‘দাদু, সরস্বতীর মুখে হাসি নেই কেন?’ চক্রবর্তী পুরোহিতের নাতনি দাদুকে জিজ্ঞেস করতেই দাদুর দৃষ্টি গেল বাড়িতে এবার আনা মূর্তির দিকে। অনেকক্ষণ ধরে বাড়ির পূজোটা করলেন। বাড়ির সবাইকে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ালেন, সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন সরস্বতীর মুখটা এবার অন্যরকম লাগছে কি না।
এতক্ষণে সবাই চোখ বুজে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রণাম সেরে সরস্বতীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে গিয়ে একটু অবাকই হল। তিন্নি তো ঠিকই বলেছে। এমন মুখ তো আগে কেউ দেখে নি।
পুরুত মশাই এর সঙ্গে বাড়ির সবাই খালপাড় থেকে ঠাকুর কেনার জন্য আফশোষ করে সিদ্ধান্ত নিল এরপর কুমোরটুলি গিয়ে ভালো করে দেখে হাসিমুখের সরস্বতী আনবে।
চক্রবর্তী মশাইয়ের মেজাজটা সক্কাল সক্কাল খিঁচড়ে গেল। আজ অনেক সকালে উঠে স্নান সেরে নিয়েছেন। পাড়াতেই গোটা দশেক পূজো সারতে হবে তারপর নতুন তৈরি হওয়া আবাসনের প্যান্ডেলের পূজো করে আবার আবাসনেরই গোটা আষ্টেক পূজোর জন্য তাঁকে বলে গেছে আবাসনের প্রোমোটার কাম কাউন্সিলর খেনু, কাউন্সিলর হওয়ার পর এখন যার আর্শীবাদ নিয়েই পাড়ায় সব পূজো, রক্তদান শিবির, বস্ত্র বিতরণ, ফুটবল, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ইলিশ উৎসব, গণবিবাহ ইত্যাদি আয়োজন করা হয়।
এসব নিয়ে বড়ো বড়ো ফ্লেক্সে তার নাম লেখা হয় সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট সমাজসেবী খগেন্দ্রনাথ নাগ। সঙ্গে তার একগাল হাসিমাখা মুখ। তার উপরে অবশ্য থাকে সেই মুখের ছবি যার অনুপ্রেরণায় খনা আজ খগেন্দ্রনাথ।
পুরুত মশাই তাড়াতাড়ি করে বাড়ির সবচেয়ে কাছের প্যান্ডেলের পূজো সারতে খাট দিয়ে বানানো বেদিতে উঠলেন। তার তিনদিক তিন রঙের শাড়ি আর উপরে ল্যাম্পপোস্ট থেকে ছিঁড়ে আনা ফিনাইল ও স্যানিটারি ক্লিনার-এর বিজ্ঞাপনী ফ্লেক্সের আচ্ছাদন।
চক্রবর্তী মশাইয়ের কোন কিছুই দেখার সময় নেই। তবু তিন্নির কথাটা আর বাড়ির সরস্বতীর মুখটা তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। আরে এই মুর্তির মুখেও হাসি নেই তো। যাকগে। এত ভাবার সময় নেই। কি মুশকিল আরও চারটে পূজো তাড়াতাড়ি করে সেরে ফেললেন, সব মুর্তির মুখেই হাসি উধাও। এরপর এ পাড়ার সবচেয়ে বড় সরস্বতী পূজার প্যান্ডেলে ঢুকলেন।
এটা খেনুর নিজের পূজো। বিশাল প্যান্ডেল, বিশাল মূর্তির বীণার মাপটাই নাকি ফুট বিশেক। পনেরোটা সিড়ি ভেঙ্গে উঠতে রীতিমতো হাঁপিয়ে গেছেন, মাথাটা চক্বর দিয়ে উঠলো কি! না এই পূজোটার জন্য তাঁর সবচেয়ে বেশি দক্ষিণা, নগদ প্রণামী, ধুতি শাড়ি ও ফল মিষ্টি জোটে। তাই এই পূজোটা কয়েকবছর ধরে তিনি অনেকক্ষণ সময় নিয়ে প্রতিটি আচার উপাচার মেনে করে থাকেন। তাছাড়াও এই পূজোয় অনেক বয়স্করাও পুষ্পাঞ্জলি দিতে আসে, তাদের চোখকান ফাঁকি দিয়ে পূজো সারা যায় না। অনেকক্ষণ সময় ধরে পূজো করলেন। সবার পুষ্পাঞ্জলি সারা হল।
গোছগাছ করছেন। হঠাৎ তিন্নির গলা। :এ……মা এই সরস্বতীর মুখেও হাসি নেই, দ্যাখ দ্যাখ।’ তিন্নির সঙ্গে ওর আশেপাশের বয়সের ছেলেমেয়েগুলো সবাই বলে উঠলো ‘তাই তো, তাই তো’।
চক্রবর্তী মশাই এবার মুখ তুলে মুর্তির মুখের দিকে তাকাতেই কি যেন হয়ে গেল। টলে পড়ে যেতে যেতে কোনরকমে মূর্তির পায়ের কাছের মাটি ধরে বসে তারপর চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন। হঠাৎই দেখতে পেলেন মূর্তির মুখে যেন এক চিলতে হাসি।
সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। খেনুর সাঙ্গোপাঙ্গোরা দৌড়ে এল। খেনূ আজকাল অত তাড়াতাড়ি সিড়ি উঠতে পারে না। গত কয়েক বছরে তার শরীরটারও তার ভুঁড়ি, টাকা পয়সা, তার সম্পত্তি, প্রভাব প্রতিপত্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। খেনু মোবাইলে ভাইপো নন্দুকে ধরল।
নন্দু পাশের পাড়ায় নেতাজীর জন্মদিনে রক্তদান ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির তদারকি করছে। কাকার আদেশে ওখানের ডাক্তারকে বাইকের পেছনে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ছুটে এল। সঙ্গে আর একটা বাইকে যন্ত্রপাতি নিয়ে আরো দুজন। চক্রবর্তী মশাইয়ের ব্লাড সুগার, ব্লাডপ্রেসার কমে গেছে। সকাল থেকে উপোস করে আছেন, তিনি নিয়ম নিষ্ঠ পুরোহিত। অনেক চেষ্টা করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে গ্লুকোজ, নুন চিনির সরবত খাইয়ে তাকে চাঙ্গা করা হল। খেনু নিজের গাড়িতে করে আবাসনের পুজো করাতে চক্রবর্তী মশাইকে নিয়ে গেল। চক্রবর্তী মশাই নিয়মমতো পূজো সারলেন। তার বাকি সব পূজো করতে যেতে হল না, খেনুর চেলারা অন্য পুরোহিত দিয়ে সেসব সামলে দিল।
দুপুরে আবাসনের সবার সঙ্গে চক্রবর্তী মশাইকে অতি যত্নে খাওয়ানো হল। খেনুর ড্রাইভার পুরোহিত মশাইকে তার পাওয়া সবকিছু মায় প্রতিটি গামছা পর্যন্ত বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এল। চক্রবর্তী মশাই যতক্ষণ পূজোর জায়গায় ছিলেন আর সাহস করে মূর্তির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন নি। বাড়ি ফিরে বাকি দুপুর ঘুমিয়ে শেষ বিকেলের দিকে উঠলেন।
এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। আজকের খবরের কাগজটা নিয়ে বসলেন। খবর বেরিয়েছে রাজ্যের স্কুলে স্কুলে শিক্ষক শিক্ষিকার ভীষণ অভাব, অনেক সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, অঙ্কের, বিজ্ঞানের, ইতিহাসের, ভূগোলের শিক্ষক নেই। পড়াশোনার ভীষণ অসুবিধা।
চক্রবর্তী মশাইয়ের মাথায় এল কিছুদিন আগে সতীদাহ নিয়ে কে নাকি কি সব বলছে, আরও আগে সদ্যজাত বাচ্চার ওজন নিয়ে, গান্ধীর অনশন ভঙ্গ নিয়ে অনেক কথা শোনা গেছে। স্কুলে মাষ্টার মাষ্টারনিরা নেই। ছেলেমেয়েগুলো কি এসবই শিখছে?!
চক্রবর্তী মশাইয়ের আবার কি একটা মনে হল, ছুটে গেলেন বাড়ির সরস্বতী মূর্তির কাছে, আস্তে আস্তে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন মুর্তির মুখের কোণে একটা রাগ আর ব্যঙ্গ মেশানো হাসি।
দেখলেন তিন্নি বাড়ি ফিরে এল। সঙ্গে তিন্নির সতেরো বছরের জ্যাঠতুতো দিদি তিতির।
তিন্নিকে মূর্তির মুখ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থমকে গেলেন। তিন্নি রেগে রেগে বলল দিদিকে ডেকে, ‘খেনুকাকু বলে দিয়েছে সন্ধ্যার পরেই যেন দিদি বাড়ি ফিরে যায়।’
দিদি বলতে গিয়েছিল ‘যাদবপুরে, ব্যারাকপুরে, আরও সব কোথায় কোথায় মেয়েরা তো দলবেঁধে রাস্তায় বের হচ্ছে, সঙ্গে ছেলে বন্ধুরাও। ওরা তো অভয়া মঞ্চের কথা বলে বেড়ায়, ভয়ও পায় না।’
খেনুকাকু নাকি খুব রেগে ধমকে দিয়েছে।
তিতির আর ওর বন্ধুরা অভয়া মঞ্চের দাদা দিদিদের খোঁজ নিতে কাল সকালেই বের হবে।










এই সমস্ত লেখা সময়ের দলিল হিসেবে থেকে যাবে অবশ্যই । লেখককে অনেক ধন্যবাদ ।