আবার এক বন্ধুর বিয়োগ ঘটলো আমাদের।
‘আমাদের’ – মানে সরকারবিরোধী সংগ্রামী জনতার।
বিশেষভাবে শ্রমিক তথা মেহনতী শ্রমজীবী মানুষের রুটি রুজির লড়াইয়ে দীর্ঘদিনের অবিচল সাথী কমরেড সমুদ্র দত্ত, যিনি বাবু দত্ত নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, হঠাৎ করেই ৮ মার্চ ২০২৬ চিরবিদায় নিলেন সবার কাছ থেকে! ৬৮ বছর বয়সে। যাদবপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে। পশ্চিমবাংলার বুকে বড্ড প্রয়োজনীয় সময়ে ঘটলো তাঁর এই প্রস্থান!
শ্রমজীবী মানুষের বন্ধুমহল থেকে, নানা বিচ্যুতির কারণে দক্ষিণপন্থী সরকারের তাঁবেদার বাহিনীতে নাম লেখানোর এক বেদনাদায়ক ধারা চলছে বেশ কিছুদিন যাৎ। ‘সরকার’ সবসময়েই শোষক রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবক ও পাহারাদার। তাই মেহনতী মানুষের সঙ্গে সরকারের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। অনেক শ্রমজীবী-বন্ধু অনেকসময়েই ঘর পাল্টে সরকারের তাঁবেদার হয়ে ওঠেন। সমুদ্র ছিলো এই সুবিধাবাদী প্রবণতার তীব্র বিরোধী। আজীবন।
অনেক ছোটবেলা থেকেই বাবু দত্ত যুক্ত হয় নক্সালবাড়ি ধারার কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে। বিভিন্ন সময়ে সিপিআই (এম-এল) দলের নানা অংশের সঙ্গেই ছিলো তাঁর সাংগঠনিক যোগ। সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী হিসাবেই তিনি সর্বদা সক্রিয় ছিলেন। সময়ের সাথেসাথে, নানারকম মতপার্থক্যের কারণে সেইসব যোগাযোগ ক্রমেই শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিলো ধারাবাহিক। কখনও বেলেঘাটার কাঠকলে; কখনও হয়তো তপসিয়া-তিলজলা অঞ্চলে ট্যানারি শিল্পে; কখনও গড়িয়ার মহামায়াতলায় বয়লার কারখানায়; আবার কখনও বানতলায় লেদার ট্যানারি কমপ্লেক্সে। সরাসরি তাঁর নেতৃত্বে, প্রায় দশহাজার ট্যানারি শ্রমিকদের কলকাতায় পথ-অবরোধ, শ্রমিক আন্দোলনের এক মাইলফলক হয়ে আছে। সংঘবদ্ধ শ্রমিকদের উত্তপ্ত মেজাজ দেখে, পুলিশের বড়ো কর্তারাও সেদিন আর ঘাঁটান নি। এই ছিলো বাবু। জাতি-জাত-ধর্ম নির্বিশেষে, শ্রমিক তথা শ্রমজীবী জনগণের ঐক্য ছিলো তাঁর সবসময়ের লক্ষ্য।
রাজনৈতিক-সাংগঠনিক অবস্থান যা-ই হোক, শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিলো নিয়মিত ও আত্মিক সম্পর্ক। কানোরিয়া জুটমিলের শ্রমিকসংগ্রামে ছিলো তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। টালিনালার পাশে যুগযুগ ধরে বসবাসকারী মানুষগুলোকে উচ্ছেদের জন্য যখন পুলিশী তাণ্ডব শুরু হয়, বাবু দত্ত তখন ছিলো সক্রিয় প্রতিবাদের একেবারে সামনের সারিতে। সেখানে গণ্ডগোলের মধ্যে এক যুবতিকে লোক্যাল লুম্পেনদের জোর করে ‘সিঁদুর পরানো’-র অপচেষ্টাকে ঠেকানোর জন্য বাবু ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাঁকে নিজের বাড়িতে এনে রাখে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বেও তাঁর সংগ্রামী ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, দিল্লী, ঝাড়খণ্ড… কোথায় মেহনতি মানুষের পাশে নেই তিনি? সর্বত্র ছুটে বেরিয়েছেন, সারা জীবন।
বাবু দত্ত শুধুই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে তৎপর ছিলেন না। শ্রমজীবীদের চিকিৎসা নিয়েও তিনি সজাগ ছিলেন। মহামায়াতলায় শ্রমিকদের বিনা পয়সায় বা নামমাত্র মূল্যে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা শুরু করেছিলেন বন্ধু ডাক্তারদের সহযোগিতায়। ওষুধও দেওয়া হতো সাধ্যমতো। চেঙ্গাইলে যখন ‘শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী হাসপাতাল’-এর কাজ শুরু হয়, তিনি ছিলেন সেই উদ্যোগের একজন সক্রিয় সহযোগী। ২০২৪ সালে আরজি কর হাসপাতালে ‘অভয়া’-র প্রশাসনিক ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে যেদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাখো লাখো মানুষ ‘রাত দখল’ আন্দোলনে পথে নেমেছিলেন, অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি সস্ত্রীক সেদিন গড়িয়ার পথে ছিলেন সারারাত।
কেবলমাত্র কারখানায়-পথে-মাঠে-ঘাটে সংগ্রামরত শ্রমজীবী মানুষের সহযোদ্ধা হিসাবে পাশে হাজির থাকাই না। মিটিং, মিছিল, সেমিনার, পোস্টারিং, পথসভা … সর্বত্রই হাজির থাকতেন তিনি! ট্রেড ইউনিয়ন করতে গিয়ে বারবার মালিকদের রোষে পরেছেন। তাঁর একরোখা জেদ শ্রমিকদের আর্থিক সুবিধা ছিনিয়ে এনেছে বহুবার। কিন্তু মালিকদের আর মালিকের দালাল ‘জনপ্রতিনিধি’(!)-দের রাগও বেড়েছে তাঁর উপর। মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর হয়রান করা হয়েছে তাঁকে। ‘জনদরদী’ সরকার সবসময়েই কালা-বোবা হয়েই থেকেছে! আজ তিনি আর বেঁচে নেই, কিন্তু মামলা আজও রয়ে গেছে!
২০০৫ সাল থেকে তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। প্রথমে ‘শ্রমজীবী’ নাম দিয়ে; পরে তার নাম হয় ‘শ্রমজীবী দেশ’; সবশেষে পত্রিকার রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যায় ‘শ্রমজীবী ভাষা’ নামে। তিনি যখন হাসপাতালের আইসিইউ-তে শেষ শয্যায়, তখনও প্রেসে থাকা মার্চ মাসের সর্বশেষ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস সংখ্যা’ নিয়ে জানতে চেয়েছেন ঘোরের মধ্যে, মৃত্যুর আগের দিন। তাঁর চিন্তায়-চেতনায়-মননে এই ছিলো পত্রিকার স্থান। দিন-রাত এক করে, দিন-মাস-বছর সমুদ্র দত্ত শুধুই শ্রমজীবী ভাষা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। বাবু দত্ত মানেই ছিলো শ্রমজীবী ভাষা; ‘শ্রমজীবী ভাষা’ আর সমুদ্র দত্ত ছিলো সমার্থক। অনেক পত্রিকার উদয় ও বিলয় ঘটেছে বিগত বছরগুলোতে, কিন্তু শ্রমজীবী ভাষা নিরন্তর পথ চলেছে দৃঢ়ভাবে। সব বাধাকে অতিক্রম করে। পত্রিকার কাজে অনেকেই কমবেশি তাঁর সঙ্গে থাকলেও, তিনিই ছিলেন সেই ব্যক্তি যাঁকে ছাড়া শ্রমজীবী ভাষা-র অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। পত্রিকার আর্থিক টানাটানির সময়ে, মায়ের পেনশনের টাকা মাসের পর মাস পুরোটাই ঢেলেছেন পত্রিকার জন্য। তাঁর ঘোষিত বিশ্বাস ছিলো, “ভালো কাজ টাকার জন্য আটকে থাকে না।” এইরকম আর একটা বাবু দত্ত কোথায় পাওয়া যাবে!
সমুদ্র দত্তের এক নজির সৃষ্টিকারী পত্রিকা এটি। ব্যতিক্রমী উদাহরণ ছাড়া, নির্দিষ্ট মাসের নির্দিষ্ট তারিখেই প্রকাশিত হয়েছে। ‘করোনা’ কালে লকডাউনের সময়ে শুরু হয় ডিজিটাল এডিশন। পরে, আবার মুদ্রিত আকারে বের হয়। শুধু পত্রিকা প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিলো না ‘শ্রমজীবী ভাষা’। বাংলাভাগ তথা দেশভাগের তাৎপর্য; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন; পশ্চিমবাংলার ছাত্র আন্দোলন; ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়েও ‘শ্রমজীবী ভাষা প্রকাশনা’ থেকে পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে নানা সময়ে।
বর্তমান কালের অন্যতম দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, প্রগতিশীল শিবিরে প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। সরকারি উচ্ছিষ্টের লোভে, নিজেদের মেরুদন্ড বিকিয়ে দিয়ে বামপন্থী শিবির থেকে বহু জনেই পা-হড়কে দক্ষিণপন্থী শিবিরে ভিড়ে যাবার প্রবণতা! শ্রমজীবী ভাষা এই স্তাবকতার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান যুথবদ্ধ প্রতিবাদের এক বলিষ্ঠ মাধ্যম। দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে, বৃহত্তর বামপন্থার এক বাস্তব মিলন ক্ষেত্র। প্রচলিত রাজনীতির রণাঙ্গনে বামপন্থীরা ‘একসাথে চলা’-র কথা মুখে বললেও, কার্যক্ষেত্রে পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতেই তাঁরা বেশি ব্যস্ত থাকেন! তাঁদের একমঞ্চে এনে কথা বলানোর এক সার্থক মাধ্যম ছিলো এই পত্রিকা। সৌজন্য সমুদ্র দত্ত, ওরফে বাবু দত্ত। যতো দিন যাচ্ছে, এই পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব ততোই উপলব্ধি করা যাচ্ছে। এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি করে উপলব্ধি করা যাবে। ‘ভোট’-এর তাগিদে নয়, পথে মাঠে ঘাটে ক্ষেতে কারখানায় অফিসে আদালতে শিক্ষালয়ে হাসপাতালে… সংগঠিত গণসংগ্রামের প্রয়োজনে। দক্ষিণপন্থা সর্বত্র ও সর্বদাই সর্বনাশের মূল, প্রকৃত বামপন্থাই মুক্তির পথ।
প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে, প্রশাসনিক অপরাধের বিরুদ্ধে, ধর্ষণ-চুরি-জালিয়াতি-থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে, জনজীবন তথা শ্রমজীবী আন্দোলন তথা গণ-আন্দোলনের উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরূদ্ধে, জনগণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সংগ্রাম যতোদিন জারি থাকবে, বামপন্থী আন্দোলনে সমুদ্র দত্তের প্রাসঙ্গিকতাও ততোদিন উজ্জ্বল থাকবে।










