অনেকগুলো ছোটবড় লড়াই মিলেই যুদ্ধ – এমনকি যুদ্ধের মধ্যেও অনেকগুলো ফ্রন্ট, সেই প্রতিটি ফ্রন্টে অনেকগুলো লড়াই। প্রতিটি লড়াই গুরুত্বপূর্ণ – কেননা লড়াইগুলো না জিতে একটা ফ্রন্ট-ও জেতা যায় না, যুদ্ধ জেতা তো অনেক অনেএএক দূরের কথা। তদুপরি, প্রতিটি লড়াইয়ে জয় মনের জোর ও নৈতিক বল বাড়ায় – সামগ্রিক যুদ্ধজয়ের পথে যে বাড়তি মনোবল খুবই কার্যকরী।
তো স্বাস্থ্য-দফতরের এই বিপুল দুর্নীতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে আমাদের এই প্রতিবাদকে যদি যুদ্ধ হিসেবে দেখি – অথবা যদি সামগ্রিকভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় যুদ্ধের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হিসেবে দেখি – তাহলে, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনটা সেই যুদ্ধের অংশ মাত্র। হ্যাঁ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং খুবই বড় একটা লড়াই – যে লড়াইয়ে তাঁরা জিতেছেন, আমরা সবাই জিতেছি – কিন্তু এটাকে যুদ্ধজয় হিসেবে ধরে নিলে ভুল হবে।
অনেক অনেএএক কাজ এখনও বাকি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামগ্রিক যুদ্ধের কথা তো বাদই দিন, শুধুমাত্র স্বাস্থ্য-দফতরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধটি জিততেও এখনও আমাদের অনেক পথ যেতে হবে।
যেমন :
১. স্বাস্থ্য-দফতরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অতি প্রাচীন হলেও গত কয়েক বছর ধরে এই অনাচার ভয়াবহ স্তরে পৌঁছেছে। আমরা যদি সময়সীমা হিসেবে বিশেষ কোনও মুহূর্তকে চিহ্নিত করতে চাই, তাহলে আমাদের ধরতেই হবে বিগত মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচন (২০২২ সালে অনুষ্ঠিত)। ওই সময় থেকেই স্বাস্থ্য-দফতরের নিয়ন্ত্রণ এই তথাকথিত ‘নর্থ-বেঙ্গল লবি’-র কুচক্রীদের হাতে চলে যায়।
উত্তরবঙ্গ লবির অপরাধীগোষ্ঠী হুমকি ও তোলাবাজির সাম্রাজ্য বিস্তারের শুরু এই রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল থেকেই।
চিকিৎসার নৈতিকতা রক্ষিত হচ্ছে কিনা, আইন ও এথিক্সের দিকটি চিকিৎসাক্ষেত্রে রক্ষিত হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা-ই মেডিকেল কাউন্সিলের কাজ। এই ‘খতিয়ে দেখা’ রোগী-পরিজনের অভিযোগের ভিত্তিতেও হতে পারে, আবার কখনও কাউন্সিল স্বতঃপ্রণোদিতভাবেও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। এবং চিকিৎসকের অনৈতিক আচরণ তথা দোষ/অপরাধ প্রমাণিত হলে কাউন্সিল চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন কিছু সময়ের জন্য সাসপেন্ড করতে পারেন, অথবা অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে পাকাপাকিভাবে বাতিলও করতে পারেন। আর বলাই বাহুল্য, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনও চিকিৎসকই চিকিৎসা করতে পারেন না।
তো এই বিপুল ক্ষমতা যদি এমন কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়, যাঁরা নিজেরাই দুর্নীতিগ্রস্ত তোলাবাজ অপরাধী, তাহলে যা যা আশঙ্কা করা যায়, তা-ই ঘটেছে। মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা নেওয়া হয়েছে। কোনও গোলমেলে ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসক বিপুল টাকা ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেয়ে গেছেন – আবার সৎ চিকিৎসক ঘুষ দিতে রাজি হননি বলে অকারণ হয়রান হয়েছেন। চক্ষুশূল চিকিৎসকরা হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন।
যেকথা বলার, আপাতদৃষ্টিতে এই সমস্যা শুধু ডাক্তারদের পেশাগত সমস্যা বলে মনে হলেও, এর অভিঘাত রাজ্যের সব নাগরিককেই পোয়াতে হবে। অন্যায়কারী সাজা না পেলে – টাকার বিনিময়ে সব সেটল করে ফেলা যাবে, এটা বুঝে গেলে – তার অন্যায় পরিসর-পরিধি ও গভীরতা, দুই দিক থেকেই বাড়তে থাকে। অপরদিকে, সৎ চিকিৎসকও হয়রান হওয়ার ভয়ে বেশি সাবধানী হতে থাকেন। দিনের শেষে, দুই ক্ষেত্রেই, ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই রোগী-পরিজন।
তো রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের সাফাই অভিযান একান্ত জরুরি। একাজে আর এক মুহূর্তও দেরি করাটা অনুচিত। এখুনি দাবি উঠুক, বর্তমান রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল ভেঙে নতুন কাউন্সিল নির্বাচনের ঘোষণা করা হোক।
২. মনে রাখতে হবে, অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
খুনী-ধর্ষকের নাম আমরা জানি না।
কিন্তু আনুষঙ্গিক ঘটনাক্রমের অপরাধীদের নাম আমরা জানি। অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, সুশান্ত রায়, সৌরভ পাল ইত্যাদি প্রভৃতি থেকে সুদীপ্ত রায় অবধি। খাতায়-কলমে এঁরা সবাই ডাক্তার। এঁদের বিরুদ্ধে এখনও সেভাবে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দু’জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু এ-ও মনে রাখা জরুরি, যে, আখতার আলির অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধেও তদন্ত হচ্ছিল – পরিণতিতে আখতার আলিই বদলি হয়ে যান। স্বাস্থ্য-বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন উপাচার্য সুহৃতা পালের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছিল – যদ্দূর জানি, তদন্ত চলছেও – কিন্তু ইতোমধ্যে তিনি একটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে গেছেন। সুতরাং, এই রাজ্যে তদন্ত হলো দুর্নীতি ধামাচাপা দেবার একটি কার্যকরী ব্যবস্থা।
৩. দুই স্বাস্থ্য-আধিকারিক – ডিএমই (ডিরেক্টর অফ মেডিকেল এডুকেশন) এবং ডিএইচএস (ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিসেস) – তাঁদের বদলি করা হবে, খুবই ভালো কথা। কিন্তু এই লাগামছাড়া দুর্নীতিতে তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখবেন কে বা কারা? অন্তত বিভাগীয় তদন্তটুকু শুরু হবে তো? নইলে তো দুদিন বাদে এঁরা বলতে শুরু করবেন, যে, এঁরা অবিচার ও রাজনীতির শিকার!! এঁদের কার্যকলাপ আতস-কাঁচের নিচে আসুক। এখুনি।
৪. বর্তমান ডিএইচএস মাত্র মাসখানেক আগে পদে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু চরম দুর্নীতি-অনাচারের দিনগুলোতে যিনি ডিএইচএস ছিলেন, তিনি অবসরপ্রাপ্ত হলেও, তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হোক। ক্ষমতার দালালি করতে করতে, চালু কথায় চটি চাটতে চাটতে, যে মহাত্মা নিজের নাকের চিকিৎসার অবকাশটুকু পাননি (তাঁর কণ্ঠ যিনি একবারও শুনেছেন, তিনিই এই কথার তাৎপর্য বুঝবেন), তাঁকে এমন করে অবহেলা করাটা নিতান্ত অনুচিত কাজ হবে।
৫. কলেজে কলেজে থ্রেট কালচার বা হুমকি সংস্কৃতি কারা কারা চালিয়ে এসেছে, সেই নামগুলো এতদিনে অনেকেই জেনে গেছেন। তাঁদের চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কলেজ থেকে দূরে রাখা হোক। এদের অনেকেই আবার তাল বুঝে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিশে যাবার চেষ্টা করছেন – সমাজমাধ্যমে আন্দোলনের সপক্ষে নরমগরম বক্তব্য শোনাচ্ছেন – কেউ কেউ আবার শুধুই অভীক-বিরূপাক্ষর কথায় এসব করতে বাধ্য হয়েছি ইত্যাদি বলে ভালো সাজার চেষ্টা করছেন (বেশ কিছু মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ উপাধ্যক্ষ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত) – তাঁদের চিহ্নিত করুন। আইনি/বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তা যদি সম্ভব না হয়, অন্তত সামাজিকভাবে এঁদের বর্জন করুন।
৬. প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে নম্বর বাড়ানো-কমানো, মূল কেন্দ্র স্বাস্থ্য-বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও…
নাহ্, লিস্টি লম্বা করছি না। প্রথম পাঁচটা পয়েন্ট – প্রথম পাঁচটা লড়াই – জেতা গেলেই এই যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে আসবে। বাকি অপরাধীদের আত্মসমর্পণ, তখন, শুধু সময়ের অপেক্ষা।
লড়াইয়ের সংখ্যাক্রম, অন্তত আমি যেটুকু বুঝি সেই ভাবনায়, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাজানো।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লড়াইয়ে জয় এসেছে। স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আত্মপ্রসাদ বিপজ্জনক।
কেননা, আবারও মনে রাখুন, আমাদের অস্ত্র আবেগ আর সৎ-ইচ্ছা – সত্যের জোর আমাদের পক্ষে, অবশ্যই – কিন্তু বিপক্ষ অর্থবলে অনেক অনেএএক এগিয়ে, সংগঠিত অপরাধীদল হিসেবে সংগঠনেও। এবং রাষ্ট্রশক্তির প্রতিটি উপকরণ, এখনও, তাদের নিয়ন্ত্রণে। যুদ্ধ সহজ নয়।
তবে, জেতা জরুরি, জিততেই হবে, না জিতলেই নয় – any goal worth fighting for – এমন কোন যুদ্ধই বা কবে কোথায় সহজে জেতা গিয়েছে!!










