আজ থেকে ঠিক পঁয়ত্রিশ বছর আগে আজকের দিনে নিহত হন শঙ্কর গুহ নিয়োগী। নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানায় ঘুমোচ্ছিলেন, খোলা জানালা দিয়ে পর পর গুলি চালায় আততায়ী। আটচল্লিশ বছরের মানুষটির বাঁচার কোনও আশাই ছিল না। হত্যার চেষ্টা হবে, জানা ছিল। তবু জানালা বন্ধ করেননি কেন, এ প্রশ্ন আজও করেন ঘনিষ্ঠরা। হয়তো হত্যা অবধারিত, তা ধরেই নিয়েছিলেন। আপসহীনতার আর কী-ই বা পরিণাম হয় এ দেশে। সে বছর আনন্দবাজার পত্রিকা-য় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারে (২৭-২-১৯৯১) সরকার-শিল্পপতিদের প্রতি যতটা আক্রমণ শাণিয়েছিলেন, ততটাই বাম নেতাদের প্রতি, “তাঁরা (মার্ক্সবাদী নেতারা) জানেন, যদি সত্যকারের আন্দোলন করতে চান, তা হলে ভারতীয় রাজনীতির মূল গলদটা বেরিয়ে পড়বে।” নিজের নিবন্ধে লিখছেন, “ভারতের ট্রেড ইউনিয়নগুলি রাজনৈতিক পার্টিগুলির উপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, বিপরীতে হতাশ রাজনৈতিক নেতারা ট্রেড ইউনিয়নের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে সমস্ত শ্রমিক আন্দোলনকে মাকড়সার জালে জড়িয়ে ফেলেছে।” এ বছর মানেসর, নয়ডা, গাজ়িয়াবাদের শ্রমিক আন্দোলনে বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভূমিকা (অথবা ভূমিকার অভাব) দেখলে কথাগুলো ফের জ্বলজ্বল করে ওঠে।
তাঁর কর্মক্ষেত্র ছত্তীসগঢ় তবু ‘নিয়োগীজি’-কে মনে রেখেছে, পশ্চিমবঙ্গে একটি ছোট বৃত্তের বাইরে তিনি প্রায় অপরিচিত। কেনই বা দিনক্ষণ খুঁড়ে স্মৃতি জাগানো? তাঁর মতাদর্শ মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ আজও প্রান্তিক। এক কমেডিয়ানের কথায়, ‘দিমাগি নকশাল’ শুনলে ভক্তরা বলে “দিমাগ কেয়া?” আর জেন-জ়ি বলে, “নকশাল কেয়া?” বদলেছে শিল্পও। শ্রমিকদের কাজ রক্ষা করে, উৎপাদনের খরচ কম রেখে, পরিমিত মেশিন ব্যবহারের যে ফর্মুলা দেন নিয়োগী, আশির দশকে যার ‘পরীক্ষামূলক’ প্রয়োগে রাজি হতে হয়েছিল ভিলাই স্টিল প্লান্টকে, সে ধারণাও কবে কোন মোড়ে ছেড়ে এসেছে শ্রমিক আন্দোলন। আজ মজুর থেকে ম্যানেজার, সবাই এক ঝাঁকার মুরগি— ছাঁটাই দেখছেন, নিজে ছাঁটাই হওয়ার প্রহর গুনছেন। এ সময়ে কেন শঙ্কর-স্মরণ?
নিয়োগীর রাজনৈতিক মত, তাঁর সাংগঠনিক কর্মসূচির ভুল-ঠিক, সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্ন সরিয়ে রেখে যদি কেবল তাঁর কাজ আর কথার দিকে তাকানো যায়, তা হলে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে যায় এই কথাটা যে, তিনি শ্রমিককে পরিপূর্ণ মানুষ বলে দেখেছিলেন। ট্রেড ইউনিয়ন তার কাজ বলতে বোঝে মজুরি বাড়ানো, বোনাস আদায়, বকেয়া পিএফ-গ্র্যাচুইটির দাবি। একে নিয়োগী বলেছেন ‘অর্থনীতিবাদ’— যখন সংগ্রাম হয় কেবল আর্থিক দাবিতে, বাকি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক প্রশ্নকে সরিয়ে রাখা হয়। তাঁর অবস্থান এর বিপরীতে— “আমরা নিজেদের মধ্যে এক সজীব সুন্দর গাছের মতো জীবন দেখতে চাই। পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের অসম্পূর্ণ, বিকৃত, দুর্বল করে রাখতে চায়। তারা চায় শ্রমিকরা হোক সস্তা দামের নির্জীব বস্তু।” রক্তকরবী আদৌ মঞ্চে অভিনয়ের মতো নাটক কি না, তা নিয়ে নাকি বিতর্ক ছিল। অথচ, সত্তর-আশির দশকে অরণ্যময় এক খনি-সাম্রাজ্যের ক্রূর, নির্যাতক বাস্তব-মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘রাজার এঁটো’ শ্রমিকদের আত্মশক্তিতে উদ্বোধিত করেছিলেন এক বাঙালি তরুণ। তাঁর শবযাত্রায় দেড় লক্ষ মানুষ হেঁটেছিলেন, এক দলহীন শ্রমিক নেতার জন্য যা বেনজির।
দল্লি-রাজহরা খনি অঞ্চলে নিয়োগীর নেতৃত্বে ছত্তীসগঢ় মাইনস শ্রমিক সঙ্ঘের আন্দোলনে দৈনিক মজুরি বাড়ে, সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে মদের বিক্রি। নিয়োগী শুরু করেন শরাব-বন্দি আন্দোলন। মাতালের জরিমানা ছিল মদ-বিরোধী বক্তৃতা দেওয়া। নেশাসক্তদের বিকেল থেকে ইউনিয়ন নেতারা কাছে কাছে রাখতেন, যাতে নেশার সময় পেরিয়ে যায়। যেখানে পাক্ষিক মজুরির দিনে ১৫ হাজার বোতলেরও বেশি মদ বিক্রি হত, সেখানে ১৯৮১ সালে বিক্রি হত ৫০-৬০ বোতল। মদ-বিরোধিতার প্রেরণা নিয়োগী পেয়েছিলেন গান্ধীর থেকে, বলেছেন একটি সাক্ষাৎকারে। তাঁর হত্যার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্তদের এক জন ছিলেন মদ কারখানার মালিক, সে কি কাকতালীয়? ছত্তীসগঢ়ের সাফল্য উত্তরাখণ্ডের (১৯৮৪) এবং অন্ধ্রপ্রদেশের (১৯৯২) মদ-বিরোধী আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।
‘শরাব-বন্দি’র কাজে এগিয়ে এসেছিল ইউনিয়নের মহিলা শাখা, পরে যা হয় মহিলা মুক্তি মোর্চা। গার্হস্থ হিংসা থেকে শুরু করে আদিবাসী মেয়েদের উপরে ঠিকাদার, জওয়ানদের আক্রমণ, সবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন মেয়েরা। মোর্চার এক নেত্রী চিকিৎসার অবহেলায় প্রাণ হারানোর পরে শ্রমিকরা নিজেদের হাসপাতাল খোলার শপথ নেন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা হয় শহিদ হাসপাতাল, যার উদ্বোধন করেছিলেন এক বৃদ্ধ শ্রমিক লহর সিংহ এবং এক বৃদ্ধ কৃষক হালাল খোর। পনেরো শয্যা এখন হয়েছে দেড়শো, খুলেছে সব ধরনের বিভাগ। আজও শ্রমিক, কৃষক, শুভানুধ্যায়ীদের টাকায় চলে হাসপাতাল, অনুদান নেয় না। বেলুড়, শ্রীরামপুর, সরবেড়িয়ায় শ্রমজীবী হাসপাতালের মডেল শহিদ হাসপাতাল।
নিয়োগী বলতেন, “শ্রমিকের কাজ আট ঘণ্টা, ট্রেড ইউনিয়নের কাজ চব্বিশ ঘণ্টা।” তাঁর ইউনিয়নের আঠারোটা শাখা ছিল— ট্রেড ইউনিয়ন, বকেয়া আদায়, কৃষি, শিক্ষা, সঞ্চয়, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া, নেশা বিরোধিতা, সংস্কৃতি, বস্তি উন্নয়ন, মহিলা, মেস, নির্মাণ, আইন, লাইব্রেরি, প্রচার, স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী এবং পরিবেশ। পাশ্চাত্যে একে বলা হয় ‘সোশ্যাল ইউনিয়নিজ়ম’— যেখানে সমতা, মর্যাদা, অধিকারের নৈতিক দাবি কর্মক্ষেত্রে আবদ্ধ থাকে না, প্রসারিত হয় বৃহত্তর সমাজে। আশির দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্রমিকদের বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী আন্দোলনকে এর সূচনা মনে করা হয়। “আসলে নিয়োগীই সোশ্যাল ইউনিয়নিজ়ম-এর প্রকৃত পথিকৃৎ,” বলেন সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক কাঞ্চন সরকার। সত্তরের দশক থেকেই প্রথমে দল্লি-রাজহরা, পরে ভিলাইতে নিয়োগীর নেতৃত্বে কৃষকদের সেচ, বাঁধের দাবির পাশে দাঁড়াতেন মজুররা, নালা কাটতেন। মজুরদের দাবিতে গলা মেলাতেন চাষিরা। ইউনিয়নের কৃষক বিভাগ থেকেই জন্ম নেয় ছত্তীসগঢ় মুক্তি মোর্চা, শুধু ভিন্ন রাজ্য নয়, বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়ে। ‘বিরোধ নয়, বিকল্প’ ছিল নিয়োগীর স্লোগান। শোষণভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা বদলাতে সংঘর্ষ, আর ছোট ছোট নির্মাণ যা বিকল্প গড়ার ক্ষেত্রে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটাবে— এই ‘সংঘর্ষ ও নির্মাণ’ ছিল তাঁর তত্ত্ব। ছত্তীসগঢ়ের আদিবাসী, স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের মধ্যে গণতন্ত্রকে মূর্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি। যে কোনও প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার আগে আলোচনায় সকলে কথা বলতেন, বিশেষত মেয়েরা। সভায় গৃহীত প্রস্তাব নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত সদস্যরা যেতেন অন্যদের কাছে। তাঁদের সম্মতি না পেলে ফের চলত আলোচনা।
সংঘর্ষ ছিল তীব্র ও ধারাবাহিক। সিপিআইএম-এল থেকে নিয়োগীর বহিষ্কার, বার বার কারাবাস, আন্ডারগ্রাউন্ডে বাঁচা (‘শঙ্কর’ ছদ্মনাম, আসল নাম ধীরেশ), নানা দাবিতে অবরোধ, ধরনা, অনশন, পুলিশি হামলার মোকাবিলায় জীবন কেটেছে তাঁর। তবু কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন চিন্তাকে। মৃত্যুর এক বছর আগে এক ভাষণে বলছেন, দুঃখী মানুষ যে পরিবর্তন চায়, তা আনতে গেলে আগে দূর করতে হবে চিন্তার এই ভ্রান্তি যে, রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান। আসলে জনশক্তির সামনে পশুশক্তিকে মাথা নত করতেই হয়। দলের নেতা, ট্রেড ইউনিয়নের নেতার উপরে নির্ভরতা সম্পর্কে বার বার সাবধান করেছিলেন তিনি। আজ স্পষ্ট, নেতা-নির্ভরতার ‘সহজ’ পথটি কত ঢালু ও পিচ্ছিল— নাগরিক-দত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে শাসক নাগরিক স্বার্থরক্ষার বিধি-ব্যবস্থাকেই কাগুজে বাঘ করে তুলছে। ‘নাগরিক অধিকার’ এখন শাঁসহীন খোলাটুকু। নিয়োগী মনে করান যে, নাগরিক, বিশেষত দরিদ্র, শ্রমজীবী মানুষ, তার অধিকার রক্ষার জন্য সংবিধান, আইন, সরকার, আদালত, কিছুর উপরেই নির্ভর করে থাকতে পারে না। অধিকারের রূপকার সে নিজে। বিকল্পের নির্মাণ সরকার করবে না, দলও নয়। করতে পারে শুধু সংগঠিত নাগরিক, নিজের জীবনীশক্তিতে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ উত্তর-সম্পাদকীয় রূপে প্রকাশিত।











