কলকাতার যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে চরম অব্যবস্থা এবং প্রভাবশালীদের আদলেখপনার কারণে মেসি কে নিয়ে ‘মাচা’ ব্যর্থ হওয়া নিয়ে চারিদিকে সোরগোল, কাঁটাছেড়া, ধামাচাপা ইত্যাদি চলছে এবং কিছুদিন চলবে। তারপর এস আই আর এর নাম বাদ, হুমায়ূন এর মুসলমানদের জন্য নতুন দল ঘোষণা ও বাবরি মসজিদ নির্মাণ, ভোট … কোন না কোন ইস্যু এসে এটিকে রিপ্লেস করে দেবে আর বাঙালিও তার স্বভাবগুণে সব কাজ ফেলে তাতে মজে যাবে।
এখানে যেটি বলার সেটি হল এই গরীব ও সব কিছুর মত খেলাতেও পিছিয়ে পড়া দেশে (সীমিত সংখ্যক দেশের খেলা এবং উপমহাদেশে জুয়ার গ্রাসে চলে যাওয়া ক্রিকেট বাদ দিয়ে) এত টাকা খরচ করে কোন কোচিং বা টুর্নামেন্ট বা ম্যাচ সংগঠন না করে নামীদামী খেলোয়াড় এনে ‘মাচা’ অনুষ্ঠান করা অপচয় ছাড়া কিছু নয়। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণ এবং খেলোয়াড়দের খুঁজে আনা, থাকা – খাওয়া – পুষ্টি – প্রশিক্ষণ – নিরাপত্তা – চিকিৎসা – বীমার সুব্যবস্থা সহ অন্যান্য ব্যবস্থা না করে ব্যবসায়িক ‘মাচা’ , আধুনিক ভাষায় যাকে বলে কমার্শিয়াল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, দিয়ে অতলে তলিয়ে যাওয়া ভারতীয় ফুটবল এবং খেলাধূলার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ার সার্বিক পিছিয়ে পড়ার কোন উন্নতি সম্ভব নয়। খেলাধূলার মূল প্রাঙ্গণ সমস্ত মাঠগুলিতে রাজনীতি ও অপরাধের মানুষদের সহযোগিতায় অসাধু প্রোমোটাররা কংক্রিটের জঞ্জাল তৈরি করে ফেলেছে কিংবা কিছু ক্ষেত্রে দাপুটে নেতাদের থিমের পুজোর ক্লাবগুলি দখল করে নিয়েছে। মাঠ নেই, তাই খেলা নেই, তাই খেলোয়াড় উঠে আসছে না। এর সঙ্গে আরও অনেক অনেক কারণ রয়েছে।
অথচ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দের হাত ধরে ভারতে ফুটবল শুরু ব্রাজিলের ৫০ বছর এবং আর্জেন্টিনার ৩০ বছর আগে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মরটিমার ডুরান্ড, নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী প্রমুখের উদ্যোগে ফুটবল ভারতে ক্রমশঃ জনপ্রিয় হতে থাকে। অনুষ্ঠিত হতে থাকে ডুরান্ড কাপ, কোচবিহার কাপ, ট্রেড কাপ, আই এফ এ শিল্ড প্রমুখ বিশ্বের প্রাচীনতম ফুটবল টুর্নামেন্টগুলি এবং প্রতিষ্ঠা হয় মোহনবাগান এ সি, ক্যালকাটা এফ সি, শোভাবাজার, এরিয়ান প্রমুখ প্রাচীনতম ফুটবল ক্লাবগুলি। মূলতঃ ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ১৮৯৩ সালে গড়ে ওঠে ‘ইন্ডিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন (আই এফ এ)’। পরে ১৯৩৭ এ তৈরি হয় ‘অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এ আই এফ এফ)’ এবং ১৯৪১ সালে শুরু হয় সন্তোষ ট্রফি। নামী গোরা সাহেব খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ১৯৩০ ও ‘৪০ এর দশকে অসাধারণ দক্ষতায় খেলার জগতকে মাত করে দেন গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার, করুণা ভট্টাচার্য, আবদুস সামাদ প্রমুখ খালি পায়ের ভারতীয় ফুটবলাররা। উঠে আসেন দুখিরাম মজুমদারের মত প্রতিভাবান কোচেরা। ভারতীয় দল বিদেশ ভ্রমণ শুরু করে।
‘৫০ এর দশকে মোহনবাগানের শৈলেন মান্না, এরিয়ানের বলাই দাস চ্যাটার্জি, ইস্টবেঙ্গল এর ভেঙ্কটেশ, আপ্পারাও, ধনরাজ, আমেদ, সালে পঞ্চপাণ্ডব এবং মোহামেডানের জুম্মা খান, ইউসুফ, ফকরি প্রমুখদের উত্থান। মেওয়ালাল, সাত্তার, রহিম, প্রেমলাল, চন্দন সিং রওয়াত প্রমুখ ছিলেন অন্যান্য নামী ফুটবলার। সেই সময় থেকে ম্যাচ খেলতে বিদেশি দলের আগমন এবং নামী ক্লাব গুলিরও বিদেশ সফর।
১৯৫০ থেকে ১৯৭১ ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণ যুগ। ১৯৫০ এ ভারতীয় ফুটবল দল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় কিন্তু যেতে পারেনি। ১৯৪৮ ও ১৯৬০ এ ভারতীয় ফুটবল দল অলিম্পিক এর মূল পর্বে খেলে। ১৯৪৮ এর লণ্ডন অলিম্পিকে খালি পায়ে খুব ভালো খেলেও ভারতীয় দল দুটি পেনাল্টি মিস করায় ফ্রান্সের কাছে ১ – ২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। ভারতের হয়ে এস রমন গোল করেন। ১৯৫৬ অলিম্পিক এ ভারত সেমি ফাইনালে উঠে চতুর্থ হয়। অস্ট্রেলিয়া কে ৪ – ২ গোলে পরাজিত করেছিল। নেভিল ডিসুজা হ্যাটট্রিক করেছিলেন। ১৯৫১ ও ১৯৬২ এর এশিয়ান গেমসে ভারত ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়া কে হারিয়ে সোনা পায়। ১৯৫৮ ও ১৯৭০ এর এশিয়ান গেমসে যথাক্রমে চতুর্থ ও তৃতীয় হয়। ১৯৬৪ তে এশিয়া কাপ, ১৯৫৯ এ মার্ডেকা কাপ এবং ১৯৭১ এ পেস্তা সুকান কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। মার্ডেকা কাপে ১৯৬৪ ও ‘৫৯ এ দ্বিতীয় এবং ‘৬৫, ‘৬৬ ও ‘ ৭০ এ তৃতীয় হয়। রহিম সাহেব প্রমুখের কোচিং এ সনত শেঠ, বলরাম, চুনী গোস্বামী, পি কে ব্যানার্জী, বদ্রু ব্যানার্জী, জার্নেল সিং, অরুণ ঘোষ, প্রদ্যোৎ বর্মন, থঙ্গরাজ, ইউসুফ খান, ফ্রাঙ্কো, কেমপেস, নুর, রাম বাহাদুর, সুকুমার সমাজপতি, শান্ত মিত্র, প্রণব গাঙ্গুলি, পরিমল দে, ইন্দার সিং, নয়িমউদ্দিন, চন্দ্রেশ্বর প্রসাদ, অরুময় নৈগম, কানন, মহম্মদ হাবিব, সুভাষ ভৌমিক, সুধীর কর্মকার, মগণ সিং, অমর বাহাদুর প্রমুখ খেলোয়াড় রা দেশ বিদেশে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে চলেন। সেই সময় ফুটবলের মক্কা কলকাতায় গ্রাম বাংলা ছাড়াও মহীশুর, হায়দ্রাবাদ সহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় রা খেলতে আসতেন।
গত শতাব্দীর ৭০ এর দশক থেকে রাজনীতির লোকদের ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে অধোগতির সূত্রপাত। তথাপি ৭০ এর দশকে পি কে ব্যানার্জী র কোচিং এ তরুণ বসু, সুধীর কর্মকার, অশোকলাল ব্যানার্জী, শ্যামল ঘোষ, প্রবীর মজুমদার, সমরেশ চৌধুরী, গৌতম সরকার, সুভাষ ভৌমিক, স্বপন সেনগুপ্ত, হাবিব, আকবর, শ্যাম থাপা, সুরজিৎ সেনগুপ্ত প্রমুখ তারকা সম্বলিত ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ঘরোয়া টুর্নামেন্ট গুলি আলোকিত করার পাশাপাশি শক্তিশালী বিদেশি দল পাস তেহরান (ইরান), পিয়ং ইয়ং সিটি (উত্তর কোরিয়া), ডক রো গাং ও চো হুং ব্যাঙ্ক (দক্ষিণ কোরিয়া), পোর্ট অথরিটি (থাইল্যান্ড) কে হারায়। শিবাজী ব্যানার্জী, সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, প্রসুন ব্যানার্জী, হাবিব, মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু, উলাগানাথন প্রমুখ তারকা সম্বলিত মোহনবাগান হারায় ইরেভান আরারাত (সোভিয়েত ইউনিয়ন) কে। পেলে, কিনাজিয়া, আলবার্তো কার্লোস সহ এক ঝাঁক তারকাকে নিয়ে কসমস দল কলকাতায় খেলতে আসে। হর্জিন্দার সিং, পর্মিন্দার সিং এর মত একগুচ্ছ প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে আসেন পাঞ্জাব থেকে। এছাড়াও মহারাষ্ট্র, কেরল, গোয়া তেও ফুটবল খুব জনপ্রিয় হয়। ব্রহ্মানন্দ , জেভিয়ার পায়াস, সাবির আলিদের মত দক্ষ খেলোয়াড় রা উঠে আসেন। কলকাতা লীগ ও শিল্ড ছাড়াও ডুরান্ড, রোভার্স, ডিসিএম ট্রফি, বর্দুলই ইত্যাদি টুর্নামেন্ট ছিল জনপ্রিয়।
পরবর্তীকালে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুদীপ চ্যাটার্জী, কৃশানু দে, বিজয়ন, আনচেরি, বাইচুং ভুটিয়া, সুনীল ছেত্রী দের মত আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় উঠে এলেও এবং নেহরু কাপের মত আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেও যেখানে উরুগুয়ে, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরী, রুমানিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নের মত দল খেললেও এবং ফ্রান্সিস কোলি, বুরুচাগা, ডগলাস, মজিদ, এমেকা প্রমুখ বিশ্ব কাপার রা ভারতে ও কলকাতায় খেলে গেলেও ভারতীয় দল তেমন কিছু করতে পারেনি। কেবলমাত্র ইস্টবেঙ্গল ২০০৩ এ ASEAN Cup জয়লাভ করে।
টাটা, ফুটবল একাডেমি করে কয়েক বছর চেষ্টা করে। উত্তর পূর্ব ভারত সহ বেশ কিছু জায়গা থেকে দক্ষ ফুটবলার উঠে আসে। বখুম, বেয়ার্ন, আইন্দনহেভেন প্রমুখ শক্তিশালী বিদেশি দল কে নিয়ে আসে। ফিফার পরামর্শে বিদেশী কোচ এনে, জাতীয় লীগ অনুষ্ঠিত করেও অ্যাড হক কাজকর্মের দরুন বিশেষ লাভ হয়নি। কারণ প্রাক্তন ফুটবলার বা পেশাদার প্রশাসক নন দশকের পর দশক ভারতীয় ফুটবল কব্জা করে রাখলেন জিয়াউদ্দিন, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, প্রফুল প্যাটেল এর মত ব্যক্তিরা। এরপর শুরু হল বুড়ো খেলোয়াড় দের এনে ‘ মাচা ‘ অনুষ্ঠান করে টাকা মারার ব্যবসা। ইতিমধ্যে ২০১৩ তে ভারতে পেশাদারী ফুটবল শুরু হলেও তা অপেশাদার মুনাফাখোর শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী দের হাতে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে।
এবার ফিরে আসা যাক সাম্প্রতিক মেসি ও মাচা নিয়ে। মেসি বাল্য থেকে বার্সিলোনার কোচিং এ ছিলেন। তাঁকে নিয়ে মাচা না করে আমাদের জুনিয়র দলের ক্যাম্পে যদি তাঁকে কয়েকদিন আনা যেত অথবা আর্জেন্টিনার কোন ভালো দলকে এনে ভারতীয় দলের সঙ্গে কয়েকটি ম্যাচ খেলানো যেত কিংবা ভারতীয় দলকে কয়েকমাস আর্জেন্টিনায় কোচিং এ রাখা যেত তাহলে ভারতীয় ফুটবল উপকৃত হত।











