পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলো। ১৫ বছরের মাথায় তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে সরকার গঠনের দিকে এগোচ্ছে বিজেপি। বেশ কিছু সংস্থার এক্সিট পোলে বিশেষজ্ঞরা আগাম বার্তা দিলেও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এখন সবটা পরিষ্কার। বাংলায় পরিবর্তন হয়েছে। তবে এই ভোট বিজেপির পক্ষে যতটা তার থেকে অনেক বেশি তৃণমূলের বিপক্ষে মানুষের রায়। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী প্রচার বা ডবল ইঞ্জিন সরকারের থেকেও গত ১৫ বছর ধরে মানুষের উপর যে অত্যাচার ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে জনতার নিজস্ব প্রতিবাদ এটা।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে এ বাংলার প্রায় ৬৫ শতাংশ হিন্দু ভোট বিজেপির দিকেই গিয়েছে। এস আই আর এ লাখো লাখো অনুপ্রবেশকারীর প্রচার বা মুসলিম বিরোধী যে হাইপ তোলা হয়েছিল তা একেবারে বিফলে গেছে এমনটা নয়। আসলে বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র তলে তলে কতটা বদলে গেছে এটা তার একটা বড় প্রমাণ। এর জন্য দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস। সফট হিন্দুত্বের ধ্বজা ধরেও ভোট তরণী পার হতে পারলোনা তারা। কিন্তু যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ তারা বুনে গেল সেটা বাংলায় মহীরুহু হয়ে ওঠে কিনা তা এবার দেখার।
অনেকেই বলছেন এবারে নির্বাচনে অভয়া কান্ড একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে আছে ৯১ লক্ষ ভোটারকে এসআইআর এর নামে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মত অগণতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়া। যেটা তৃণমূল কংগ্রেস আপাত বিরোধিতা দেখিয়েও এ রাজ্যে হতে দিয়েছে। নির্বাচনে তার ফল হাতেনাতে ভুগতে হল তাদের। এর সঙ্গে রয়েছে চাকরি চুরি, কয়লা চুরি, বালি চুরি সহ এমন অসংখ্য হাজার হাজার চুরির ঘটনা। এই বলগাহীন ঔদ্ধত্য, সীমাহীন দুর্নীতির জেরেই মানুষ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। নিজের কেন্দ্র ভবানীপুর থেকেও ১৫ হাজার ভোটে হেরে গিয়েছেন তিনি, বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে।। খেলা হলো বটে। তবে খেলা ঘুরেও গেল।
আজ ভোটের রায় দেখে অনেকেই আনন্দ প্রকাশ করছেন, যাঁরা দুদিন আগেও ভিন্নমত প্রকাশ করছিলেন। স্বাভাবিক। কারণ তাঁরা তখনও বুঝতে পারছিলেন না ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কোন দিকে যেতে চলেছে। আগামী পাঁচ বছর ধরেই এই রংবদল চলবে। আজ জনতা যে তৃণমূলকে গালি দিয়ে বিজেপিকে আনলো আগামীতে সেই দলেই হয়তো তৃণমূলের অনেক নেতা নেত্রীকেও দেখতে পাবো। হয়তো মধ্যবিত্ত সমাজে এটাই ঘটার। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যদি সবকিছুকে এপলিটিক্যাল বলে চেঁচান তবে এমনটাই হওয়ার কথা। আমাদের দিন দৈনন্দিন যাপনে অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় কি?
তবে দক্ষিণপন্থী ধারণার প্রচারে এসে মানুষ এখন রাজনৈতিক বললেই দলের বাইরে ভাবতে পারছেন না। মানুষ এবারেও বামপন্থীদের বিশ্বাস করেনি। সারা বাংলায় একমাত্র মুর্শিদাবাদের ডোমকলে জয়ী হয়েছেন তাঁরা। শুনলাম কেরল থেকেও নিশ্চিহ্ন হয়েছে দল। সামনে হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখব যেখানে মানুষ বামপন্থাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতন করে দেখবে।। আজ থেকে বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মানুষদের জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই জয়ের আভাস পেয়েই দিল্লিতে প্রেস কনফারেন্স করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ভাষণে বামপন্থাকে রোগ বলে চিহ্নিত করে মোদীজি দেশ থেকে কমিউনিজমকে উপরে ফেলার আহবান জানিয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে বামপন্থীরা আরও বেশি আক্রান্ত হবেন। তাদেরকে গণশত্রুতে পরিণত করার চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে।
এখন প্রশ্ন তৃণমূল কংগ্রেসের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে কিনা? দলটা থাকবে না উঠে যাবে? তবে বামপন্থীরা থাকবেন। কারণ বামপন্থা তো হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা কোন বুর্জোয়া বিষয় নয়। বামপন্থা আসলে একটি দৃষ্টিভঙ্গি। ঠিক বিজ্ঞানের মতন। যেমন বৈজ্ঞানিকের মৃত্যু হলেই বিজ্ঞানের মৃত্যু হয় না । ঠিক তেমনভাবেই বামপন্থাও টিঁকে যাবে।












