কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী শামীম আহমেদের উপর বিজেপি-আরএসএস গুন্ডাদের আক্রমণের তীব্র ধিক্কার জানাই। রাজ্যজুড়ে শাসকদলের গুন্ডারাজ ও ফ্যাসিবাদী কায়দায় হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
তৃণমূল সরকার বিদায় হলেও তৃণমূলী গুণ্ডারাজ যে নবকলেবরে গেরুয়া অবয়বে এখনও বহাল, বলা ভালো আরও ভয়ানক রূপে আত্মপ্রকাশ করছে, তারই জ্বলন্ত উদাহরণ গতকাল রাতের ঘটনা।
গড়বেতায় আইনজীবী শামীম আহমেদ এবং তাঁর সহকর্মীরা সাম্প্রদায়িক গুন্ডাদের ভয়ানক আক্রমণের মুখে পড়েন। সামনে আসা ভিডিওগুলিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অত্যন্ত উগ্র ভঙ্গিতে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে দিতে লাঠি ও অস্ত্র হাতে একদল দুষ্কৃতী তাঁদের গাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। গাড়ির কাঁচ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হচ্ছে। চলছে গালিগালাজ, প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি, ধাক্কাধাক্কি ও শারীরিক নিগ্রহ। বারবার শান্তভাবে কথোপকথনের চেষ্টা করা হলেও উন্মাদের মতো সেই দুষ্কৃতী দল লাঠি-বাঁশ দিয়ে গাড়ির কাঁচ ভাঙতে থাকে। এবং পুলিশ উপস্থিত থাকলেও আক্রমণ আটকানোর কোনো প্রচেষ্টা পুলিশের তরফে দেখা যায়নি।
শামীম আহমেদ প্রথম দিন থেকেই তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আমাদের, ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট তথা অভয়া আন্দোলনের পাশে সর্বশক্তি দিয়ে থেকেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ যখন বারবার প্রতিহিংসামূলক আক্রমণ নামিয়ে এনেছে আন্দোলনকারীদের উপর, তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রেই আইনজীবী এবং সহযোদ্ধা হিসেবে আমাদের পাশে থেকেছেন।
২০২৪-এর অনশন আন্দোলনের সময় পুজো পরিক্রমায় স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে ৯ জন ছাত্রকে গ্রেফতারের মামলা হোক, বেআইনিভাবে মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং উপেক্ষা করে আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকদের পোস্টিং পরিবর্তনের মামলা হোক, অথবা প্রায় ত্রিশ জন আন্দোলনকারী চিকিৎসক ও মেডিকেল পড়ুয়ার নামে সারি সারি মিথ্যে FIR-এর বিরুদ্ধে লড়াই, সব ক্ষেত্রেই আমরা তাঁকে পাশে পেয়েছি। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের নামে আন্দোলনকারীদের হয়রানির সময়ও আইনি সহায়তা নিয়ে তিনি এবং তাঁর টিম পাশে থেকেছেন।
নিজের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অভয়া আন্দোলনের শুরু থেকেই আমাদের সঙ্গে মতবিনিময়, আইনি পরামর্শ ও আইনি সহায়তা দিয়ে এসেছেন আইনজীবী শামীম আহমেদ।
তাঁর উপর এই ন্যক্কারজনক আক্রমণকে আমরা তাই আমাদের উপর আক্রমণ হিসেবেই দেখছি। সাথে এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন এই হামলার সময় হামলাকারীরা যে ধর্মীয় স্লোগান উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করছে তা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করা মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে মানুষের ওপর আক্রমণ, বা হিংসা ও বিভেদ ছড়ানো অত্যন্ত ভয়ানক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের পরিচয়বাহী। এর বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির যে ছবি প্রতিদিন সামনে আসছে, তা দেখে মনে হয় প্রশাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে। আজ কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাল কোনও সংবাদমাধ্যমের অফিসে হামলা। কখনও কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী, কখনও শিক্ষক-শিক্ষিকা, কখনও ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, কখনও সাংবাদিক অথবা আইনজীবী। প্রতিদিন কোনও না কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠ আক্রান্ত হচ্ছেন শাসকদলের গুন্ডাবাহিনীর হাতে।
পুলিশ প্রশাসনের নেতিবাচক ভূমিকা আগের সরকারের আমলের মতোই বিদ্যমান। অন্যদিকে শাসকদলের মুখপাত্ররা রোজ বুদ্ধাবতার সেজে জলদগম্ভীর গলায় প্রেস বার্তা দিচ্ছেন যে যারা এই গুন্ডামি করছে, তাদের সঙ্গে দলের নাকি কোনও সম্পর্কই নেই!
তাহলে প্রশ্ন একটাই। এই শাসক দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন ‘হনুমানের দল’ গোটা রাজ্যজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, আর সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন? বারবার একই অজুহাত, একই অস্বীকার এবং একই নিষ্ক্রিয়তা আসলে এই হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া, মদত দেওয়া এবং কার্যত এনডোর্স করারই নামান্তর।
গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদী কণ্ঠের উপর এই আক্রমণ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সমস্ত শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
শামীম আহমেদের উপর হামলার অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের গ্রেফতার চাই।
গুন্ডারাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
গণতন্ত্রের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।










