আমরা কেন গিয়ে অনুনয় করব – “আমাদের মামলা তুলে নিন”?
প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। অভয়ার ন্যায়বিচারের আন্দোলনে আমরা যে ক্ষুদ্র অংশটুকু নিতে পেরেছি, সেটাকে আমি কোনো কৃতিত্ব বলে দেখি না। একজন মানুষ হিসেবে, একজন চিকিৎসক হিসেবে, একজন সন্তানের পিতা হিসেবে এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে – ওই সময়ে যেটুকু করা আমাদের কর্তব্য ছিল, আমরা সেটুকুই করার চেষ্টা করেছি।
আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছি, প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি, কর্মসূচি করেছি, প্রশ্ন করেছি, বিচার চেয়েছি। কারণ ঘটনাটা আমাদের কাছে কোনো দূরের সংবাদ ছিল না। হাসপাতালের করিডর, চিকিৎসকদের কর্মস্থল, আমাদের নিজেদের পেশাগত পরিবেশ – সেই জায়গাতেই একজন তরুণ চিকিৎসকের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার অভিঘাত আমরা প্রতিদিন অনুভব করেছি।
আজও আমরা যে ন্যায়বিচার চেয়েছিলাম, তা সম্পূর্ণভাবে অধরা। কিন্তু বিচার এখনও না পাওয়া মানে এই নয় যে সেই আন্দোলন ব্যর্থ ছিল, কিংবা প্রতিবাদের নৈতিকতা কমে গেছে। বরং প্রশ্নটা এখনও বেঁচে আছে বলেই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাও বেঁচে আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল – বিচার চাওয়াটাই যেন কোনো কোনো সময় অপরাধ হয়ে উঠেছিল।
একজন চিকিৎসক শুধু “Justice for Abhaya” লেখা টি-শার্ট পরে কর্তব্যরত অবস্থায় ছিলেন – তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হল। দুর্গাপুজোর সময় প্যান্ডেলের পাশে কেউ বিচার চেয়ে আওয়াজ তুললেন – তাঁকেও পুলিশি হেনস্থার মুখে পড়তে হল। বিভিন্ন চিকিৎসক ও সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হল, থানায় ডেকে পাঠানো হল, বারবার আইনি ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যে রাখা হল।
এই অভিজ্ঞতাগুলো বাইরে থেকে শোনা রাজনৈতিক গল্প নয়। যাঁরা সেই সময় প্রতিবাদের সঙ্গে ছিলেন, তাঁরা জানেন – ফোন এলে বুকের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঠত, “এবার কাকে ডাকা হল?” কার নামে মামলা হল, কে থানায় গেলেন, কার পরিবার আতঙ্কিত -এসব ছিল আন্দোলনের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ।
আর এখানেই প্রশ্নটা বড় হয়ে যায়।
সুপ্রিম কোর্ট যদি বলে যে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের জন্য নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, তাহলে বাস্তবে প্রতিবাদকারীদের থানায় নিয়ে যাওয়া, মামলা দিয়ে চাপে রাখা বা প্রশাসনিক ভয় দেখানোর অর্থ কী?
তৎকালীন সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আমাদের আপত্তি সেখানেই ছিল এবং আজও আছে।
আমরা সেই সময় রাষ্ট্রের প্রতিহিংসার স্বাদ পেয়েছি। তাই আজ সরকার বদলে যাওয়ার পর একটা বিষয় আমি খুব স্পষ্টভাবে বলতে চাই – আমরা কোনো সরকারের কাছে করুণা চাই না।
আজ নতুন সরকার এসেছে। কয়েক মাস অতিক্রান্ত। বাংলায় এখন তথাকথিত “ডাবল ইঞ্জিন” সরকার। নতুন মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেছেন -তিনি “ভোলেননি, ভোলেননি, ভোলেননি”; তিনি “কমিটেড, কমিটেড, কমিটেড।”
ভালো কথা।
তাহলে এখন সময় কথার নয়, কাজের।
অভয়ার বিচার চেয়ে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, তাঁদের মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে – সেটা নতুন সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষার বিষয়। আমাদের পরীক্ষা নয়।
আমরা কেন গিয়ে অনুনয় করব – “আমাদের মামলা তুলে নিন”?
কোন অপরাধের জন্য?
বিচার চাওয়ার জন্য?
একজন সহকর্মীর মৃত্যুর সত্য জানতে চাওয়ার জন্য?
রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার জন্য?
নাকি গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করার জন্য?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সেই মামলাগুলি প্রত্যাহারের জন্য আমাদের কারও দরজায় গিয়ে আকুলি-মিনতি করার প্রয়োজন নেই।
যে রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে মামলা করেছিল, সেই রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব সেই অন্যায় সংশোধন করা।
সরকার বদলেছে – কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে আমার কোনো রোম্যান্টিক ধারণা নেই। শাসকের জামাকাপড়ের রং বদলাতে পারে, পতাকা বদলাতে পারে, স্লোগান বদলাতে পারে- কিন্তু রাষ্ট্র সব সময়ই ক্ষমতার একটি যন্ত্র। আর ক্ষমতা স্বভাবতই অস্বস্তিকর প্রশ্ন পছন্দ করে না।
এই শিক্ষা আমরা গত কয়েক বছরে খুব কাছ থেকে পেয়েছি।
তাই নতুন সরকারের প্রতিও আমাদের অবস্থান একই থাকবে। ভালো কাজ করলে সমর্থন করব, অন্যায় করলে প্রশ্ন করব। কারণ আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে অভয়ার বিচার চাইনি। আমরা বিচার চেয়েছি একজন মানুষ, একজন চিকিৎসক এবং একজন নাগরিক হিসেবে।
মুখ্যমন্ত্রী যদি সত্যিই “ভোলেননি”, যদি সত্যিই “কমিটেড” হন, তাহলে তার প্রমাণ আমাদের কথায় নয় – প্রশাসনিক পদক্ষেপে দেখা যাবে।
আমরা অপেক্ষা করব সেই কাজের জন্য।
কিন্তু নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য, কিংবা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য, কোনো সরকারের কাছে মাথা নত করে আবেদন করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
কারণ আমরা অন্যায় করিনি।
আমরা বিচার চেয়েছিলাম।
আর বিচার চাওয়া কোনো অপরাধ নয়!











