গত ২৪শে জুলাই শহর কলকাতায় এক রূপকথার জন্ম হল। পড়ন্ত সূর্যের মায়াবি আলোয় লাখো মানুষের মিছিলে জ্বলে উঠল হাজার আশার ঝাড়বাতি। এই রূপকথার নির্মাণ যারা করল তারা সবাই এ শহরের বাসিন্দা নয়। দূরের শহরতলী, গ্রাম থেকে ট্রেনে, বাসে করে দল বেঁধে মিছিলে এসেছে। শহরের সমস্ত আনাচ কানাচ থেকে এসেছে অগণিত মানুষ। কেউ শাড়ি, সালোয়ার, কেউ ক্রপ টপ- জিন্স, কেউ বোরখায় আবৃত, কেউ স্পাইডার ম্যান, ব্যাট ম্যানের মুখোশ পরা। ঝাঁকে ঝাঁকে ‘আট টা নটার সূর্য ‘ দাপিয়ে বেড়ালো কাল শহরের প্রাণকেন্দ্র। পথের কোন কূলকিনারা ছিল না, যে দিকে দৃষ্টি যায় সেই দিকেই শুধু মানুষ – বঞ্চিত, অপমানিত, প্রতারিত ভয় ভাঙ্গা মানুষের বাঁধভাঙ্গা ক্ষোভ আর উল্লাস – গানে, কবিতায় স্লোগানে। নির্যাতিত মানুষের মিছিলই এখন পথ। এত মহিলা আর এত সংখ্যালঘুর অংশগ্রহণ কলকাতায় খুব কম মিছিলেই দেখা গেছে।
NEET পরীক্ষা বাতিলের পর সারা দেশ জুড়ে কুড়ি জন ছাত্র ছাত্রীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। শুধু NEET পরীক্ষা নয়, গত দশ বছরে মোট ১৫২ টি সর্ব ভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। জুন২০২৪ এর NET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও নাকি ফাঁস হয়ে গিয়েছিল! দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিরুদ্ধে দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ ও সোচ্চার হচ্ছে। যুক্তিসঙ্গত এবং স্বচ্ছ শিক্ষাব্যবস্থার দাবি মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। এই অধিকারের জন্যই শুরু হয়েছিল দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ পার্টির অনশন অবস্থান, এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন সোনাম ওয়াংচুক এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব। সারা দেশ জেগে উঠেছে এই আন্দোলনে। নবীন প্রজন্ম অতুলনীয় সাহস দেখিয়েছে পুলিশি দমন নিপীড়নের বিরুদ্ধে। ভারত জুড়ে বিজেপি আর আর এস এসের বিরুদ্ধে জনমত ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলা, বিহার, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং অন্যান্য রাজ্যে। সমর্থন জানিয়েছেন পাঞ্জাবের কৃষকেরা। বিদেশি ফান্ডিং আর বিদেশের চক্রান্ত বলে আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করে বিজেপির পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা দেশের মানুষকে বোকা বানাতে পারেনি।
মিছিল চলাকালীন কিছু সাংবাদিকদের ওপর নিগ্রহের ঘটনা ঘটে যা অবশ্যই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। কিন্তু গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে সংবাদ মাধ্যম তার ভূমিকা কতটা পালন করছে সেই প্রশ্ন তোলা খুব জরুরি। বড় মিডিয়া হাউসগুলি এখন মানুষের নির্যাতন, আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করা জরুরি মনে করেনা। যে কোন বিরুদ্ধতাকে দেশবিরোধী চক্রান্ত হিসাবে দাগিয়ে দিয়ে সরকারের নির্লজ্জ চাটুকারিতাই গোদি মিডিয়ার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে সাংবাদিক এবং সংবাদ মাধ্যম নিজেদের স্বাধীন চিন্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে মেরুদণ্ড বিক্রি করেন নি, ভারত রাষ্ট্র সুপারি কিলার আর ইডি পাঠিয়ে তাদের নির্ভীকতার পুরস্কার দিয়েছে। ২০১৪ তে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে ১০ জন স্বাধীন সাহসী সাংবাদিক অপরাধ চক্রের হাতে খুন হয়েছেন –
২৬ শে নভেম্বর ২০১৪ অন্ধ্র প্রদেশে এম ভি শঙ্কর,
২৭ মে ২০২৪ এ উড়িষ্যায় তরুণ কুমার আচার্য,
২০ জুন মধ্যপ্রদেশে সন্দীপ কোঠারি,
২০১৫ এ উত্তর প্রদেশে ১৩ আগস্ট সঞ্জয় পাঠক,
৩০ শে আগস্ট কর্নাটকে এম এম কালবুর্গি,
উত্তর প্রদেশে ৩রা অক্টোবর ২০১৫ এ হেমন্ত যাদব,
২০১৬ র ১৩ নভেম্বর বিহারে রাজদেও রঞ্জন,
২০১৬ র ২৩ শে র আগস্ট গুজরাটে কিশোর দাভে,
২০১৭ র ৫ই সেপ্টেম্বর কর্নাটকে গৌরী লঙ্কেশ,
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে ত্রিপুরায় সুদীপ দত্ত ভৌমিক।
শেষ ১২ বছরে নিহত সংবাদকর্মীর সংখ্যাটা হল ২৫। আজ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যারা অগ্নিবর্ষণ করছেন তাদের কতজন নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন যে সব সাংবাদিক তাদের হয়ে কথা বলেছিলেন ?
নিউজক্লিক, দ্য কুইন্ট, দ্য ক্যারাভ্যান, দ্য ওয়্যার —এই মিডিয়া হাউস গুলি ধারাবাহিকভাবেই সরকারি নীতিকে প্রশ্ন করে।
৩ অক্টোবর, ২০২৩ প্রবীর পুরকায়স্থ সহ নিউজক্লিকের অন্যান্য সাংবাদিকদের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি করে UAPA আইনে গ্রেফতার করা হয় প্রবীর পুরকায়স্থ ও অমিত চক্রবর্তীকে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের ১৫ মে গোটা প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেন এবং প্রবীর পুরকায়স্থ অব্যাহতি পান। কলকাতার যে সাংবাদিকরা সাংবাদিক নিগ্রহের প্রতিবাদে মিছিলের ডাক দিলেন তাঁরা তখন কটা মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন?
যন্তর মন্তরের স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনকে সরকারি নির্দেশে দেশবিরোধী চক্রান্ত হিসাবে প্রচার করেছে সরকারের পোষা সংবাদ মাধ্যম। ছাত্র ছাত্রী আর সাধারণ মানুষের উপর নির্মম পুলিশি নির্যাতনের খবর চেপে দিয়ে সোনাম ওয়াংচুক আর আরশোলাদের বিদেশি যোগাযোগ নিয়ে জোরদার আলোচনা করেছে এই সংবাদ মাধ্যম। সম্প্রতি পররাষ্ট্র দপ্তর সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছে ছাত্র আন্দোলনে বিদেশি অর্থ সাহায্য সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই সরকারের কাছে। ভুয়ো অভিযোগের ভিত্তিতে মিডিয়া ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার চালিয়ে গেছে। ডিম ছোঁড়াকে গণরোষের বহিঃপ্রকাশ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছে, তৃণমূলের আশ্রিত কিছু সমাজবিরোধীকে হাফ প্যান্ট পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে এলাকায় ঘোরানোর ঘটনায় হাততালি দিয়ে মানুষকে খেপিয়েছে এই মিডিয়া। ২৪ তারিখের আন্দোলনকারীদের মধ্যে মিডিয়া নিগ্রহের অভিযোগে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের গ্রেফতার করে অপরাধের ঘটনা পুনর্নির্মাণের নামে ধর্মতলায় যখন খালি পায়ে হাঁটিয়েছে পুলিশ তখন এই মিডিয়া উল্লাসে ফেটে পড়েছে।
তাই মিডিয়ার গনতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় আমরা যেন মাথায় রাখি একটি চরম অগণতান্ত্রিক পরিবেশে গণতান্ত্রিক নিরপেক্ষতা কথাটা সোনার পাথরবাটির মতো শোনায়। গণতন্ত্র বাঁচানোর জিগির তুলে বিরোধী আর সংখ্যালঘুদের উপর নেমে আসে রাষ্ট্রের উদ্যত খড়গ।
গত এক মাসে বিজেপি আর এস এসের গদি টলেছে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে। বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় ভারতীয় দূতাবাসের সামনে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। বিপুল জনাদেশ নিয়ে আসা সরকার তাই নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে। নতুন প্রজন্ম ভয়ের অচলায়তন ভেঙ্গে দিয়ে নিয়ে এসেছে প্রতিবাদের মুক্তধারা। অত্যাচারীর মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠেছে। এই প্রজন্মই নতুন ইতিহাসের সারথি।
রূপকথার যে আশ্চর্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল ২৪ জুলাই এর ধর্মতলা, সেই আলোর রেখায় আঁকা হচ্ছে ভবিষ্যতের পথ-
“কল্লোলিনী শহর আমার,
ফিরেছো আপন রূপে
বিদ্রোহের রাঙা আলোয় অপূর্ব সে মুখ
ভয়ের বাঁধ ভেঙে বানভাসি পাপের খোঁয়াড়
মুক্তধারায় ধুয়ে দাও গৈরিক গ্লানির চিহ্ন”
কৃতজ্ঞতা:
সৃজন ভট্টাচার্য
দেবাশিস গোস্বামী
অসিত ভট্টাচার্য










