আজ এক দুরন্ত পাহাড়ি তনয়ার কথা বলবো। তাঁর নাম শবনম বশির গোজের চেচি। কাশ্মীরের বান্দিপোরার এক গুজ্জর – বাকরওয়াল ট্রাইবাল পরিবারের কন্যা শবনম। গুজ্জর – বাকরওয়াল সম্প্রদায়ের মানুষরা জীবিকা সূত্রে যাযাবর পশুপালক। জন্মসূত্রে এমনই এক পারিবারিক প্রেক্ষাপটের সদস্যা হয়েও শবনম বশির আজ কাশ্মীরের এক ট্রাভেল প্রোমোটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভূস্বর্গ কাশ্মীরের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে পর্যটনের ওপর। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাশ্মীর নিয়ে সারা দুনিয়ার পর্যটনপ্রেমী মানুষের আগ্রহের অন্ত নেই। একজন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্যুরিজম গবেষক হিসেবে শবনমের আক্ষেপ ছিল যে তাঁদের সুন্দরী বান্দিপোরাকে নিয়ে পর্যটকদের মধ্যে কোনো আগ্রহ, উদ্দীপনা নেই। আসলে কাশ্মীরের পর্যটন বিভাগের কর্মকর্তারা ট্যুরিজমের প্রসারে এই এলাকার অপার সম্ভাবনার কথা জানতেন না। একজন সোলো ট্রেকার হিসেবে শবনম পাহাড়ি পাকদণ্ডী পেরিয়ে চলতে চলতে আবিষ্কার করেছেন ১৬টি নতুন সম্ভাবনাময় পর্যটন স্থলকে যা আজ ভ্রামণিক মানুষদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যটনের হাত ধরেই একদা উপেক্ষিত বান্দিপোরা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। সুস্থিত পর্যটনের হাত ধরে বান্দিপোরার মানুষদের যাযাবর জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। আদর করে কাশ্মীরের লোকজন তাঁকে ডাকে Isabella Bird of the Valley বলে।
আজ বেশ তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছে শবনম। ভোরের আলো ফুটতে এখনও খানিক সময় বাকি। পর্বতের ওপর দিকের ঢালে লম্বা লম্বা ঘাসের বুগিয়াল। শীতের বরফ গলার সংকেত পেয়েই মাটি ফুঁড়ে উঁকি দিচ্ছে নবীন ঘাসের দল। কিছুদিনের মধ্যেই বরফের ধবধবে সাদা গালিচাকে সরিয়ে হরিৎ চারণভূমি জাঁকিয়ে বসবে গোটা এলাকা জুড়ে । এমন ঘাসের জমিকে ঘিরেই কাশ্মীরের গুজ্জর – বাকরওয়াল সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনের পরিশ্রমী যাপন । এইসব ডিঙিয়েই শবনম নামের মেয়েটি চলেছে চারণভূমির ওপর দিয়ে চরণ ফেলে ফেলে ; মাঝেমাঝেই একঠায় দাঁড়িয়ে পড়ছে সে, হাতের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখছে শিশির ধোওয়া ভোরের অনির্বচনীয় দৃশ্যপট। নাগমার্গের ওপর দিয়ে হালকা মেঘের দলেরা উড়ে চলেছে কোন্ অজানা ঠিকানায়। শবনমের মুঠোফোনের ক্যামেরা সব ধরে রাখে।
এইসব এলাকায় এখনও শহুরে ট্যুরিস্টদের পা পড়েনি। আর পড়বেই বা কী করে? রাজ্যের পর্যটন বিভাগের কর্মকর্তারা এখনও বান্দিপোরার এসব বিজন অঞ্চলের কথা জানেন না। তাই বান্দিপোরার পাহাড়তলিতে এখনও বিরাজমান পিনফেলা নৈঃশব্দ্য আর অনন্ত শান্তি। নিজের এলাকাকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করে শবনম, হয়তো নিজেকেও।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কাশ্মীর। প্রতি বছরই দেশ বিদেশের লাখো মানুষ এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পা রাখেন শবনমের রাজ্যে। অথচ নতুন নতুন জায়গায় যাওয়ার পরিবর্তে বহুদিনের চেনা পথেই তাঁদের পরিক্রমা। শবনম এই গতানুগতিকতার বিপরীতে চলতে চায় , চারণিক পরিবারের অনিশ্চয়তা ভরা জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা ও স্থায়ি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে চায় পর্যটনের হাত ধরে। ঘুরতে গেলেও যে চাই পুঁজি। পারিবারিক সাহায্যের প্রত্যাশা না করেই শবনম নতুন সম্ভাবনার খোঁজে বান্দিপোরার সর্বত্র অভিযাত্রীর মন নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, খতিয়ে দেখতে চায় সেইসব এলাকার পর্যটন সম্ভাবনা। লম্বা ট্রেকিং শুরু করে শবনম সমস্ত সমস্যার কথা, সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখেই। নিজের পিঠের ব্যাগে প্রয়োজনীয় সবকিছু ভরে নিয়েই পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় শবনম বশির,এক অনমনীয় পাহাড় কন্যা। সে জানে একবার যদি পর্যটন বিভাগের নজরে আনা যায় এই নতুন নতুন এলাকাগুলোকে তাহলে তথাকথিত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে বিলম্ব হবেনা। বাড়বে তাঁদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা।

অন্যের মুখের কথায় বিশ্বাস না করে শবনম নিজে পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখেছেন বান্দিপোরার প্রতিটি এলাকা যদি নতুন কোনো সম্ভাবনার খোঁজ পাওয়া যায়। শবনম জানে, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কোনো স্থানকে তিল তিল করে গড়ে তুলতে হয়। একবার পর্যটকদের নেক নজরে পড়লে পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্যে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব হবে না। সবথেকে আগে একটা প্রাথমিক পরিচিতি লাভ করা দরকার, পরবর্তী উন্নয়ন ঘটবে আপন নিয়মে। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।
ময়দানে নেমে পড়েছে কোমর বেঁধে। চান্দাজি, নাগমার্গের মতো অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত জায়গাগুলোতে এখন ভিড় জমছে ভ্রমণ পিপাসুদের। সুযোগ বুঝে সরকারের পক্ষ থেকে শুরু করা হয়েছে হোম স্টে প্রকল্প। সেই প্রকল্পে যুক্ত হতে আবেদনকারী প্রার্থীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে শবনমের উদ্যোগের যে অনেকটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে তা স্বীকার করে নিয়েছেন সবাই।
এই মুহূর্তে বান্দিপোরার উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ বেয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন পর্যটকরা। শবনমের লেখা কিতাব পড়ে তাঁরা কাশ্মীরের এই আন এক্সপ্লোরড এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন। বছরে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ আসছেন শবনমদের অতিথি হয়ে। শবনমের দেখানো পথেই ট্রেকিং করছেন তাঁরা। এরমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে খান চল্লিশ হোম স্টে। সেখানে কাশ্মীরী কায়দায় আতিথেয়তা গ্রহণের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। পশুচারণের অনিশ্চয়তা থেকে এখন অনেকটাই মুক্তি মিলেছে। এককালে যাঁরা শবনমকে বাধা দিয়েছিল তারাই আজ শবনমের প্রচেষ্টায় খুশি। এক নতুন আবহে আজ উদ্বেলিত সবাই। খুশি শবনমও, কেননা এমনই এক আশ্চর্য রূপান্তরের রূপকথা রচনা করতেই চেয়েছিল শবনম বশির – সুদূরের পিয়াসী এক চঞ্চল নগকন্যা।
ঋণ স্বীকার: Awaz, বেটার ইন্ডিয়া, শবনম বশিরের ফেসবুক পেজ।
মার্চ ২ .২০২৬













খুব ভালো লাগলো শবনমের অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনী শুনে। তবে একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে। এই এলাকায় ধীরে ধীরে পর্যটকের সমাগম বাড়লে যে প্রকৃতির আকর্ষণে যাওয়া, সেটাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না তো? সরকারি পর্যটন দপ্তর সেই দিকে আদৌ নজর দেবে? পদচারী ট্রেকারদের আনাগোনা বাড়লে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু যখনই যাতায়াতের সুবিধা, থাকা খাওয়ার জায়গা বাড়বে, তখনই সাধারণ পর্যটক পরিবারের আনাগোনা বাড়বে – সেটাই চিন্তার।
ধন্যবাদ অভ্র। সত্যিই, শবনমের কথা প্রেরণার উৎস। এক পশুপালক যাযাবর পরিবারের মেয়ের এমন চিন্তা ভাবনা দেখে খুব ভালো লাগে। অনেক অনেক বাধা ডিঙিয়ে শবনমদের পাদপ্রদীপের আলোয় আলোকিত হতে হয়। পদে পদে বিধিনিষেধ। বান্দিপোরায় পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনকে পিছনে ফেলে ওরা এখন আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করছে কিছুটা। পর্যটকদের দৌরাত্ম্য না বাড়লেই মঙ্গল।