে সুসম্পন্ন করার ফলে অল্প কর্মী সম্বল করেও ব্লাডব্যাঙ্কের ঘূর্ণায়মান চাকা কখনওই অবরুদ্ধ হয় না, সেই মুন্না, শম্ভু, তারাশঙ্করদের হাতে কিছু অতিরিক্ত টাকা পুজোর উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া।
আর একা একাই দূর মফস্বলের তথাকথিত ম্যাড়মেড়ে, জাঁকজমকহীন মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে অনামা শিল্পীদের গড়া অনুপম মাতৃমূর্তিদের মাঝে আমার গর্জনতেল মাখা শৈশব-কৈশোরকে খুঁজে ফেরা।
হে চিন্ময়ী———
নবনীলিমায় বাজে মহাভেরী
দিকে দিকে তব মাধুরী যে হেরি
সুললিত তালে তালে সুধা আনে
আলোকেরই সাথে –
হে চিন্ময়ী —
ছবি : আন্তর্জাল










