মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রাণাকে বাংলাদেশী সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে ওড়িশার সম্বলপুরে। এই বাংলার হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে গিয়েছেন কাজের জন্য। বাংলাভাষায় কথা বলার জন্য বাংলাদেশী সন্দেহে তাদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্যে। এর কারণ কেন্দ্রিয় সরকারেরই বিদ্বেষী মনোভাব। কেন বলছি একথা, ব্যাখ্যা করছি।
বীরভূমের পাইকরের বাসিন্দা সুনালী বিবির কাহিনী এখন সবার জানা। সুনালীরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে দিল্লিতে কাজ করছিলেন। বিগত বছরের ২৪ জুন স্রেফ বাংলায় কথা বলার অপরাধে বাংলাদেশি সন্দেহে কেন্দ্রিয় সরকার অধীনস্থ দিল্লি পুলিশ সুনালী, তার স্বামী দানিস শেখ, আট বছরের পুত্র সাবিরসহ পরিবারের আরও তিনজনকে পুলিশ আটক করে। তাঁরা এদেশের নাগরিকত্বের নানান বৈধ কাগজপত্র পুলিশের কাছে পেশ করেন।
কিন্তু পুলিশ এবং FRRO (Foreigners Regional Registration Office) কর্ণপাত করেনি তাঁদের কথায়। মাত্র ৪৮ ঘন্টার ভেতর ২৬ জুন তাঁদের বাংলাদেশে জোর করে পুশ ব্যাক করা হয়। সুনালী তখন আটমাসের অন্তসত্তা। কোনো মানবিক দিকেরও ধার ধারেনি আমাদের ভারত সরকার। তাঁদের স্থান হয় বাংলাদেশের চাপাইনবাবগঞ্জের জেলে।
সুনালীর বাবা হাইকোর্টে আপীল করেন। হাইকোর্ট তাঁদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে এবং deportation। পদ্ধতি ক্ষতিয়ে দেখে বলে
১. সুনালী বিবি ও অন্যদের যে ভাবে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা আইনসম্মত deportation নয়।
২. Foreigners Act, 1946, Citizenship Rules, FRRO-র নির্ধারিত প্রক্রিয়া,কোনোটাই মানা হয়নি।
৩. গর্ভবতী নারী ও শিশুর ক্ষেত্রে মানবাধিকার সম্পূর্ণ লঙ্ঘিত হয়েছে।
হাইকোর্ট ২৬ সেপ্টেম্বর রায় দেয় কেন্দ্রিয় সরকারকে চার সপ্তাহের ভেতর সবাইকে দেশে ফেরৎ আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে এরকম push back যেন না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশেও একটি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ রায় দেয় যে সুনালী ও তার পরিবারের সদস্যরা আসলে ভারতীয় নাগরিক এবং তাদের ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
কোনো সরকারের যদি অসাধু উদ্দশ্য না থাকে তাহলে সে এরপর তড়িঘড়ি সমস্ত তথ্য ক্ষতিয়ে দেখে দেশের নাগরিকের ওপর যে ভয়ংকর অন্যায় হয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে দ্রুত তার নাগরিকদের দেশে ফেরৎ আনার চেষ্টা করবে কারণ তাঁরা যে কাগজপত্র দিয়েছেন তা বৈধ এবং অকাট্য। অথচ আমাদের কেন্দ্রিয় সরকার সুনালীদের বক্তব্য সঠিক কি না তা নিয়ে ন্যুনতম তদন্তটুকু না করে হাই কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে চলে গেল সুপ্রিম কোর্টে এই যুক্তি দেখিয়ে যে সুনালীরা বাংলাদেশের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এর বিরুদ্ধে রায় দিয়ে হাইকোর্ট তার সীমা অতিক্রম করেছে কারণ হাই কোর্ট দেশের বৈদেশিক বিষয় (foreign affairrs) নিয়ে কোনো রায় দিতেই পারে না। ব্যাস বিষয়টি চলে গেল আরো আইনি জটিলতার খপ্পরে।
জেলে থাকতে থাকতে সুনালীর বাংলাদেশেই প্রসব হয় এবং সুপ্রিম কোর্ট মানবিকতার ভিত্তিতে সুনালী ও তার শিশুদের এদেশে ফেরানোর রায় দিলেও বাকিরা আজও আইনের বেড়াজালে বাংলাদেশের কারান্তরালে অভিশপ্ত কাল কাটাচ্ছেন দুঃস্বপ্নের মত।
এই ঘটনার বিপদটা একটু ভেবে দেখা যাক। সুনালীরা তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যে সকল নথিপত্র দেখিয়েছিল তা হল-
১. আধার কার্ড, ২. প্যান কার্ড, ৩. ভোটার আইডি, ৪. ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় সুনালীর বাবা মা এবং পরিবারের অন্যান্যদের নাম থাকার প্রমাণ, ৫. পরিবারের বহু পুরোনো জমির দলিল, ৬., এদেশে দীর্ঘদিনের বসবাসের প্রমাণ হিসেবে স্থানীয়দের সাক্ষ্য। এগুলোর কোনোটাই কিংবা সবগুলো একত্রে দেখেও সরকার নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে মানেনি আর এদের একমাত্র অপরাধ ছিল বাংলায় কথা বলা।
এখন কথা হল সরকার যদি কাউকে শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার কারণে তার বৈধ নাগরিকত্বকে অস্বীকার করে গায়ের জোরে তাকে বিদেশের মাটিতে push back করে তাহলে নাগরিক অধিকার এই দেশে বিন্দুমাত্র থাকে কি? এত সব বৈধ কাগজের যদি কোনো মূল্য না থাকে তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে যে দল তারা তো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বা প্রতিহিংসা মেটাতে যে কোনো বাংলাভাষী নাগরিককে যে কোনো দিন অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে push back করতে পারে! তারপর তো যাদের ক্ষমতা আছে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টে লড়ে ফিরে আসার হয়ত মরিয়া চেষ্টা চালাবে আর যারা তা পারবে পচে মরবে বিদেশের কারাগারে!
একটা নির্বাচিত সরকার তার কোনো বৈধ নাগরিকের প্রতি এতবড় অন্যায় করতে পারে? বাংলাভাষী কোনো নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত নয় এই দেশে? সুনালীর পরিবার যে বিভীষিকার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তার দায় কে নেবে?
এসবের উত্তর নেই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই বাংলায় ভোটের প্রচারে আসা শুরু করে দিয়েছেন, কিন্তু দেখবেন এতবড় নির্লজ্জ অন্যায় করার পর এই বিষয়ে তাঁরা সম্পূর্ণ নীরব। এই বাংলার বিজেপি নেতারাও মুখে কুলুপ এঁটেছেন! তাঁরা শীর্ষ নেতৃত্বকে কোনো প্রশ্ন যেমন করেন্ননি তেমনি জবাবদিহি করেননি এই বাংলার মানুষের কাছেও। এর অর্থ এটাকে তাঁরা অন্যায় বলে মনেই করেন না। তাই বিজেপি শাসিত রাজ্যে রাজ্যে বাংলাভাষীদের হেনস্থা এবং মব লিঞ্চিং হয়ত আরো দেখতে হবে আমাদের। আর পাশাপাশি হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের স্লোগান আস্তিনের নীচে লুকিয়ে রেখে চলবে এই রাজ্যে বিজেপির ২৬-এর ভোটপ্রচার!











