সাত সকালে ইউ টিউবে ভেসে আসা ছবিটা দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়েছিলাম। আপনাদেরও নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে অমন চমকদার দৃশ্যখানি – সারসার মহিলার দেহ শোয়ানো রয়েছে চিতার ওপর, অন্তিমশয়ানে। বালিশের পাশে রাখা চশমা চোখে আঁটতেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। মধ্যপ্রদেশের ছাত্তারপুর জেলার কুপী গ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মহিলারা এক অভিনব কায়দায় প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। কেন এমন আজব পদ্ধতিতে আন্দোলন? কেন্দ্রীয় সরকারের জল শক্তি মন্ত্রকের উদ্যোগে মধ্যপ্রদেশ এবং সংলগ্ন উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কেন ও বেতোয়া নদীকে জুড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য : অত্যন্ত খরা পীড়িত বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে সেচের ব্যবস্থা করা এবং সেই সূত্রে আরও কিছু সহযোগী পরিষেবার সম্প্রসারণ ঘটানো। নদী সংযোগের ভাবনাকে বাদ দিলে আর সবকিছুই আমাদের খুব চেনা ভাবনার বিষয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে অগণিত নদী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ আমরা সবাই দেখেছি । এক সময়ে বলা হয়েছে এই সুবিশাল কংক্রিটের প্রাচীর দিয়ে নদীকে বেঁধে দেওয়া হলে অশান্ত নদী শুধু মানুষের বশ মানবে না, তার জল নিয়ে চলবে মানব উন্নয়নের বিচিত্র হোরিখেলা। হাজারো কল্পনার জাল বুনে আম জনতাকে মোহিত করে একে একে প্রকল্পের রূপায়ণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাহলে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন কেন মধ্যপ্রদেশের এই অঞ্চলের মানুষজন? এ কেমন উন্মত্ততা? আন্দোলনের নামে এ কেমন উন্নয়নের বিরোধিতা?আসলে সমস্যার বীজ যে এখানেই নিহিত রয়েছে। একটা বড়ো রকমের ঝড় যে আসছে তা বেশ টের পাচ্ছিল ছাত্তারপুর ও পান্নার আদিবাসী মানুষজন। মহল্লায় মহল্লায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতদিন উন্নয়নের ডঙ্কা বাজানো হচ্ছিলো। ফিসফিস করে শঙ্কিত কন্ঠে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো মানুষগুলো। কথা তো নয়, প্রতিরোধের বার্তা বিনিময়।কেমন একটা থমথমে পরিস্থিতি। পান্নার জঙ্গলের বুনো নিস্তব্ধতা খান খান করে পাহাড় ভাঙ্গা মেশিনের যান্ত্রিক ঘড়ঘড়ানি, ধুলো উড়িয়ে বুলডোজার আর জেসিবি মেশিনের মাটি খোঁড়ার শব্দ ভেসে আসতেই জঙ্গলের মানুষজন সচকিত হয়ে ওঠে নতুন করে। অচিরেই যন্ত্র দানবদের উল্লাসে মাতোয়ারা হলো বনাঞ্চল – পায়ে চলার সরু বনপথগুলো পরিবর্তিত হলো চওড়া পথে, পাহাড়ের এলিয়ে পড়া অংশগুলোকে কেটে সরিয়ে দেওয়া হলো, কাটা পড়লো কতো শত গাছগাছালি,লতা – বল্লরী আর এতোকাল সহজ সরল অরণ্যবাসী মানুষদের অভিভাবকের মতো আগলে রাখা মহাদ্রুমের দল। শঙ্কাগ্রস্ত মানুষকে বলা হলো – “তোমাদের ছাপোষা জীবনে এবার ঝড় উঠবে, উন্নয়নের ঝড়। তোমাদের কেন নদীকে যোগ করে দেওয়া হবে বেতোয়ার সঙ্গে। এতে তোমাদের মঙ্গল হবে – প্রজেক্টে কাজ পাবে, খেতিবারির জন্য জল পাবে,নলের জল এসে উঁকি দিয়ে যাবে তোমাদের দুয়ারে দুয়ারে, সুইচ টেপা আলোয় ঝলমল করে উঠবে গোটা ছাত্তারপুর আর পান্না জেলা। জানো, সরকার তোমাদের জন্য কতো রূপিয়া লগ্নি করছে – ৪৪৬০৫ কোটি টাকা! এমন বিনিয়োগ কেবলই তোমাদের উন্নয়নের জন্য। ভাবতে পারো ? সরকার তোমাদের কত্তো খেয়াল করে,বলো !
তবুও প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন তোলে চির বঞ্চিত সাধারণ মানুষেরা।
– আমাদের গ্রামগুলোর কী হবে?
– আমাদের খেতিবারির কী হবে?
– আমাদের জঙ্গলের অধিকারের কী হবে?
– আমাদের জঙ্গলের জানোয়ার আর চিড়িয়াদের কী হবে?
– আমাদের জোহার থান আর ছোট্ট গির্জার কী হবে?কোনো উত্তর নেই এসব প্রশ্নের।– “আরে বাপু! তোমাদের তো সরকারের পক্ষ থেকে ভালো রকমের মুআবজা দেওয়া হবে। তা দিয়ে অন্য কোথাও বসতি গড়ে তুলবে। ওহে!কিছু পেতে হলে যে কিছু ছাড়তেও হবে,সে কথা কি জানা নেই তোমাদের ?” রাতের গাঢ় অন্ধকারে পুলিশের ভারি বুটের শব্দে একটু একটু করে ভরে ওঠে কুপী গ্রামের ধূলিময় পথ। গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় প্রতিবাদী আন্দোলনের নেতা অমিত ভাটনগর সহ আরও কয়েকজন প্রতিবাদরত মানুষকে। এমন বেয়াদপি সহ্য হয়? লোক খেপানো অমিত অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসেছিলেন। তাঁকে ঘিরেই সংগঠিত হচ্ছিল প্রতিবাদ। অমিত ভাটনগর প্রশ্ন তুলেছেন জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মানুষদের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে। বিরাট ঘোটালা।
প্রজাদের প্রশ্নাতীত আনুগত্য যেখানে কাম্য, সেখানে এতোশত প্রশ্ন করে বাগড়া দেওয়া কেন বাবা? অমিত ভাটনগর সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ ও বাধা দেবার অভিযোগে গ্রেফতার হলেন। এর থেকে আর বেশি কিই বা করতে পারতো প্রশাসন?
সরকার তোমাদের উন্নয়নের জন্য ঝুলি উজাড় করে দিচ্ছে ।
এমন বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে সংলগ্ন দুটি রাজ্যের মানুষজন বিপুলভাবে লাভবান হবে, কেবলমাত্র ২০০০ টি আদিবাসী পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া হতে হবে। বৃহত্তর জনগণের স্বার্থে একটু আত্মত্যাগ করা যেতেই পারে। অবশ্য সাধারণ মানুষের কাছে এটুকু মোটেই সামান্য ছিলো না। তারা বুঝতে পারছিলেন যে একবার ভিটে ছাড়া হওয়ার অর্থ হলো তাদের এতোদিনের অনুসৃত জীবনের সমস্ত ছন্দ ছিঁড়ে ছিন্নমূল মানুষের অনিশ্চিত জীবনকে মেনে নিতে বাধ্য হওয়া। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন প্রচলিত সমস্ত দমন পীড়নের পন্থা অবলম্বন করতে কোনো কার্পণ্য করেনি , কিন্তু প্রতিবাদীরা নাছোড়। সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিতে হবে। পুলিশের সংস্পর্শ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে গ্রামের মানুষজন এক অভিনব কর্মসূচি পালন করার উদ্যোগ নেয় – চিতা আন্দোলন। নদীর ওপর পাতা হলো চিতা, গ্রামের মহিলারা এগিয়ে এলেন অদম্য উৎসাহে। সেই চিতার ওপর শুয়ে শুয়েই তারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। সেখান থেকে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস বা ক্ষমতা পুলিশ প্রশাসনের মানুষজনের ছিলোনা, এতোটাই কঠিন ও সংঘবদ্ধ ছিল সেই প্রতিরোধ। খানিকটা আমতা আমতা করে ছাত্তারপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আদিত্য পাটলে জানিয়েছেন – “কই! আমরা তো অমিত ভাটনগরকে গ্রেফতার করিনি ! অনশনের কারণে অমিত জীর স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল,তাই তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে”।প্রতিবাদ স্থলে একটা সামান্য চৌপায়ায় শুয়ে দুর্বল অশক্ত শরীরে দু সপ্তাহ ধরে অনশনরত অমিত ভাটনগর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে চলেছেন তাঁর প্রিয় সংগ্রামী সহযোদ্ধাদের সঙ্গে। চিতার ওপর অন্তিমশয়ানে শুয়ে থাকা অবস্থায় মহিলাদের প্রতীকি প্রতিবাদে টনক নড়েছে প্রশাসনের। এমন আন্দোলন হয়তো কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিলো প্রশাসনের কাছে। প্রতিবাদীরা আরও উন্নত সহায়তা প্যাকেজের দাবি করেছে । এছাড়া আর কিইবা করার ছিল তাদের ? নিজেদের ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় তুলে ধরার পাশাপাশি গলায় দড়ি বেঁধে আত্মহননের প্রচেষ্টা করার কথাও জ্ঞাপন করেছিলো প্রতিবাদে মুখর মানুষেরা নিতান্তই মরীয়া হয়ে। সুতীব্র আন্দোলনের ফলে প্রশাসন আবার নতুন করে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। নৈতিক জয় হয়েছে প্রতিবাদীদের। এই সাফল্যটুকুও নেহাত কম নয়।গত শুক্রবার অমিত ভাটনগর তাঁর মায়ের অনুরোধে দীর্ঘ ১৮ দিন ব্যাপী অনশন কর্মসূচি ভেঙেছেন। সত্যাগ্রহ অনশনের সঙ্গে আমরা পরিচিত সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই। এখন সরকার উন্নয়নের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। আন্দোলনের কাছে সাময়িক নতিস্বীকার করেছে প্রশাসন। তাঁরা সবকিছু নতুন করে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে। গ্রামের সাধারণ আদিবাসী মানুষজন অবশ্য এতেই আশ্বস্ত নন। এরমধ্যে পালিত হয়েছে অরন্ধন ব্রত। এমন ছোটো ছোটো প্রচেষ্টা আরও সংহত করেছে তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আর প্রতিবাদকে। এদেশে এখন এক আশ্চর্য শাসনতন্ত্র জারি হয়েছে। দেশের জল জঙ্গল জমি সব কিছুই এখন বড়ো বড়ো কর্পোরেট সংস্থার কাছে বিকিয়ে দিচ্ছে সব প্রতিবাদ প্রতিরোধকে উপেক্ষা করে। দেশের প্রধান গণমাধ্যমে এসব খবর আসে না। তবুও লড়াই জারি থাকে। অমিত ভাটনগর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন – অনশন ভঙ্গ করা মানে আন্দোলন থেকে সরে আসা নয়, ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তি সঞ্চয় করা উই শ্যাল ওভার কাম।বার্ণা নদীতে জল বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া মানুষদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। তবে আগুন একবার ধরলে তাকে নেভানো সহজ নয়। ওপরের জমাট বাঁধা ছাইয়ের নিচে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে ক্রোধ আর বঞ্চনার আগুন। কেন আর বেতোয়া নদী অববাহিকায় বসবাসরত মানুষজনের এই আন্দোলন সফল হোক। রাষ্ট্রযন্ত্রের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।
ঋণ স্বীকার:
তথ্য ও ছবির জন্য প্রচলিত সর্ব ভারতীয় সংবাদ সূত্রের কাছে ঋণী।
২৭ জুলাই, ২০২৬ ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা এবং দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘ দিন ধরে চলা আন্দোলনের সংহতিতে গত ২৪ জুলাই বামপন্থী
সহরচনাকারঃ পারমিতা দাশ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি বিদ্যালয়ের মিড ডে মিলের মেনুর বদল নিয়ে জোরদার বিতর্ক শুরু হয়েছে। নতুন সরকার মিড ডে মিলের জন্যে বরাদ্দ
সারা দেশ বর্তমানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে উত্তাল। ক্ষোভের আঁচ রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ এই সমস্যা আমাদের প্রত্যেকের। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।