গত ৩রা জুন ২০২৫, সকালে পুরুলিয়া জেলার জয়পুর থানার নারায়ণপুর গ্রামে নিজের শাড়ির ফাঁসে একটি গাছে ঝুলতে দেখা যায় মিঠাইমণি মাহাতোকে।
গরীব পরিবারে জন্ম হওয়া মেয়েকে বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিল মিঠাইমণি। তার জন্ম হয়েছিল পুরুলিয়া জেলার মফস্বল থানার অন্তর্গত হুলকা গ্রামে। স্বামী রোজগারের জন্য বাইরে থাকতো। শাশুড়ি, দেওর এবং দেওরের স্ত্রী (জা) তাকে নিয়মিত অত্যাচার করত। স্বামী অরূপ মাহাতো সব জানলেও কোন প্রতিবাদ করত না এবং রোজগারের সব টাকা মায়ের হাতে তুলে দিত। নিঃসন্তান মিঠাইমনি সব অত্যাচার সহ্য করে সেলাই ইত্যাদি ছোটখাটো কাজ করে নিজের হাতখরচা চালাত।
গ্রামবাসীরা জানায় সম্প্রতি মিঠাইমণির স্বামী স্ত্রীর ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠায়। সেই টাকা দাবী ক’রে শাশুড়ি, দেওর ও জা মিঠাইমণির উপর প্রবল অত্যাচার শুরু করে। মারধর, গালিগালাজ, বিছানায় জল ঢেলে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য অত্যাচার চলতে থাকে। নিরুপায় হয়ে মিঠাইমণি গ্রামের হরিমন্দিরে এসে শুয়ে থাকে। সেখানেও সে রেহাই পায়নি। তাকে মন্দিরের থামে মাথা ঠুকে দেওয়া হয়। সে প্রাণ বাঁচাতে পাশ্ববর্তী গ্রামে পালিয়েও রক্ষা পায়নি। মারতে মারতে তাকে ফিরিয়ে এনে জোর করে বাপের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বাবা-মা’কে সঙ্গে করে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেরার সময় মিঠাই-এর মা-বাবা কে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরদিন সকালেই নারায়ণপুর গ্রামে মিঠাইমনিকে ‘সকল পাশবিক অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে’ ঝুলতে দেখা যায়। জয়পুর থানা কোন প্রস্তুতি ছাড়াই ‘আত্মহত্যা’ ঘটেছে এমন অনুমান প্রকাশ করে দেহ ময়না তদন্তে পাঠিয়ে দেয়।
এই ঘটনা হুলকা গ্রামের সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেন নি। তাঁরা সমবেত হয়ে শ্বশুড়বাড়ির লোকেদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞান মনস্ক, পশ্চিমবঙ্গ –র কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামবাসীকে সমবেত করে ন্যায়বিচার আদায়ের লক্ষ্যে জোট বাঁধার আহ্বান রাখেন।
ভিলেজ পুলিশ মারফৎ খবর পেয়ে থানা থেকে পুলিশ এসে বলে মেয়েটির বাপের বাড়ি থেকে লিখিত অভিযোগ না করলে গ্রেপ্তার সম্ভব নয়। পুলিশের যুক্তিতে গ্রামবাসী বিশেষতঃ মহিলারা সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। ঘরে ঘরে শেষ দেখার প্রস্তুতি শুরু হয়।
৫ই জুন ময়না তদন্তের পর দেহ গ্রামে নিয়ে আসা হলে হুলকা এবং সংলগ্ন গ্রামের মানুষ গ্রেপ্তারির দাবিতে রাস্তা অবরোধ করেন। পুলিশ হাজার চেষ্টা করেও গ্রামবাসী বিশেষতঃ মহিলাদের টলাতে পারেনি। মহিলারা ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন “তিনদিন ধরে অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবি দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে মেয়েটি গাছে উঠে নিজে ফাঁসি দিতে পারে না। এক্ষুনি মহিলা পুলিশ এনে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে হবে”। এরপর বাপের বাড়ির করা অভিযোগের ভিত্তিতে মিঠাইমনির দেওরকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকিদের গ্রেপ্তারির দাবিতে অবরোধ চলতে থাকে। থানা থেকে বড়বাবুরা এসে জনতাকে হুমকি দিয়ে বলে “রাস্তা অবরোধ বেআইনী কাজ, রাস্তা না ছাড়লে সকলকে গ্রেপ্তার করা হবে।” এই হুমকি বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। জনতার বিক্ষোভ চরমে ওঠে। পুলিশ জনতার সংগ্রামী মেজাজ দেখে পিছু হঠে। দুঘণ্টা পর তদন্তকারী অফিসার মহিলা পুলিশ এনে শ্বশুর-শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করে।
পরদিন গ্রামবাসীরা অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেন। ৭ই জুন ২২৫ জন মহিলা সহ ২৫০ জন গ্রামবাসী থানায় ডেপুটেশন দেন। জনতার প্রবল চাপে পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের (যারা মিঠাইমণির অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেছিলেন) ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়। ১১ই জুন দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তাঁদের জবানবন্দী লিপিবদ্ধ হয়।
ন্যায়বিচারে কালক্ষেপণ দেখে হুলকাসহ সংলগ্ন ৩টি গ্রামের গ্রামবাসীরা (অধিকাংশই মহিলা) ২১শে জুন এক বিক্ষোভ মিছিল করে থানা ঘেরাও করে পুনরায় দাবি দাওয়া পেশ করেন। এই উদ্দীপ্ত মিছিলে তিন শতাধিক মানুষ জড়ো হন। স্মরণে রাখা যেতে পারে যে এই অঞ্চলের ৬টি গ্রামে বিজ্ঞান মনস্ক, পশ্চিমবঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে গত সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে এক ঐতিহাসিক মিছিল হয়েছিল। মিঠাইমণির ন্যায়বিচারের দাবিতে বর্তমান চলমান গণআন্দোলন, শ্রমজীবীদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার একমাত্র উপায় তা আবারও প্রমাণ করল।
বিজ্ঞান মনস্ক, পশ্চিমবঙ্গ অভয়া মঞ্চের অন্তর্ভুক্ত একটি সংগঠন।









