হাতে একটা মোটা ফাইল নিয়ে চেম্বারে ঢুকলেন মধ্যচল্লিশের দম্পতি। ভদ্রমহিলা চেয়ার টেনে বসলেন। ভদ্রলোক শুন্য দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে অসহায়তার মৃদু হাসি দিলেন।
-অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি ডাক্তারবাবু। হাজার টাকা ভিজিটের ডাক্তারও দেখিয়েছি। কিন্তু সমস্যা তো কমছে না।অনেকে বললো আপনার কথা। যদিও আমার আসার ইচ্ছে ছিলো না। উনার জোরাজুরিতে আসতে বাধ্য হলাম।
কম ভিজিটের অসম্মান এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। তাই এসব কথা গায়ে না মেখে ভদ্রমহিলাকে উনার কথার মাঝেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘অসুবিধা কি হচ্ছে’?
ভদ্রমহিলা কোনো কথা না বলে হাতে ধরা মোটা ফাইলগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে চোখের ঈশারায় দেখে নিতে বললেন। আমিও বাধ্য চিকিৎসকের মতো একটির পর একটি প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট সব খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম। কোনোটিতে মাসিকের অনিয়মিততার কারণে হরমোনাল চিকিৎসা দেওয়া। কোনোটিতে উচ্চরক্তচাপের জন্য চিকিৎসা ও সাথে মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার উপদেশ। রক্তের রিপোর্ট প্রায় স্বাভাবিক। ইসিজি-তে হৃদস্পন্দনের হার বেশি। এছাড়া কহতব্য বিশেষ কিছু অস্বাভাবিকতা নেই।
ফাইল নিরীক্ষণ শেষ করে জিজ্ঞেস করলাম, মানসিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনটা কোথায়?
এবার ভদ্রমহিলা কটমট করে তাকিয়ে বললেন, আমাকে দেখে কি আপনার ‘পাগল’ মনে হচ্ছে? মাঝেমাঝে রক্তচাপ বেড়ে যায় বলে ওই ডাক্তার আমাকে মানসিক ডাক্তারের কাছে যেতে বলে দিলো। আমি কারুর ওষুধই খাই নি। আর আপনিও দেখছি আমার হাজব্যান্ডের মত পাগল বলার চেষ্টা করছেন। আমার হাজব্যান্ডের সাথে ‘সেটিং’ করেছেন নাকি?
উনার হঠাৎ আক্রমণে থতমত খেয়ে গেলেও পরমুহূর্তেই ভদ্রলোকের অসহায় চোখের দিকে একঝলক তাকিয়ে নিজেকে সামলে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলাম- আচ্ছা, বলুন তো, আপনার বয়স তো পঁয়তাল্লিশ।ছেলে মেয়ে কয়টি?
-দুটি মেয়ে। ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিলেন উনি।
-মাসিক কি নিয়মিত হচ্ছে?
-না, তিন চার মাস বন্ধ ছিলো, তারপর হঠাৎ গতকাল থেকে শুরু হয়েছে।
-ধরে নিন, সন্ধ্যেবেলা দুই মেয়ের সাথে বসে টিভি দেখছেন। কারুর কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আপনার হঠাৎ গরম লাগতে শুরু করলো।মাথা থেকে একটা গরম ভাব কানের পাশ দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলো।সাথে তীব্র ঘাম আর অস্বস্তিভাব। মিনিট দশেকের পরেই আবার ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো।
কথাটি জিজ্ঞেস করার পরেই ভদ্রমহিলা হঠাৎই ভোল বদলে আমার দিকে সম্ভ্রমের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, একদম ঠিক ধরেছেন ডাক্তারবাবু।এটা তো আমার প্রায়ই হয়। ঘামে ভিজে যাই একেবারে। দু-তিনবার গ্রামীণ চিকিৎসক এসে বলেছিলো গ্যাসটা মাথায় উঠে গেছে। খান কতক কি সব ইঞ্জেকশন আর স্যালাইন দিয়েছিলো এর জন্য।
আমি বললাম, সেই চিকিৎসার কোনো প্রেসক্রিপশন আছে? ভদ্রলোক এবার এগিয়ে এসে বললেন, না, বেশিরভাগ গ্রামীণ চিকিৎসকেরা তো প্রেসক্রিপশনই দেন না। কি ইঞ্জেকশন দিয়েছিলেন, সেটাও জানি না।
এহেন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনহীন চতুরতা আমি ভালোভাবে বুঝলেও গ্রামের মানুষের অজ্ঞানতার সুযোগে এ অনিয়ম আজ সমাজে সর্বগ্রাসী। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, মাঝে মধ্যে কি ঘুম কম হচ্ছে?
ভদ্রমহিলা স্তিমিতনেত্রে জবাব দিলেন- হ্যাঁ।
এবার ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মাঝে মধ্যেই কি হঠাৎ করে রেগে যাচ্ছেন উনি?
ভদ্রলোক যাইপরনাই সোৎসাহে চোখ গোলগোল করে বললেন- সে আর বলতে ডাক্তারবাবু। এ নিয়েই তো সংসারে অশান্তি। আমরা সবাই বুঝছি, মানসিক একটা সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু উনি কিছুতেই মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে যাবেন না।
আমি আবারও প্রশ্ন করলাম- আপনাদের দাম্পত্য জীবন?
এবার ভদ্রলোক প্রায় কেঁদেই ফেলেন আর কি ।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে মনে মনে হিসেব কষে নিলাম। বয়েস পঁয়তাল্লিশ। মাসিক বন্ধ হতে চলেছে অর্থাৎ কিনা মেনোপজ। মুড সুইং। ঘুম না হওয়া। হঠাৎ গরম ভাব, মানে-হটফ্লাশ। সবমিলিয়ে “পেরিমেনোপজাল সিন্ড্রোম”। নারী হরমোন ইস্ট্রোজেনের ঘাটতিই প্রধান কারন। পুরাতন চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে এখনও অনেকে সরাসরি ইস্ট্রোজেন প্রয়োগ করে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচ.আর.টি) করলেও সাইড এফেক্টের কারণে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী এ পদ্ধতি খুব কমই প্রয়োগ হয় আজকাল।
ইদানীং ফ্ল্যাভোনের একধরনের আইসোমার প্রয়োগ করে সাইডএফেক্ট ছাড়াই বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। সাথে মুড সুইংয়ের চিকিৎসা দিলেই অল্প কয়েকদিনেই সুফল পাওয়া যায়।
ভদ্রমহিলার ক্ষেত্রেও বেশ ভালোই ফল পাওয়া গেলো। তিন সপ্তাহের মধ্যেই তীব্র গরমবোধ, মুড সুইং, নিদ্রাহীনতা সব গায়েব। পরের বার এসে আমার ভিজিট কম নেওয়ার জন্য কত মানুষের উপকার হয় সেই নিয়ে প্রশংসা করে গেলেন। উনি বেরিয়ে যাবার পর ভদ্রলোক একগাল স্বস্তির হাসি হেসে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্রেসক্রিপশন দেখে গ্রামীণ ডাক্তার বললো, ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। তাতে নাকি বেশ ক্ষতি হবে।
আমি মৃদু হেসে জবাব দিলাম, কোনটা ঘুমের ওষুধ, কোন ওষুধের কি কাজ সেটা হজম করতে গিয়ে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ্যতার নিরিখে চিকিৎসক হয়েছি। মরলে না হয় পাশ করা চিকিৎসকের হাতেই মরবেন। কারণ ডেথ সার্টিফিকেটটা লেখার অধিকারও সরকার আমাদের হাতেই দিয়ে রেখেছেন।










