সাফিনা হুসেইন , ভারতের এই কন্যা এই বছরের রমন ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে অন্যতম বলে বিবেচিত হয়েছেন। বলতে দ্বিধা নেই যে সাফিনার নাম আগে কখনও শুনিনি। এটা আমার দৈন্যতা। এশিয়ার নোবেল পুরস্কার হিসেবে মান্যতা পাওয়া এই পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রাপকদের তালিকায় তাঁর নাম ঘোষিত হওয়ায় তাঁকে নিয়ে কিঞ্চিত চর্চা শুরু হয়েছে আম দরবারে।
ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রাপক হলেন ভূদান যজ্ঞ কর্মসূচির রূপকার আচার্য বিনোবা ভাবে। একাধিক বঙ্গবাসীও বিভিন্ন সময়ে এই পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বরেন্য দুই সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী, গৌরকিশোর ঘোষ, বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় প্রমুখ। আর এই বছরের জন্য মনোনীত হয়েছেন দিল্লির বাসিন্দা সাফিনা হুসেইন ও তাঁর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন – “এডুকেট গার্লস” । সংগঠনের নাম থেকেই পরিস্কার যে দেশের মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এই সংস্থার সদস্যরা কাজ করে চলেছেন। সাফিনা হুসেইন ও তাঁর স্বপ্নের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এডুকেট গার্লস হলো এই পুরস্কার প্রাপক প্রথম ভারতীয় সংগঠন। আসুন সাফিনার সাথে আপনাদের আলাপ করিয়ে দিই।
একসময় কাজের সূত্রেই সাফিনাকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে পৃথিবীর একাধিক মহাদেশে, বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নানান দেশে। উন্নয়নশীল দুনিয়ার এইসব দেশের মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে তিনি যেন নতুন করে আবিষ্কার করেন নিজের দেশ ভারতবর্ষকে। সমাজ উন্নয়নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত বিভিন্ন কর্মসূচি রূপায়ণ করতে গিয়ে সাফিনা বিশ্বের ঐসব অঞ্চলেও প্রত্যক্ষ করেন তীব্র লিঙ্গ বৈষম্য, পারিবারিক হিংসা ও সামাজিক অসমতার মতো ভয়ঙ্কর বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতিকে। বিদেশে কাজ করতে করতে সেখানকার মহিলাদের দুর্বিষহ জীবনযাপন তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। তাঁদের মধ্যেই তিনি যেন দেখতে পান তাঁর পেছনে ফেলে যাওয়া মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে। এদেশের কন্যা সন্তানদের সমস্যা অন্তহীন। মাতৃ জঠরে বেড়ে ওঠা ভ্রুণটি একটি কন্যা সন্তানের একথা টের পেলেই তাকে নিকেশ করতে তৎপর হয়ে ওঠে পরিবারের সদস্যরা। সন্তানটি সৌভাগ্যক্রমে পৃথিবীর আলো দেখতে পেলেই অভিভাবকরা তার বিয়ের কথা ভাবতে বসেন। এমন মানসিকতার কারণেই এদেশে নাবালিকা বিবাহ এক গহীন সমস্যার রূপ নিয়েছে। রাজস্থানের ৬০- ৭০ % মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয় নাবালিকা বয়সে। সারা ভারতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ৪৬% । স্বাধীনতা লাভের প্রায় আট দশক পরেও আমার আপনার দেশ ভারতবর্ষ কন্যা সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে রাখার বিচারে গোটা দুনিয়ার মধ্যে এক নম্বরে। 
২০০৭ সালে তিনি ফিরে এলেন ভারতে, স্থাপন করলেন তাঁর সম্পূর্ণভাবে অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন Educate Girls – মেয়েদের শিক্ষিত করুন । তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কারণ দর্শাতে গিয়ে সাফিনা বলেছেন —***
- আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে সযত্নে লালিত ইচ্ছেটাকে – দেশের মেয়েদের শিক্ষা – রূপায়িত করার জন্য আমি বিদেশের মোহ ও মাটি ছেড়ে দেশে ফিরে এলাম। একেবারে গোড়া থেকেই আমার আমি নিজেই নিজেকে উদ্বুদ্ধ করেছি একথা ভেবে যে আমাকে যে কোনো উপায়ে দেশের মেয়েদের শিক্ষার পথে পরিচালিত করতে হবে কেননা এই পথে হেঁটেই আজ আমি আমার স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যে এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে আসতে পেরেছি। কি আশ্চর্য দেশ আমাদের! এখানে এখনও একটি গৃহপালিত ছাগলকে গণ্য করা হয় পারিবারিক সম্পদ হিসেবে, আর কন্যা সন্তান হলো পারিবারিক দায়,লায়াবিলিটি।আর তাই মেয়ের পঠনপাঠনের জন্য খরচ করা হলো অপব্যয়। তাঁদের অভিমত – কেন আমরা মেয়েদের পঠনপাঠনের জন্য ব্যয় করবো? সে তো আর ভবিষ্যতে আমাদের পরিবারের সঙ্গে থাকবেনা, স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। সেক্ষেত্রে মেয়েদের শিক্ষার জন্য খরচ করতে যাব কোন্ যুক্তিতে? পুরুষানুক্রমিকভাবে আজন্ম লালিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা আমাদের বিপথে পরিচালিত করছে।
সাফিনা এই সময় ঠাট্টা করে বলেছিলেন – সরকার আমাকে ৫০ টা স্কুল দিক ; আগামী ৫ বছরের ভেতর আমি ৫০০০ স্কুল তৈরি করে নিতে পারবো। সবাই তাঁর এই কথাকে তেমন পাত্তা দেয়নি।
২০০৫ সালে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে এলো। বিদেশের মাটি থেকে ওড়া বিমান এসে নামলো দেশের মাটিতে। সাফিনা আর কালবিলম্ব না করেই ছুটলেন মানবসম্পদ উন্নয়ন দফতরের কার্যালয়ে। সরকারের কাছে পেশ করলেন তাঁর ইচ্ছার কথা – আমি মেয়েদের শিক্ষার জন্য কাজ করতে চাই। আধিকারিকদের বললেন দেশের সবথেকে পিছিয়ে থাকা এলাকা কোনটা যেখানে লিঙ্গ বৈষম্য ভয়ঙ্করভাবে এখনও টিকে রয়েছে। সরকারের তরফ থেকে দেশের এমন ৬৫০ টি জেলার মধ্য থেকে ২৬ টিকে আলাদা করে বেছে দেওয়া হলো। ঘটনাক্রমে এই ২৬ জেলার ৯ টি জেলাই ছিল রাজস্থানের।
সম্পূর্ণভাবে নিজের উদ্যোগে সাফিনা হুসেইন শুরু করলেন এই কঠিন সিঁড়ি ভাঙার কাজ। সরকার একটা তালিকা তৈরি করেই খালাস। সমস্ত ব্যয়ভার বহনের দায় সাফিনার ওপরেই বর্তালো। এতো দিনের বরফ গলতে শুরু করেছে টের পেতেই রাজস্থানের সরকার রাজ্যের ৫০০ টি স্কুলকে এডুকেট গার্লস প্রকল্পের আওতায় আনার অনুমতি দেয় সাফিনাকে। পাশাপাশি ৫% ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে অবশ্য এই অর্থকরী সাহায্য বেড়ে দাঁড়ায় ১৭%। সবটাই সম্ভব হয় সাফিনার অক্লান্ত আন্তরিক পরিশ্রমের ফলে।
এতো বিপুল সংখ্যক ছাত্রীর পঠনপাঠনের জন্য শিক্ষিকা জোগাড় হলো কোথা থেকে? সরকার কি এতো জন শিক্ষিকা নিয়োগ করলো? একদমই না। সাফিনার সংগঠন তারও ব্যবস্থা করে ফেললো অভিনব উপায়ে। মোট ২৩০০০ জন মেয়েকে বেছে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এডুকেট গার্লসের “টিম বালিকা”। এই দলের ২৩০০০ এর বেশি সদস্যারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে খুঁজে বের করে স্কুলছুট্ ছাত্রীদের। জোগাড় করে তাঁদের নাম , ঠিকানা আর অভিভাবকদের নাম। জানতে চায় স্কুল ছুটের কারণগুলো। এ হলো এক ধরনের গণসংযোগ। স্বেচ্ছাসেবিকাদের নিয়মিত যোগাযোগের ফলে রক্ষণশীল পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ একটু একটু করে বাড়তে থাকে। “মেয়েদের পড়াশোনার জন্য খরচ করা অর্থহীন” – এই মনোভাবের বদল হয়েছে অনেকটাই।
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৫













সাফিনার কথা সত্যিই অনুপ্রেরণা জোগায়। কথায় আছে – ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। এইসব মানুষ ইচ্ছে শক্তির ওপর ভর করেই বিশ্বজয়ী। মানুষ হিসেবে মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাই সাফিনাকে এতো বড়
সাফল্য এনে দিয়েছে। সাবাস।
সমাজের জন্য কিছু করবো – এই ভাবনাটাই সেভাবে চাগিয়ে তোলেনা আমাদের অন্তরাত্মাকে। সাফিনা এই ডাকে সাড়া দিয়েই আজ বিশ্ব জয়ী।
সাফিনা হুসেইন কে আমার ও কুর্ণিশ জানাই। সাফিনার আলোতে চারিদিক আরো আলোকিত হোক। সাফিনা র এই চেষ্টা ঘরে ঘরে আরো সাফিনা কে বিকশিত করুক।