চলুন একটু ছোট বেলায় ঘুরে আসি। ভাবছেন? তা কীভাবে সম্ভব? আরে সম্ভব। সেই সুদূর অতীতে ফেলে আসা সময়ের কোনো একটা জবরদস্ত স্মারককে আমাদের সবার মাঝে এনে ফেললে তার অনুষঙ্গেই যে আমাদের ছোট বেলায় ফেরা সম্ভব হবে। ভাবছেন তো কী সেই আশ্চর্য স্মারক ? একটা মজার ছড়া যাঁর রচয়িতা হলেন বিখ্যাত লেখক তথা ছড়াকার যোগীন্দ্রনাথ সরকার। ছড়ার নাম – মজার দেশ। অনেক অনেক ওলটপালটে ভরা এক আশ্চর্য দেশের কথা শুনিয়েছেন কবি। আসুন পড়ে দেখি তারই একটা স্তবক —
এক যে আছে মজার দেশ….
আকাশ সেথা সবুজ বরণ
গাছের পাতা নীল;
ডাঙায় চরে রুই কাতলা
জলের মাঝে চিল!
কি ! সবটাই আজগুবি বলে মনে হচ্ছে ? সেটাও যে অস্বাভাবিক নয় মোটেই। এমন ঘটনা আবার ঘটে নাকি ? ঘটে ঘটে । জলের মাছ ডাঙায় উঠে আসে। তোমরা তা জানতি পার না। গভীর সমুদ্রের আবাসিক মাছের এভাবে জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসার কাহিনিই আমরা এবার শুনবো Alison Laferriere’ র মুখে।
এ্যালিসন একজন গবেষিকা। ক্যালিফোর্নিয়ার The Scripps Institution of Oceanography তেই তাঁর কাজকর্ম। প্রতিদিনের অভ্যাস মতো সেদিনও তিনি তাঁর পোষ্য একান্ত প্রিয় সারমেয়টিকে নিয়ে ভোরের সৈকতে বেড়াতে বেড়িয়েছেন। হঠাৎ তাঁর নজর আটকে গেল খানিকটা তফাতে পড়ে থাকা এক লম্বাটে গড়নের বস্তুর প্রতি। এ্যালিসন প্রথমে ভাবলেন, নির্ঘাৎ কোনো আবর্জনা ! ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে বেলাভূমিতে এসে আটকে পড়েছে। এ তো বলে কয়েও মানুষজনকে সচেতন করে ওঠা গেলনা। মনে মনে খানিকটা অসহায় হয়ে পড়লেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়ার শান্ত এনসিনিটাস শহরের গ্র্যান্ডভিউ বিচ মুহুর্তেই সরগরম হয়ে উঠলো এ্যালিসনের আবিষ্কারকে ঘিরে। যাকে দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল নিছকই এক ভেসে আসা জঞ্জাল, কাছে এসে এ্যলিসন বুঝতে পারলেন গভীর সমুদ্র থেকে সৈকতে উঠে আসা এই জঞ্জালটি আসলে হলো একটি অতি লম্বাটে চেহারার মাছ। নাম Oarfish বা বৈঠা মাছ (?)।
আসুন , এই অতিথি সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিয়ে নেওয়া যাক্। সারা দুনিয়ার সমুদ্রগুলোর এক স্বাভাবিক অধিবাসী হলো এই জায়ান্ট ওরফিশ বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় Regalecus glesne. Regalecidae পরিবারের সদস্যভূক্ত এই মাছেরা একান্তই oceanodromous বা সমুদ্রচারী। মরু অঞ্চলের শীতল জলরাশি ছাড়া এদের দেখা মেলে প্রায় সর্বত্রই। তবে দেশভেদে এদের নামের বৈচিত্র্য আছে।কারও কাছে এই মাছটির পরিচয় রিবন ফিশ বা ফিতে মাছ, কেউ বলে স্টিমার ফিশ্ ; হেরিংকুলের রাজা বলে ডাকে কেউ , আবার কারও কাছে এর পরিচয় doomsday fish বা বিপর্যয়ের মাছ হিসেবে।
বিজ্ঞানীদের মতে এই মাছটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ray finned fish. রিবন বা ফিতের মতো ছিপছিপে গড়নের লম্বাটে চেহারার এই মাছের পৃষ্ঠ পাখনা বা dorsal fin টি একেবারে লেজের শেষভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মাছের pectoral fin বা বক্ষ পাখনা দুটি খাটো এবং বেশ শক্ত পোক্ত গড়নের। আর পায়ু পাখনা বা pelvic fin দুটি নৌকার বৈঠা বা দাঁড়ের মতো দেখতে। পাখনার এই বিশেষ ধরনের গঠনের জন্যই মাছটিকে Oarfish বা বৈঠা মাছ বলা হয়। শরীরের রং মুখ্যত রূপালি ও আকাশি নীল এবং তার ওপর রয়েছে গাঢ় কালচে রঙের ছোপ । পাখনাগুলো সবই ক্রিমসন বা হালকা গোলাপি রঙের। লম্বা, দীর্ঘ শরীরের কারণে জলের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে যাবার সময় বেশ আঁকাবাঁকা, সর্পিল ভঙ্গিতে যায়। ফলে অনেকেই একে সমুদ্র সর্প বা sea serpent ভেবে বসে। ১৭৭২ সালে Peter Ascanius সর্বপ্রথম এই মাছটির দেখা পান নরওয়েতে। তারপর থেকেই এই মাছ নানা দেশে নানা নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
এমন এক প্রাণি ,যার নিবাস সমুদ্রের অনেকটাই গভীরে,যদি হঠাৎ করে ডাঙায় উঠে আসে তাহলে তো তাকে নিয়ে নানান কথা তৈরি করা হবে লোককথা বা লোকপুরাণের জনপ্রিয় আখ্যানের আকারে। ওরফিশের বেলাতেও তেমনি ঘটেছে। সুদূর জাপানের লোককথায় এই মাছটিকে প্রত্যাসন্ন বিপর্যয়ের ভগ্নদূত বলে মনে করেন সেই দেশের মানুষেরা। এমন কুসংস্কার সব দেশেই আছে। টাওয়ার অফ লন্ডনের দাঁড়কাক থেকে শুরু করে কালো বেড়ালের রাস্তা কেটে যাওয়া কিংবা সাতসকালেই এক শালিখ দেখা – সবই এমন আসন্ন বিপদের বার্তাবহ বলে মনে করেন একদল মানুষ।
তাইওয়ানের রুইফাঙ্ বন্দর। ভোররাত থেকে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থেকে ট্রলার ভর্তি সমুদ্রের পশরা নিয়ে বন্দরে ফিরছিল একদল মানুষ। হঠাৎ ট্রলার চালকের নজরে পড়লো পাড়ের খুব কাছাকাছি ভেসে থাকা সূর্যের আলোয় চকচক করতে থাকা রূপালি রঙের জলযান। গভীর সমুদ্রের জল থেকে উঠে আসা এ কোন্ আশ্চর্য যান? ডুবোজাহাজের মতো খাড়া ভাবে উঠে আসে সেটি। ট্রলার চালক প্রায় প্রতিদিনই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ফিরছেন,কই এমন প্রাণির দেখা তো কস্মিনকালেও পাননি! তাহলে? গল্পের গরু গাছে ওঠে। আর এ তো জলের মাছ!!
ঠিক কবে থেকে এই মিথের জন্ম হলো জাপানে ,তা নিয়ে অবশ্য কিছুটা মতপার্থক্য আছে। তবে সপ্তদশ শতকের কাহিনিতেই এই ভুতুড়ে মাছের উল্লেখ পাওয়া যায়। জাপানের লোকজনদের কাছে অবশ্য এই মাছের পরিচিতি ছিল ryugu no tsukai নামে। জাপানি ভাষায় এর অর্থ হলো “ সমুদ্র দেবতার প্রাসাদ থেকে আগত দূত”। এরপর বহুদিন কেটে গেছে। এই মাছের কথা আর তেমন ভাবে শোনা যায়নি।
২০১১ সালে এই মাছকে ঘিরে পুরনো বিশ্বাস আবার নতুন করে চাগার দিয়ে উঠলো। ঐ বছরই প্রায় কুড়িটি ওরফিশের ডাঙায় উঠে আসার ঘটনা নজরে আসে এবং তার পর পরই প্রবল ধংসাত্মক ভূমিকম্পের ফলে তছনছ হয়ে যায় জাপান, উত্তাল হয়ে ওঠে সমুদ্রের জল, সৃষ্টি হয় মারণ সুনামির , ভেসে যায় বহু সংখ্যক মানুষ। যা ছিল নিছকই এক লোকবিশ্বাস, এই ঘটনার পর তা ফিলিপাইন্স থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত সর্বত্রই harbinger of disaster বা বিপর্যয়ের বার্তাবাহক হিসেবে নতুন করে বিশেষ মান্যতা পেতে শুরু করে।
বড়ো মাপের ভূমিকম্পের পেছনে ওরফিশের ডাঙায় উঠে আসার বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু না বললেও বিজ্ঞানী মহলের একাংশ এই প্রসঙ্গে বলেন যে, “সমুদ্রের নিচে থাকা চ্যুতি রেখা বরাবর কোনো রকম আলোড়ন ঘটলে মাছেদের পক্ষে তা আগাম আন্দাজ করতে পারা খুবই স্বাভাবিক। ফলে তারা আত্মরক্ষার জন্য নিচ থেকে ওপরে উঠে আসতেই পারে। এটা হয়তো একটা সংকেত,তবে এর পেছনে কতটা বৈজ্ঞানিক সত্য লুকিয়ে আছে তা আরও পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ।”- এমনই অভিমত ইকোলজিকাল সিসমোলজিস্ট কিয়োশি ওয়াটৎসুমির।
মাত্র দিনকয়েক আগে মেক্সিকোর উপকূলের বালির ওপর এক ওরফিশের উঠে আসার ঘটনা নজরে পড়তেই আবার নতুন করে চাগাড় দিয়ে উঠেছে ওরফিশকে ঘিরে আলোচনা। বিজ্ঞানীদের কাছে এই মাছটির অস্তিত্বের বিষয়টি অজানা নয়, তবে এই সময়ের প্রচার সর্বস্ব দুনিয়ায় দুরন্ত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে এই অতিথি মাছের ছবি ও খবর। এরফলে নতুন করে আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে আমজনতার মনে। তাঁদের মনে এই মাছকে ঘিরে জাগছে নতুন নতুন প্রশ্ন –
এই মাছেরা স্বভাবে ভয়ঙ্কর কি না? তারা কী খায় ? কতটা লম্বা হয় এরা? এই মাছকি খাওয়া যায়? ইত্যাদি হরেক রকমের প্রশ্নের ফুলঝুড়ি ফুটছে মানুষের মনে। এই মুহূর্তে জেগে ওঠা এমনই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে এ যাত্রায় বিদায় নেব।
- আগেই বলেছি এই মাছেরা অত্যন্ত লম্বা। এখনও পর্যন্ত সবথেকে লম্বা যে ওরফিশের দেখা মিলেছে, তার দৈর্ঘ্য ৫৬ ফিট বা ১৭ মিটার। পূর্ণ বয়স্ক একটি মাছের ওজন ২৭০ কিলোগ্রাম বা ৪০০ পাউন্ড। তবে সাধারণ ওরফিশের লম্বাই ও ওজন দুইই অপেক্ষাকৃত কম হয়।
- ওরফিশ হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম মাছ।
- একান্তই নিরীহ স্বভাবের এই মাছ সমুদ্রে ভাসমান প্ল্যাঙ্কটন খেয়েই বেঁচে থাকে।
- ওরফিশ খেতে মোটেই সুস্বাদু নয়। যাঁরা এই মাছের স্বাদ নেবার সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের মতে এই মাছের স্বাদ অনেকটাই থকথকে জেলির মতো।
গভীর সমুদ্রের আবাসিক এই প্রাণি তথা মাছটি এখনও অনেক অনেক রহস্যেঘেরা। বিজ্ঞানীরা এই মাছ নিয়ে জোরকদমে গবেষণা করুন। আমরা বরং এই মুহূর্তে ওরফিশ নিয়ে আরও নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকি। আসুন, ততক্ষণে লেখাটা পড়ে মতামত লিখে ফেলুন। আর তারপর ছড়িয়ে দিন বন্ধুমহলে।
পুনশ্চ:
বিষয়টি কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে। আজ সকালে ভূমিকম্প হয়েছে। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পন সবাই টের না পেলেও সিসমোমিটারে তা নথিভুক্ত হয়েছে। ৫.১ কম্পাঙ্কের ভূমিকম্প নতুন কোনো বিপর্যয়ের সংকেত নয়তো?
তথ্যসূত্র / ছবিঃ
উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম।
ছবির জন্য প্রচলিত উৎসগুলোর কাছে আন্তরিক ঋণী।


















Dada apnar lekha gulo pore anek jinis jante pari !Darun 🙏🏻
দাদা তো শিখিয়েই চলেছেন,ভাইরা শিখছে কি ?
ভালো তথ্য বহুল লেখা। বহু প্রাণীই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগাম সঙ্কেত পায় সুতরাং এই মাছের পাওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ওরফিশের কাহিনী পরে অজানা সংকেত এর ই ভয়ে আছি। প্রচলিত বিশ্বাস আবার সত্যি হয়ে উঠবে না তো? আবার কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেন না ঘটে। যাহোক লেখকের লেখার মাধ্যমে এই বিচিত্র মাসের কাহিনী অবগত হতে পারলাম।,🐟🪱
প্রথমে ওরফিশ বা বৈঠা মাছের ওপর তৈরি ভিডিওটা দেখে আমিও বেজায় ভয় পেয়েছিলাম। ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাণিদের আচরণের অস্বাভাবিকতা বিজ্ঞানীদের কাছে ক্রমশই মান্যতা পাচ্ছে। সেদিক থেকে দেখলে মাছের জল ছেড়ে সটান ডাঙায় উঠে আসাটা পরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তবে এই দুয়ের সম্পর্ক নেহাতই কাকতালীয়। আতঙ্কের কিছু নেই।
সমুদ্রের এক অজানা সহবাসীর সঙ্গে লেখক আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন বলে ধন্যবাদ।মাছ যে শুধু মাছ নয় বিপর্যয়ের ইঙ্গিতবাহী তা অবাক করেছে। লেখার সঙ্গে ইউ টিউবের ভিডিওটি বিষয়টিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। তবে পত্রিকার মূল সুরের সঙ্গে এমন লেখা মানানসই হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখুন সম্পাদকমশাই। পাঠকেরা তুষ্ট।
ধন্যবাদ আপনাকে মতামত জানানোর জন্য। পত্রিকার মূল সুরটি অক্ষুন্ন রেখেই লেখা। বাকি সিদ্ধান্ত সম্পাদক মহোদয় ও পাঠকদের ওপরেই ছেড়ে দিলাম।
এই লেখকের সংস্পর্শে থাকলে প্রকৃতি ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো পাওয়া যায় ।মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় প্রখর।সতর্ক থাকা উচিত।
গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন — তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো…।
পৃথিবীতে বড়ো রকমের রদবদল ঘটতে যাচ্ছে।আর আমাদের চেতন ইন্দ্রিয়গুলো ক্রমশই নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছি আমরা।ভয় সেখানেই।
I guess they can sense the plate movements and upcoming earthquake/tsunami as all catfish do😇
It’s too early to predict,but there is no doubt that the animals have very strong sense to guess such debacles much earlier than us.
True that ❤️🔥
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে সবটাই অজানা ছিলো। সমৃদ্ধ হলাম।
ফিতে মাছ, নামটা পড়ে আমার পাবদা মাছের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলো। 😊
ভালো লাগলো। অজানা তথ্য জানলাম