“আমি পৃথিবীতে এমন এক ব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে শোষণ থাকবে না।…সুন্দর পৃথিবীকে আমি খুব ভালবাসি। কিন্তু তার চেয়েও আমার কাছে প্রিয় আমার কাজ।…আমি জানি ওরা আমাকে হত্যা করবে। মরতে তো সবাইকে হবে–ই, আজ অথবা কাল। আমাকে হত্যা করলে আমার কাজ, আমাদের আন্দোলন থেমে থাকবে না।“
১৯৯১ এর ২৮শে সেপ্টেম্বর কারখানা মালিকদের ভাড়াটে খুনির গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ছত্তিশগড়ের অবিসংবাদিত শ্রমিক নেতা শংকর গুহ নিয়োগী। মৃত্যু আসন্ন জানতেন। একটি ক্যাসেটে রেকর্ড করে গিয়েছিলেন তাঁর পর মুক্তিমোর্চার লাল সবুজ পতাকা কারা সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। পাঁচ জন শ্রমিক নেতা, একজন যুবনেতা এবং তিনজন বুদ্ধিজীবী নিয়ে ন’জনের একটি কেন্দ্রীয় কমিটির নাম প্রস্তাব করে যান গুহনিয়োগী। এই কমিটির অন্যতম সদস্য শহীদ হাসপাতালের চিকিৎসক, শংকর গুহ নিয়োগীর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ডক্টর পুণ্যব্রত গুণের লেখা ‘শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর: এক সহযোদ্ধার প্রতিবেদন’ সেতু প্রকাশনী থেকে’ প্রকাশিত হয় গুহনিয়োগীর শহাদতের পঁচিশ বছর পর ২০১৬ র ২৮শে সেপ্টেম্বর। দশ বছর পর ২০২৬ এর ২৮শে সেপ্টেম্বর গুহনিয়োগীর ৩৫ তম শহীদ দিবসে কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে এই বই এর পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল।
শঙ্কর গুহ নিয়োগীর মৃত্যুর পরে কলকাতা তথা বাংলা তোলপাড় হয়। নিহত নেতার স্বপ্ন স্পন্দিত হয় গোটা দেশ। দল্লি রাজহরা হয়ে ওঠে বিপ্লবতীর্থ। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সংগঠনে ভাঙ্গন ধরে। নানা জটিলতা, পরিস্থিতির প্রতিকূলতা গুহনিয়োগীর শেষ দিনগুলির সাথি ডক্টর পুণ্যব্রত গুণকে বাধ্য করে ছত্তিশগড় ছাড়তে। শহীদ হাসপাতালের আদর্শে, কানোরিয়া আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চেঙ্গাইলে গড়ে ওঠে শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র। স্বাস্থ্য আন্দোলন এবং গণ আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণের জন্য গড়ে ওঠে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। ২০২৪ এর অগাস্টে যখন সারা বাংলা, সারা ভারত জেগে ওঠে অভয়া আন্দোলনে, সেই আন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা নেয় শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ অভয়া মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক হিসাবে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ছত্তিশগড়ের সংগ্রাম নিয়ে নতুন করে আগ্রহ উদ্দীপনা তৈরি হয় কলকাতার রাজপথে, কলকাতার সীমা ছাড়িয়ে দূর দুরান্তে। এই আগ্রহই ‘শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর: এক সহযোদ্ধার প্রতিবেদন’ বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। দীর্ঘদিনের গণ আন্দোলনের কর্মী বোলান গঙ্গোপাধ্যায় বইটি উদ্বোধন করেন।
এই দিন আরো একটি বই প্রকাশিত হয় – “A Documentary Film on Chhattishgarh Workers’ Movement: Struggle and Creation for a Documentary Film’। মঞ্চে বইটি প্রকাশ করেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, নাটক ও চলচিত্র বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। শঙ্কর গুহ নিয়োগীর হত্যার খবর পেয়ে Just Film Unit এর একদল যুবক ছত্তিশগড়ে গিয়ে ছত্তিশগড় আন্দোলন এবং শঙ্কর গুহ নিয়োগী কে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাভাবে এই কাজ বার বার বন্ধ করে দিতে হয়। অবশেষে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সক্রিয় সহায়তায় সম্পূর্ণ হয় ছবির নির্মাণ ।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শিবানন্দ মুখার্জী এবং অসীম চৌধুরী পরিচালিত এই অসাধারণ তথ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয়। ছত্তিশগড় আন্দোলনের এক দুর্লভ দলিল এই তথ্যচিত্র। শ্যামলপ্রকৃতির আশীর্বাদধন্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছত্তিশগড়ে মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা। এই ছবিতে মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, প্রকৃতির জন্য সংগ্রাম জীবন্ত হয়ে ওঠে আন্দোলনের কর্মী সংগঠকদের সঙ্কল্পে, শ্রমিক শিল্পী ফাগুরাম যাদবের গানে। আন্দোলনের আদর্শ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ছুবির বিস্তারে, ডক্টর বিনায়ক সেন, ডক্টর আশিস কুণ্ডু এবং ডক্টর পুণ্যব্রত গুণের ভাষ্যে। দেশি পিস্তলের ছররা গুলি গুহনিয়োগীকে হত্যা করলেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। । সংগ্রামী মানুষের কাছে ছত্তিশ গড় আন্দোলন আর শঙ্কর গুহনিয়োগীর মৃত্যুঞ্জয়ী আদর্শ আজ ও এক স্বপনপুরের দরজা খুলে দেয়। অনাগত স্বপ্নের বীজ বপন করে শেষ হয় ৩৫ তম শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান-
“জাহাঁ গরীবী শোষণ ঔর পুঁজিবাদ নই হোহী
অইসন ছত্তিশগড় কব বন্হী
জব কিসান মজদুর কে ছত্তিশগড় মে রাজ হোহী” ।।
** লেখার শিরোনাম অনুষ্টুপ পত্রিকায় প্রকাশিত শঙ্কর গুহ নিয়োগীর একটি কবিতা থেকে সংগৃহীত।











