১৩ই এপ্রিল , ২০২৫
স্বাস্থ্যদপ্তরের সীমাহীন দুর্নীতি-দুর্বৃত্তচক্র যে অপরাধের পরিবেশ তৈরি করেছে, তা আট মাস আগে আর জি কর মেডিকেল কলেজে বাংলার মেয়েকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল। পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রমাণ লোপাটের, অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টার অভিযোগ আজও বিচারাধীন। এই সময় আমরা দেখেছি কিভাবে ক্ষমতার মদতপুষ্ট দুর্বৃত্ত-হুমকি চক্র চিকিৎসক সহ সমস্ত পেশা-বৃত্তির মানুষ, ছাত্র-যুব-মহিলা-প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষ, ক্রীড়া-সংস্কৃতি সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জীবন জীবিকার ওপর আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। স্বাস্থ্যসহ সমস্ত ক্ষেত্রে নিয়োগে দুর্নীতি, স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা, লুটের ভোটে জেতা ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিলকে দুর্নীতি-থ্রেটচক্রের আঁতুড়ঘরে পরিণত করা– এই সময় আমরা দেখেছি। আর জি করের ঘটনার পর শতাধিক বিভিন্ন বয়সের শিশু ও মহিলাদের উপর নৃশংস অত্যাচার করে তাদেরকে খুন করা হয়েছে। সেখানেও বারবার প্রশাসন ও ক্ষমতার দিকে আঙুল উঠেছে। গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসের দাবিতে ন্যায় সঙ্গত আন্দোলনরত ছাত্রকে পিষ্ট করেছে শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ির চাকা। গণ আন্দোলনে উদ্বেলিত হয়েছে সারা সমাজ। পুলিশ- প্রশাসনের বিরুদ্ধে শুধু যে অপরাধচক্রকে আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে তা নয়, তারা চূড়ান্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদীদের ওপর।
রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার চূড়ান্ত অনাচার-অরাজকতা, শিক্ষক নিয়োগে সীমাহীন দুর্নীতিও এই সময়ের প্রমাণিত বাস্তবতা। চিকিৎসকরাও সমাজের অন্য সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মতো দুর্নীতির কারণে বঞ্চিত শিক্ষক চাকুরি প্রার্থীদের ও তাদের আন্দোলনের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকুরীরত প্রায় ২৫৭৫৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হয়েছে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে। নিয়োগে দুর্নীতির সঙ্গে দুর্নীতির প্রমাণ লোপাট ও যোগ্য -অযোগ্য চাকুরী প্রার্থীদের পৃথকীকরণ করার বিষয়ে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর ও স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরিকল্পিত অনীহা ও ব্যর্থতা আজ মহামান্য আদালতে প্রমাণিত। ‘যোগ্য ‘ চাকরিহারা মাননীয় শিক্ষকেরা আজ সঙ্গত কারণেই আন্দোলনে। ওনাদের বিক্ষোভ আন্দোলনে পুলিশের বর্বরোচিত আক্রমণ বাংলার লজ্জা । আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। সাধারণ জনসমাজের সঙ্গে আমাদেরও ধারণা রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর ও স্কুল সার্ভিস কমিশনের সীমাহীন দুর্নীতি, অপদার্থতা ও পরিকল্পিত অপরাধের শিকার তারা। আমরা ‘যোগ্য’ মনে করা, কিন্তু বাতিল হওয়া মাননীয় শিক্ষকমহাশয়দের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল। একইসঙ্গে আমরা এই সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে যে সমস্ত শিক্ষক-চাকুরী প্রার্থী (মোট পরীক্ষার্থী প্রায় বাইশ লক্ষ- এর মধ্যে) বঞ্চিতই থেকে গেলেন, সুস্থ সৎ জীবিকার সুযোগ পেলেন না তাদের আন্দোলনের প্রতিও আমরা সহমর্মিতা জানাতে চাই। আমরা মনে করি যারা নিজেদের যোগ্য বলে মনে করেন এবং এই দুর্নীতিচক্রের শিকার হয়ে যারা চাকরী না পেয়ে বঞ্চিতই রয়ে গেলেন, সাধারণ জনসমাজের সঙ্গে মিলিতভাবে সামগ্রিক দুর্নীতি ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে তাদের সবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই ওনাদের জীবন- জীবিকা, মর্যাদা এবং সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবাংলার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে পারে ও তার হৃতগৌরব ফেরাতে পারে।
আমরা দাবি করছি ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের জন্যে নিয়ম মেনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং একইসঙ্গে দুর্নীতির কারণে বঞ্চিত লাখো লাখো চাকুরিপ্রার্থীদের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিতকরণ। আর যাদের সীমাহীন লোভ ও চৌর্যবৃত্তির কারণে আজ যোগ্য শিক্ষকদের জীবন-জীবিকা-পরিবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ল, সামাজিক মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হলো এবং আরো অনেকে হকের চাকরী না পেয়ে বঞ্চিতই থেকে গেলেন, তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
এইসঙ্গে সর্বক্ষেত্রে এই নৈরাজ্য ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত ও দলমত নির্বিশেষে যে আওয়াজ উঠেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বাতাবরণ তৈরী করে তাকে ঢেকে দেবার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার আহ্বান জানাচ্ছি ।









