সংগ্রামী গণমঞ্চের দ্বারা আহুত ২৭শে জুনের গণকনভেনশনের খসড়া প্রস্তাব
দীর্ঘ উত্তেজনার পর গত ৪ মে পশ্চিমবাংলার ১৮তম বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। আমরা সবাই জানি যে এই নির্বাচনে রেকর্ড তৈরি করে ভোটার তালিকার ৯৩% নির্বাচক ভোট দিয়ে বিজেপির হাতে পশ্চিমবাংলার আগামী পাঁচ বছরের শাসনভার তুলে দিয়েছেন এবং নতুন সরকার ৯ মে শপথ গ্রহণ করে তার পথচলা শুরু করেছে। এবং এই দেড় মাস সময়েই নবগঠিত বিজেপি সরকার সারা দেশের মতই এখানেও তার দরিদ্র, শ্রমজীবী নাগরিক-বিরুদ্ধ চরিত্র প্রবলভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে। দিকে দিকে ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, হকারের ওপরে নেমে এসেছে বুলডোজার, প্রায় মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাক্ষ্য রেখে এবং সমস্ত মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করে দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূলের নেতাদের কোমরে দড়ি পরিয়ে পুলিশ নিজদায়িত্বে এলাকা প্রদক্ষিণ করাচ্ছে যাতে কিছু মানুষের ডিম ছোঁড়ার ভিডিও বানানো যায়। এর সঙ্গেই তুমুলগতিতে শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। ঈদ-ঊল-আদাহতে গরু জবাইয়ে নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা, মসজিদে নামাজের আওয়াজে বাধা, রেডরোডের নামাজ আটকে ওই একই জায়গায় মোদীর যোগচর্চার জন্য ৭ দিনের ফতোয়া, জোর করে শ্যামাপ্রসাদকে বাঙ্গালীর আইকন বানিয়ে তার নামে অজস্র গল্পকথার অবিরল প্রচার, ইত্যাদি নাটক ক্রমাগতই অভিনীত হয়ে চলেছে বাংলার মঞ্চে। আর তাই বিজেপিকে ভোট দেওয়া অজস্র গরীব, শ্রমজীবী মানুষ ইতিমধ্যেই ভাবতে শুরু করছেন যে তাদের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কিনা। আর এর সঙ্গেই অন্ধকার পাকাপাকিভাবে জায়গা নিয়েছে সেইসমস্ত মানুষের জীবনে যারা এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগই পাননি। কারণ এই প্রথম বহু লক্ষ জীবিত, সুস্থ, আগে বহুবার ভোট দেওয়া, নিজের ঠিকানায় উপস্থিত থাকা নাগরিক, ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং সংবিধান রক্ষাকারী সর্বোচ্চ আদালতের যৌথ সিদ্ধান্তে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। একথা আমরা সবাই জানি যে অযোধ্যার রামমন্দির বা কাশ্মীরের ৩৭০ ধারার মতোই গত বহু দশক ধরে পূর্ব ভারতের বাংলা ও অসম প্রান্তের জন্য বিজেপির নির্মিত কল্পপ্রকল্পটি হল দশকের পর দশক ধরে লক্ষ-কোটি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর ঢুকে পড়া, তার ফলে এই এলাকার জনবিন্যাসের পরিবর্তন ঘটে যাওয়া এবং পশ্চিমবঙ্গে ওই ভুয়ো ভোটারদের ভোটের জোরেই স্বাধীনতার পর থেকে সমস্ত অবিজেপি সরকারের টিকে থাকার গল্প। প্রায় এই তত্ত্বের অনুসারি প্রকল্প হিসেবেই তাই জাতীয় নির্বাচন কমিশন গত অক্টোবর মাস থেকে বাংলার মানুষের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন SIR নামক একটি ফর্ম-বোমা নিয়ে, সঙ্গে ছিল ক্রমাগত গোলপোস্ট বদলানো শর্তের মিথ্যাচার। ফলে মাসের পর মাস কোটি কোটি বাঙালি নাগরিক মানুষ পাগলের মতো এক দোর থেকে অন্য দোরে দৌড়ে মরলেন আর গতর খাটিয়ে রোজগার করা অর্থ জলের মত খরচ করে অচেনা, অপ্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজ জোগাড় করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হল না। প্রথমে প্রায় ১ কোটি মানুষের নামসম্বলিত এক অত্যাশ্চর্য সন্দেহভাজন (Logical discrepancy) তালিকা প্রকাশিত হল, যার থেকে ‘শুনানি’ করে প্রথমেই সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের নাম কেটে বাদ দেওয়া হল। পরবর্তীতে আদালতের পরামর্শে আরও ৬০ লক্ষ মানুষ নিজেরই দেশে ‘বিচারাধীন’ (under Adjudication) হয়ে গেলেন এবং শেষমেশ তার মধ্যে ২৭ লক্ষেরও বেশী মানুষের ভোটাধিকার এই নির্বাচনে কেড়ে নেওয়া হল। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট শুধু স্বগতোক্তি করলেন ‘একটা নির্বাচনে ভোট দিতে না পারলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে’, আর ২৭ লক্ষকে পরামর্শ দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিদের মাথায় বসিয়ে তৈরি করা ট্রাইব্যুনালে আবেদনের আর ডিলিটেড সাড়ে পাঁচ লক্ষকে বলা হল নতুন করে তালিকায় নাম তোলার জন্য ফর্ম-৬ জমা করতে। কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে কাজ শুরু করে এই ট্রাইব্যুনাল নির্বাচনের আগে একজন প্রার্থীসহ মাত্র ১৬০৭ জনের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারলেন। অবশ্য এতে নিশ্চয়ই প্রমাণ হল যে আবেদনকারীদের মধ্যে বাস্তবিক ভোটাধিকার থাকা অজস্র নাগরিক থেকে গেছেন, যাদের এই ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে ‘সাংবিধানিক’ বাধা সৃষ্টি করে নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হল না।
সমস্যা হল এই যে কুনাট্যের এইখানেই শেষ হল না। ঘটা করে ঘোষিত ১৯টি ট্রাইব্যুনাল যাদের প্রায় ২৫ লক্ষের মতো আবেদন খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তারা নির্বাচনোত্তর সময়ে শম্বুক গতিতে কাজ চালাতে থাকলেন। ফলে ২৯ এপ্রিলের পর থেকে ৩ সপ্তাহেরও বেশী সময়ে মাত্র ৬৫৮১টি আবেদনের নিষ্পত্তি হল যার মধ্যে ৪০৪৩টি আবেদন (৬১%) গৃহীত হল এবং বাকি ২৫৩৮টি আবেদনের মধ্যেও অনেকগুলি আগেই গৃহীত হয়ে গেছে বলে জানা গেল। সাধারণ পাটিগণিতের হিসেব বলে যে এই গতিতে আবেদনের নিষ্পত্তি চলতে থাকলে ২৫ লক্ষ আবেদনের নিষ্পত্তিতে প্রায় ১১৪০ সপ্তাহ বা ২২ বছর সময় বা ২০৪৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। যার অর্থ শুধুমাত্র ১টি নয়, অনেকে এমনও হয়তো থাকবেন যারা সেই শতবর্ষ পার করা ‘অমৃত ভারত’-এই আবার ভোটের কালি আঙ্গুলে লাগাতে পারবেন, অবশ্য যদি তখনও তারা ও এদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র বেঁচে থাকে, তবেই। এই পর্বে স্বস্তি একটাই যে নেতাদের ফাঁকা হুঙ্কার সত্ত্বেও রেশন সংক্রান্ত নির্দেশিকা বা অন্নপূর্ণা যোজনার নির্দেশ বলছে যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা প্রতি মানুষেরই আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত সরকারী প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার অধিকার থাকবে, অর্থাৎ এই লক্ষ লক্ষ মানুষের এইসমস্ত নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না, অন্ততঃ এখনই। কিন্তু আমাদের একথা ভুললে চলবে না যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজে, বিশেষতঃ সংখ্যালঘুর ওপরে অত্যাচার নামিয়ে আনার কাজে, তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখানোর কাজে বিজেপি-আর এস এস সিদ্ধহস্ত, এবং ফলতঃ মানুষের স্বার্থরক্ষায় লড়াই আমাদের জারি রাখতেই হবে।
তবুও একথাও ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বিজেপির ‘অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্বের চিত্রনাট্যর সম্ভবতঃ এখানেই ইতি হয়েছে, যেহেতু এবারের পরে তাদের আর নতুন করে এই প্রসঙ্গ টেনে আনার সুযোগ থাকবে না, এবং এটাও এখন সবাই বুঝে গেছেন শুধু নির্বাচনী সভার চিৎকার দিয়ে জ্যান্ত মানুষকে ‘বুলডোজার’ দিয়ে প্রতিবেশী দেশের সীমানা পার করে ফেলে আসা যায় না, আন্তর্জাতিক আইন এমন কোন কাজকে মান্যতা দেয় না। প্রতিদিনই তাই খবরে আসছে যে কিছু অসহায় এদেশের নাগরিক মানুষকে জোর করে বর্ডার পার করার চেষ্টা করেও শেষমেশ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি-র বাধায় এদেশের বিএসএফ ‘মানবিক’ কারণে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তাই শেষমেশ হয়তো কয়েক হাজার নানা কারণে সীমানা পার করে আসা প্রতিবেশী দেশের নাগরিক মানুষকে তার নিজের দেশে ফেরত পাঠিয়েই এই কুনাট্যের অন্ত হবে, আর এস এসের আরও একটি রাজনৈতিক ইস্যুর মৃত্যু হবে যেমনটা রামমন্দির বা ৩৭০ ধারার ক্ষেত্রেও ঘটেছে, যদিও মিথ্যা ভয় ধরানো প্রচার নিজেদের স্বার্থেই তারা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এর সঙ্গেই যে সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে তা হল এই লক্ষ লক্ষ মূলতঃ সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটারকে বহু বছর ধরে ভোট দিতে না দেওয়ার চক্রান্তটি। ফলে এই অসাংবিধানিক নির্যাতন বন্ধ করা, ট্রাইব্যুনালে ঝুলে থাকা সমস্ত আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করাই আমাদের কর্তব্য হওয়া উচিৎ। নিম্নলিখিত দাবিগুলি আদায়ের লক্ষ্যে তাই এই কনভেনশনের আহ্বান করা হচ্ছে-
১) অবিলম্বে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা অনেকগুণ বাড়াতে হবে, ২) নিয়মিত ও দ্রুত আবেদনের নিষ্পত্তি করতে হবে, ৩) প্রতিটি জেলায় ট্রাইব্যুনালের অফিস খুলে প্রতিটি আবেদনকারীকে বাতিল করার আগে সশরীরে শুনানির সুযোগ দিতে হবে ও বাতিলের কারণ তাকে লিখিতভাবে দর্শাতে হবে, ৪) সমস্ত নিষ্পত্তির কাজ আগামী ৬ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে, ৫) কোন নাগরিককেই কোন সময়ের জন্যেই সরকারি প্রকল্পের সুযোগসুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
এবং এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য সমস্ত অধিকার সচেতন নাগরিক এবং এই বিষয়টিতে উদ্বিগ্ন সমস্ত মানুষ ও সংগঠনদের একসাথে এনে সবার মতামত সাপেক্ষে উপরোক্ত দাবিগুলিতে পরিমার্জিনা করা, গ্রহণযোগ্য দাবিসনদটি তৈরি করা, এবং যুগপৎ রাস্তা ও আদালতের লড়াইয়ের মাধ্যমে এই লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করা।









